বিহঙ্গ রে

বিহঙ্গ রে

--পীযূষকান্তি বিশ্বাস

 
দূরে… বহুদূরে… আকাশ যেখানে বরফ স্পর্শ করে, সেই সাইবেরিয়ার ভূমির ওপর দিয়ে শীতল হাওয়া ভেসে এসেছে। নদীগুলো সেখানে বছরভর জমাট বরফে আবদ্ধ থাকে আর গ্রীষ্মকালেও নদীর ভেতরকার জল পুরোটাই বরফের ছায়ায় ঝলমল করে। তবে সেই বরফের দেশ থেকে একদল পরিযায়ী পাখি উড়ে এলো, যেন সীমাহীন আকাশের অদৃশ্য সফরীরা। তাদের কাছে কোনো পাসপোর্ট নেই, নেই কাঁটাতারের অনুমতি। তাদের দেশ হলো আকাশ; তাদের মানচিত্র, কেবল হাওয়ার স্রোত আর উত্তর নক্ষত্রের আলো।
দিল্লির ধূসর আকাশে যখন শীতের হিমেল পরশ নামে, তখন দূর দেশের পাখিরা তাদের ডানায় হাজার হাজার মাইলের স্মৃতি নিয়ে উড়ে আসে সুলতানপুরের জলাশয়ে। এ এক অদ্ভুত টান, এক অমোঘ আকর্ষণ। সাইবেরিয়ার বরফঢাকা প্রান্তর, মঙ্গোলিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, চীনের উত্তরের হ্রদ কিংবা রাশিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলের কনকনে শীতকে পিছনে ফেলে তারা আসে এক টুকরো উষ্ণতার খোঁজে, এক মুঠো খাবারের সন্ধানে। দিল্লির শুষ্ক প্রকৃতিতে সুলতানপুরের এই জলাশয় যেন এক মরুদ্যান, পরিযায়ী পাখিদের এক ক্ষণিকের স্বর্গ।
এই পাখিদের দলেই ছিল দীপ্তনেত্র, তার সাদা পালকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চোখের দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ ও উজ্জ্বল। তুন্দ্রা থেকে উড়ে আসা এই পাখিটি ছিল মাছ ধরায় ওস্তাদ। তার লম্বা, সরু ঠোঁট যেন জলের গভীরে লুকিয়ে থাকা শিকারকে এক নিমেষে চিনে নিত। আরেকজন ছিল চন্দ্রমুখ, গোলগাল চেহারা আর হালকা লাল ঠোঁটের এই পাখিটি এসেছিল সাইবেরিয়া থেকে। তার স্বভাব ছিল শান্ত, মায়াবী। তাদের দলে আরও ছিল লাপ, যে ডিগবাজি খেয়ে সকলের মন জয় করত, আর ছিল গৌরমুখ, যার কণ্ঠের দীর্ঘ তান বাতাসে সুরের অনুরণন তুলত। গৌরমুখ এসেছিল উত্তর মঙ্গোলিয়া থেকে, তার ফেলে আসা দেশের জন্য তার মন সর্বদাই ভারাক্রান্ত থাকত।
দলের সবচেয়ে প্রবীণ ও বিশালকায় ছিল শশিনখ। তার গম্ভীর স্বভাবের জন্য অন্য পাখিরা তাকে একটু সমীহ করেই চলত। সে যখন মাছ ধরতে নামত, তখন তার আশেপাশের এলাকা থাকত জনশূন্য। কৃষ্ণকায় ক্ষীণকণ্ঠ আর তার সহচরী করুণাক্ষি ছিল এই দলের আর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা কোনো এক জায়গায় স্থির থাকত না, সুলতানপুরের সমস্ত জলাশয়ে তাদের অবাধ বিচরণ ছিল।
দিল্লি সহজ দেশ নয়। এ হলো এক অদ্ভুত ভূখণ্ড, যেখানে আকাশ যেনা এক নিঃশ্বাসে শুকনো করে দেয় নদী। কখনো হঠাৎ বৃষ্টি নামে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় বাতাসে আগুন। তারপরও, এই শুকনো ভূমিতেই প্রতি বছর দূরদেশের পাখিরা আসে। কেন আসে, কেউ জানে না। হয়তো এ এক ধ্রুব টান।
সে বছর দিল্লিতে বৃষ্টি হয়েছিল প্রচুর। জলাশয়গুলো কানায় কানায় পূর্ণ ছিল, আর মাছেরাও ছিল আকারে বড় ও সংখ্যায় অনেক। দিনের শেষে মাছ ধরা আর খেলাধুলার পর পাখিরা এসে জড়ো হত বাবলা আর অর্জুন গাছের ডালে। রাত নামলে শুরু হত তাদের গল্পগুজব, তাদের আলোচনা। সুলতানপুর থেকে ভরতপুরের জলাশয় কতটা উন্নত, সেখানকার মাটির গুণাগুণ, ঘন জঙ্গলের আরামদায়ক আশ্রয়—এইসব নিয়েই চলত তাদের রাতের আড্ডা। ভরতপুর যেন তাদের কাছে এক স্বপ্নের দেশ, এক উন্নত জগৎ, যেমনভাবে মানুষ আমেরিকার চাকচিক্য নিয়ে আলোচনা করে।
গৌরমুখ তার ফেলে আসা দেশের কথা বলত। উত্তর মঙ্গোলিয়ার সেই বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর, তার শৈশবের সেই হ্রদ, যেখানে সে প্রথম উড়তে শিখেছিল—এইসব স্মৃতিচারণায় তার কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসত। সে বলত, এই মরশুম শেষ হলেই সে ফিরে যাবে তার নিজের দেশে। দীপ্তনেত্রের মনেও ছিল তার তুন্দ্রা অঞ্চলের টান। সেখানে খাবারের অভাব হয়তো ততটা ছিল না, কিন্তু এক অজানা আকর্ষণে সে প্রতি বছর উড়ে আসত এই সুলতানপুরে।
দীপ্তনেত্র যে ডালে বসত, সেই ডালেই ছিল চন্দ্রমুখের আশ্রয়। একসাথে থাকতে থাকতে, একসাথে শিকারে যেতে যেতে, একসাথে সাঁতার কাটতে কাটতে কখন যে তাদের মধ্যে এক গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি। চন্দ্রমুখের শান্ত, স্নিগ্ধ স্বভাব দীপ্তনেত্রের মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিত। আর দীপ্তনেত্রের শিকার ধরার কৌশল, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চন্দ্রমুখকে মুগ্ধ করত। সমান্তরাল স্রোতে সাঁতার কাটতে কাটতে, আকাশে পাশাপাশি ঝাপটাতে ঝাপটাতে, অচেতনভাবে জন্ম নেয় প্রেম—যে প্রেম আসলে বলার নয়, কেবল একসঙ্গে থাকা।
সুলতানপুর তখন ভরা বর্ষায় অস্থায়ী স্বর্গ হয়ে উঠেছিল। কাদায় খেলাধুলা, কবে যাবে কোথায় যাবে সেই সব পরিকল্পনায় রাত কাটে। কিন্তু মরশুম অবধি স্বর্গ থাকে না। দিল্লির এপ্রিল-মে এলে সবুজের রং ফিকে হয়ে যায়। হাওয়ায় ঝাপসা আগুন ঝরে পড়ে, পাথর হয়ে যায় তরতাজা মাঠ।
দিন গড়িয়ে চলল। শীতের শেষে বসন্ত এল, তারপর গ্রীষ্ম। দিল্লির গরম বাড়তে শুরু করল। এপ্রিল-মে মাস নাগাদ গরম যখন অসহনীয় হয়ে উঠল, তখন শশিনখ একদিন প্রস্তাব দিল, এবার ফেরার পালা। আকাশে মেঘের আনাগোনা কম, বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তাই এখনই দল বেঁধে উড়ে যাওয়ার সেরা সময়। চার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে, মাঝে বিশ্রামের সুযোগ বিশেষ মিলবে না।
দীপ্তনেত্র তার ডানা ঝাপটিয়ে নিজের শক্তি মেপে নিল। গৌরমুখ ঘোষণা করল, সে-ই উড়ানের ফর্মেশন লিড করবে। তার বাঁয়ে থাকবে চন্দ্রমুখ আর ডাইনে দীপ্তনেত্র। পিছনে থাকবে শশিনখ ও অন্যান্যরা। সবাই যখন ফেরার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন চন্দ্রমুখ এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে ছিল।
একদিন সন্ধ্যায়, যখন সবাই তাদের ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে উত্তেজিত, তখন চন্দ্রমুখ ধীর স্বরে বলল:
"আমার যাওয়া হবে না।"
তার কথায় সবাই অবাক হয়ে গেল।  গৌরমুখ জিজ্ঞেস করল:
"কেন? তোমার কি শরীর খারাপ?"
চন্দ্রমুখ মাথা নেড়ে জানাল, সে সুস্থ। তারপর সে সবাইকে নিয়ে গেল অশ্বত্থ গাছের ডালে তার বাসার কাছে। সেখানে দুটি ফ্যাকাশে নীল রঙের ডিম পরম যত্নে সাজানো ছিল। চন্দ্রমুখ বলল:
"এই ডিম দুটি রেখে আমি উড়ে যেতে পারব না। আমার আগামী সন্তানদের কথা ভেবে আমি দিল্লির এই আবহাওয়া, এই জল-বাতাসকে আপন করে নিয়েছি। আমি এখানেই থেকে যেতে চাই। এই সুলতানপুরের জলাশয়ই হবে আমার অন্তিম শয্যা।"
চন্দ্রমুখের এই সিদ্ধান্তে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। দীপ্তনেত্রের মন দুঃখে ভরে গেল। সে চন্দ্রমুখকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু চন্দ্রমুখ তার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। সে বলেছিল, "যেখানে আমার সন্তানরা জন্মাবে, সেটাই আমার দেশ। আমি তাদের এই দেশের মাটিতেই বড় করে তুলতে চাই।"
অবশেষে বিদায়ের দিন এল। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে গৌরমুখের নেতৃত্বে পাখিদের ঝাঁক উড়ে চলল তাদের নিজেদের দেশের উদ্দেশে। দীপ্তনেত্র শেষবারের মতো চন্দ্রমুখের দিকে তাকাল। তার চোখে ছিল জল। চন্দ্রমুখ তার বাসা থেকে তাদের উড়ে যাওয়া দেখছিল। তার মনও ভারাক্রান্ত ছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল এক নতুন জীবনের স্বপ্ন।
দিল্লির আকাশে পাখিদের ঝাঁক মিলিয়ে গেল। চন্দ্রমুখ থেকে গেল দিল্লিতে। নীড়ে বসে, ঠোঁটে উষ্ণতা মেখে সে ডিম পাহারা দিল। দিন কেটে গেল, উড়ানের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল। চারপাশ ধীরে ধীরে থেমে এলো, সুলতানপুরের শান্ত বাতাসে শোনা গেল শুধু তার সন্তানের ফুঁড়ে বেরোনোর আওয়াজ। সে এখন আর পরিযায়ী নয়, সে এখন দিল্লির স্থায়ী বাসিন্দা। এই শহরকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেছে। তার কাছে এখন সুলতানপুরের জলাশয়ই সাইবেরিয়ার বরফঢাকা প্রান্তর, অশ্বত্থের ডালই তার তুন্দ্রা অঞ্চলের আশ্রয়। সে তার সন্তানদের শেখাবে দিল্লির আকাশে উড়তে, এই জলাশয়ে শিকার করতে। কিন্তু সুলতানপুরের আকাশে এখনো ভেসে বেড়ায় অন্যরকম ডানার শব্দ—চন্দ্রমুখের সন্তানদের। সুলতানপুরের রাত দীর্ঘ হয়। গাছের ডালে ডালে কখনো আগের মতোই একইভাবে  হাওয়া গান করে।  দূরে এখনও নক্ষত্র জ্বলছে। অদূরে গৌরমুখ, দীপ্তনেত্র আর শশিনখ হয়তো ফিরে গেছে তাদের জন্মভূমির দিকে।
 

Comments