ক্যাট আই

ক্যাট আই

--পীযূষকান্তি বিশ্বাস

 

যেখানেই জোড়াপাখি ,  

সেখানেই কালবৈশাখী ।

 

কালবৈশাখী ঝড় আমাকে শিখিয়ে গিয়েছিল,  কিছু প্রেম থাকে যা কেবল একদিনের জন্য আসে। আর তা স্বপ্ন স্মৃতিসৌধ ভেঙ্গে দিয়ে যায় । রয়ে যায় তার আঁচড় । আর কিছু স্মৃতি থাকে যা ছেঁড়া ঘুড়ির মতো  হাতে বাঁধা,  কেটে গেছে তবু কাটে নাই তার রেশটুকু থেকে যায় আজীবন। কালবৈশাখীর সঙ্গে কাটানো এমন একটি বৈশাখের কথা মনে প্ড়ে । সে ছিলো এক দশক আগের কথা । আমার কাছে পহেলা বৈশাখ মানে শুধু নতুন বছরের শুরু ছিলো না,  শুধু উৎসবের রঙ আর গান নয় । আমার কাছে পহেলা বৈশাখ মানে এক পরাবাস্তব প্রেমের স্মৃতি, যার রঙটা ঠিক লাল বা সাদা নয়, বরং নোনা। চোখের জলের মতো নোনা, স্মৃতির মতো নোনা।

 

দিল্লির বুকে বসেও বৈশাখকে অনুভব করা যায়, তবে সে অনুভবে ঢাকার সেই আদি অকৃত্রিম উত্তাপ কই? এখানেও বৈশাখ আসে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে নিয়মমাফিক। কিন্তু সে যেন এক প্রবাসী বৈশাখ, যার শরীরে ধুলোমাখা লু হাওয়ার গন্ধ, প্রাণের স্পন্দন সেখানে কই? চৈত্র শেষের এই দিনগুলোতে দিল্লির আকাশটাও তেতে ওঠে বটে, কিন্তু সে তেতে ওঠা যেন এক যান্ত্রিক ঘোষণা – গ্রীষ্ম আসছে, তৈরি থেকো।

 

আমি শিবেন উপাধ্যায়, প্রবাসী বাঙালি। পেশায় না হলেও নেশায় কবি। অনেকে শিবুদা বলেও ডাকে অবশ্য। দিল্লির আইআইটিতে চাকরি করতাম । প্রবাসে কেটে গেলো এই পঞ্চাশ বছর ।  দিল্লিতে থাকি বটে, কিন্তু মন পড়ে থাকে বাংলার দুই তীরে – কলকাতা আর ঢাকা। বাংলা ভাষার নতুন বাঁক, নতুন স্রোত, দুই বাংলার সাহিত্যের আনাগোনা – এসবের খোঁজখবর রাখাটা আমার মজ্জাগত। আর এই খোঁজ রাখতে রাখতেই গত কলকাতা বইমেলায় পরিচয় হয়েছিল নাহিদা ইয়াসমিনের সাথে। নাহিদা – ঢাকার তরুণ কবি, যার দীঘল কালো চোখের মণি দুটোতে অদ্ভুত এক বেড়ালের চোখের দ্যুতি। বুদ্ধিদীপ্ত মুখশ্রী, হাসিতে মুক্তো ঝরে, আর কথায় ঝরে পড়ে কবিতার ফল্গুধারা। ‘বিউটি উইথ ব্রেন’ কথাটা যেন ওর জন্যই তৈরি। কয়েক দিনের পরিচয়েই মনে হয়েছিল, এ মেয়ে যেন শুধু কবি নয়, নিজেই এক চলমান কবিতা।

 

সেই নাহিদাই ফোন করে মনে করিয়ে দিয়েছিল, "শিবেনদা, পহেলা বৈশাখ আসছে। ঢাকায় আসছেন তো?"

 

ঢাকার পহেলা বৈশাখ! সে তো এক কিংবদন্তী। গল্প শুনেছি, ছবি দেখেছি, লেখা পড়েছি। কিন্তু নিজে কখনো সেই জনসমুদ্রে মিশে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা – এ সবই ছিল আমার কাছে বইতে পড়া বা টিভিতে দেখা দৃশ্য। নাহিদার আমন্ত্রণটা যেন সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটার পালে হাওয়া দিল।

 

কিন্তু এই গ্রীষ্ম? বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য – এই দুই মাস জুড়ে যে তীব্র দাবদাহ চলবে বাংলা জুড়ে, তার কথা ভাবলেই মনটা দমে যায়। প্রকৃতি তার আপন নিয়মেই চলবে। জানি, ঢাকার রাস্তায় এই জ্বালা ধরানো গরম নিয়েই অফিসযাত্রীরা অফিসে ছুটবে, ঘামে জবজবে হয়ে লোকাল বাসে ঝুলবে। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, অধ্যাপকেরা স্কুল-কলেজে যাবেন সেই একই রোদ মাথায় নিয়ে। কিছুই করার নেই। ঠান্ডা পানীয়, ঠান্ডা জলই হবে তখন একমাত্র আরামের খোঁজ। আর বিরক্তিকর ঘাম? সে তো গ্রীষ্মের অলিখিত সঙ্গী, আসবেই। আমরা যারা হয়তো দিল্লিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে এই গরমের কথা ভাবছি, আরামের কল্পনা করছি, তারাও মাস শেষে ইলেক্ট্রিক বিলের কথা ভেবে শিউরে উঠি। ঢাকার মানুষের কষ্টটা নিশ্চয়ই আরও বেশি।

 

তবু, এই গ্রীষ্মই তো নিয়ে আসে আম, জাম, কাঁঠাল আর লিচুর সম্ভার। ফলের গন্ধে ম ম করবে চারপাশ। আর আসবে কালবোশেখী। ধ্বংসের তাণ্ডব নিয়ে এসেও সে যেন দিয়ে যায় সৃষ্টির আশ্বাস, ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয় জমা হওয়া গ্লানি। এই ভ্যাপসা গরম সহ্য করতে করতেই মানুষ আষাঢ়-শ্রাবণের জন্য অপেক্ষায় থাকবে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর রিমঝিম বর্ষার আগমনকে মনশ্চক্ষে দেখতে পাবে।

 

নাহিদার ডাক, পহেলা বৈশাখের টান, আর নিজের ভেতরের কবিসত্তার তাগিদ – সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম। যাব ঢাকা। এই গ্রীষ্মের দাবদাহকে সঙ্গী করেই ডুব দেবো উৎসবের সাগরে। দেখব কেমন করে ঢাকা উদযাপন করে তার প্রাণের উৎসব। আর হয়তো, খুঁজে নেব সেই বেড়ালচোখি কবিকে, যার চোখে আমি কলকাতা বইমেলার ভিড়ে এক ঝলক পরাবাস্তবতার ছায়া দেখেছিলাম।

 

#

ঢাকা এয়ারপোর্টে নামতেই প্রথম যে জিনিসটা ধাক্কা দিল, তা হলো আর্দ্রতা মেশানো তীব্র গরম। দিল্লির শুকনো গরমের চেয়ে এ যেন অন্য জিনিস। বাতাসে উৎসবের গন্ধ ভাসছে, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে ঘামের নোনতা গন্ধ আর আসন্ন দিনের তীব্র রোদের পূর্বাভাস। রাস্তায় মানুষের ভিড়। অনেকের পরনেই লাল-সাদার ছোঁয়া। শহরটা যেন জেগে উঠেছে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য।

 

হোটেলের ঘরে ব্যাগ রেখেই বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য রমনা পার্ক, ছায়ানটের বর্ষবরণের আসর। ভোরের আলো ফুটতে তখনও দেরি আছে। কিন্তু শাহবাগ চত্বর পেরিয়ে রমনার দিকে এগোতেই মানুষের ভিড় বাড়তে লাগল। লালপেড়ে সাদা শাড়ি আর সাদা পাঞ্জাবির স্রোত। বাতাসে কেমন একটা অধীর অপেক্ষা। বটমূলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই কানে এল সুর – "এসো হে বৈশাখ, এসো এসো..."। রবীন্দ্রনাথের গান, ছায়ানটের শিল্পীদের কণ্ঠে যেন অন্য মাত্রা পেয়েছে।

 

এই বিশাল বটবৃক্ষ, যার তলায় কয়েক দশক ধরে চলছে বর্ষবরণের এই আয়োজন, সে যেন নিজেই এক ইতিহাসের সাক্ষী। আচ্ছা, এই যে বাংলা সন, যার প্রথম দিনটিকে ঘিরে এত আয়োজন, এর শুরুটা কোথায়? মনে পড়ে গেল সম্রাট আকবরের কথা। যদিও কেউ কেউ বলেন এর শিকড় আরও গভীরে, হয়তো রাজা শশাঙ্কের আমলেও এর প্রচলন ছিল। তবে আকবরের সময়েই এর সংস্কার হয়। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ। ফসলের মৌসুমের সাথে মিলিয়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যই চান্দ্র হিজরি সনের বদলে সৌর সনের ভিত্তিতে ফতেহুল্লাহ সিরাজি তৈরি করেন এই 'ফসলি সন', যা আজকের বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ। কৃষকের ফসল ওঠা আর খাজনা দেওয়ার সময়কে মিলিয়ে দেওয়ার এক চমৎকার প্রয়াস।

 

প্রথম দিকে পহেলা বৈশাখ ছিল মূলত গ্রামীণ উৎসব। হালখাতা, ব্যবসায়ীদের নতুন হিসাব খোলা, গ্রামে গ্রামে মেলা, লোকগান, লোকনৃত্য – এসবই ছিল এর অঙ্গ। শহরে এর নাগরিক উদযাপন, বিশেষ করে আজকের এই রূপে, শুরু হয় ষাটের দশকে ছায়ানটের হাত ধরে। রমনার বটমূলে এই সঙ্গীতানুষ্ঠানই হয়ে ওঠে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক বলিষ্ঠ প্রকাশ। পাকিস্তানি শাসনামলে যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল, তখন এই আয়োজন ছিল এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। আজ সেই বটমূল লোকে লোকারণ্য। মানুষের কলরব, গানের সুর, ভোরের আলো-আঁধারি – সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ।

 

আমি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলাম। চোখ খুঁজছে একজোড়া বেড়ালের মতো চোখ। কিন্তু কোথায় সে? এত মানুষের ভিড়ে একজন নির্দিষ্ট মানুষকে খুঁজে পাওয়া খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই। গানের সুরে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। ‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’ – লাইনগুলো যেন এই গ্রীষ্মের প্রেক্ষাপটে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ কাঁধে একটা টোকা পড়ল। চমকে ফিরে তাকালাম।  

 

নাহিদা

 

সাদা জামদানি, লাল পাড়। খোঁপায় বেলি ফুলের মালা। মুখে হালকা হাসি। আর সেই চোখ। ভোরের আলোয় তার বেড়ালচোখের মণি দুটো যেন আরও উজ্জ্বল, আরও গভীর মনে হচ্ছে। মনে হলো, এই চোখ দুটো যেন এই পৃথিবীর নয়, অন্য কোনো জগতের।

"অবশেষে খুঁজে পেলাম দিল্লির কবিকে," নাহিদার কণ্ঠে কৌতুক। "কখন এলেন?"

"এই তো," আমি তখনও কিছুটা ঘোরগ্রস্ত। "আপন মনে বৈশাখীর গান শুনছিলাম।"

"কেমন লাগছে ঢাকা?"

"অসাধারণ। জীবন্ত। উত্তপ্ত, কিন্তু প্রাণবন্ত।"

"উত্তাপ তো থাকবেই," নাহিদা হাসল। "বৈশাখ মানেই তো রুদ্রের আবাহন। কিন্তু এই রুদ্র রূপের মধ্যেই তো নতুনের জন্ম।"

ওর কথাগুলো সাধারণ, কিন্তু বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল, যা আমাকে টানছিল। ওর চোখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখাটা যেন আবছা হয়ে আসছে। আমি কি সত্যিই ঢাকায় দাঁড়িয়ে আছি? নাকি কলকাতা বইমেলার কোনো মুহূর্ত দীর্ঘায়িত হয়ে এই ভোরে এসে পৌঁছেছে?

 

#

রমনার আসর শেষ হলে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের দিকে। গন্তব্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগদান। পথে মানুষের ঢল নেমেছে। সবার মধ্যেই একটা বাঁধভাঙা উল্লাস। লাল-সাদার ছড়াছড়ি। শিশুদের গালে আঁকা আলপনা, হাতে হাতে মাটির খেলনা। গরম উপেক্ষা করেই সবাই যেন নেমে এসেছে রাস্তায়।

চারুকলার সামনে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। শোভাযাত্রার জন্য তৈরি করা বিশাল বিশাল প্রতিকৃতি – বাঘ, প্যাঁচা, ময়ূর, হাতি – দাঁড়িয়ে আছে। আর আছে অসংখ্য মুখোশ। কোনোটা রাক্ষসের, কোনোটা দেবদূতের, কোনোটা নিরীহ পশুর, কোনোটা বিদ্রুপাত্মক। রঙ, রূপ, আর আকারের কী বৈচিত্র্য!

"এই শোভাযাত্রা শুধু একটা মিছিল নয়, শিবেনদা," নাহিদা বলল। "এটা আমাদের লোকশিল্পের প্রদর্শনী, একই সাথে সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ কামনার প্রতীকী প্রকাশ। জানেন তো, ইউনেস্কো একে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে।"

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। শিল্পীদের হাতের কাজ, তাদের ভাবনা – সবকিছুই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু নাহিদার পাশে দাঁড়িয়ে এই মুখোশগুলোর দিকে তাকাতে গিয়ে আমার অন্যরকম অনুভূতি হলো। মনে হলো, মুখোশগুলো যেন শুধু জড়বস্তু নয়। তাদের চোখগুলো যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা বিশাল প্যাঁচার প্রতিকৃতির স্থির চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, সে যেন বহু যুগের জ্ঞান ধারণ করে বসে আছে, নীরবে দেখছে মানুষের এই উল্লাস।

"কী ভাবছেন?" নাহিদার প্রশ্নে ঘোর কাটল।

"ভাবছি, এই মুখোশগুলো কি শুধু আমাদের মুখের অভিব্যক্তি আড়াল করে, নাকি ভেতরের অন্য সত্তাটাকে বের করে আনে?"

নাহিদা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর তার বেড়ালচোখ দুটো আমার চোখের দিকে স্থির করে বলল, "হয়তো দুটোই। আমরা সবাই তো প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো মুখোশ পরেই থাকি, তাই না? এই উৎসবের দিনে না হয় সেই মুখোশগুলো একটু রঙিন হলো।"

ওর উত্তরটা আমাকে আবার ভাবনায় ফেলে দিল। ওর সহজ কথাগুলোর মধ্যেও কেমন যেন একটা দর্শন লুকিয়ে থাকে।

 

শোভাযাত্রা শুরু হলো। ঢাকের বাদ্য, মানুষের কোলাহল, গান – সব মিলেমিশে একাকার। আমরাও সেই স্রোতে গা ভাসালাম। বিশাল প্রতিকৃতিগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে, যেন কোনো প্রাচীন উপকথার চরিত্ররা নেমে এসেছে ঢাকার রাজপথে। রঙ, রঙ, চারিদিকে শুধু রঙ। মানুষের পোশাকে, প্ল্যাকার্ডে, প্রতিকৃতিতে, আকাশে উড়ন্ত বেলুনে – রঙের এমন বাঁধভাঙা উৎসব আমি আগে দেখিনি।

হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হলো, রঙগুলো যেন শুধু বাইরে নয়, আমার ভেতরেও প্রবেশ করছে। আমার সাদা পাঞ্জাবিটা যেন আরও ধবধবে লাগছে, তার উপর যেন অদৃশ্য লাল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। নাহিদার লাল পাড়টাকেও মনে হলো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, যেন দপদপ করে জ্বলছে।

"আপনার চোখেও তো আজ বৈশাখের রঙ লেগেছে, শিবেনদা," নাহিদা হঠাৎ বলল।

"তাই?" আমি হাসার চেষ্টা করলাম। "কী রঙ?"

"সেটা তো আমি বলব না," সে রহস্যময় হাসি হাসল। "সেটা আপনার খুঁজে নিতে হবে।"

আমরা শাহবাগ মোড় পেরিয়ে টিএসসির দিকে যাচ্ছি। গরম বাড়ছে। ঘামে শরীর ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু নাহিদার মুখে ক্লান্তির কোনো চিহ্ন নেই। সে যেন এই ভিড়, এই গরম, এই কোলাহলের ঊর্ধ্বে অন্য কোনো জগতে বিচরণ করছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা আশ্চর্য সাবলীলতা। মাঝে মাঝে যখন ভিড়ের চাপে আমরা খুব কাছাকাছি চলে আসছি, আমি তার শরীরের মৃদু সুগন্ধ পাচ্ছি। বেলি ফুল আর তার নিজস্ব শরীরের গন্ধ মিলেমিশে এক মাদকতাময় আবেশ তৈরি করছে।

আমার মনে হতে লাগল, এই শোভাযাত্রা, এই ঢাকা শহর, এই নাহিদা – সবকিছুই যেন একটা স্বপ্নের অংশ। আমি কি জেগে আছি, নাকি কোনো কবিতার পঙক্তি ধরে হেঁটে চলেছি?

#

দুপুরের দিকে আমরা একটা ছোট রেস্তোরাঁয় বসলাম। পান্তা-ইলিশের আয়োজন। মাটির সানকিতে পান্তা ভাত, পাশে এক টুকরো ভাজা ইলিশ, কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ আর শুকনো লঙ্কা ভাজা। অতি সাধারণ খাবার, কিন্তু পহেলা বৈশাখের দিনে এর আবেদন অন্যরকম।

খেতে খেতে নাহিদা বলল, "অনেকেই এখন পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়া নিয়ে কথা বলেন। জাটকা নিধন, ইলিশের প্রজনন মৌসুম – এসব নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। সেটা ভালো।"

"ঠিকই," আমি সায় দিলাম। "ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশের কথাও ভাবা দরকার।"

"তবুও," নাহিদা ইলিশের কাঁটা বাছতে বাছতে বলল, "এই পান্তা-ইলিশের সাথে বাঙালির একটা নস্টালজিয়া জড়িয়ে আছে। হয়তো এর রূপ বদলাবে, ইলিশের বদলে অন্য কিছু আসবে, কিন্তু এই একসাথে বসে বছরের প্রথম দিনটা উদযাপন করার রীতিটা থেকে যাবে।"

ওর কথা শুনতে শুনতে আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। কলকাতা বইমেলায় আমাদের পরিচয় হয়েছিল কবিতার সূত্রে। কিন্তু আজ সারাদিন ওর সাথে কথা বলতে গিয়ে মনে হচ্ছে, ও যেন শুধু কবি নয়, জীবনের গভীরতর রহস্যগুলোকেও অনায়াসে ছুঁয়ে যেতে পারে।

খাওয়া শেষ করে আমরা আবার পথে নামলাম। কোথায় যাব, কোনো ঠিক নেই। শুধু হাঁটছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে দিয়ে, কার্জন হলের পাশ দিয়ে। পুরনো দালানগুলো যেন ইতিহাসের বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় তখনও উৎসবের রেশ। তবে সকালের সেই তীব্রতাটা একটু কমেছে।

"আচ্ছা শিবেনদা, আপনার কি কখনো মনে হয়েছে সময় স্থির হয়ে আছে?" নাহিদা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল।

"মানে?" আমি ওর দিকে তাকালাম। ওর বেড়ালচোখ দুটো যেন দূরের আকাশে কিছু খুঁজছে।

"মানে, এই যে আমরা হাঁটছি, কথা বলছি, এই মুহূর্তটা – এটা কি সত্যিই বয়ে চলে যাচ্ছে, নাকি অন্য কোনো মাত্রায় এটা চিরকালের জন্য স্থির হয়ে থাকছে?"

ওর প্রশ্নগুলো আমাকে বারবার চমকে দিচ্ছিল। এ কেমন ভাবনা! পরাবাস্তবতার ছোঁয়া ওর কথায়, ওর চাহনিতে। আমি বললাম, "কবিতায় হয়তো সময়কে স্থির করে রাখা যায়, বাস্তবে..."

"বাস্তব কোনটা?" সে আমার দিকে ফিরল। "যা আমরা চোখে দেখছি, কানে শুনছি, সেটাই কি একমাত্র বাস্তব? নাকি অনুভবের জগৎটাও আরেকটা বাস্তব?"

ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার উত্তর হারিয়ে গেল। মনে হলো, ওর কথাই ঠিক। অনুভবের জগৎটাই হয়তো আসল বাস্তব। আর সেই জগতেই হয়তো আমাদের এই দেখা হওয়াটা অন্য কোনো তাৎপর্য বহন করছে।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাছাকাছি চলে এসেছি। বিকেলের আলো নরম হয়ে আসছে। কিন্তু আকাশে জমতে শুরু করেছে কালো মেঘ। দিনের সেই অসহ্য গরমটা কমে গিয়ে বাতাসে একটা গুমোট ভাব। কালবোশেখীর স্পষ্ট ইঙ্গিত। মানুষজন আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। যারা খোলা জায়গায় ছিল, তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এদিক ওদিক যাচ্ছে।

"ঝড় আসছে," আমি বললাম।

"আসুক," নাহিদা শান্ত গলায় বলল। "গ্রীষ্মের এই দাবদাহের পর কালবোশেখী তো আশীর্বাদের মতো। ধুয়ে মুছে সব পরিষ্কার করে দেবে।"

ওর শান্ত ভাব দেখে আমি অবাক হলাম। আসন্ন ঝড়ের কোনো উদ্বেগ ওর চোখেমুখে নেই। বরং মনে হলো, সে যেন এই ঝড়টার জন্যই অপেক্ষা করছিল।

#

কথা শেষ হতে না হতেই ঝড়টা শুরু হলো। প্রথমে প্রবল ধুলোঝড়। চারপাশ অন্ধকার করে ধুলোর এক বিশাল মেঘ যেন তেড়ে এল। তারপর শুরু হলো প্রচণ্ড বাতাস। গাছের ডালপালা মটমট করে ভাঙার শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সাথে কান ফাটানো বজ্রপাত আর বিদ্যুতের ঝলকানি।

আমরা দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিলাম টিএসসির সামনের গোল চত্বরটার ছাউনির নিচে। সেখানে আরও কিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু আমাদের চারপাশে যেন একটা অদৃশ্য বলয় তৈরি হয়ে গেছে। বাইরের তাণ্ডব চলছে, কিন্তু আমরা দুজন যেন সেই তাণ্ডবের কেন্দ্রে স্থির হয়ে আছি। বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে গায়ে। নাহিদার চুল ভিজে মুখের উপর এসে পড়েছে। বিদ্যুতের আলোয় ক্ষণে ক্ষণে তার মুখটা উদ্ভাসিত হচ্ছে। আর সেই বেড়ালচোখ দুটো! সেই আলোয় যেন আরও বেশি রহস্যময়, আরও বেশি মায়াবী লাগছে।

"ভয় করছে?" সে আমার খুব কাছে সরে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ে এসে লাগল।

"একটু," আমি প্রায় কাঁপা গলায় বললাম। "তবে ভয় ছাপিয়ে অন্য একটা অনুভূতি হচ্ছে।"

"কী অনুভূতি?" তার চোখে কৌতুক।

"মনে হচ্ছে, এই ঝড়টা শুধু বাইরে নয়, আমার ভেতরেও চলছে। সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে।"

সে হাসল। সেই হাসিটা ঝড়ের শব্দের সাথে মিশে গেল। "ওলটপালট হওয়া তো ভালো। পুরনো সব ভেঙে গেলেই তো নতুন কিছু গড়ার জায়গা তৈরি হয়।"

হঠাৎ সে আমার হাতটা ধরল। তার হাতের স্পর্শ ঠান্ডা, কিন্তু তাতে যেন বিদ্যুতের প্রবাহ। আমি চমকে তার দিকে তাকালাম। তার চোখে গভীর আবেগ। সেই বেড়ালচোখের গভীরে যেন মহাকালের ঘূর্ণি।

"শিবেনদা," তার কণ্ঠস্বর আর্দ্র, বৃষ্টির শব্দের চেয়েও করুণ। "আপনি কি বিশ্বাস করেন, কিছু কিছু দেখা হওয়ার কোনো কারণ থাকে না, কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না? তারা শুধু একটা মুহূর্তের জন্য আসে, তীব্র আলো জ্বালিয়ে, তারপর আবার মিলিয়ে যায়?"

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে তখন প্রবল আলোড়ন। এই মেয়েটা কে? সে কি সত্যিই ঢাকার কবি নাহিদা ইয়াসমিন? নাকি আমার দিল্লি থেকে বয়ে আনা কোনো স্বপ্ন বা বিভ্রম?

"আমাদের এই দেখা হওয়াটা," সে বলে চলল, তার চোখ আমার চোখে নিবদ্ধ, "এটাও হয়তো সেরকমই। কলকাতা বইমেলার সেই কয়েকটা দিন, আর আজকের এই পহেলা বৈশাখ। দুটো বিচ্ছিন্ন বিন্দু। হয়তো এদের সংযোগকারী কোনো রেখা নেই।"

"নাহিদা, তুমি কী বলছ এসব?" আমার গলা দিয়ে স্বর বের হতে চাইছে না।

"সত্যি বলছি," সে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোখ ছলছল করছে। "কিছু সম্পর্ক থাকে, যা সময়ের হিসেব মানে না। তারা আসে কালবোশেখীর মতো, সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার ঝড়ের শেষে যেমন আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়, তারাও তেমনি মিলিয়ে যায়, শুধু রেখে যায় একটা ভেজা মাটির গন্ধ, একটা গভীর অনুভূতি।"

বিদ্যুৎ চমকাল আবার। সেই আলোয় আমি স্পষ্ট দেখলাম, ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। কিন্তু সে কাঁদছে না। তার ঠোঁটে সেই অদ্ভুত, বিষণ্ণ হাসিটা লেগেই আছে।

"সময় ফুরিয়ে আসছে, শিবেনদা," সে প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল।

"কিসের সময়?" আমার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল।

সে উত্তর না দিয়ে আমার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। বাইরে তখনো ঝড়ের তাণ্ডব। বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে, কিন্তু বাতাস বইছে প্রবল বেগে। আমার মনে হলো, আমি যেন সময়ের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বাস্তব আর পরাবাস্তব মিলেমিশে একাকার। নাহিদার স্পর্শ, তার কথা, তার চোখের মায়া – সবকিছু আমাকে এক ঘোরলাগা জগতে নিয়ে যাচ্ছে।


Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ