ডিকয়
ডিকয়
সে তেমন শরীরসর্বস্ব,
সুডৌল বিভাজিকার দুরন্ত হাতছানি,
চাঁদ চাঁদ মিহিদানা মোহন টার্গেট—
প্রায় বুলসআই-লাল,
প্রায় প্রায় নির্বিবাদ সত্যি স্বচ্ছ।
তার ঠোঁট দু’টি প্রতিশ্রুতির মতো খোলে,
তার শরীর প্রায় নেচে ওঠা মুদ্রা,
যুদ্ধক্ষেত্র এক শয়নকক্ষ,
শয়নকক্ষ এক নয়নাভিরাম খতিয়ান।
প্রতিটি চুম্বন, এক উত্তোলন—
প্রতিটি স্পর্শ, এক আত্মসমর্পণ,
ছিটকে বের হয়ে যাওয়া হোয়াইট ইয়েলো।
ওহ, কিন্তু প্রেমই তাহলে যুদ্ধ যে গুনগুন করে,
আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখা চড়াই-উতরাই,
তার প্রেমিকদণ্ডের শেয়ারমার্কেট।
সে ভাবে, যখন সে লক্ষ্য ভেদ করছে,
ছুটিয়ে দিয়েছে আগুনের দুরন্ত ফুলকি,
সেখানে শরীরসর্বস্ব দিয়ে সাজিয়ে রাখা ডিকয়,
একটি সাধারণ সাবজেক্ট ও স্থূল উথাল।
প্রলোভন আর ঈশ্বরে পার্থক্য কী?
দু’জনেই পূজা চায়,
দু’জনেই তোমাকে খালি করে দেয়,
দু’জনেই ধ্বংসকে মনে করায় মুক্তির স্বাদ।
কিন্তু আসল টার্গেট তো ইতিমধ্যেই পিছনে—
সারবাঁধা রানওয়ে থেকে ঝাঁক ঝাঁক মারণ,
একটি অর্থবহ শাইশাই,
একটি কর্মক্ষম পনপন,
একটি সুপারসোনিক নব্বই ডিগ্রি ভল্ট দিয়ে
অলক্ষ্যে পিছন থেকে ঘুরে এসে
তবাহ করে দিয়ে যায় তার উচ্চতম মাংসল।
টাইফুন
সে এসেছিল এক মৃদু নৌকার মতো—
পালগুলো ভিজে, সাদা, নীরব,
বুকে বয়ে এনেছিলো ভোরের সুবাস,
যেন কুয়াশার ভেতর লুকিয়ে আনা কোনো প্রতিশ্রুতি।
তুমি তখন ভেবেছিলে—
এই নৌকা হয়তো তোমার ঘাটেই বেঁধে থাকবে,
ঢেউ ওঠা-নামার সঙ্গে ভাগ হবে
সকল দিগন্ত, সকল বৃষ্টি আর নীলাভ-ছায়া।
কিন্তু সমুদ্রের মতোই সে জানত
ফেরার রুট গোপন থাকে অচেনা মানচিত্রে।
একদিন হঠাৎ,
তোমার ঘুমন্ত তট থেকে
সে গুটিয়ে নিল সব গিঁট,
খুলে দিল নোঙর,
আর চলে গেল অদৃশ্য স্রোতের হাত ধরে।
তুমি শুধুই দেখলে—
তোমার ডেকে পড়ে আছে ভাঙা দড়ির সুতো,
মেঝেতে গড়িয়ে পড়া দুই-তিনটি শামুকের খোল,
আর সেই কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি
যা একসময় তোমাকে বলেছিল—
“আমি কখনো ছেড়ে যাব না।”
ঝড় তখন শুধু এক শব্দ নয়,
এটা হয়ে ওঠে হাড়ে জমে থাকা ঠান্ডা হাওয়া—
যা মনে করিয়ে দেয়,
প্রতিটি আলিঙ্গনেই লুকিয়ে থাকতে পারে বিদায়,
প্রতিটি প্রতিশ্রুতিতেই
জন্ম নিতে পারে এক অদেখা সমুদ্রযাত্রা।
ক্যারাভান
বালুর ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে
তুমি দেখেছিলে জল—
ঝিলমিল, রৌদ্রছাঁকা, সুনিশ্চিত জল,
যেন তৃষ্ণার মধ্যে ছড়ানো ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি।
পায়ের তলায় তখন পুরনো পদচিহ্ন,
প্রতিটি ধুলোকণা গুনছিল তোমার নিঃশ্বাস।
তুমি হেঁটেই যাচ্ছিলে—
জলের দিকে, সবুজের দিকে, ছায়ার দিকে,
যেন তোমার সমস্ত ক্লান্তি
সেখানে গিয়ে থামবে।
কিন্তু কাছে যেতে যেতে
তুমি দেখলে—
জল নেই, সবুজ নেই, ছায়া নেই,
আছে শুধু কাঁপতে থাকা গরম হাওয়া
আর বালুর ভেতরে ডুবে যাওয়া তোমার পায়ের ছাপ।
মরিচিকা তখন যেমন মিথ্যা দৃশ্য নয়—
এটা এক কাঠিন্য,
যা শেখায়—
সবচেয়ে দীপ্তিময় প্রতিশ্রুতিই
হতে পারে সবচেয়ে নিশ্চিত শূন্যতার পোশাক।
ব্লাস্ট
শহরের বিকেলটায় হঠাৎ
এক অদ্ভুত শব্দ ছিঁড়ে দিল বাতাস—
মৃত্যুর কর্কশ ডাক,
যার পরে নীরবতা পর্যন্ত হয়ে গেল বধির।
মুহূর্তের ভেতর,
রাস্তার মোড়ের দোকানগুলো উড়ে গেল ধোঁয়ার ভেতর,
ফলের ঠেলাগাড়ি ছড়িয়ে দিল রক্তে ভেজা কমলা,
একটি ফাটা চশমা এসে আটকে রইল ভাঙা জানালার কোণে।
চিৎকার, দৌড়, ধুলো
আর ছড়িয়ে পড়া পোড়া মাংসের গন্ধ—
মনে হচ্ছিল পৃথিবী এক সাথে
সকল পুরনো শত্রুতাকে নিক্ষেপ করেছে ওয়ালপেপার মতো
এই অচেনা দেয়ালের ওপর।
ব্লাস্ট শুধু দেয়াল ভাঙে না,
এ তাৎক্ষণিক ভাবে ভেঙে ফেলে মানুষের ভিতর—
একটি মায়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় তার শিশুর আঙুল,
একটি প্রেমের চিঠিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়
যেন তা কখনো লেখা হয়নি।
ধোঁয়াটা কেটে গেলে
থাকে শুধু ধ্বংসের সংখ্যা আর ভোঁতা আলো,
যা নিভু নিভু করে বলে যায়—
কেউ একজন আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল
এই দিনটিকে সম্পূর্ণ অন্ধ করে দিতে।
ব্ল্যাক বক্স
যখন আকাশে আগুন জ্বলে ওঠে
আর ধাতব ডানায় ছিটকে পড়ে মৃত্যুর আলোক,
তখনও কোথাও ভেতরে,
অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে এক শান্ত সাক্ষী—
ব্ল্যাক বক্স।
সে বলে না কিছু, তবু সব জানে—
পাইলটের শেষ নিঃশ্বাস,
ক্যাপ্টেনের কাঁপা গলা,
আর সেই মুহূর্তটি,
যখন চারদিকের নীল হাওয়াকে ছিন্ন করে
বজ্রপাতের মতো নেমে আসে সিদ্ধান্তহীন নৈঃশব্দ্য।
সব মুছে যায়:
ধোঁয়া, আগুন, শরীর, যাত্রী, নামের তালিকা—
কিন্তু ব্ল্যাক বক্স টিকে থাকে,
তার ভেতর রেকর্ড হয় সভ্যতার এক শ্বাসরুদ্ধ সেকেন্ড,
যেখানে মানুষ নিজেকে বোঝার চেষ্টা করে
প্রলয়ের ধ্বনির মধ্য দিয়ে।
পরে সন্ধানে আসে লোকেরা—
ধ্বংসস্তূপের নিচে, পরিখায়, তুষারঢাকা পাহাড়ে,
তারা খোঁজে শুধু এক ছোট বাক্স,
যার ভিতর ঘুমিয়ে আছে উত্তর, অপরাধবোধান, প্রার্থনা।
ব্ল্যাক বক্স তখনই বাঁচে—
যখন সবকিছু মরে গিয়েছে,
তবু সেই মৃত্যুর ভিতরও
সে ধরে রাখে এক অকাট্য সত্য—
মানুষ কতটা ভঙ্গুর,
তবু কত কৌতূহলী নিজের শেষ মুহূর্ত জানার জন্য।
সানসেট পয়েন্ট
উঁচু পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে
তুমি দেখছো পৃথিবীর গভীরতা—
নীচে মেঘ, আরও নীচে অচিন নদী,
আর তারও তলায় অগণিত পাথরের নিঃশব্দ ইতিহাস।
এইখানে বাতাসের রঙ অন্যরকম—
নরম, ধারালো, তীব্র—
যেন শ্বাস নিলেই ফুসফুসে ঢুকে যায়
একটা সম্পূর্ণ মহাবিশ্বের পাহাড়ি নিঃসঙ্গতা।
তুমি যখন হাত বাড়াও সামনে,
মনে হয় ছুঁয়ে ফেলবে আকাশের হাঁটু,
কিন্ত পায়ের নিচের মাটি তখনও বলে যায়—
এক ইঞ্চি এদিকেও নয়, না হলে শেষ।
পাহাড়ের কিনারা এক আজব জায়গা—
এখানে ভয় আর স্বাধীনতা
একসাথে হাঁটে হাত ধরে,
এখানে প্রতিটি পদক্ষেপ
তোমাকে শেখায় জীবনের ওজন
আর শূন্যতার টান।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়—
ঝাঁপিয়ে পড়লেই সব জানা যাবে:
কত গভীর নীচের অন্ধকার,
কত সত্য নিজের পতন,
আর কত মিথ্যে ছিল আমাদের পাহাড় ডিঙানোর স্বপ্ন।
তারপর তুমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকো—
বাতাসের ভেতর, দোলায়িত ঘাসের পাশে,
আকাশের তলায়, পৃথিবীর ওপরে,
উঁচু পাহাড়ের কিনারায়—
যেখানে জীবন আর মৃত্যুর মাঝে
এক দীর্ঘ নিশ্বাস ভেসে বেড়ায়।
বুলেট
এক মুহূর্ত—
শব্দটা কেটে গেল হাওয়ার বুক চিরে,
কানের পাশ দিয়ে ছুটে গেল আগুনের রেখা,
যেন সময় নিজেই হঠাৎ ছুরি হয়ে উঠেছে।
তুমি টের পেলে কেবল তীব্র উত্তাপ,
একটা গরম শ্বাস তোমার ত্বকের গা ছুঁয়ে গেল,
আর তারপর চারদিক থেমে গেল—
মাঠ, গাছ, ঝিঁঝিঁ, এমনকি নিজের হৃদস্পন্দনও।
এক সেকেন্ডে তুমি বুঝলে—
জীবন কেমন সরু সীমানায় টিকে থাকে,
যেখানে এক মিলিমিটার মানে
বেঁচে থাকা আর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া।
বুলেট চলে গেল,
কিন্তু তার শব্দ থেকে গেল ভেতরে—
একটা অবর্ণনীয় গুঞ্জন,
যা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়
যে তুমি এখনও এখানে আছো,
শুধু একটা হালকা টান রেখে গেছে হাওয়ায়
যেখানে মৃত্যু সহজেই থেমে যেতে পারত।
এরপর যতবার বাতাস তীব্র হয়,
তুমি কান পেতে শোনো—
সেই আগুনের বাঁশির মতো শব্দ,
যা জানিয়ে দিয়ে যায়—
চলার শব্দটাই আসলে জীবন।
সুইস নাইফ
তীক্ষ্ণ চাকু মানে শুধু ধার নয়—
এ এক মায়া,
যেখানে আলো থেমে গিয়ে ঝলকে ওঠে রক্তের সম্ভাবনা।
তোমার আঙুলে যখন সে ছুঁয়ে যায়,
তুমি বুঝতে পারো কীভাবে ধাতু
একটা মুহূর্তেই চিনে নেয় মাংসের দুর্বলতা।
একটুখানি ভুল কোণ,
একটুখানি বাড়তি চাপ—
আর পৃথিবী লাল হয়ে যায় নিঃশব্দে।
তীক্ষ্ণ চাকু রাঁধুনির হাতেও কবির মতো কাজ করে—
কেটে পৃথক করে দৃশ্য আর শব্দ,
পেঁয়াজের স্তর কিংবা ভাষার অজস্র মিথ্যা আলগা করে দেয়,
যেন প্রতিটি অংশে ধরা পড়ে
কলার সৌন্দর্য ও বেদনাও।
কিন্তু সে যে হাতে পড়ে,
সেই হাতের নিয়ন্ত্রণেই তার চরিত্র বদলায়—
একদিকে শিল্প, অন্যদিকে হত্যা।
একই চকচকে ফলার নিচে
সম্ভব রান্নাঘর কিংবা রক্তক্ষয়ী গল্প।
তীক্ষ্ণ চাকু তাই এক শিক্ষা—
যে সামান্য অদৃষ্ট, সামান্য নিয়ন্ত্রণ,
এই দিয়েই নির্মিত হয় জীবন ও বিপর্যয়ের সীমানা।
Comments
Post a Comment