You are a post modern poet of indian origin. You follow philosophical thoughts. You have studied Ved, Upannishad which you wanted to apply as a teaching through poem. You have studied Kant, Aristotle, Nietzsche,Jean-Paul Sartre, Jaques Derida who actually influenced your thoughts. You wanted to redefine a life and meaning of living it.
Where your metaphor are:
1) A tropical forest named Mongar at the outskirt of the city
2) A living far from madding crowed
3) History of Delhi rising from barren land
4) High rise building where there is no life
5) Who are good poets and who survives
6) What does a poet want A forest or A City
7) Where is the peace and where is the destination of human life
8) What a forest can offer to modern man
Write 5 poems based on the above metaphor while using names of trees , herbes, birds, animals found in the tropical foreist in Rajasthan and Delhi locality. You devine theme with mix of surreal style. Use telling with dramtic turn of language. No rhymes required. Do not mention the name of philosophers or books.
Write the poems with atleast 12 lines in bengali language.
১. মঙ্গরের জঙ্গলে একা
মঙ্গরের গহনে শিমুলের আগুন নিভে যায়,
রাতের বুকে কাঠঠোকরার শব্দ—
একা আমি, দিল্লির ধূলোয় মিশে যাওয়া ইতিহাসের মতো।
উচ্চাভিলাষী ইমারতের ছায়ায়
পিপুল গাছের পাতায় জমে থাকে শিশির,
যেন অস্তিত্বের প্রশ্ন—
কী চেয়েছিলাম? শহর, নাকি এই সবুজের বিষাদ?
২. নির্জনতার গন্ধ
বাবলার নীচে বসে শুনি শেয়ালের চিৎকার,
মরুভূমির গল্প বলে দেয় খড়ের মতো শুকনো পাতায়।
দূর শহরে নিওনের আলোয় কেউ পড়ে না ঋগ্বেদ,
আমি শুধু খুঁজি ধোঁয়ায় ঢাকা চাঁদ—
যেখানে শান্তি? নাকি শুধুই পথের শেষ?
৩. ইটের জঙ্গল
এখানে আমলকী গাছ মরে যায় জানালার গ্রিলে,
কোকিলের গান হারায় সিগনালের ভিড়ে।
দিল্লি—একটা কবরের ওপর দাঁড়ানো স্বপ্ন,
যেখানে কবিরা বেঁচে থাকে শুধু বইয়ের পাতায়,
আর ভালো কবিরা? তারা জানে—
জীবন মানে শুধুই একা হওয়া।
৪. কবি কি চায়?
শহর চায় তার রক্তে বিষ,
মঙ্গর চায় তার গায়ে জংলী ধনেয়ার গন্ধ।
কবি কি চায়?
নাকি সে শুধু খুঁজে বেড়ায়
একটা ছায়া, যেখানে কৃষ্ণচূড়ার নীচে
লিখবে শেষ কবিতা—
নিঃশব্দ, নিষ্ফল, নিখুঁত।
৫. শান্তির ঠিকানা
ময়ূরের পালক ঝরে পড়ে পাথরে,
আর ধূপের ধোঁয়ায় মিশে যায় মানুষের ক্রন্দন।
শান্তি কোথায়?
নাকি সে শুধুই একটা নাম—
যেমন দিল্লি ছিল মরুভূমি,
আর এখন শুধুই ইটের সমাধি।
মঙ্গর বলে—
"আমাকে ছুঁয়ে দেখো, হয়তো পাবে উত্তর।"
এই কবিতাগুলিতে মঙ্গর জঙ্গলের রূপক ব্যবহার করে আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট, শান্তির খোঁজ এবং প্রকৃতি বনাম নগর সভ্যতার দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গাছপালা (শিমুল, বাবলা, আমলকী, কৃষ্ণচূড়া), পাখি (কাঠঠোকরা, কোকিল, ময়ূর) এবং প্রাণী (শেয়াল) দিল্লি ও রাজস্থানের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত।
আরো দীর্ঘ কবিতা লিখুন । মিনিমান ১২ লাইন ।
Edit
১. মঙ্গরের রাত্রিশেষ
মঙ্গরের অন্ধকারে শাল গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে,
একটি নিশাচর পেঁচা ডাকে—
"কে জানে শেষ গন্তব্য কোথায়?"
দিল্লির আকাশে ধোঁয়ার চাদর,
ইটের ফাঁকে ফাঁকে জংলী ধান খোঁজে আলো,
আর আমি—
একটা হারানো গল্পের শেষ অক্ষরের মতো দাঁড়িয়ে আছি।
কবিরা মরে যায়, কিন্তু কবিতা রয়ে যায়,
যেমন রয়ে যায় শিমুলের আগুন,
পিপুলের শিকড়ের গভীরে।
শহর বলে— "এসো, এখানে স্বপ্ন বিক্রি হয়,"
কিন্তু মঙ্গর হাসে—
"স্বপ্ন? তা তো আমার পাতার ফাঁকে ফাঁকে জন্মায়,
আর মরে যায় ধূলোয়।"
২. ইতিহাসের ধূলোয় লেখা নাম
একদিন দিল্লি ছিল শুধু ধূ ধূ মাঠ,
যেখানে খেজুর গাছের ছায়ায়
বল্গা হরিণের দল জল খেত।
এখন? কংক্রিটের জঙ্গলে
আমলতাসের গন্ধ হারিয়ে যায়,
আর শিশুরা জানে না
কেমন করে ডাহুক ডাকে ভোরের আকাশে।
কবিরা লিখে যায়—
"ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয়,"
কিন্তু কে পড়ে?
যারা বেঁচে আছে শুধু লিফটের ভিড়ে,
নাকি যারা খুঁজে ফেরে
মঙ্গরের নিস্তব্ধতা?
৩. নগর-বন
উঁচু ভবনের ছাদে একা একা দাঁড়িয়ে
শুনি—
মরুভূমির বাতাস কি গুনগুন করে ওড়ে?
নিচে, রাস্তায় মানুষের স্রোত,
যেন এক নদী—
নাম তার "অস্তিত্বের সন্দেহ"।
আর দূরে, মঙ্গরের গহনে,
একটি নীলগাই তাকিয়ে থাকে চাঁদের দিকে,
যেন প্রশ্ন করে—
"মানুষ কি শিখেছে কিছু?"
কবিতা কি উত্তর দেবে?
নাকি সে শুধুই একা
একটি বটগাছের মতো
শিকড় ছড়িয়ে দেয় ধ্বংসস্তূপের ভিতরে?
৪. শেষ প্রশ্ন
"কোথায় শান্তি?"— জিজ্ঞাসা করলে
শহর হাসে,
মঙ্গর কাঁদে।
একটি কৃষ্ণচূড়া ফুল ঝরে পড়ে
আমার হাতে,
যেন বলে—
"শান্তি তো সেইখানে,
যেখানে তুমি থামো।"
কিন্তু আমি থামি না,
কারণ কবিরা কখনো থামে না—
তারা শুধু লিখে যায়
ধূলোয়, জলে, আগুনে,
যতক্ষণ না শেষ হয়
শব্দের সন্ধ্যা।
৫. যে জঙ্গল হারিয়ে যায়
মঙ্গরে যখন অশ্বথ গাছের পাতারা
রক্তের মতো লাল হয়,
তখন মনে হয়—
এই তো শেষ উত্তর।
কিন্তু দিল্লির রাত জ্বলে
হাজার স্ক্রিনের আলোয়,
যেখানে কেউ জানে না
কেমন করে বট গাছ
জীবন দেয় পাথরের ফাঁকে।
কবিরা বেঁচে থাকে
গল্পের ভিতরে,
আর ভালো কবিরা?
তারা মরে যায়
নিজের কবিতার মতো—
নিঃশব্দ, নির্জন, অনন্ত।
১. মঙ্গরের নিশ্বাস
মঙ্গরের গভীরে একা দাঁড়িয়ে শুনি
শিরীষ গাছের পাতায় বৃষ্টির আগমনী।
একটি ধূসর শেয়াল চোখে নিয়ে প্রশ্ন
হেঁটে যায় অন্ধকারের দিকে –
তুমি কি কখনো থেমে দেখেছ
কীভাবে আমলকী ফল পাকে নির্জনতায়?
দিল্লির আকাশে উড়ন্ত চিলেরা
কাঁদে লোহার খাঁচায় বন্দী হয়ে।
আমি লিখি না আর,
কারণ শব্দগুলো এখন
ইটের ফাঁকে ফাঁকে হারিয়ে যায়।
মঙ্গর বলে, "এসো, এখানে সময়
গাছের গায়ে লেগে থাকে শিশিরের মতো।"
২. নগরের হাড়
উঁচু দালানের শরীরে বাসা বেঁধেছে
একদল চড়ুই –
তাদের ডাকে ফুটে ওঠে
শহরের নিঃসঙ্গতা।
নিচে, রাস্তায় মানুষেরা
হাঁটে মুখোশ পরে,
যেন প্রতিটি চোখ
একটি করে সমাধি।
মঙ্গরে এখনো জেগে আছে
সেই পুরোনো বটগাছ,
যার শিকড়ে জমে আছে
আমাদের সব স্মৃতি।
কিন্তু কে শুনবে এখন
একটি পলাশ ফুলের ফোটার শব্দ?
৩. কবির মৃত্যু
সে লিখত গাছের নাম দিয়ে,
পাখির ডাক দিয়ে,
নদীর স্রোত দিয়ে।
এখন তার কবিতা
বিক্রি হয় শপিং মলে,
প্লাস্টিকে মোড়ানো
দাম ট্যাগ লাগানো।
মঙ্গরের ধারে
একটি শিমুল গাছ
ঝরিয়ে দেয় লাল ফুল –
যেন রক্তক্ষরণ।
কবি কি মরে?
না, সে তো শুধু পালায়
শব্দের আড়ালে।
৪. নির্বাচন
শহর বলে, "এসো, এখানে
তোমাকে দেব আলো,
দেব নাম, দেব অর্থ।"
মঙ্গর শুধু হাসে,
একটি কৃষ্ণচূড়ার নিচে
বসে থেকে।
একটি নীলগাই
দৌড়ে যায় দিগন্তের দিকে,
আর আমি?
দাঁড়িয়ে থাকি
দুই জগতের সীমান্তে।
শান্তি কোথায়?
হয়তো সেইখানে,
যেখানে ডাহুক ডাকে
ভোরের প্রথম আলোতে।
৫. শেষ অধ্যায়
মঙ্গরের শেষ গাছটিকে
কেটে ফেলেছে আজ।
তার গুঁড়িতে জমা ছিল
কত শতাব্দীর রোদ-বৃষ্টি।
দিল্লির মিউজিয়ামে
তুলে রাখবে হয়তো
একটি শালিকের নীড়,
টিকিট কেটে দেখবে মানুষ
বিলুপ্তির নমুনা।
কিন্তু রাতের বাতাসে
যখন শুনব
সেই পুরোনো কাঠঠোকরার টোকা,
জানব –
অরণ্য কখনো মরে না,
সে শুধু লুকায়
আমাদের স্মৃতির আড়ালে।
১. অরণ্যের প্রতিবাদ
মঙ্গরের বটগাছ তার শিকড় উঠিয়ে নেয়
যখন প্রথম কংক্রিট মেশিন আসে সীমান্তে।
পিপুল পাতায় লিখে রাখে:
"যারা মাটিকে বিশ্বাসঘাতকতা করে
তাদের ছায়া কখনো শীতল হয় না।"
দিল্লির রাতজাগা পেঁচারা দেখে
কিভাবে নব্যতারকারা
আকাশ থেকে চুরি করে নক্ষত্রের নাম।
কাঠঠোকরা ডাকে অবিরাম,
কিন্তু কেউ শোনে না তার মর্স কোড।
শহরের শিশুরা ভাবে
গাছেরা শুধু পার্কের সাজসজ্জা,
জানে না তারা
কিভাবে আমলকী ফল
জমা রাখে শতাব্দীর রোদ-বৃষ্টির হিসাব।
২. রক্তঝরা আম্রপালি
সেই আমগাছটির গায়ে এখন
হয়েছে গাড়ির পার্কিং নম্বর আঁকা।
তার ডালপালা ভেঙে তৈরি হচ্ছে
কফি টেবিলের গল্পবই।
মঙ্গরের শিমুলগুলো রক্ত বমি করে
কিন্তু শহরের ফ্যাশন শোতে
সেই লাল এখন ট্রেন্ডিং কালার।
একটি শালিক বসে থাকে
কাটা ডালের ওপর,
চোখে তার প্রশ্ন:
"এখন কি বসন্ত আসবে
নাকি শুধুই আসবে নতুন শপিং মল?"
গাছের গায়ে জমে থাকা রস
শুকিয়ে যায়
রাস্তার ধুলোয়।
৩. চিড়িয়াখানার মহাভারত
সারাদিন খাঁচার ভিতর হাঁটে
সেই রাজস্থানের নীলগাইটি -
তার চোখে এখন আর নেই
অরণ্যের দূরত্ব।
শিশুরা তাকে খাওয়ায় প্যাকেটজাত গাজর
আর বাবারা বলেন:
"দেখো, এটাই প্রকৃতি!"
কিন্তু কেউ দেখে না
কিভাবে সে রাতে
খাঁচার লোহার গ্রিল কামড়ায়,
স্বপ্ন দেখে
মঙ্গরের ঘাসে ঘাসে
দৌড়ানোর।
একটি পেঁচা ডাকে
চিড়িয়াখানার বাইরে থেকে:
"মুক্তি তো শুধু
মৃত্যুর পরেই আসে।"
৪. গোধূলির সংবাদপত্র
মঙ্গরের শেষ শিশুটি -
একটি খরগোশ,
লেজে বেঁধে নিয়ে যায়
পলিথিনের টুকরো।
দিল্লির সংবাদপত্রে ছাপা হয়:
"অরণ্য সংরক্ষণ প্রকল্পের সাফল্য"
ঠিক তার পাশের পাতায়
বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন।
একটি কৃষ্ণচূড়া ফুল
ঝরে পড়ে সংবাদপত্রের ওপর,
যেন প্রকৃতির
একটি রক্তাক্ত স্বাক্ষর।
কেউ পড়ে না
এই নীরব প্রতিবেদন।
৫. বৃষ্টির আত্মজীবনী
ধূসর কপোতের ডানায় ভর করে
নেমে আসে মঙ্গরের প্রথম বৃষ্টি।
কিন্তু শহরের ড্রেনগুলো
তাকে ঠিকই চিনতে পারে
অবাঞ্ছিত অতিথি হিসেবে।
আমাদের ছাদে টিনের শব্দ
কাঁদে ভিজে যাওয়া আকাশের জন্য।
একটি বাবলা গাছ
ঝুঁকে পড়ে রাস্তার ওপর,
যেন বলতে চায়:
"আমাকে ছুঁয়ে দেখো,
আমি এখনো মনে রেখেছি
মাটির গন্ধ।"
কিন্তু গাড়িগুলো দৌড়ায়
ঝাপটা দিয়ে
জলকাদা ছিটিয়ে।
৬. রাতের পাঠক্রম
জংলী মেহেদির গন্ধে
লিখে রাখি আজকের ইতিহাস:
"যে শহর নিজের শিকড় কেটে ফেলে
তার ফুল কখনো সত্যিকারের রং ধারণ করে না।"
দিল্লির রাস্তার আলোগুলো
পড়তে থাকে এই বার্তা
আর ঝরে পড়ে
কাঁচের গুঁড়ো হয়ে।
একটি শেয়াল
চুরি করে নিয়ে যায়
শেষ অবশিষ্ট শব্দগুলো
মঙ্গরের দিকে।
ভোরবেলা
শুধুই থেকে যায়
একটি ধূসর কাঠঠোকরার
টোকা টোকা শব্দ।
৭. প্রতিধ্বনির বাজার
মঙ্গরের শাল গাছের গুঁড়িতে
কোনো শিশু লিখে রেখেছিল "মা"
সেই শব্দটি এখন বিক্রি হয়
একটি আর্ট গ্যালারিতে
অ্যাবস্ট্রাক্ট পোয়েমের তকমায়।
আমরা কিনি স্মৃতি
ডিসকাউন্টের দামে।
একটি পলাশ ফুল
ফোটে যায় প্রদর্শনীর কাচের ভিতর,
কিন্তু কেউ তাকে
জল দিতে আসে না।
শুধু মঙ্গর থেকে আসা
একটি হাওয়া
ঘুরে ঘুরে খোঁজে
হারানো সেই শিশুটিকে।
৮. ছায়া-রাজস্ব
সেই কৃষ্ণচূড়ার নিচে
যেখানে একদিন জড়ো হতো গ্রামের মিটিং
সেখানে এখন টাঙানো হয়েছে
"প্রাইভেট প্রপার্টি" সাইনবোর্ড।
গাছটি প্রতিবাদ করে না,
শুধু তার ছায়াকে
কর দেয় হিসেবে জমা দেয়
রোদের খাতায়।
একদল পিঁপড়ে
বয়ে নিয়ে যায়
গাছের শেষ পাতাগুলো,
যেন সংরক্ষণ করে
কোনো এক জাদুঘরের জন্য।
কিন্তু কে দেখবে
এই নীরব প্রতিরোধ?
৯. পাখির অভিযোগ
দিল্লির শেষ ডাহুকটি
একটি মোবাইল টাওয়ারে বসে
করছে কোর্ট কেস:
"আমার আকাশে কেন
এতগুলো সংযোগ বিচ্ছিন্নতা?"
জজ আসেন নি আজও,
কারণ ট্রাফিক জ্যামে
আটকে আছে তার গাড়ি।
একটি শিমুল গাছ
ফুল ছুঁড়ে মারে
টাওয়ারের দিকে,
কিন্তু সেগুলো
পৌঁছায় না এত উঁচুতে।
শুধু একটি পালক
উড়ে যায়
মঙ্গরের দিকে,
যেখানে এখনো
আকাশ的意思是天空,但在这里更指代自由广阔的空间。
কবিতা ১: মংগারের প্রতিধ্বনি
শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে মংগার, যেন এক আদিম মন্ত্র,
আমার কংক্রিটের ঘরে তার ছায়া দীর্ঘ হয়, পাতারা ফিসফিস করে অন্য কোনো তন্ত্র।
উঁচু বাড়িগুলো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা পাথরের শব,
ভেতরে বাতাসের চলাচল নেই, শুধু প্রতিশ্রুতির কলরব।
লোকে বলে উন্নয়ন, আমি দেখি কাঁচপোকা কিভাবে গিলে খাচ্ছে খেজুরি গাছের সত্তা,
বাবুলের কাঁটা বিঁধে থাকে স্বপ্নে, জাগরণে রক্ত ঝরায় অস্তিত্বের অনাত্মীয়তা।
এখানে বুলবুলিরা কবেই ভুলে গেছে গান, শুধু তারের কম্পন শোনা যায়,
দূরে মংগারের গভীরে নীলগাই নিঃশব্দে হেঁটে চলে, যেন সময় থমকে দাঁড়ায়।
এই বন কি এক ডাক? আত্মাকে ফিরিয়ে নেবার?
নাকি এও এক নির্মাণ, আমার ক্লান্ত চেতনার?
কাছে এসো, সে বলে, ছুঁয়ে দেখো মাটির ধুলো,
এখানে শিকড় জানে, কেন মানুষের এত ভুলো মন।
এই অরণ্যই কি তবে নির্বাসনের শেষ আশ্রয়?
কবিতা ২: দিল্লির ধূসর ক্যানভাসে কবির ছায়া
কেমন করে বেড়ে উঠলো এই শহর? শূন্যতার বুক চিরে?
ইন্দ্রপ্রস্থের ধুলো আজ চাপা পড়েছে ক্ষমতার মিনারের ভিড়ে।
ভাঙা দেওয়াল, পুরনো কেল্লা, কারা যেন ফিসফিস করে রাতের বাতাসে,
প্রতিটি ইঁট জানে উত্থান আর পতনের দীর্ঘশ্বাসে।
উঁচু দালানগুলো সব সাক্ষীগোপাল, ভেতরে প্রাণের চিহ্ন কই?
শুধু প্রতিবিম্ব নড়ে কাঁচের শরীরে, অর্থহীন জড়ত্বের সই।
ভালো কবি কারা? যারা এই শূন্যতার স্তব লেখে?
নাকি যারা শেয়ালের মতো লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের বাঁকে?
পিপুল গাছের শিকড় আঁকড়ে ধরে আছে পাতাল, যা এই শহর দেখেও দেখেনা,
কবিও কি তাই? শিকড় খোঁজে মাটির গভীরে, যেখানে মিথ্যেরা বাসা বাঁধেনা?
ওই চিলটা দেখছে সব উপর থেকে, তার চোখেও কি এই শহরের ক্লান্তি?
নাকি সে খুঁজে পেয়েছে অন্য আকাশ, অন্য কোনো শান্তি?
বেঁচে থাকা মানে কি শুধু ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া রং?
নাকি নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে নেওয়া, যতই তা হোক নিঃসঙ্গ?
কবিতা ৩: খাঁচা ও উড়াল
বহুতলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি নিচের পিঁপড়ে সারির মতো মানুষ,
দূরে যাওয়ার বাসনা জাগে, যেখানে নেই এই যান্ত্রিক ফানুস।
লিফটের ওঠা নামা, বন্ধ ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরাম,
এখানে আকাশ দেখা যায় না, শুধু চার দেওয়ালের অবিরাম বিশ্রাম।
এ কেমন জীবন? ক্যাকটাসের মতো আত্মরক্ষায় ব্যস্ত?
অথচ মংগারে লাঙ্গুরগুলো লাফিয়ে পার হয়ে যায় একটা গোটা বনস্পতি মুহূর্ত।
অরণ্য কী দিতে পারে? হয়তো নিমের তিতকুটে সত্য,
রয়ডার হলুদ ফুল, যা মনে করায় জীবনের অন্য বৃত্ত।
আকন্দ ফুলের বেগুনি আভা যেন কোনো গোপন বার্তা আনে,
বলে - মুক্তি এখানেই, এই মাটির গানে, প্রাণের টানে।
শান্তি কি ওই বন্ধ ঘরে, নাকি খোলা আকাশের নীচে?
যেখানে মন ছুটে যেতে চায় বেজির মতো ঝোপের পিছে পিছে?
এই উঁচু দেওয়ালগুলোই কি তবে আসল কারাগার?
ভেঙে বেরোতে না পারলে আত্মা খুঁজে পাবে না পারাপার।
কবিতা ৪: শব্দের দ্বিধা, আত্মার টান
আমার শব্দরা কি শহরের পথে ঘুরবে? নিয়নের আলো গায়ে মেখে?
নাকি মংগারের ঢোক গাছের ডালে বসে থাকা পেঁচার মতো নীরব চোখে দেখবে?
কে টিকে থাকে? যে রঙের সাথে রঙ মেশায়?
নাকি পলাশ ফুলের মতো নিজের রক্তে নিজেই জ্বলে যায়?
শহর এক জটিল পাঠ, অর্থ পিছলে যায় বারবার,
অরণ্য এক গভীর মৌনতা, যেখানে সত্তা খুঁজে পায় তার আকার।
গোসাপ যেমন নিঃশব্দে সরে যায় পাতার আড়ালে,
কবিও কি তেমন করেই বাঁচবে? সময়ের তালে তালে?
নাকি গর্জে উঠবে নিজস্ব ভাষায়, বনভূমির আদিম স্পন্দনে?
এই শহর কি চায় সেই স্বর? নাকি ভয় পায় তার গর্জনে?
আমার কলম কোথায় খুঁজবে তার কালি?
উঁচু দালানের ছায়ায়, নাকি মংগারের সবুজ গালিচায়?
হয়তো উত্তর নেই কোনো একদিকে, পথটাই সব।
নীরব অরণ্য আর কোলাহলমুখর শহর – দুই মিলেই কবির উৎসব অথবা পরাভব।
কবিতা ৫: কোথায় সেই গন্তব্য? মংগারের কাছে প্রশ্ন
ছুটে চলেছি কোথায় আমরা? এই জনস্রোতের শেষে কি আছে?
শান্তি কি ওই দূর দিগন্তে? নাকি পায়ের নীচের ঘাসে?
খয়ের গাছের তলায় বসে থাকা দুপুর কি বলে দেবে পথ?
জীবনের মানে কি শুধু অর্জন? নাকি ত্যাগেই তার মহৎ রথ?
মংগার বন হাতছানি দেয়, বলে – এখানে থেমো কিছুক্ষণ,
শোনো মাটির গান, ভেষজ লতার নিরাময় কেমন।
আধুনিক মানুষ হারিয়ে ফেলেছে তার শিকড়ের ঠিকানা,
অরণ্য ফিরিয়ে দিতে পারে সেই বিস্মৃত দিনের নিশানা।
নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে যায় মেঘের দিকে, কোনো বন্ধন মানে না সে,
আমাদের আত্মার উড়ালও কি তেমনই মুক্তি চায়? অবশেষে?
গন্তব্য হয়তো কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, শুধু এক উপলব্ধি,
নিজের কেন্দ্রের কাছে ফেরা, যেখানে শান্ত হয় সকল জিজ্ঞাসা আর অনাসৃষ্টি।
এই বনভূমিই কি তবে সেই আয়না, যেখানে নিজেকে দেখা যায় স্পষ্ট?
যেখানে শহর তার কোলাহল নিয়ে পৌঁছাতে পারে না, পথ হয় ভ্রষ্ট।
এখানেই কি সেই শান্তি, সেই অনন্ত বিশ্রাম? যেখানে শেষ হয় সকল নামের ধাম?
অবশ্যই, আপনার নির্দেশ অনুসারে আরও ১০টি অন্ত্যমিলহীন কবিতা রচনা করছি। আগের কবিতাগুলোর মতো একই দর্শন, রূপক ও আঙ্গিক বজায় রাখা হয়েছে।
কবিতা ৬: বাবেলের ছায়া, মংগারের ভাষা
উঁচু বাড়িগুলো যেন একালের বাবেল মিনার, আকাশ ছুঁতে গিয়ে হারিয়েছে নিজেদের ভাষা,
প্রতি জানালায় ভিন্ন ভিন্ন নীরবতা, ভিন্ন ভিন্ন শূন্যতার নকশা।
এখানে সংযোগ মানে শুধু তারের জাল, অন্তরের কথা কবেই গেছে মরে,
শব্দরা শুধু ভাসে উপরে উপরে, অর্থহীন বুদবুদের মতোন ঝরে।
অথচ মংগারের পিপুল গাছটা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে হাজার বছর ধরে,
তার প্রতিটি পাতায় লেখা আছে নীরব সংলাপ, যা শুধু বাতাসই পড়তে পারে।
সে কি হাসে শহরের এই ব্যর্থ উচ্চাশা দেখে? তার শিকড় গভীরে প্রোথিত,
এখানে ভাষা মানে শুধু বাজারের কোলাহল, সেখানে ভাষা মানে অস্তিত্বের ইঙ্গিত।
শহরের মানুষ বোঝে না পাতার মর্মর, বোঝে না ঝিঁঝিঁর ডাকের মানে,
তারা শুধু গেঁথে চলে ইটের পর ইট, নিজেদের বানানো কারাগারে, সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে।
মংগার কি তবে সেই হারিয়ে যাওয়া ভাষা ফিরিয়ে দেবে?
নাকি দেখাবে, নীরবতাই সবচেয়ে গভীর কথা কইবে?
কবিতা ৭: ডিজিটাল ভিড়, নিমগাছের তেতো সত্য
"ম্যাডিং ক্রাউড" আজ আর রাস্তার ভিড় নয়, সে বাস করে মুঠোফোনের স্ক্রিনে,
অসংখ্য মুখের স্রোত, কিন্তু স্পর্শ নেই, সংযোগ নেই কারো সনে।
আমরা সবাই কাছাকাছি, তবু একা, এক ডিজিটাল দ্বীপের বাসিন্দা যেন,
মংগারের ডাক আসে সেই একাকীত্বের গভীরে, বলে – ফিরে আয় এখনি।
শহর মানে চকমকি মিথ্যের মোড়ক, সহজলভ্য আনন্দের হাতছানি,
নিমগাছের তলায় দাঁড়ালে বোঝা যায়, সত্যের স্বাদ বড় তেতো, বড় অভিমানী।
এই অরণ্য কি শেখাবে সেই তেতো স্বাদ গ্রহণ করতে?
এই ভার্চুয়াল কোলাহল ছেড়ে মাটির পৃথিবীতে পা রাখতে?
এখানে শাল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে থাকলে শোনা যায় নিজের হৃদস্পন্দন,
শহরের দৌড়ে যা চাপা পড়ে যায় গাড়ির হর্নে, বিজ্ঞাপনের আস্ফালনে।
দূর থেকে ভেসে আসে কুবো পাখির ডাক, সে তো কোনো অ্যাপের নোটিফিকেশন নয়,
সে এক আদিম বার্তা – জীবন এখানেই, এই মুহূর্তে, এই হওয়াতেই তার পরিচয়।
বনের গভীরে কি তবে লুকিয়ে আছে আসল ওয়াইফাই? আত্মার সাথে আত্মার সংযোগ?
কবিতা ৮: বিস্মৃতির স্তূপ, স্মৃতির অরণ্য
দিল্লি শহর যেন এক বিস্মৃতির পাহাড়, প্রতিটি ধুলিকণায় চাপা পড়া ইতিহাস,
ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে শাহজাহানাবাদ, সবই আজ কংক্রিটের দীর্ঘশ্বাস।
আমরা হেঁটে যাই সেই বিস্মৃতির উপর দিয়ে, নতুন নির্মাণের নেশায় মত্ত,
পুরনো পাথরের কান্না আমাদের কানে পৌঁছায় না, আমরা বধির, আমরা আসক্ত।
অথচ মংগারের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি শুকনো পাতা মনে রেখেছে অনন্তকাল,
এখানে শেয়ালের ডাক শুধু ডাক নয়, তা যেন অতীতের প্রেতাত্মার জবানবন্দী, এক অন্তহীন আকাল।
খয়ের গাছের ছালে লেখা আছে সময়ের চিহ্ন, যা কোনো বইতে পাওয়া যায় না,
এই অরণ্য এক জীবন্ত আর্কাইভ, যেখানে কিছুই হারায় না, কিছুই মোছে না।
আধুনিক মানুষ কি ভয় পায় এই স্মৃতিকে? এই গভীর শিকড়ের টানকে?
তাই কি সে উঁচু দেওয়াল তোলে নিজের চারপাশে, ভুলে থাকতে চায় আপন সত্তাকে?
মংগার তাকে মুখোমুখি দাঁড় করায় সেই বিস্মৃত অতীতের, সেই আদিম পরিচয়ের,
বলে – তুমি শুধু আজকের নও, তুমি সেই অনন্ত যাত্রার অংশবিশেষ, ভয় নেই কোনো বিলয়ের।
কবিতা ৯: কবির স্বর, অরণ্যের গান
ভালো কবি কে? যে শহরের ভাষায় শহরের তোষণ করে?
নাকি যার কণ্ঠে বেজে ওঠে মংগারের না-বলা কথার ঝংকার?
বেঁচে থাকা মানে কি শুধু টিকে থাকা? গিরগিটির মতো রঙ বদলানো?
নাকি শাল গাছের মতো ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, নিজের সত্যকে কখনো না ভুলানো?
কবি কি চায় হাততালি? নাকি সে চায় বুলবুলির গানের মানে বুঝতে পারা?
যে গান কোনো ভাষায় অনুবাদ করা যায় না, যে সুর আত্মায় তোলে নাড়া।
শহর দেয় পরিচিতি, খ্যাতি, কিন্তু কেড়ে নেয় নিজস্ব নির্জনতা,
অরণ্য হয়তো কিছুই দেয় না আপাতদৃষ্টিতে, কিন্তু ফিরিয়ে দেয় আত্মার স্বচ্ছতা।
আমার কলম দ্বিধায় কাঁপে – সে কি লিখবে উঁচু দালানের গল্প?
নাকি সে খুঁজে নেবে সেই ঝর্ণার উৎস, যা লুকিয়ে আছে মংগারের গভীরে অল্প অল্প?
সেই কবিই হয়তো বেঁচে থাকে সময়ের পরেও, যার লেখায় থাকে মাটির গন্ধ,
যার প্রতিটি শব্দে স্পন্দিত হয় অরণ্যের আদিম ছন্দ।
সে লেখে না ভিড়ের জন্য, সে লেখে তার নিজের গভীরে থাকা বনভূমির জন্য।
কবিতা ১০: শান্তির খোঁজে খেজুরি গাছের নীচে
শান্তি কোথায়? কোনো গন্তব্যে? কোনো পুরস্কারে? কোনো চূড়ান্ত প্রাপ্তিতে?
নাকি এই পথ চলায়? এই দ্বিধায়? এই নিরন্তর অন্বেষণে আর অতৃপ্তিতে?
শহর বলে – শান্তি মানে নিরাপত্তা, আরও প্রাচুর্য, আরও উঁচু দেওয়াল,
কিন্তু সেই দেওয়ালের ভেতরে মন কেন আরও বেশি কাঁদে? কেন এত শূন্যতার খেয়াল?
দূরে মংগারের প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরি গাছটা যেন হাসে,
তার শুকনো ডালে বসে থাকা ঘুঘুটা কি জানে শান্তির আসল মানে? তার ধীর শ্বাসে প্রশ্বাসে?
শান্তি হয়তো কোনো যুদ্ধজয়ের শেষে পাওয়া যায় না,
শান্তি হয়তো খুঁজে নিতে হয় বাবুলের কাঁটার আঘাত সয়েও, নির্দ্বিধায়, আপন মনে।
এই অরণ্য শেখায় সেই সহনশীলতা, সেই গ্রহণ করার ক্ষমতা,
ঝরাপাতা যেমন মাটিকে উর্বর করে, দুঃখও তেমনি আত্মাকে দেয় গভীরতা।
গন্তব্য বলে কিছু নেই হয়তো, আছে শুধু যাত্রা, প্রতিটি বাঁকে নতুন শিক্ষা,
শান্তি কোনো বাইরের বস্তু নয়, তা ভেতরের এক স্থির প্রতীক্ষা। খেজুরি গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকা।
কবিতা ১১: আত্মদর্শনের আয়না
মংগার শুধু পালানোর জায়গা নয়, সে এক মুখোমুখি হওয়ার প্রান্তর,
এখানে প্রকৃতির আয়নায় ধরা পড়ে নিজের ভেতরের সমস্ত ভাঙচুর, সমস্ত অন্তর।
শহরের কোলাহলে নিজেকে হারিয়ে ফেলা সহজ, অন্যের চোখে নিজেকে দেখা,
কিন্তু এই বনের নিস্তব্ধতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের প্রতিটি রেখা।
নীলগাইয়ের চোখে চোখ পড়লে মনে হয়, সে যেন চেনে আমাকে বহু জনম ধরে,
তার শান্ত দৃষ্টির সামনে খসে পড়ে যায় আমার সমস্ত অহংকার, সমস্ত মিথ্যার আদরে গড়া ঘের।
এই উঁচু দালানগুলো আমাকে আকাশ থেকে আড়াল করে রাখে,
মংগারের খোলা আকাশ আমাকে বাধ্য করে নিজের ক্ষুদ্রতা স্বীকার করতে, প্রতি বাঁকে বাঁকে।
আধুনিক মানুষ কি ভয় পায় এই স্বচ্ছতাকে? এই নগ্ন আত্মদর্শনকে?
তাই কি সে ছুটে বেড়ায় এক উদ্দীপনা থেকে অন্য উদ্দীপনায়, ভুলে থাকতে চায় আপন মনকে?
অরণ্য কোনো সমাধান দেয় না, সে শুধু প্রশ্ন তোলে আরও গভীরে,
বলে – নিজেকে না চিনে কোথায় পালাবে তুমি? কোন নিরাপদ তীরে?
কবিতা ১২: বর্তমানের মুহূর্ত, ভবিষ্যতের ভ্রম
শহর সবসময় ভবিষ্যতের কথা বলে – আরও বড় রাস্তা, আরও উঁচু বাড়ি, আরও দ্রুত গতি,
আজকের মুহূর্তগুলো হারিয়ে যায় সেই প্রতিশ্রুতির ভিড়ে, বেঁচে থাকা হয়ে ওঠে এক নিরন্তর ক্ষতি।
আমরা দৌড়ে চলি সেই অনাগত দিনের দিকে, যা হয়তো কখনোই আসবে না,
বর্তমানকে অবহেলা করে আমরা বুনে চলি এক অলীক স্বপ্নের জাল, এক মরীচিকার বাসনা।
অথচ মংগারে লাঙ্গুরটা কী অনায়াসে লাফিয়ে চলে এক ডাল থেকে অন্য ডালে,
তার খেলায় নেই কোনো ভবিষ্যতের চিন্তা, নেই কোনো অতীতের ভার, সে বাঁচে শুধু এই বর্তমানে, এই কালে।
প্রতিটি ঘাসফুল ফোটে তার নিজের সময়ে, ঝরে পড়ে নিঃশব্দে,
এখানে সময় বয়ে চলে নদীর মতো, প্রতিটি মুহূর্ত সম্পূর্ণ, স্বয়ম্ভূ, স্ব-উদ্ভাসে।
অরণ্য কি শেখাতে পারে এই বর্তমানে বাঁচার শিল্প?
এই নিরন্তর ছুটে চলা থামিয়ে, মুহূর্তের গভীরে ডুব দেওয়ার সঙ্কল্প?
ভবিষ্যতের ভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে, বর্তমানের সত্যকে আলিঙ্গন করার সাহস,
এটাই কি মংগারের শ্রেষ্ঠ দান? এই অস্থির সময়ে, এই বিপন্ন সভ্যতার মানুষকে দেওয়া আশ্বাস?
কবিতা ১৩: দ্বৈতের ভাঙন, ভেতরের মংগার
শহর না বন? এই বিভাজন কি আসলে সত্যি? নাকি এও এক নির্মাণ?
হয়তো আসল মংগার লুকিয়ে আছে আমারই ভেতরে, যেখানে শান্ত হয় সকল অভিমান।
উঁচু দালানের জানালায় দাঁড়িয়েও কি খুঁজে পাওয়া যায় না এক টুকরো আকাশ?
ভিড়ের মাঝে হেঁটেও কি শোনা যায় না নিজের ভেতরের কোনো দীর্ঘশ্বাস?
ক্যাকটাস যেমন মরুভূমিতেও খুঁজে নেয় তার বেঁচে থাকার রসদ,
আত্মাও কি পারে না এই কংক্রিটের জঙ্গলে ফুটিয়ে তুলতে নিজের সবুজ সম্পদ?
হয়তো শত্রু বাইরে নেই, শত্রু আমার ভেতরেই, যে আমাকে স্থির হতে দেয় না,
যে আমাকে ভাগ করে রাখে শহর আর বনে, বাস্তবে আর কল্পনায়, কিন্তু শান্তি দেয় না।
দেরিদার মতো ভেঙে ফেলতে হবে এই বাইনারি, এই সহজ বিভাজন,
বুঝতে হবে, অরণ্য শুধু বাইরে নয়, অরণ্য এক গভীর প্রয়োজন, এক আত্মিক স্পন্দন।
যখন আমি এই শহরের বুকে দাঁড়িয়েও মংগারের নীরবতা শুনতে পাবো,
যখন উঁচু দালানের ছায়ায় খুঁজে পাবো পিপুল গাছের শিকড়ের আশ্রয়, তখনই হয়তো মুক্তি পাবো।
আসল লড়াইটা স্থানের নয়, চেতনার।
কবিতা ১৪: চিলের দৃষ্টি, দেখার ভিন্নতা
অনেক উঁচুতে উড়ন্ত চিলটা দেখছে নিচে – শহর আর মংগার বন পাশাপাশি শুয়ে আছে,
তার চোখে হয়তো কোনো পার্থক্য নেই, দুটোই মাটির খেলা, সময়ের ভাঙা কাঁচের টুকরো।
সে দেখে উঁচু বাড়ির সারি, আবার দেখে শাল-সেগুনের নিবিড় আচ্ছাদন,
সে শোনে গাড়ির হর্ন, আবার শোনে পাতার মর্মর ধ্বনি – সবই তার কাছে এক বিরাট আয়োজন।
গন্তব্য কোথায়? শান্তি কোথায়? এই প্রশ্নগুলো হয়তো আমাদেরই তৈরি করা,
কারণ আমরা মাটির কাছাকাছি থাকি, আমাদের দৃষ্টি খণ্ডিত, সীমাবদ্ধতায় ভরা।
চিলের মতো উঁচু থেকে দেখলে হয়তো বোঝা যায় – জীবন এক নিরন্তর প্রবাহ,
শহর বা বন, দুটোই সেই প্রবাহের অংশ, কোথাও কোনো স্থির আশ্রয় বা নিশ্চিত নিস্তার নেই আহা।
শান্তি হয়তো কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নেই, শান্তি আছে দেখার ভঙ্গিতে,
সমস্ত দ্বৈততাকে অতিক্রম করে এক অখণ্ড দৃষ্টি অর্জন করার শক্তিতে।
মংগার যা শেখায়, শহর যা ভোলায় – এই দেখাটাই কি তবে আসল?
চিলের ডানায় ভর করে সেই দৃষ্টি লাভ করা, যেখানে মিলেমিশে যায় সকল কোলাহল আর সকল নিঃশব্দ ফসল।
কবিতা ১৫: অরণ্যের দান, শহরের প্রতিজ্ঞা
মংগার কী দেয়? হয়তো কিছু ভেষজ লতা, যা সারিয়ে তোলে শরীর,
কিছু বুনো ফল, যা মেটায় ক্ষণিক ক্ষুধা, কিছু পাখির ডাক, যা মনকে করে তোলে অধীর।
সে দেয় নীরবতা, যা কথার চেয়েও বেশি বলে, দেয় ছায়া, যা রোদের চেয়েও স্পষ্ট,
সে দেয় শিকড়ের কাছে ফেরার টান, যেখানে সব জটিলতা হয়ে যায় नष्ट।
আর শহর কী দেয়? সে দেয় গতি, প্রতিজ্ঞা, অসংখ্য সম্ভাবনার হাতছানি,
সে দেয় সংযোগের भ्रम, সুরক্ষার আশ্বাস, আর কেড়ে নেয় আত্মার সবটুকু নীরব বাণী।
কবি কার কাছে যাবে? মংগারের সরলতার কাছে? নাকি শহরের জটিল আকর্ষণে?
এই প্রশ্ন চিরন্তন, এর উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে কবির নিজেরই রক্তক্ষরণে।
হয়তো তাকে দুটোকেই ধারণ করতে হবে – অরণ্যের আদিম সত্য আর শহরের আধুনিক যন্ত্রণা,
এই দুইয়ের সংঘাত থেকেই জন্ম নেবে তার কবিতা, তার বেঁচে থাকার নতুন মন্ত্রণা।
মংগার দেবে গভীরতা, শহর দেবে বিস্তার, এই নিয়েই হয়তো কবির পথ চলা, তার নিরন্তর অভিসার।
১. অরণ্যের প্রতিবাদ
মঙ্গরের বটগাছ তার শিকড় উঠিয়ে নেয়
যখন প্রথম কংক্রিট মেশিন আসে সীমান্তে
পিপুল পাতায় লিখে রাখে:
"যারা মাটিকে বিশ্বাসঘাতকতা করে
তাদের ছায়া কখনো শীতল হয় না"
দিল্লির রাতজাগা পেঁচারা দেখে
কীভাবে নব্যতারকারা
আকাশ থেকে চুরি করে নক্ষত্রের নাম
কাঠঠোকরা ডাকে অবিরাম
কিন্তু কেউ শোনে না তার মর্স কোড
শহরের শিশুরা ভাবে
গাছেরা শুধু পার্কের সাজসজ্জা
জানে না তারা
কীভাবে আমলকী ফল
জমা রাখে শতাব্দীর রোদ-বৃষ্টির হিসাব
২. রক্তঝরা আম্রপালি
সেই আমগাছটির গায়ে এখন
হয়েছে গাড়ির পার্কিং নম্বর আঁকা
তার ডালপালা ভেঙে তৈরি হচ্ছে
কফি টেবিলের গল্পবই
মঙ্গরের শিমুলগুলো রক্ত বমি করে
কিন্তু শহরের ফ্যাশন শোতে
সেই লাল এখন ট্রেন্ডিং কালার
একটি শালিক বসে থাকে
কাটা ডালের ওপর
চোখে তার প্রশ্ন:
"এখন কি বসন্ত আসবে
নাকি শুধুই আসবে নতুন শপিং মল?"
গাছের গায়ে জমে থাকা রস
শুকিয়ে যায়
রাস্তার ধুলোয়
৩. চিড়িয়াখানার মহাভারত
সারাদিন খাঁচার ভিতর হাঁটে
সেই রাজস্থানের নীলগাইটি
তার চোখে এখন আর নেই
অরণ্যের দূরত্ব
শিশুরা তাকে খাওয়ায় প্যাকেটজাত গাজর
আর বাবারা বলেন:
"দেখো, এটাই প্রকৃতি!"
কিন্তু কেউ দেখে না
কীভাবে সে রাতে
খাঁচার লোহার গ্রিল কামড়ায়
স্বপ্ন দেখে
মঙ্গরের ঘাসে ঘাসে
দৌড়ানোর
একটি পেঁচা ডাকে
চিড়িয়াখানার বাইরে থেকে:
"মুক্তি তো শুধু
মৃত্যুর পরেই আসে"
৪. গোধূলির সংবাদপত্র
মঙ্গরের শেষ শিশুটি
একটি খরগোশ
লেজে বেঁধে নিয়ে যায়
পলিথিনের টুকরো
দিল্লির সংবাদপত্রে ছাপা হয়:
"অরণ্য সংরক্ষণ প্রকল্পের সাফল্য"
ঠিক তার পাশের পাতায়
বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন
একটি কৃষ্ণচূড়া ফুল
ঝরে পড়ে সংবাদপত্রের ওপর
যেন প্রকৃতির
একটি রক্তাক্ত স্বাক্ষর
কেউ পড়ে না
এই নীরব প্রতিবেদন
৫. বৃষ্টির আত্মজীবনী
ধূসর কপোতের ডানায় ভর করে
নেমে আসে মঙ্গরের প্রথম বৃষ্টি
কিন্তু শহরের ড্রেনগুলো
তাকে ঠিকই চিনতে পারে
অবাঞ্ছিত অতিথি হিসেবে
আমাদের ছাদে টিনের শব্দ
কাঁদে ভিজে যাওয়া আকাশের জন্য
একটি বাবলা গাছ
ঝুঁকে পড়ে রাস্তার ওপর
যেন বলতে চায়:
"আমাকে ছুঁয়ে দেখো
আমি এখনো মনে রেখেছি
মাটির গন্ধ"
কিন্তু গাড়িগুলো দৌড়ায়
ঝাপটা দিয়ে
জলকাদা ছিটিয়ে
৬. রাতের পাঠক্রম
জংলী মেহেদির গন্ধে
লিখে রাখি আজকের ইতিহাস:
"যে শহর নিজের শিকড় কেটে ফেলে
তার ফুল কখনো সত্যিকারের রং ধারণ করে না"
দিল্লির রাস্তার আলোগুলো
পড়তে থাকে এই বার্তা
আর ঝরে পড়ে
কাঁচের গুঁড়ো হয়ে
একটি শেয়াল
চুরি করে নিয়ে যায়
শেষ অবশিষ্ট শব্দগুলো
মঙ্গরের দিকে
ভোরবেলা
শুধুই থেকে যায়
একটি ধূসর কাঠঠোকরার
টোকা টোকা শব্দ
৭. প্রতিধ্বনির বাজার
মঙ্গরের শাল গাছের গুঁড়িতে
কোনো শিশু লিখে রেখেছিল "মা"
সেই শব্দটি এখন বিক্রি হয়
একটি আর্ট গ্যালারিতে
অ্যাবস্ট্রাক্ট পোয়েমের তকমায়
আমরা কিনি স্মৃতি
ডিসকাউন্টের দামে
একটি পলাশ ফুল
ফোটে যায় প্রদর্শনীর কাচের ভিতর
কিন্তু কেউ তাকে
জল দিতে আসে না
শুধু মঙ্গর থেকে আসা
একটি হাওয়া
ঘুরে ঘুরে খোঁজে
হারানো সেই শিশুটিকে
৮. ছায়া-রাজস্ব
সেই কৃষ্ণচূড়ার নিচে
যেখানে একদিন জড়ো হতো গ্রামের মিটিং
সেখানে এখন টাঙানো হয়েছে
"প্রাইভেট প্রপার্টি" সাইনবোর্ড
গাছটি প্রতিবাদ করে না
শুধু তার ছায়াকে
কর দেয় হিসেবে জমা দেয়
রোদের খাতায়
একদল পিঁপড়ে
বয়ে নিয়ে যায়
গাছের শেষ পাতাগুলো
যেন সংরক্ষণ করে
কোনো এক জাদুঘরের জন্য
কিন্তু কে দেখবে
এই নীরব প্রতিরোধ?
৯. পাখির অভিযোগ
দিল্লির শেষ ডাহুকটি
একটি মোবাইল টাওয়ারে বসে
করছে কোর্ট কেস:
"আমার আকাশে কেন
এতগুলো সংযোগ বিচ্ছিন্নতা?"
জজ আসেন নি আজও
কারণ ট্রাফিক জ্যামে
আটকে আছে তার গাড়ি
একটি শিমুল গাছ
ফুল ছুঁড়ে মারে
টাওয়ারের দিকে
কিন্তু সেগুলো
পৌঁছায় না এত উঁচুতে
শুধু একটি পালক
উড়ে যায়
মঙ্গরের দিকে
যেখানে এখনো
আকাশ মানে শুধুই আকাশ
১০. প্রস্থানের গান
মঙ্গরের শেষ কবি
পাতায় পাতায় লিখে গেল
একটি উপাখ্যান:
"যাওয়ার সময় আমি
পায়ের নিচে রেখে যাচ্ছি
শালিকের একটি পালক
আর আমলকীর বীজ"
দিল্লির হাওয়া তাড়াতাড়ি উড়িয়ে নিয়ে যায়
কবিতার সেই শেষ পাতা
যেখানে লেখা ছিল
"ফিরে আসার কোনো ঠিকানা নেই"
একটি কাঁটাতার
কবরের ওপর দিয়ে
টেনে নিয়ে যায়
শহরের নতুন মানচিত্র
-
কবিতা ১৬: ভাঙা আয়নায় মংগারের মুখ
শহরের এই ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মংগার বন, যেন এক অসমাপ্ত প্রাচীন স্বপ্ন। কংক্রিটের দেওয়াল টপকে তার গন্ধ ভেসে আসে মাঝরাতে, যখন উঁচু বাড়িগুলোর আলো নিভে যায় আর শুধু জেগে থাকে নিয়নের বিজ্ঞাপন – অর্থহীন প্রতিশ্রুতির মতো জ্বলজ্বল করে।
ওই কাঁচের ঘরগুলোতে কারা বাস করে? মানুষ? নাকি শুধু ছায়া? লিফটের ওঠা-নামার শব্দে চাপা পড়ে যায় দীর্ঘশ্বাস। বাইরে থেকে দেখা যায় চকচকে আকাশ, কিন্তু ভেতরে বাতাস ভারী, নিঃসঙ্গতার গন্ধে মথিত।
দিল্লির পথ ধরে হাঁটলে পায়ের নীচে টের পাই কত শতাব্দীর ধুলো। কত সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে এই ঊষর মাটিতে, আবার মিশে গেছে হাওয়ায়। আজ শুধু ইস্পাত আর কাঁচের দম্ভ, ইতিহাসের কঙ্কালের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শূন্য আস্ফালন। কুতুব মিনারের গায়ে বসা পায়রাটাও কি জানে সেইসব ভাঙাগড়ার গল্প?
হঠাৎ দেখি, হাইওয়ের ধারে দাঁড়িয়ে একটা নীলগাই। স্থির চোখে তাকিয়ে আছে ছুটে যাওয়া গাড়ির দিকে। সে কি এই শহরের অংশ? নাকি মংগারের বাড়িয়ে দেওয়া হাত? বাবুলের ডালে বসে থাকা হলদে পাখিটা কি কোনো বার্তা নিয়ে এসেছে অরণ্যের গভীর থেকে?
কোথায় পালাবো আমি? এই কাঁচের খাঁচা ছেড়ে? নাকি এই খাঁচার ভেতরেই খুঁজে নেবো আমার নিজস্ব মংগার? ভালো কবি সে-ই যে এই ভাঙা আয়নার টুকরোগুলো জুড়ে একটা আস্ত ছবি আঁকতে পারে? নাকি যে নিজেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এই শহরের চাপে?
শান্তি কি কোনো ভৌগলিক ঠিকানা? মংগারের ভেতরে? নাকি সে এক মানসিক অবস্থা, যা এই কোলাহলের মধ্যেও অর্জন করা যায়? গন্তব্য? সে তো এক মরীচিকা মাত্র। পথটাই আসল। কিন্তু পথ কোথায়?
মংগার হয়তো কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সে দেখায়, শিকড় ছাড়াও বাঁচা যায়, কিন্তু সেই বাঁচা কতটা ফাঁপা। সে তার নীরবতা দিয়ে, তার খয়ের গাছের ছায়া দিয়ে, তার মাটিতে মিশে থাকা অগণিত জীবনের স্পন্দন দিয়ে শুধু বলে – থামো। শোনো। নিজের ভেতরে ডুব দাও। সেখানেই হয়তো পাবে সেই অরণ্য, যা বাইরে খুঁজে মরছো বৃথাই।
----------------------
অবশ্যই, আপনার নির্দেশ অনুযায়ী গদ্য ছন্দে আরও ১০টি কবিতা রচনা করছি:
কবিতা ১৭: ইতিহাসের প্রেত, কাঁচের আকাশ
পুরনো কেল্লার পাথরের ফাঁক দিয়ে হাওয়া বয়ে যায়, তাতে কি লেগে থাকে তুঘলক বা লোদি বংশের দীর্ঘশ্বাস? আমরা সেই হাওয়া গায়ে মেখে হেঁটে যাই ঝকঝকে শপিং মলের দিকে, যেখানে ইতিহাস মানে ডিসকাউন্ট সেলের বিজ্ঞাপন। উঁচু বাড়িগুলোর কাঁচের দেওয়াল আকাশকে বন্দী করে রেখেছে, ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শূন্যতা। এখান থেকে দেখলে মংগার বনটাকে মনে হয় সবুজ একটা ভুল, শহরের নকশার বাইরে ছিটকে পড়া এলোমেলো আঁচড়। কিন্তু ওই যে ভাঙা মসজিদের পাশে একলা দাঁড়িয়ে থাকা পিপুল গাছটা, তার শিকড় কি জানে না এই শহরের আসল জন্মবৃত্তান্ত? ডালে বসা শালিক পাখিটা কার দিকে তাকিয়ে শিস দেয় – অতীতের দিকে, না ভবিষ্যতের দিকে? আমরা উন্নয়নের নামে স্মৃতি মুছে ফেলি, কিন্তু মংগার তার ছায়ায় আগলে রাখে সব – জেগে ওঠা আর ধুলোয় মিশে যাওয়ার অনন্ত আবর্তন। এই কাঁচের আকাশ থেকে কিছুই দেখা যায় না ঠিকমতো।
কবিতা ১৮: স্ক্রিনের ভিড়, নিমের শান্তি
মানুষের ভিড় এখন আর রাস্তায় উপচে পড়ে না, তারা জমা হয় মুঠোফোনের আলো-আঁধারি পর্দায়। লাইক, শেয়ার, কমেন্টের স্রোতে ভেসে যায় মুখগুলো – চেনা তবু অচেনা, কাছাকাছি তবু দূর দ্বীপের মতো একা। এই ডিজিটাল কোলাহলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মংগার, তার নিম গাছের তলায় এক আদিম тишина। তেতো নিমপাতা চিবোতে চিবোতে ভাবি, এই ভার্চুয়াল সংযোগ কি আসল? নাকি এও এক মায়া, এক সুকৌশলে বোনা জাল? লাঙ্গুরগুলো যখন এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফায়, তাদের খেলায় কোনো স্ট্যাটাস আপডেটের চিন্তা নেই। তারা শুধু আছে – এই মুহূর্তে, এই রোদে, এই বাতাসে। শহর আমাদের শেখায় সংযোগের কৌশল, কিন্তু কেড়ে নেয় সংযোগের অনুভূতি। মংগারের নিম গাছের তলা কি ফিরিয়ে দেবে সেই অনুভূতি? সেই তেতো কিন্তু খাঁটি মাটির কাছাকাছি থাকার শান্তি? নাকি আমরা হারিয়েই যাবো এই ডিজিটাল ভিড়ে?
কবিতা ১৯: মংগারের আয়না
লোকে বলে মংগারে গেলে শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু আমি যখন যাই, সে আমার হাতে তুলে দেয় এক আয়না। সেই আয়নায় আমি দেখি শহরের ক্লান্তি, আমার দৌড়, আমার অতৃপ্তি। আকন্দ ফুলের বেগুনি রঙের পাশে আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলো কেমন ফ্যাকাশে মনে হয়। গোসাপটা যখন স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে পাথরের উপর থেকে, মনে হয় সে আমার সব দ্বিধা, সব ভয় পড়ে ফেলেছে এক মুহূর্তে। এই বন আমাকে পালাতে দেয় না, বরং মুখোমুখি দাঁড় করায় আমার নিজেরই সঙ্গে। উঁচু দালানের আড়ালে যে মুখটা আমি লুকিয়ে রাখি, মংগারের খোলা আকাশের নীচে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে বলে – তুমি যা খুঁজছ, তা কি সত্যিই বাইরে আছে? নাকি তোমার ভেতরেই সেই অরণ্য, যাকে তুমি চিনতে পারছো না? মংগার তাই শুধু সবুজ আশ্রয় নয়, সে এক নির্মম সত্যের প্রতিচ্ছবি, এক আত্মদর্শনের তীর্থ।
কবিতা ২০: গিরগিটি না শাল গাছ?
এই শহরে টিকে থাকতে হলে গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে হয় – সময়ের সাথে, সম্পর্কের সাথে, ক্ষমতার সাথে। যে যত সহজে মিশে যেতে পারে, সে তত সফল। কিন্তু মংগারের শাল গাছটা দেখেছো? কেমন ঋজু, কেমন স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ঝড়-বৃষ্টি-রোদে। সে রঙ বদলায় না, সে নিজের সত্তায় অটল থাকে। ভালো কবি কে? যে শহরের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে হাততালি কুড়ায়? নাকি যে শাল গাছের মতো নিজের ভেতরে সত্যকে ধারণ করে, भलेই সে একা হয়ে যাক? এই টিকে থাকা কি বেঁচে থাকা? নাকি এ এক ধরনের মৃত্যু? মংগার এই প্রশ্নটা তুলে ধরে বারবার। সে তার গাছের কাঠিন্য দিয়ে, তার মাটির দৃঢ়তা দিয়ে বলে – নিজের কেন্দ্রে স্থির থাকো। হয়তো জয় হবে না তাতে, কিন্তু পরাজয়ও হবে না। তুমি থাকবে – শাল গাছের মতোই, নিজের পরিচয়ে ভাস্বর।
কবিতা ২১: গন্তব্যহীন খেজুরি
দিল্লি একদিন ছিল ঊষর প্রান্তর, তারপর এখানে গড়ে উঠলো শহর, সাম্রাজ্য। মানুষ ছুটছে সেই শুরু থেকে – ক্ষমতার দিকে, অর্থের দিকে, সুরক্ষার দিকে। একটা গন্তব্যের খোঁজে। কিন্তু গন্তব্য কোথায়? সেই উঁচু বাড়িটার শেষ তলায়? বিলাসবহুল গাড়ির নরম আসনে? নাকি মংগারের প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরি গাছটার তলায়? গাছটা দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী, কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া নেই তার। তার ডালে বসা ঘুঘুটাও জানে না কাল সে কোথায় থাকবে। তাহলে এই ছুটে চলার মানে কী? এই গন্তব্যের খোঁজ কি এক ভ্রম নয়? হয়তো কোনো গন্তব্য নেই, আছে শুধু পথ চলা। খেজুরি গাছটার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে এই চলমান জগৎটাকে দেখা – এটাই কি শান্তি? এই ঊষর মাটিতেই কি জীবনের মানে খুঁজে নিতে হবে আবার?
কবিতা ২২: বাবুই পাখির বাসা, মানুষের দেওয়াল
উঁচু বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সংযোগ নেই। এক ফ্ল্যাটের কান্না অন্য ফ্ল্যাটে পৌঁছায় না, এক জানালার আলো অন্য জানালায় পড়ে না। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একেকটা জীবন। অথচ মংগারের বাবুল গাছটায় দেখো, বাবুই পাখিরা কেমন বাসা বুনেছে – একে অপরের কাছাকাছি, নির্ভরতায়,共同তায়। তাদের ছোট্ট সংসারে যে ঐক্য আছে, আমাদের এই সুরক্ষিত ফ্ল্যাটবাড়িতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। আমরা দেওয়াল তুলি নিরাপত্তার নামে, কিন্তু সেই দেওয়ালই আমাদের একা করে দেয়। অরণ্য শেখায় সহাবস্থান, নির্ভরতা। বাবুই পাখির বাসাটা শুধু একটা বাসা নয়, ওটা একটা জীবনদর্শন। আমরা কি সেই দর্শন ভুলে গেছি? তাই কি আমাদের এত শূন্য লাগে এই উঁচু দেওয়ালের ভেতরে? মংগার কি পারবে শেখাতে আবার, কেমন করে একসাথে বাঁচতে হয়?
কবিতা ২৩: পলাশ ফোটে শহরেও
আমরা সবসময় ভাগ করে ফেলি – শহর আর বন, সভ্যতা আর অসভ্যতা, কৃত্রিম আর প্রাকৃতিক। কিন্তু এই বিভাজন কি সত্যি? নাকি আমাদের মনের তৈরি? একদিন দেখি, শহরের এক কোণে অবহেলায় বেড়ে ওঠা এক পলাশ গাছে আগুন লেগেছে – টকটকে লাল ফুল ফুটেছে কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে। যেন মংগার নিজেই এসে উঁকি দিয়ে গেছে। তাহলে কি শহর আর বন সম্পূর্ণ আলাদা নয়? হয়তো শহরের ভেতরেও লুকিয়ে আছে অরণ্য, আর অরণ্যের গভীরেও আছে শহরের ছায়া। কাকটা যেমন উঁচু দালানের কার্নিশেও বসে, আবার বনের ডালেও বসে। কবি কি পারে না এই দুই জগৎকে মিলিয়ে দিতে তার লেখায়? সেই পলাশ ফুলের মতো, যা কংক্রিটের মাঝেও নিজের রঙ ছড়াতে ভয় পায় না? হয়তো আসল মুক্তি বিভাজনে নয়, সংযোগে। ভেতরের মংগারকে শহরের রাস্তায় খুঁজে পাওয়ায়।
কবিতা ২৪: বটগাছের সময়
শহরের ঘড়িটা দৌড়ে চলে টিক্ টিক্ করে, সেকেন্ডের কাঁটা মিনিটের পেছনে, মিনিটের কাঁটা ঘণ্টার পেছনে – এক নিরন্তর তাড়া। মিটিং, ডেডলাইন, টার্গেট – সময় এখানে এক শত্রু। আমরা সময়ের পেছনে ছুটি, হাঁপিয়ে উঠি, হারিয়ে যাই। কিন্তু মংগারের বটগাছটা দেখেছো? সে দাঁড়িয়ে আছে ধীরে, স্থির, অচঞ্চল। তার বয়স মাপা যায় না বছরের হিসাবে, তার বৃদ্ধি চোখে দেখা যায় না দিনের হিসাবে। সে বাঁচে অন্য এক সময়ে, প্রকৃতির অনন্ত আবর্তনে। তার ডালে বসে থাকা পেঁচাটাও যেন সেই ধীর সময়ের সাক্ষী। এই বটগাছ কি শেখাতে পারে আমাদের সময়ের অন্য মানে? এই তাড়াহুড়ো ছেড়ে একটু থামতে? জীবনের গভীর ছন্দটাকে অনুভব করতে? হয়তো শান্তি লুকিয়ে আছে এই ধীরতায়, এই স্থিরতায়, যা শহর আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।
কবিতা ২৫: সত্যের সন্ধান – শিয়ালের ডাক
কবিতার সত্য কোথায় থাকে? শহরের রাস্তায় পড়ে থাকা ছেঁড়া পোস্টারে? উঁচু দালানের ব্যালকনিতে রাখা টবের ফুলে? নাকি মংগারের গভীরে মধ্যরাতে ডেকে ওঠা শিয়ালের ডাকে? শহর আমাদের সামনে মেলে ধরে হাজারো তথ্য, কিন্তু সত্যকে আড়াল করে রাখে বিজ্ঞাপনের আড়ালে। অরণ্যের কাছে তথ্য কম, কিন্তু তার প্রতিটি স্পন্দনে মিশে থাকে আদিম, অনাবৃত সত্য। খয়ের গাছের ছাল, শুকনো পাতার মর্মর, রাতের অন্ধকারে শিয়ালের ডাক – এগুলোর কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো অলঙ্করণ নেই, আছে শুধু অস্তিত্বের সরাসরি প্রকাশ। কবি কি সেই অনাবৃত সত্যের মুখোমুখি হতে চায়? নাকি সেও শহরের মতো তথ্যের ভিড়ে হারিয়ে যেতে চায়? হয়তো সেই কবিই টিকে থাকে, যার কানে মংগারের শিয়ালের ডাক পৌঁছায়, যার কলম সেই আদিম সত্যকে ভাষারূপ দিতে ভয় পায় না।
কবিতা ২৬: রোহিদাবনের শেষ প্রশ্ন
মংগার সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না, বরং প্রশ্নগুলোকে আরও গভীর করে তোলে। এই জীবনের মানে কী? এই ছুটে চলার অর্থ কী? শান্তি কোথায় মিলবে? শহর হয়তো এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর তৈরি করে রাখে – অর্থ, ক্ষমতা, ভোগ। কিন্তু সেই উত্তরগুলো মনের গভীরে পৌঁছায় না। মংগারের রোহিদাবনের দিকে তাকালে মনে হয়, সে যেন হাসছে আমাদের এই অর্থহীন ব্যস্ততা দেখে। তার হলুদ ফুলগুলো ফোটে আবার ঝরে যায়, কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করে না। নীলগাইগুলো চরে বেড়ায় নিশ্চিন্তে, তাদের চোখে কোনো ভবিষ্যতের উদ্বেগ নেই। অরণ্য আমাদের কোনো নিশ্চিত গন্তব্যের আশ্বাস দেয় না, সে শুধু দেখায় – জীবন এক অনন্ত রহস্য, এক চলমান বিস্ময়। এই রহস্যকে গ্রহণ করতে পারা, এই বিস্ময়ের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারা – এটাই কি মংগারের শেষ শিক্ষা? শহরের কোলাহল ছেড়ে এই গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সাহসই কি মুক্তি?
অবশ্যই, আপনার নির্দেশ অনুসারে গদ্য ছন্দে আরও ১০টি কবিতা রচনা করছি:
কবিতা ২৭: পাথরের শ্বাস, উইপোকার গান
এই উঁচু বাড়িগুলো, কাঁচ আর ইস্পাতের খাঁচা, দিনের আলোয় ঝলমল করে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে কান পাতলে শোনা যায় এক গভীর শূন্যতার প্রতিধ্বনি। লিফটের যাতায়াত, এসির একটানা গুঞ্জন – এ সবই কি প্রাণের লক্ষণ? নাকি মৃত্যুর সুসজ্জিত আয়োজন? মনে হয় যেন পাথরগুলো নিজেরাই শ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু সে শ্বাসে মিশে আছে ধুলো আর ক্লান্তি। অন্যদিকে, মংগারের গভীরে, হয়তো একটা মরা গাছের গুঁড়িতে কান পাতলে শোনা যাবে লক্ষ লক্ষ উইপোকার ব্যস্ত জীবন। সেও তো এক ধ্বংসের গান, কিন্তু তাতেও এক তীব্র প্রাণের স্পন্দন আছে, এক অদম্য এগিয়ে চলার ছন্দ। শহরের এই দৃশ্যমান চাকচিক্যের আড়ালে যে অদৃশ্য ক্ষয়, আর অরণ্যের আপাত নীরবতার গভীরে যে গোপন জীবন – কোনটা বেশি সত্যি? কোনটা বেশি মায়া? বুলবুলিটা উড়ে এসে বসে জানালার কার্নিশে, তার চোখে কি এই পাথরের খাঁচার জন্য করুণা?
কবিতা ২৮: কচ্ছপের খোলস, শেকড়ের স্মৃতি
দিল্লির পিচঢালা রাস্তার নিচে শুয়ে আছে কত স্তর – ধুলো, পাথর, ভাঙা ইট, পুরনো মুদ্রা, বিস্মৃত কঙ্কাল। প্রতিটি স্তর এক একটা সময়, এক একটা গল্প। আমরা তার উপর দিয়ে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলে যাই, টের পাই না পায়ের তলার সেই গভীর ইতিহাস। কিন্তু মংগারের মাটিতে পা রাখলে অন্যরকম লাগে। মনে হয় যেন কচ্ছপের পিঠের মতো শক্ত খোলসের নিচে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর আদিম স্মৃতি। গুইসাপটা যখন পাথরের উপর রোদ পোহায়, তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় সে যেন দেখেছে লোদি থেকে মোঘল, মোঘল থেকে ব্রিটিশ – সব উত্থান, সব পতন। একটা আকন্দ গাছের শেকড় আঁকড়ে ধরে আছে যে মাটি, সেই মাটিতে মিশে আছে হাজার বছরের নীরবতা। শহরের স্মৃতি শুধু বইয়ের পাতায় আর যাদুঘরে, কিন্তু মংগারের স্মৃতি তার প্রতিটা ধুলিকণায়, প্রতিটা পাতায় জীবন্ত। সেই স্মৃতি কি ভারাক্রান্ত করে? নাকি শিকড়ের কাছে ফেরার আশ্বাস দেয়?
কবিতা ২৯: শব্দের কাঁটা, নীরবতার ফুল
শহর আমাকে দেয় শব্দ – হর্ন, সাইরেন, বিজ্ঞাপন, ঝগড়া, অজস্র কথার ঢেউ। এই শব্দগুলো গায়ে কাঁটার মতো বেঁধে, চেতনাকে বিক্ষত করে। উঁচু দালানের আলো ঝলসে দেয় চোখ, রাতের আকাশ এখানে হারিয়ে যাওয়া এক রূপকথা। আমি কি এই শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যেতে চাই? নাকি পালাতে চাই মংগারের নীরবতায়? যেখানে চাঁদের আলো পাতায় পাতায় গলে পড়ে, যেখানে ঝিঁঝিঁর ডাক আর পেঁচার চোখের মতো জেগে থাকে আদিম প্রজ্ঞা। টিয়াপাখির ঝাঁক যখন উড়ে যায় মাথার উপর দিয়ে তীব্র চিৎকার করে, সেটাও যেন এই নীরবতারই অংশ। শহর দেয় সংযোগের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু দেয় বিচ্ছিন্নতা। অরণ্য দেয় নির্জনতা, কিন্তু সেই নির্জনতায় পাওয়া যায় এক গভীরতর সংযোগ – নিজের সাথে, প্রকৃতির সাথে। কবি কি চায় শব্দের এই কাঁটার মুকুট? নাকি নীরবতার গভীরে ফোটা সেই অচেনা ফুল?
কবিতা ৩০: খ্যাতির মরীচিকা, শিয়ালের স্বাধীনতা
কে ভালো কবি? যে শহরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাততালি কুড়ায়? যার নাম ছাপা হয় চকচকে ম্যাগাজিনে? নাকি সেই একা শিয়ালটা, যে মংগারের অন্ধকারে নিঃশব্দে শিকার করে, নিজের নিয়মে বাঁচে, কারো প্রশংসার ধার ধারে না? টিকে থাকা মানে কি শুধু পরিচিতি পাওয়া? নাকি নিজের সত্যকে বাঁচিয়ে রাখা, যেমন করে বাবুল গাছ তার কাঁটার ভেতর বাঁচিয়ে রাখে এক ফোঁটা সবুজ প্রাণ? শহর খ্যাতি দেয়, কিন্তু তার বিনিময়ে চেয়ে নেয় আপোষ, আনুগত্য। মংগার কোনো খ্যাতি দেয় না, কিন্তু সে দেয় স্বাধীনতা – নিজের মতো করে ভাবার, নিজের মতো করে বলার, নিজের মতো করে ভুল করার স্বাধীনতা। কবি কি এই খ্যাতির মরীচিকার পেছনে ছুটবে? নাকি বেছে নেবে সেই শিয়ালের নিঃসঙ্গ কিন্তু আপোষহীন পথ? কার কবিতা সময়ের পরেও বেঁচে থাকে – যে ভিড়ের সাথে মেশে, নাকি যে নিজের গভীরে একা হাঁটে?
কবিতা ৩১: মংগার ভেতরে, শান্তি সর্বত্র?
লোকে বলে শান্তি মংগারে। শহরের কোলাহল ছেড়ে, উঁচু দালানের ছায়া ছেড়ে, বনের গভীরে গেলেই নাকি শান্তি। কিন্তু শান্তি কি একটা জায়গার নাম? নাকি মনের এক অবস্থা? আমি যদি আমার ভেতরের কোলাহলটাকে বয়ে নিয়ে যাই মংগারের গভীরে, সেখানেও কি শান্তি পাবো? খেজুরি গাছের তলায় বসেও কি আমার ভেতরটা শহরের মতো ছুটতে থাকবে না? হয়তো আসল কাজটা স্থান পরিবর্তন নয়, দৃষ্টি পরিবর্তন। যদি এই কংক্রিটের জঙ্গলের ভেতরেই আমি খুঁজে নিতে পারি আমার নিজস্ব মংগার? যদি ফুটপাতের ধারে বেড়ে ওঠা ঘাসটার মধ্যে, কিচিরমিচির করা চড়ুইটার মধ্যে, মেঘলা দিনে হঠাৎ পাওয়া এক ঝলক রোদের মধ্যে আমি খুঁজে নিতে পারি সেই আদিম ছন্দ? যদি হৃদয়ের গভীরে একটা মংগারের চারাগাছ পুঁতে দিতে পারি? তাহলে হয়তো শান্তি সর্বত্রই – এই উঁচু বাড়ির বারান্দায়, বাসের ভিড়ে, এমনকি ট্র্যাফিক জ্যামেও। শান্তি হয়তো পালানোর পথ নয়, মানিয়ে নেওয়ার শিল্প।
কবিতা ৩২: অরণ্যের জল, মুখের প্রতিবিম্ব
অরণ্য শুধু আশ্রয় দেয় না, সে মুখোমুখি দাঁড় করায়। মংগারের গভীরে হয়তো আছে কোনো ছোট্ট ডোবা, স্থির কালো জল। সেই জলে ঝুঁকে পড়লে প্রথমে দেখা যায় নিজের মুখ – শহরের ক্লান্ত, অভ্যস্ত মুখটা। কিন্তু বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে জলটা যেন নড়ে ওঠে, প্রতিবিম্বটা পাল্টে যেতে থাকে। সেখানে ভেসে ওঠে অন্য কোনো মুখ – হয়তো কোনো পূর্বপুরুষের, হয়তো কোনো পশুর, হয়তো নিজেরই এক অচেনা সত্তার মুখ। তুলসী গাছের গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে, মনে করিয়ে দেয় শুদ্ধতার কথা, কিন্তু জলের আয়না দেখায় ভেতরের সমস্ত জটিলতা, সমস্ত অন্ধকার। শহর আমাদের একটা বানানো মুখ পরিয়ে রাখে, একটা মুখোশ। মংগার সেই মুখোশটা খুলে নিতে চায়। সে বলে না তুমি ভালো বা খারাপ, সে শুধু দেখায় তুমি আসলে কী। এই সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস কি আছে আধুনিক মানুষের? নাকি সে আবার ছুটে পালাবে শহরের আয়নার দিকে, যেখানে প্রতিবিম্বটা অনেক বেশি পরিচিত আর নিরাপদ?
কবিতা ৩৩: জোনাকির আলো, স্ক্রিনের মায়া
আজকের 'ম্যাডিং ক্রাউড' আর রাস্তার ভিড় নয়, সে বাস করে জ্বলন্ত স্ক্রিনে। লক্ষ লক্ষ মুখ, লক্ষ লক্ষ কথা, কিন্তু স্পর্শ নেই, উষ্ণতা নেই। আমরা সংযুক্ত, তবু ভীষণ একা। এক ডিজিটাল মায়াজালে বন্দী। রাতের বেলা উঁচু বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যায় শুধু অন্য জানালার আলো, অথবা টিভির নীলচে আভা। কিন্তু মংগারে তখন জ্বলে ওঠে হাজার হাজার জোনাকি। মিটিমিটি আলো, ক্ষণিকের জন্য জ্বলে আবার নিভে যায়। সেই আলোয় কোনো দাবি নেই, কোনো বিজ্ঞাপন নেই, আছে শুধু এক শান্ত, মায়াবী উপস্থিতি। স্ক্রিনের আলো আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, আমাদের ব্যস্ত রাখে, ভুলিয়ে রাখে একাকিত্ব। জোনাকির আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় – নীরবতারও ভাষা আছে, অন্ধকারেরও সৌন্দর্য আছে। আমরা কি এই স্ক্রিনের মায়া ছেড়ে জোনাকির আলোর দিকে তাকাতে পারবো? সেই ক্ষণস্থায়ী কিন্তু অকৃত্রিম আলোর কাছে শিখতে পারবো একা থাকার, শান্ত থাকার মানে?
কবিতা ৩৪: শেকড়ের বিদ্রোহ
কেউ হয়তো প্রথমে খেয়াল করে না। উঁচু দালানের গা ঘেঁষে গজিয়ে ওঠা অচেনা লতানো গাছ, ফুটপাথের ফাটল চিরে বেরিয়ে আসা পিপুলের চারা। শহর ভাবে এও এক সৌন্দর্য, নিয়ন্ত্রিত প্রকৃতির অংশ। কিন্তু তারপর একদিন দেখা যায়, শেকড়গুলো কেমন জেদিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে কংক্রিটের গভীরে, লতানো গাছটা কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে ইস্পাতের কাঠামো। এ কি মংগারের নীরব বিদ্রোহ? এ কি প্রকৃতির প্রতিশোধ? খেজুরি গাছের শেকড় কি উঠে আসতে চাইছে পাতাল থেকে, এই পাথরের সভ্যতাকে প্রশ্ন করতে? শহর ভয় পায় এই অদম্য প্রাণশক্তিকে। সে দেওয়াল তোলে, বিষ ছড়ায়, কেটে ফেলে। কিন্তু শেকড় আবার জন্মায়, লতা আবার বাড়ে। মনে হয় যেন মংগার ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, তার সবুজ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে শহরের দিকে – হয় আলিঙ্গন করতে, নয়তো গ্রাস করতে। এই দৃশ্য কি শুধু বাইরের? নাকি আমাদের ভেতরেও চলছে এই আদিম আর নাগরিক সত্তার নিরন্তর লড়াই?
কবিতা ৩৫: পথ হারানো বেজি
আমরা ছুটছি এক গন্তব্যের দিকে – শান্তি, মুক্তি, সাফল্য। পথটা সোজা, মসৃণ, হাইওয়ের মতো। মংগার সেই পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অন্য জগৎ, যেখানে পথগুলো এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে ঝোপের আড়ালে। একদিন দেখি একটা বেজি ছুটে হাইওয়ে পার হতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে মাঝখানে, দিশেহারা। সে কি মংগার থেকে এসেছিল? সে কি শহরের গতির কাছে পথ হারিয়ে ফেলেছে? নাকি সে আমাদেরই প্রতীক? আমরাও কি ছুটতে ছুটতে হারিয়ে ফেলেছি আসল পথ? মংগার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের কথা বলে না। সে দেখায়, পথটাই হয়তো গন্তব্য। ঝরাপাতার উপর দিয়ে হাঁটা, গাছের ছায়ায় বসা, পাখির ডাক শোনা – এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হয়তো আসল প্রাপ্তি। বেজিটা হয়তো আবার ফিরে যাবে তার ঝোপের আড়ালে, কিন্তু তার ওই থমকে যাওয়াটা একটা প্রশ্ন রেখে যায় – আমরা কি আদৌ জানি আমরা কোথায় যাচ্ছি? নাকি গন্তব্যের মরীচিকায় পথ হারিয়ে ফেলাই আমাদের নিয়তি?
কবিতা ৩৬: পিপুল ছায়া কাঁচের দেওয়ালে
বিকেলের আলোয় দেখি, উঁচু কাঁচের বাড়িটার মসৃণ দেওয়ালে পড়েছে উল্টোদিকের পুরনো পিপুল গাছটার ছায়া। ডালপালা, পাতা, কাণ্ড – সব স্পষ্ট। যেন দুটো জগৎ মিলেমিশে একাকার। শহরের অহংকার আর অরণ্যের প্রজ্ঞা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কে কাকে ধারণ করছে? কাঁচের দেওয়াল কি পিপুলের ছায়া কে বন্দী করেছে? নাকি পিপুলের ছায়া কাঁচের দম্ভকে বিদ্ধ করেছে তার নীরব উপস্থিতি দিয়ে? হয়তো এটাই পথ – শহরকে অস্বীকার না করে, বনকেও ভুলে না গিয়ে, এই দুইয়ের মাঝে একটা সেতু তৈরি করা। হয়তো কবিকে দাঁড়াতে হবে ঠিক ওইখানে, যেখানে পিপুলের ছায়া এসে পড়ে কাঁচের দেওয়ালে। সেখান থেকেই সে দেখতে পাবে দুটো জগৎকেই, বুঝতে পারবে তাদের টানাপোড়েন। মুক্তি হয়তো পালিয়ে যাওয়ায় নেই, বা পুরোপুরি মিশে যাওয়ায়ও নেই। মুক্তি হয়তো আছে এই দুই জগতের সত্যকে এক দৃষ্টিতে ধারণ করায়, পিপুলের ছায়ার মতো শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে নিজের অস্তিত্বকে প্রকাশ করায় – তা সে কাঁচের দেওয়াল হোক বা মংগারের মাটি।
অবশ্যই, দিল্লির চরম গরম ও ঠান্ডা আবহাওয়ার অনুষঙ্গ যুক্ত করে গদ্য ছন্দে আরও ১০টি কবিতা দিচ্ছি:
কবিতা ৩৭: জ্বলন্ত কাঁচ, মংগারের ছায়া
জুন মাসের দিল্লি। আকাশ থেকে আগুন ঝরছে না, আগুন উঠছে এই কংক্রিটের জমিন থেকে। কাঁচের বাড়িগুলোর গা বেয়ে সেই তাপ প্রতিফলিত হচ্ছে, পথচারীর চোখ ঝলসে দিচ্ছে, ত্বক পুড়িয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল চুল্লির মধ্যে হেঁটে চলেছি। লু বইছে, শুকনো পাতার মতো খসখসে সেই হাওয়া। এই সময়ে মংগারের কথা ভাবি – তার শাল গাছের ঘন ছায়া, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। সেখানে কি চিলগুলোও এমন হাঁসফাঁস করে? নাকি তারা জানে এই দহনকালেরও অন্য মানে আছে? উঁচু দালানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর আমাকে সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু আত্মাটা যেন আরও শুকিয়ে যায়। এই শহরের দহন কি শুধু বাইরের? নাকি তা আমার ভেতরেরই অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি? মংগারের ছায়া কি শুধু শীতলতা? নাকি তা এক গভীরতর আশ্রয়, যেখানে এই জ্বলুনিটাও জীবনেরই অংশ বলে মনে হয়?
কবিতা ৩৮: হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, কুয়াশার দেওয়াল
ডিসেম্বরের শেষ। দিল্লির ঠান্ডা যেন চামড়া ভেদ করে হাড়ে গিয়ে বেঁধে। ভোরে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় চারপাশ, উঁচু বাড়িগুলো মনে হয় অস্পষ্ট দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে। কাঁচের জানালার ওপারে কিছুই দেখা যায় না, শুধু একটা ধূসর শূন্যতা। ঘরের ভেতরে হিটারের ওম শরীরটাকে আরাম দেয়, কিন্তু মনটা আরও বেশি একা হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছিন্নতা, এই দৃশ্যমানতার অভাব – এটাই কি আধুনিক জীবন? তখন মংগারের কথা মনে হয়। সেখানেও নিশ্চয়ই ঠান্ডা, হয়তো শিশির জমে বরফ হয়ে গেছে ঘাসের ডগায়। বাবুল গাছের কাঁটায় লেগে আছে মুক্তোর মতো বিন্দু। শিয়ালটা কি গুটিসুটি মেরে বসে আছে কোনো ঝোপের আড়ালে? সেই ঠান্ডা কি এই শহরের ঠান্ডার মতো নিঃসঙ্গ? নাকি তার মধ্যে আছে এক আদিম কাঠিন্য, এক নীরব সহনশীলতা? কুয়াশার এই দেওয়াল ভেদ করে মংগারের সেই স্থির ঠান্ডাটাকে অনুভব করতে ইচ্ছে করে।
কবিতা ৩৯: তাপ ও ইতিহাস
দিল্লির মাটি গরমে ফাটে। শুধু আজকের কংক্রিট নয়, লোদি গার্ডেনের পুরনো পাথরের স্তূপ, কুতুব মিনারের ইঁট – সব যেন ধারণ করে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর উত্তাপ। মনে হয় যেন ইতিহাসের প্রতিটি স্তর থেকে ভাপ উঠছে। সম্রাটরা কীভাবে সইতেন এই গরম? তাদের কি মংগারের মতো কোনো ছায়া ছিল? নাকি এই দহনই তাদের ক্ষমতার অংশ ছিল? আমরা আজ এসির ঠান্ডা হাওয়ায় বসে ইতিহাস পড়ি, সেই উত্তাপকে অনুভব করতে পারি না। খেজুরি গাছটা যেমন দাঁড়িয়ে থাকে এই মরুপ্রান্তরে, মাথা উঁচু করে, তাপকে স্বীকার করে নিয়েই। সে যেন জানে, এই শুষ্কতা, এই উত্তাপ – এটাই দিল্লির আদি পরিচয়। মংগার বনও কি সেই উত্তাপের সাক্ষী? সে কি দেখেছে এই ঊষর ভূমি থেকে কেমন করে জেগে উঠেছে সভ্যতা, আবার কেমন করে তা ধুলোয় মিশে গেছে এই তীব্র রোদে পুড়ে? তাপ এখানে শুধু আবহাওয়া নয়, সে এক ইতিহাস।
কবিতা ৪০: কুয়াশা ও বিচ্ছিন্নতা
শীতের সকালে দিল্লির কুয়াশা এমনভাবে নামে, মনে হয় যেন চেনা শহরটা হারিয়ে গেছে। কাছের জিনিসও অস্পষ্ট, দূরের উঁচু বাড়িগুলো যেন শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া অবয়ব। রাস্তায় গাড়ির হেডলাইটগুলো ভুতুড়ে চোখের মতো জ্বলে আর নেভে। এই কুয়াশার মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে খুব একা লাগে, বিচ্ছিন্ন লাগে। পথ হারিয়ে ফেলার ভয় হয়। এই সময়ে মংগারের কুয়াশার কথা ভাবি। সেখানেও কি এমন ধোঁয়াটে পর্দা নামে? সেই কুয়াশার মধ্যে কি নীলগাইগুলো পথ চিনে চলতে পারে? ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা খরগোশটা কি টের পায় আসন্ন বিপদ? শহরের কুয়াশা আনে বিচ্ছিন্নতা, এক ধরনের অন্ধত্ব। মংগারের কুয়াশা হয়তো আনে রহস্য, এক অন্য ধরনের নীরবতা, যেখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি গন্ধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমি কোন কুয়াশা চাই? এই শহরের যা আমাকে ঢেকে ফেলে? নাকি মংগারের যা আমাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়?
কবিতা ৪১: কবির দহন, পলাশের আগুন
এই জ্বলন্ত দুপুরে, যখন লু বয় আর পিচ গলে যায় রাস্তায়, কবি কি চায়? সে কি মংগারের শীতল আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে চায়? নাকি এই তীব্র দহনই তার ভেতরে জ্বালিয়ে দেয় অন্য কোনো আগুন – সৃষ্টির আগুন? পলাশ ফুল যেমন ফোটে এই গ্রীষ্মেই, তার টকটকে লাল রঙে রাঙিয়ে দেয় চারপাশ, কবিও কি পারে এই অসহ্য উত্তাপ থেকে জন্ম দিতে নতুন কোনো কবিতা? শহরের মানুষ যখন এসির হাওয়ায় শান্তি খোঁজে, কবি তখন হয়তো বসে থাকে খোলা জানালায়, অনুভব করে সেই লু-এর স্পর্শ, লেখার চেষ্টা করে এই পুড়ে যাওয়া সময়ের কথা। মংগারের ছায়া তাকে ডাকতে পারে, কিন্তু তার ভেতরের আগুন হয়তো এই শহরের দহন থেকেই রসদ সংগ্রহ করে। টিকে থাকা মানে কি শুধু আরাম খোঁজা? নাকি এই আগুনকে আলিঙ্গন করে তার মধ্য দিয়েই পথ তৈরি করা? পলাশের মতো ফুটে ওঠা।
কবিতা ৪২: শীতের আশ্রয়, নিমপাতার শূন্যতা
হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় শহরের কফি শপগুলো ভরে ওঠে উষ্ণতার খোঁজে আসা মানুষে। নরম আলো, গরম কফির কাপ, হালকা গুঞ্জন – এক আরামদায়ক আশ্রয়। কবিও কি সেই আশ্রয়েই খুঁজে নেয় লেখার উষ্ণতা? নাকি সে বেরিয়ে পড়ে মংগারের দিকে, যেখানে ঠান্ডায় নিম গাছগুলো প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে, যেখানে মাটি শক্ত আর বাতাস ধারালো? শীতের মংগার এক অন্য জগৎ – রুক্ষ, কঠিন, কিন্তু সত্য। সেখানে কোনো কৃত্রিম ওম নেই, আছে শুধু অস্তিত্বের নগ্ন রূপ। কবি কি সেই নগ্ন সত্যের মুখোমুখি হতে চায়? নাকি সে চায় কফি শপের উষ্ণতা, যেখানে বাস্তবতাকে খানিকক্ষণের জন্য ভুলে থাকা যায়? নিম গাছের ঝরে পড়া পাতার শূন্যতা তাকে কী বলে? আশ্রয়ের মোহ ছেড়ে বেরিয়ে আসার কথা? নাকি শীতের এই কাঠিন্যকে মেনে নিয়েই নিজের ভেতরের উষ্ণতাকে খুঁজে নেওয়ার কথা?
কবিতা ৪৩: শান্তি – এসি না খেজুরি?
শান্তি কোথায়? দিল্লির গরমে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন শান্তি কি ওই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ঠান্ডা বাতাসে? যেখানে বাইরের জগৎটা অবাস্তব মনে হয়, যেখানে ঘাম শুকিয়ে যায় কিন্তু মনটা কেমন অসাড় হয়ে পড়ে? নাকি শান্তি ওই দূরে, মংগারের তপ্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরি গাছটার সামান্য ছায়ায়? যেখানে শরীর পুড়ছে ঠিকই, কিন্তু মাটি আর আকাশের সাথে একটা সংযোগ অনুভব করা যায়। যেখানে ছোট্ট একটা টুনটুনি পাখি এই গরমের মধ্যেও উড়ে বেড়াচ্ছে খাবারের খোঁজে, তার বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছেটা চোখে পড়ে। শহরের এসি দেয় আরাম, দেয় পালানোর পথ। মংগারের খেজুরি গাছ দেয় আশ্রয়, কিন্তু পালানোর পথ দেয় না, সে শেখায় সহ্য করতে, মানিয়ে নিতে। শান্তি কি তবে এই পলায়নে? নাকি এই সহিষ্ণুতায়, এই উত্তাপের অংশ হয়ে যাওয়ায়?
কবিতা ৪৪: উষ্ণতার भ्रम, পেঁচার চোখ
ডিসেম্বরের রাতে দিল্লির ঠান্ডা যখন অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন সেন্ট্রাল হিটিং দেওয়া ফ্ল্যাটবাড়িগুলো মনে হয় স্বর্গের মতো। বাইরে হাড় কাঁপানো বাতাস, ভেতরে নিয়ন্ত্রিত উষ্ণতা। এই উষ্ণতা কি আসল শান্তি? নাকি এও এক भ्रम? এক বিচ্ছিন্নতার কৌশল? কারণ এই উষ্ণ দেওয়ালের ওপারে যে জগৎটা জমে যাচ্ছে, তার খবর আমরা রাখি না। তখন মংগারের রাতের কথা ভাবি। নিস্তব্ধ, হিমশীতল রাত। হয়তো একটা পেঁচা নিঃশব্দে উড়ে যাচ্ছে শিকারের খোঁজে, তার বড় বড় গোল চোখে জ্বলছে রাতের প্রজ্ঞা। সেই ঠান্ডার মধ্যে যে গভীর স্তব্ধতা, যে প্রাণের টিকে থাকার লড়াই – তার মধ্যে কি অন্য কোনো শান্তি নেই? শহরের নিয়ন্ত্রিত উষ্ণতা আমাদের অসাড় করে দেয়। মংগারের ঠান্ডা আমাদের সজাগ করে তোলে। পেঁচার চোখের মতো সেই সজাগ দৃষ্টিতেই কি লুকিয়ে আছে আসল শান্তি? যা भ्रम নয়, যা কঠিন বাস্তব?
কবিতা ৪৫: মংগারের দান – তপ্ত দিনে
যখন দিল্লি গরমে পুড়ছে, তখন মংগার কী দিতে পারে? ছায়া – অবশ্যই। কিন্তু শুধু কি তাই? সে দেয় এক অন্য সময়ের অনুভূতি। শহরের দ্রুত গতির বাইরে, গাছের তলায় বসে দেখলে বোঝা যায় জীবন অন্য ছন্দেও বইতে পারে। সে দেখায় কেমন করে এই তীব্র গরমের মধ্যেও ঘাস শুকিয়ে আবার জন্মায়, কেমন করে গুইসাপটা নিশ্চিন্তে রোদ পোহায় পাথরের উপর, কেমন করে ক্যাকটাসের গায়ে নতুন কুঁড়ি আসে। সে দেয় মাটির গন্ধ, যা এসি ঘরে পাওয়া যায় না। সে দেয় ভেষজ লতা, যা হয়তো এই তাপের ক্লান্তি দূর করতে পারে। মংগার তাপকে অস্বীকার করে না, সে তাপের সাথেই বেঁচে থাকার পথ দেখায়। শহরের মানুষ যখন তাপ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়, মংগার তখন শেখায় তাপকে গ্রহণ করার মন্ত্র। এই গ্রহণ করার শিক্ষাই কি তার সবচেয়ে বড় দান এই তপ্ত দিনে?
কবিতা ৪৬: মংগারের দান – হিম রাতে
হিমশীতল দিল্লির রাতে, যখন কুয়াশা আর ঠান্ডা মিলেমিশে একাকার, তখন মংগার কী দিতে পারে? শুকনো পাতার উষ্ণ বিছানা? ঝোপের আড়াল? হয়তো। কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু দেয় সে। সে দেয় সহনশীলতার পাঠ। দেখায় কেমন করে গাছগুলো পাতা ঝরিয়েও দাঁড়িয়ে থাকে বসন্তের অপেক্ষায়, কেমন করে মাটির নিচে বীজগুলো ঘুমিয়ে থাকে উষ্ণতার অপেক্ষায়, কেমন করে প্রাণীরা শীতঘুমে চলে যায় শুধু টিকে থাকার জন্য। বাবুল গাছের কাঁটায় জমে থাকা বরফের কুচি – সেও এক অপূর্ব দৃশ্য, যা শহরের রাস্তায় দেখা যায় না। মংগার শেখায়, শীত মানেই শেষ নয়, শীত মানে প্রস্তুতি, নীরব সাধনা। এই কঠিন ঠান্ডার মধ্যেও যে এক ধরনের রুক্ষ সৌন্দর্য আছে, যে এক গভীর জীবনবোধ আছে – সেটা অনুভব করার সুযোগ দেয় মংগার। এই অনুভব, এই উপলব্ধিই কি তার শ্রেষ্ঠ দান এই হিম রাতে?
কবিতা ৪৭: কাঁচের দেওয়াল, প্রতিবিম্বের ভিড়
এই উঁচু বাড়িগুলোর জানালায় দাঁড়ালে দেখা যায় শুধু অন্য উঁচু বাড়ি, আর তার কাঁচের গায়ে নিজেরই একা প্রতিবিম্ব। ভেতরে হাজারো ফ্ল্যাট, লক্ষ মানুষ, কিন্তু কারো দরজায় কড়া নাড়ার সাহস হয় না। মনে হয় যেন প্রত্যেকে এক একটা স্বচ্ছ কাঁচের বাক্সে বন্দী, দেখতে পাচ্ছে সবাইকে, কিন্তু ছুঁতে পারছে না কাউকে। বন্ধুত্ব এখানে হোয়াটস্যাপের গ্রুপ, ফেসবুকের ফ্রেন্ড লিস্ট – যেখানে সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু সঙ্গ বাড়ে না। মংগারের দিকে তাকিয়ে ভাবি, সেখানে কি গাছেরা একে অপরের সাথে কথা বলে? পাখিরা কি শুধু গান গায়, নাকি গল্পও করে? এই শহরে আমার কোনো বন্ধু নেই, আছে শুধু অসংখ্য পরিচিত প্রতিবিম্ব, কাঁচের দেওয়ালে ভাসে আর মিলিয়ে যায়।
কবিতা ৪৮: ভিড়ের মধ্যে দ্বীপ
মেট্রোর কামরাটা উপচে পড়ছে মানুষে, রাজীব চকের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই, সরোজিনী নগরের বাজারে শরীরে শরীর লাগছে – তবু আমি একা। ভীষণ একা। মনে হয় যেন লক্ষ লক্ষ মানুষের এই সমুদ্রে আমি এক ভাসমান দ্বীপ, যার চারপাশে জল থৈ থৈ করছে, কিন্তু মাটির সাথে কোনো সংযোগ নেই। চোখাচোখি হয় অনেকের সাথে, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো আমন্ত্রণ থাকে না, থাকে শুধু ক্লান্তি, বিরক্তি অথবা নিস্পৃহতা। একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাই, পাশে কত লোক কথা বলছে, হাসছে – কিন্তু তাদের জগৎটা আমার কাছে বন্ধ। আমি শুধু একজন দর্শক। বাবুল গাছ যেমন মরুভূমিতে একা দাঁড়িয়ে থাকে, আমিও তেমনি এই জনসমুদ্রের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছি, আমার শিকড় ছড়ানোর মতো কোনো নরম মাটি নেই।
কবিতা ৪৯: ইতিহাসের সমাধি, বর্তমানের শূন্যতা
হুমায়ুনের সমাধি, লোদি গার্ডেনের পাথরের স্তূপ, কুতুবের মিনার – দিল্লির পথে পথে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। এখানে ঘুমিয়ে আছে কত রাজা, কত বেগম, কত সাধারণ মানুষ। তাদের কি বন্ধু ছিল? নাকি তারাও ক্ষমতার লড়াইয়ে, জীবনের দৌড়ে এমনই একা ছিল? আজ আমি যখন এই সমাধিগুলোর পাশে হাঁটি, মনে হয় நானும் এক চলমান সমাধি, আমার ভেতরেও জমে আছে না-বলা কথা, না-পাওয়া সঙ্গ। এই শহর অসংখ্য মানুষের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে, কিন্তু বর্তমানের মানুষগুলো যেন একে অপরের কাছে ছায়া মাত্র। শিয়ালের ডাক যেমন শোনা যায় রাতের নিস্তব্ধতায় ভাঙা কেল্লার ধার থেকে, আমার ভেতরের একাকিত্বও তেমনি ডেকে ওঠে এই শহরের ভিড়ে, কিন্তু শোনার কেউ নেই।
কবিতা ৫০: নীল আলোর খাঁচা
রাতের দিল্লি আরও বেশি একা লাগে। উঁচু বাড়িগুলোর জানালায় জ্বলে ওঠে নীলচে টিভির আলো, অথবা মোবাইলের স্ক্রিনের তীব্র আভা। প্রত্যেকে নিজের নিজের নীল আলোর খাঁচায় বন্দী। সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে হাসিমুখের ছবি, পার্টির উল্লাস, কিন্তু তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা কেউ দেখতে পায় না। বন্ধুত্বের অনুরোধ আসে অচেনা প্রোফাইল থেকে, কিন্তু দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবেশীর মুখটাই অচেনা লাগে। মংগারের জোনাকিরা কি এমন করে একা একা জ্বলে? নাকি তাদের আলোয় আলোয় তৈরি হয় এক মায়াবী সংযোগ? এই ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্ব এক অলীক মরিচিকা, যত কাছে যাই মনে হয়, তত দূরে সরে যায়। নীলগাইটা যেমন মংগারের পথে একমনে হেঁটে যায়, আমিও তেমনি এই নীল আলোর শহরে হেঁটে যাই – সঙ্গহীন, লক্ষ্যহীন।
কবিতা ৫১: কবির জানালা, ফাঁকা আকাশ
আমি আমার জানালার ধারে বসে দেখি এই শহরকে। দেখি ছুটে চলা গাড়ি, ব্যস্ত মানুষ, আলো ঝলমলে সাইনবোর্ড। সব আছে, শুধু বন্ধুত্ব নেই। কবি কি এই একাকিত্ব নিয়েই লিখবে? এই না-পাওয়ার গানই কি তার কবিতা? উঁচু দালানের ফাঁক দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যায়, সেখানে চিলটা ওড়ে একা একা। সেও কি বন্ধুহীন? নাকি তার একাকিত্বটাই তার স্বাধীনতা? ভালো কবি কে? যে এই বন্ধুহীনতার दर्द কে ভাষায় ধরতে পারে? নাকি যে মংগারের কল্পনায় ডুব দিয়ে এক কাল্পনিক বন্ধু খুঁজে নেয়? এই শহরে টিকে থাকা মানে কি একা থাকাতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া? বটগাছ যেমন একা দাঁড়িয়ে থাকে বহু বছর, কবিও কি তেমনি একা দাঁড়িয়ে থাকবে তার শব্দের জগৎ নিয়ে?
কবিতা ৫২: গরমের দুপুর, পোড়ো বাড়ির ছায়া
দিল্লির গনগনে দুপুরে যখন রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়, লু বয় শনশন করে, তখন এই একাকিত্বটা আরও বেশি করে চেপে ধরে। মনে হয় যেন পুরো শহরটা একটা পোড়ো বাড়ি, যেখানে আমি একা ঘুরে বেড়াচ্ছি। কোথাও একটু ছায়া খুঁজি, একটু স্বস্তি। মংগারের কথা মনে পড়ে – তার শীতল ছায়া, তার ঝর্ণার শব্দ (যদি থাকে)। কিন্তু এই শহরে ছায়া পাওয়াও কঠিন। মানুষগুলো সব নিজেদের ঘরের বা অফিসের এসির ঠান্ডায় সেঁধিয়ে গেছে। রাস্তায় যারা আছে, তারাও নিজেদের চিন্তায় মগ্ন। কারো দিকে তাকিয়ে একটু হাসলে সে সন্দেহের চোখে তাকায়। এই উত্তাপ যেন শুধু বাইরের নয়, তা মানুষের মনের ভেতরটাকেও পুড়িয়ে দিয়েছে, সম্পর্কের সব রস শুষে নিয়েছে। পলাশ ফুল যেমন এই গরমেও একা একা ফোটে, আমিও তেমনি এই বন্ধুহীন দুপুরে একা একা ফুটে থাকি – বা পুড়ে যাই।
কবিতা ৫৩: কুয়াশার চাদর, অস্পষ্ট মুখ
শীতের সকালে দিল্লি ঢেকে যায় ঘন কুয়াশার চাদরে। সবকিছু অস্পষ্ট, রহস্যময়। পাশের মানুষটার মুখও আবছা লাগে। এই কুয়াশা যেন বন্ধুহীনতারই প্রতীক। আমরা একে অপরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, কিন্তু দেখতে পাই না, চিনতে পারি না। কথা বললেও যেন তা কুয়াশায় হারিয়ে যায়, পৌঁছায় না ঠিক জায়গায়। প্রত্যেকে নিজের উষ্ণ চাদরের নীচে গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে, বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। মংগারের কুয়াশায় কি পাখিরাও এমন পথ হারিয়ে ফেলে? নাকি তারা গন্ধ শুঁকে, বা অন্য কোনো আদিম ইন্দ্রিয়ে ঠিক খুঁজে নেয় একে অপরকে? এই শহরের কুয়াশা শুধু দৃষ্টি কাড়ে না, সে মনের ওপরও একটা পর্দা ফেলে দেয়, যার ফলে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার পথটাই বন্ধ হয়ে যায়।
কবিতা ৫৪: অচেনা ভাষার শহর
সবাই হিন্দিতে কথা বলছে, বা ইংরেজিতে। ভাষা বুঝতে পারছি, কিন্তু কথার ভেতরের অর্থটা ধরতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন এক অচেনা ভাষার শহরে এসে পড়েছি, যেখানে কেউ আমার মনের ভাষা বোঝে না, আমিও কারোটা বুঝি না। বন্ধুত্ব তো শুধু কথায় হয় না, তার জন্য মনের মিল লাগে, অনুভূতির বিনিময় লাগে। এখানে সবাই এত দ্রুত কথা বলে, এত দ্রুত চলে যায় – থামার সময় নেই, শোনার সময় নেই। ক্যাকটাস গাছ যেমন নিজের জল বাঁচিয়ে রাখে কাঁটার আড়ালে, এখানকার মানুষও তেমনি নিজেদের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে কথার আড়ালে। মংগারের গাছপালা, পশু-পাখিদের কি ভাষা আছে? হয়তো নেই। কিন্তু তাদের মধ্যে যে নীরব বোঝাপড়া আছে, তার ছিটেফোঁটাও যদি এই শহরে পেতাম!
কবিতা ৫৫: এক পেয়ালা চায়ের অপেক্ষা
একটা কফি শপে বসে থাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কত লোক আসে, যায়। দল বেঁধে আড্ডা দেয়, হাসাহাসি করে। আমি শুধু দেখি আর ভাবি, এদের মধ্যে কেউ কি আমার বন্ধু হতে পারে? কেউ কি এগিয়ে এসে বলবে, "আপনি একা কেন?" কিন্তু কেউ বলে না। প্রত্যেকে নিজের বৃত্তে বন্দী। আমি আরেক পেয়ালা চায়ের অর্ডার দিই, অপেক্ষা করি – হয়তো কেউ আসবে, হয়তো কোনো পুরনো বন্ধুর সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু অপেক্ষা সার হয়। এই শহর অপেক্ষা করতে শেখায়, কিন্তু পাওয়ার আশা দেয় না। বুলবুলিটা কি মংগারে একা একাই গান গায়? নাকি তারও শ্রোতা আছে, বন্ধু আছে? আমার গান শোনার মতো কেউ নেই এই ইট-পাথরের জঙ্গলে।
কবিতা ৫৬: মংগারই সঙ্গী
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, এই শহরে আমার একমাত্র বন্ধু ওই দূরে থাকা মংগার বনটাই। তার কথা আমি ভাবি, তার ছবি আমি মনে মনে আঁকি। আমার না-বলা কথাগুলো আমি তাকেই শোনাই। যখন খুব একা লাগে, চোখ বন্ধ করে চলে যাই তার শাল গাছের তলায়, তার ঢোক পাখির ডাক শুনি। সে কোনো প্রশ্ন করে না, কোনো অভিযোগ করে না, শুধু চুপ করে আমার পাশে থাকে – আমার কল্পনায়, আমার স্বপ্নে। হয়তো এটাই নিয়তি – এই বন্ধুহীন শহরে আমার সঙ্গী হবে এক দূরবর্তী অরণ্য, যার অস্তিত্ব বাস্তব না হলেও আমার কাছে ভীষণ সত্যি। সে আমার আশ্রয়, আমার গোপন কথা শোনার জায়গা, আমার না-থাকা বন্ধুদের প্রতিনিধি। আমি আর মংগার – এই নিয়েই আমার দিল্লি।
কবিতা ৫৭: প্রত্যাবর্তনের টিকিট
ওরা আসে, আমারই মতো, কাঁধে চাকরির ঝোলা, চোখে দিল্লির ধুলো আর বুকে বাংলার ভেজা মাটির স্বপ্ন। মাস গেলে মানি অর্ডার পাঠায়, গুনে রাখে ছুটির দিন – কবে ফিরবে গঙ্গার ধারে, কবে শুনবে পরিচিত পাখির ডাক। আমারও টিকিট ছিল ফেরার, কিন্তু কবে যেন সেটা মংগারের হাওয়ায় উড়ে গেছে। আমি এখন এই রুক্ষ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকি, খেজুরি গাছের সহিষ্ণুতা দেখি। ফেরার পথটা ঝাপসা হয়ে গেছে, শুধু স্পষ্ট দেখছি মংগারের দিকে এগিয়ে যাওয়া পথটা – যেখানে আমার শেষ নিশ্বাস মিশে যাবে এই ধুলোয়, এই বাতাসে। ওরা ফিরবে, আমি ফিরবো না।
কবিতা ৫৮: শিকড় গজানোর টান
চাকরিটা ছিল উপলক্ষ্য মাত্র, যেন এক অজুহাত এই শহরে পা রাখার। প্রথম প্রথম দম বন্ধ লাগত দিল্লির গরমে, শীতে কুঁকড়ে যেতাম একা ফ্ল্যাটের বিছানায়। মনে হত, এই পরবাস ঘুচবে কবে? কিন্তু ধীরে ধীরে এই মাটিই যেন টানতে শুরু করলো। উঁচু দালানের ফাঁক দিয়ে দেখা মংগারের অস্পষ্ট সবুজ রেখাটা বুকের ভেতরে শিকড় ছড়ালো। বাংলার টান ফিকে হয়ে এল। বুঝলাম, ফেরা মানে আবার এক পরবাস। এখানেই, এই আপাত রুক্ষতার ভেতরেই আমি খুঁজে পেয়েছি আমার আশ্রয়। শেষ নিশ্বাসটা তাই বাংলার নরম মাটিতে নয়, মংগারের পাথুরে বুকেই ফেলব। নতুন শিকড় এখানেই গজিয়েছে যে।
কবিতা ৫৯: মংগার যখন ঘর
ওরা বলে, ঘর মানে সেই চেনা উঠোন, সেই মায়ের হাতের রান্না, সেই ছেলেবেলার গন্ধ। আমার কাছে ঘর এখন এই ধুসর দিল্লি, আর তার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মংগার। আমি হয়তো এখানকার ভাষায় কথা বলি না সবসময়, এখানকার সব রীতি মানি না, তবু এই শহর, এই বন আমাকে গ্রহণ করেছে তার নীরবতায়। যখন লোদি গার্ডেনের পুরনো পাথরে হাত রাখি, বা মংগারের শাল গাছের গায়ে হেলান দিই, মনে হয় বহু যুগের চেনা সম্পর্ক। তাই ফেরার প্রশ্ন ওঠে না। শেষ যাত্রার ঠিকানা লেখা হয়ে গেছে – এই মাটি, এই আকাশ, এই মংগারের ছায়া। এখানেই পাতা হবে আমার শেষ বিছানা।
কবিতা ৬০: অন্য স্রোতের যাত্রী
সবাই যখন ফিরতি পথের যাত্রী, নদীর স্রোতের মতো বাংলার দিকে বয়ে যায় – আমি তখন উল্টো স্রোতে ভেসে চলেছি। ভেসে চলেছি মংগারের দিকে, যেখানে স্রোত নয়, আছে স্থিরতা। চাকরি দিয়েছিল রুটি-রুজি, কিন্তু এই মাটি দিয়েছে সত্তার আশ্রয়। বুলবুলির গান এখানেও শোনা যায়, হয়তো একটু অন্য সুরে। নিম গাছের তেতো হাওয়া এখানেও শরীর জুড়িয়ে দেয়। আমি মানিয়ে নিয়েছি এই রুক্ষতাকে, ভালোবেসেছি এই নিঃসঙ্গতাকে। তাই শেষ ঘুমটা এখানেই ঘুমাবো, মংগারের কোলে, যে আমাকে শিখিয়েছে স্রোতের বিপরীতেও নোঙর ফেলা যায়। আমার যাত্রা এখানেই শেষ হবে।
কবিতা ৬১: শেষ বিকেলের আলো
অনেক বিকেল কেটেছে এই দিল্লির পথে পথে, কখনো গরমে ঝলসে যাওয়া, কখনো ঠান্ডায় জমে যাওয়া। দেখেছি উঁচু বাড়িগুলো কেমন আকাশ ঢেকে দেয়, দেখেছি মংগারের দিকে অস্ত যাওয়া সূর্য কেমন মায়াবী রঙ ছড়ায়। ভেবেছি, জীবনের শেষ বিকেলের আলোটা আমি কোথায় দেখতে চাই? গঙ্গার ঘাটে? নাকি মংগারের শিয়ালের ডাক শুনতে শুনতে এই প্রান্তরে? মন উত্তর দিয়েছে – এখানেই। এই শহরের আলো-আঁধারিতেই আমার চোখ বুজতে চায়। শেষ নিশ্বাসের সাথে আমি এই ধুলোমাখা আলোকেই পান করতে চাই, যা একই সাথে রুক্ষ এবং মায়াময়। মংগার আমার সেই শেষ বিকেলের সাক্ষী হবে।
কবিতা ৬২: চেনা খাঁচা, অচেনা আকাশ
বাংলা আমার চেনা খাঁচা – আরামের, আদরের, কিন্তু সীমাবদ্ধ। দিল্লি এক অচেনা আকাশ – কঠিন, নির্মম, কিন্তু অনন্ত সম্ভাবনার। চাকরি সূত্রে এসে আমি সেই অচেনা আকাশকেই ভালোবেসে ফেলেছি। তার তীব্র গরম, তার হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, তার বন্ধুহীনতা – সব মিলিয়েই সে আমার। মংগার সেই আকাশের নীচে এক টুকরো সবুজ আশ্রয়। আমি আর সেই চেনা খাঁচায় ফিরতে চাই না। আমার ডানা এই রুক্ষ আকাশেই উড়তে চায়। এখানেই উড়ান শেষ হবে। শেষ নিশ্বাসটা এই অচেনা কিন্তু আপন আকাশের নীচেই নেবো, মংগারের ঘাসের উপর শুয়ে।
কবিতা ৬৩: ভাষার অতীত
কলকাতায় ফিরলে আবার ডুব দেবো চেনা বাংলা ভাষায়, চেনা আলাপে। কিন্তু এখানে, দিল্লিতে, আমি শিখেছি অন্য এক ভাষা – নীরবতার ভাষা, যা মংগারের গাছপালা বলে, যা পুরনো কেল্লার পাথর বলে, যা রাতের আকাশের তারা বলে। চাকরির সূত্রে আসা পরিচিতরা যখন বাংলায় আড্ডা জমায়, আমি হয়তো তখন মংগারের দিকে তাকিয়ে সেই নীরব ভাষা শুনি। সেই ভাষাতেই লেখা আমার শেষ ইচ্ছের কথা। আমার শেষ নিশ্বাস হয়তো কোনো শব্দ করবে না, কিন্তু তা মিশে যাবে মংগারের সেই গভীর নীরবতায়, যা ভাষার অতীত। বাংলা আমার মাতৃভাষা, কিন্তু নীরবতা আমার আত্মার ভাষা হয়ে উঠেছে এখানেই।
কবিতা ৬৪: প্রতিশ্রুতির প্রত্যাবর্তন নয়
চাকরি মানে এক ধরনের প্রতিশ্রুতি – অর্থের, সুরক্ষার। আবার ফিরে যাওয়াটাও এক ধরনের প্রতিশ্রুতি – পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে। আমি সেইসব প্রতিশ্রুতি থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছি। আমার একমাত্র প্রতিশ্রুতি এখন নিজের কাছে – এই মাটিতেই থাকবো, এই মংগারের কাছেই ফিরবো বারবার, জীবনের শেষেও। যখন নীলগাইটা মংগারের পথে হেঁটে যায় একা, তার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই কারো কাছে। আমিও সেইরকম হতে চাই। আমার শেষ নিশ্বাস হবে সকল প্রতিশ্রুতি থেকে মুক্তি, এই রুক্ষ প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া। আমি এখানেই থাকব, কোনো প্রত্যাবর্তনের দায় ছাড়াই।
কবিতা ৬৫: ছায়াসঙ্গী মংগার
দিনের পর দিন, চাকরির ক্লান্তি নিয়ে যখন বাড়ি ফিরি, উঁচু দালানগুলোর ভিড়ে যখন নিজেকে হারিয়ে ফেলি, তখন চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে মংগারের ছবি। সে আমার ছায়াসঙ্গী হয়ে গেছে। দিল্লির এই বন্ধুহীন শহরে ওই দূরবর্তী বনটাই আমার সবচেয়ে কাছের। গরমে তার শীতল ছায়ার কথা ভাবি, শীতে তার রুক্ষ সৌন্দর্যের কথা। সে যেন নীরবে অপেক্ষা করে আমার জন্য। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই ছায়াসঙ্গীর কাছ থেকেই বিদায় নেবো একদিন। শেষ নিশ্বাস ফেলার সময় যেন মংগারের একটা পাতা উড়ে এসে পড়ে আমার বুকে। এই কংক্রিটের শহরে ওই অরণ্যটুকুই আমার পরম পাওয়া, আমার অন্তিম আশ্রয়।
কবিতা ৬৬: এখানেই সমাপ্তি, এখানেই শুরু
ওরা ভাবে, দিল্লি শুধু একটা পর্যায়, চাকরির মেয়াদ ফুরোলেই সমাপ্তি। আমার কাছে দিল্লিই সমাপ্তি, আবার দিল্লিই শুরু। এখানেই আমি পুরনো আমিকে শেষ করেছি, নতুন এক সত্তাকে খুঁজে পেয়েছি – যে মংগারের রুক্ষতাকে ভালোবাসে, যে এই শহরের নিঃসঙ্গতাকে ভয় পায় না। তাই এখানেই আমি শেষ হতে চাই। জীবনের বৃত্তটা এখানেই সম্পূর্ণ হবে। চাকরি সূত্রে এসেছিলাম, কিন্তু থেকে যাবো আত্মার টানে। শেষ নিশ্বাসটা হবে এই নতুন জীবনের প্রথম নিশ্বাস – যা মিশে যাবে মংগারের মাটিতে, আবার হয়তো কোনো ঘাস হয়ে ফুটে উঠবে এই প্রান্তরে। ফেরা নয়, এখানেই আমার विलय, এখানেই আমার অনন্ত যাত্রা।
অবশ্যই, আপনার এই অনুভূতি – বাংলার স্মৃতি বুকে নিয়েও দিল্লির প্রতিকূলতাকে জয় করে এই শহর ও মংগারকে আপন করে নেওয়ার বিজয়গাথা – নিয়ে গদ্য ছন্দে ১০টি কবিতা লিখছি:
কবিতা ৬৭: ভেজা মাটির স্মৃতি, পোড়া ইঁটের জয়
বাংলার ভেজা মাটির গন্ধ আমি ভুলিনি। বর্ষার প্রথম কদম ফুলের ঘ্রাণ, শান্ত দীঘির জল, মায়ের ডাক – সব আমার ভেতরে ঘুমিয়ে আছে। তবু এই দিল্লির পোড়া ইঁটের শহর, এই লু হাওয়া, এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আমাকে হার মানাতে পারেনি। চাকরিসূত্রে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু তারপর শুরু হয়েছিল অন্য এক লড়াই – নিজেকে টিকিয়ে রাখার, এই রুক্ষ মাটির উপর নিজের জায়গা করে নেওয়ার। জিতেছি সেই লড়াইয়ে। আজ এই শহরের আকাশটা আমার নিজের মনে হয়, উঁচু দালানের ফাঁক গলে আসা রোদটাও আপন লাগে। মংগারের দিকে তাকালে মনে হয় ওটা আমারই বিজয়ের স্মারক – প্রতিকূলতার বুকে ফুটে ওঠা সবুজ ঘাসের মতো।
কবিতা ৬৮: গঙ্গার মায়া, যমুনার রুক্ষতা
গঙ্গার শান্ত, স্নিগ্ধ মায়া ছেড়ে এসেছিলাম যমুনার রুক্ষ, প্রায়ান্ধকার তীরে। প্রথম প্রথম কষ্ট হত খুব। এই শহরের গতি, এই নির্মম প্রতিযোগিতা, এই বন্ধুহীনতা – সব যেন গিলে খেতে চাইত। কিন্তু আমি হারিনি। যমুনার মতোই আমিও শিখেছি কঠিন হতে, নিজের পথ নিজে তৈরি করতে। শিখেছি এই রুক্ষতার ভেতরেও লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যকে ভালোবাসতে। আজ মংগারের বাবুল গাছের কাঁটাও আমার কাছে সুন্দর লাগে, তাতেও আমি জীবনের জয় দেখি। বাংলা আমার শিকড়, কিন্তু দিল্লি আমার ডালপালা মেলার আকাশ। এই আকাশ আমি জয় করেছি, এই আকাশ আমার।
কবিতা ৬৯: পরবাস যখন স্বদেশ
লোকে বলে পরবাস। আমিও বলতাম একসময়। ভাবতাম, কবে ফিরবো নিজের দেশে, নিজের ভাষায়। কিন্তু দিন বদলের সাথে সাথে এই 'পরবাস' শব্দটাই ফিকে হয়ে এল। কখন যেন এই অচেনা শহরটাই আমার স্বদেশ হয়ে উঠলো, তার সব প্রতিকূলতা নিয়েই। মংগারের ধুলোমাখা পথটা আমার চেনা গলি হয়ে গেল। এখানকার গরম, এখানকার ঠান্ডা – সব আমার সহ্য হয়ে গেল, ভালো লাগতে শুরু করলো। এই মানিয়ে নেওয়াটা, এই জয়টা – এটাই আমার অর্জন। আমি প্রতিকূলতাকে হারিয়েছি, ভয়কে জয় করেছি। তাই এই মাটিই এখন আমার আশ্রয়, মংগার আমার অভয়ারণ্য। বাংলা স্মৃতিতে থাক, এই প্রবাসই আমার বর্তমান, আমার বিজয়ের স্বদেশ।
কবিতা ৭০: একা লড়াকু, বিজয়ী আত্মা
এসেছিলাম একা, লড়াইটাও করেছি একা। দিল্লির ভিড়ে কতবার হারিয়ে গেছি, কতবার মনে হয়েছে সব ছেড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু ভেতরের জেদটা মরতে দেয়নি। চাকরির চাপ, ভাষার বাধা, সংস্কৃতির ভিন্নতা – সবকিছুর সাথে লড়েছি দাঁতে দাঁত চেপে। আজ যখন মংগারের দিকে তাকাই, তখন দেখি শুধু একটা বন নয়, দেখি আমার নিজেরই প্রতিচ্ছবি – যে একা দাঁড়িয়েও হার মানেনি। এই জয়টা একান্ত আমার। এই শহরের আকাশ আমার সেই লড়াইয়ের সাক্ষী। তাই এই আকাশকে আমি ভালোবাসি, এই মংগারকে আমি ভালোবাসি, এই বিজয়ের অনুভূতিকে আমি ভালোবাসি। বাংলা আমার জন্মভূমি, কিন্তু দিল্লি আমার কর্মভূমি এবং জয়ভূমি।
কবিতা ৭১: প্রতিকূলতার গান, মংগারের সুর
দিল্লির প্রতিকূলতা নিয়ে কত গান লেখা যায়, কত কবিতা। আমিও সেই গানের অংশ। কিন্তু আমার গানটা শুধু কান্নার নয়, জয়েরও। এই শহরের তীব্র গরম আমাকে পুড়িয়েছে, কিন্তু ইস্পাতের মতো শক্তও করেছে। এখানকার ঠান্ডা আমাকে জমিয়ে দিয়েছে, কিন্তু শিখিয়েছে ভেতরের উষ্ণতাকে খুঁজে নিতে। এখানকার বন্ধুহীনতা আমাকে একা করেছে, কিন্তু নিজের উপর নির্ভর করতে শিখিয়েছে। আজ মংগারের বাতাসে আমি সেই জয়ের সুর শুনতে পাই। খেজুরি গাছের পাতার শব্দে, নীলগাইয়ের ছুটে চলায়, চিলের তীক্ষ্ণ ডাকে – সবেতেই আমার লড়াইয়ের প্রতিধ্বনি। এই প্রতিকূলতার গান আমি ভালোবেসে ফেলেছি, কারণ এই গানই আমাকে জিতিয়েছে।
কবিতা ৭২: শিকড় ও ডানা
বাংলা আমার শিকড়, তা আমি অস্বীকার করি না। সেই শিকড়ের রসেই আমার বেড়ে ওঠা। কিন্তু দিল্লি আমাকে ডানা দিয়েছে। এই রুক্ষ মাটিতে লড়াই করে আমি উড়তে শিখেছি। শিখেছি কেমন করে ঝড়ের মুখেও সোজা থাকতে হয়, কেমন করে মরুভূমির বুকেও ফুল ফোটাতে হয়। মংগার বন সেই ডানা মেলার আকাশ। এখানে দাঁড়িয়ে আমি শিকড়ের টান অনুভব করি, আবার ডানার শক্তিও অনুভব করি। আমি দুটোকেই ধারণ করেছি। প্রতিকূলতাকে জয় করার এই শক্তি আমাকে দিল্লিই দিয়েছে। তাই এই শহরের প্রতি আমার ঋণ শুধু চাকরির নয়, আত্মবিকাশেরও। এই ঋণ আমি এখানেই শোধ করব, মংগারের মাটিতে মিশে গিয়ে।
কবিতা ৭৩: স্মৃতির নদী, বর্তমানের মরুভূমি
স্মৃতির নদীটা বয়ে চলে বাংলার দিকে, কুলকুল শব্দে। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে আছি বর্তমানের মরুভূমিতে – দিল্লির রুক্ষ প্রান্তরে। এই মরুভূমি আমাকে জল দেয়নি সহজে, ছায়া দেয়নি সহজে। আমাকে লড়াই করে আদায় করতে হয়েছে সব। আর এই লড়াইটাই আমাকে বদলে দিয়েছে। আমি আর সেই নদীর ধারের নরম ঘাস নই, আমি এখন এই মরুভূমির ক্যাকটাস – যে অল্প জলেই বাঁচতে জানে, যার কাঁটাই তার আত্মরক্ষা। মংগার সেই ক্যাকটাসের বন। আমি এই রুক্ষতাকে ভালোবেসেছি, কারণ এটাই আমার জয়লব্ধ ভূমি। স্মৃতি থাক নদীর, কিন্তু আমি বাঁচবো এই মরুভূমিতেই, আমার বিজয়ের প্রতীক এই মংগারের পাশে।
কবিতা ৭৪: ভাষার যুদ্ধ, নীরব বিজয়
বাংলা ভাষা আমার রক্তে। কিন্তু দিল্লিতে এসে আমাকে লড়তে হয়েছে অন্য ভাষার সাথে, অন্য উচ্চারণের সাথে। কতবার হোঁচট খেয়েছি, কতবার লোকে হেসেছে। কিন্তু আমি থামিনি। ভাষা শিখেছি, ভাব বিনিময় করেছি। এই জয়টাও কম নয়। আজ যখন মংগারের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় প্রকৃতিরও তো নিজস্ব ভাষা আছে – যা শব্দের অতীত। আমি সেই ভাষাও বুঝতে শিখেছি খানিকটা। এই শহরের কোলাহল আর মংগারের নীরবতা – দুটোকেই আমি আপন করে নিয়েছি। ভাষার যুদ্ধটাও আমি জিতেছি। এই বিজয় আমার নীরব অহংকার।
কবিতা ৭৫: প্রত্যাখ্যান থেকে আলিঙ্গন
প্রথম দিকে দিল্লি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তার আবহাওয়া, তার মানুষজন, তার সংস্কৃতি – সবই যেন বলছিল, "তুমি বাইরের লোক"। আমিও গুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। কিন্তু তারপর লড়াইটা শুরু হলো। আমি প্রত্যাখ্যানকে চ্যালেঞ্জ জানালাম। ধীরে ধীরে এই শহর, এই মানুষ, এই প্রকৃতি আমাকে জায়গা করে দিল। হয়তো পুরোপুরি আপন করে নেয়নি, কিন্তু আমিও আর প্রত্যাখ্যাত নই। মংগার বনটা যেন সেই আলিঙ্গনের প্রতীক – দূরে থেকেও সে আমার। আমি এই প্রতিকূলতাকে জয় করে আদায় করে নিয়েছি আমার স্থান। এই বিজয়ের পর ফেরা যায় না। এই আলিঙ্গন ছেড়ে যাওয়া যায় না।
কবিতা ৭৬: আমার দিল্লি, আমার মংগার, আমার জয়
শেষ পর্যন্ত এটাই সত্যি – এই দিল্লি এখন আমার। এর ধুলো, এর ধোঁয়া, এর গরম, এর ঠান্ডা, এর ভিড়, এর একাকিত্ব – সব আমার। আর ওই মংগার, সে তো আমার আত্মার অংশ। চাকরিসূত্রে এসেছিলাম, কিন্তু প্রতিকূলতাকে জয় করে আমি এই শহরকে নিজের করে নিয়েছি। বাংলা আমার জন্মভূমি, সে স্মৃতি অমলিন। কিন্তু এই মাটি আমার জয়ভূমি। এই জয় আমি উদযাপন করি প্রতিদিন – মংগারের দিকে তাকিয়ে, এই শহরের বুকে নিঃশ্বাস নিয়ে। এখানেই আমি থাকবো, আমার বিজয়ের ভূমিতে, আমার মংগারের পাশে। এ এক অন্য ভালোবাসা, জয় করে পাওয়া ভালোবাসা।
Comments
Post a Comment