সলিল চৌধুরী

সুরের ইন্দ্রজালে আবৃত এক আশ্চর্য কবি: সলিল চৌধুরী
পীযূষকান্তি বিশ্বাস


আমার জন্মের আগে থেকেই বাংলার সঙ্গীতাকাশে সলিল চৌধুরী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর সুরের বৈচিত্র্য, সঙ্গীতের গঠনশৈলী এবং অর্কেস্ট্রেশনের অভিনবত্ব তাঁকে এক কিংবদন্তীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গীতিকার হিসেবেও তাঁর খ্যাতি প্রশ্নাতীত। হিন্দি সঙ্গীত জগতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভার এক আশ্চর্য দিক প্রায়শই আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেভাবে উঠে আসেনি – তা হলো তাঁর অসাধারণ কাব্য প্রতিভা। সঙ্গীতের মোহন ইন্দ্রজাল এতটাই তীব্র যে তা অনেক সময় শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ ও কাব্যিক সৌন্দর্যকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সুরের মায়াবী আবরণে ঢাকা পড়ে যায় কবিতার স্বতন্ত্র সত্তা। শ্রোতা যখন সুরে মুগ্ধ হন, তখন কথা সেখানে গৌণ হয়ে সুরের ভেলায় ভেসে যায়। কিন্তু যখন আমরা সলিল চৌধুরীর লেখা গানগুলিকে সুরের সঙ্গ ছাড়াই, নিছক 'টেক্সট' বা পাঠ্য হিসেবে পাঠ করি, তখন তাঁর কবিতার অনন্যতা, চিত্রকল্পের বলিষ্ঠতা এবং ভাবের গভীরতা কাব্যরসিক মনকে অভিভূত করে, এক স্বতন্ত্র কবিসত্তার সুস্পষ্ট ছাপ রেখে যায়। আজকের এই ক্রোড়পত্র সেই অনালোকিত কাব্য প্রতিভাকেই নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করার একটি প্রয়াস। আমরা ডুব দেবো সলিল চৌধুরীর শব্দতরঙ্গে, উন্মোচন করার চেষ্টা করব তাঁর কবিমানসের সেই গভীরতাকে, যা সুরের আড়ালে থেকেও স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

বিশেষত সলিল চৌধুরীর মতো যুগজয়ী স্রষ্টার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: কেন একজন গীতিকার, যার শব্দ লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে ফেরে, তিনি প্রথাগত অর্থে একজন কবির সমান মর্যাদা বা জনপ্রিয়তা লাভ করেন না? এই অন্বেষণের গভীরে প্রবেশ করলে মাধ্যম, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাস উন্মোচিত হয়। গীতিকার সলিল চৌধুরী একজন কতখানি গীতিকার বা কতোখানি কবি, এই নিয়ে আমাদের মতো গুণগ্রাহীদের কাছে এক বিস্ময়কর জিজ্ঞাসা । পথকে ততো গুরুত্ব না দিয়ে যিনি যাত্রাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। "ওগো আর কিছুই তো নয়,
বিদায় নেবার আগে তাই,তোমারি নয়নে পাওয়া তোমারি সুরে গাওয়া,এ গান খানি রেখে যাই"। নিজেই বলেছেন ।

প্রথমত, আমাদের গীতিকার ও কবির সৃজনক্ষেত্রের মৌলিক পার্থক্যটি অনুধাবন করতে হবে। কবিতা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পমাধ্যম। তার আবেদন মুদ্রিত অক্ষরের নিস্তব্ধতায়, পাঠকের মননে এবং নিজস্ব ছন্দ-মাত্রার সুষমায় নিহিত। পাঠক নিজের কল্পনা ও বোধ দিয়ে কবিতার জগতকে নির্মাণ করেন। অন্যদিকে, একটি গান বা গীতি হলো শব্দ ও সুরের এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন। এখানে কথা বা লিরিক সুরের ওপর নির্ভরশীল; সুরের চলন, তাল এবং যন্ত্রানুষঙ্গ কথার ভাবকে বহুগুণে বিবর্ধিত করে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়। এই নির্ভরশীলতাই গীতিকারের প্রতিভার মূল্যায়নে একটি দ্বিধা তৈরি করে। শ্রোতা যখন একটি গান শোনেন, তখন তিনি কেবল শব্দকে গ্রহণ করেন না, বরং গায়কী, সুরের আবহ এবং সামগ্রিক পরিবেশনার দ্বারা প্রভাবিত হন। ফলে, গানের কথা  কাব্যিক গুণ অনেক সময়েই সুরের ছত্রছায়ায় ঢাকা পড়ে যায়। সলিল চৌধুরীর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও প্রকট, কারণ তিনি কেবল গীতিকার নন, একজন যুগান্তকারী সুরকারও বটে। তাঁর সুরের গঠন এতটাই জটিল ও অভিনব যে, তা প্রায়শই তাঁর লিরিকের কাব্যিক গভীরতাকে ছাপিয়ে যায়। "যারে যারে উড়ে যারে পাখী ফুরালো প্রাণের মেলা, শেষ হয়ে এলো বেলা আর কেন মিছে তোরে বেঁধে রাখি" । এক অনন্যভাষায় তাকে উড়িয়ে দিয়েছেন । কিছুই বেঁধে রাখতে চান নি ।


দ্বিতীয়ত, সলিল চৌধুরীর গানগুলিকে যদি সুর থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল মুদ্রিত অক্ষরে পাঠ করা হয়, তবে তাঁর কাব্যপ্রতিভার নিদর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর লিরিক কেবল কিছু কথার সমষ্টি নয়, তা গভীর জীবনবোধ, রাজনৈতিক চেতনা এবং অনবদ্য চিত্রকল্পের এক শৈল্পিক দলিল। সলিল চৌধুরীর কাব্যমননের আর একটি উজ্জ্বল দিক হলো তাঁর প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী চেতনা। তিনি গণসংগীতকে এক নতুন শৈল্পিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর ‘গাঁয়ের বধূ’ গানটি নিছক এক গ্রামীণ প্রেমের গান নয়। এক জীবনবোধ আর চিরকালীন বাংলার প্রতিচ্ছবি "আজও যদি তুমি কোনো গাঁয়ে দেখো ভাঙা কুটিরেরও সারি" , আপনিও জানবেন সেখানে মহান সলিল চৌধুরী বাংলার মধুরতম একজন কবি হয়ে উঠতে চেয়েছেন ।


কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত কাব্যগুণ থাকা সত্ত্বেও সলিল চৌধুরীকে কেন রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো ‘কবি’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় না? এর অন্যতম কারণ হলো মাধ্যমকেন্দ্রিক বিভাজন। সাহিত্য জগত ঐতিহাসিকভাবে মুদ্রিত মাধ্যমকে (বই, পত্রিকা) শিল্পের বিশুদ্ধতম রূপ বলে মনে করে এসেছে। গান, যেহেতু তা পরিবেশনানির্ভর এবং বাণিজ্যিক জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত (বিশেষত চলচ্চিত্র সংগীত), সেহেতু তাকে প্রায়শই ‘লঘু’ বা ‘জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক উন্নাসিকতা সলিল চৌধুরীর মতো বহু প্রতিভাকে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করেছে। তাঁর গান জনপ্রিয়, কারণ তা মানুষের কথা বলে; কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই যেন তাঁর কাব্যিক মূল্যায়নের পথে এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছে।


"ওগো আর কিছু তো নয়" সেখানে সারল্যের আড়ালে জটিলতার বুনন । "না যেও না"-র ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে "ওগো আর কিছু তো নয়"। এটি প্রেমের এক নির্মল, নিষ্পাপ স্বীকারোক্তি। কিন্তু এই সারল্যও সলিলীয় ভঙ্গিতে এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। "সকলি হারায়ে বুঝি সকলি পেল"—এই লাইনটি গানটির কেন্দ্রবিন্দু। এখানে কোনো জটিল দর্শন নেই, আছে কেবল হৃদয়ের এক সহজ আকুতি। সলিল চৌধুরী এখানে দেখিয়েছেন, বিশাল কাব্যিক আয়োজন ছাড়াও কীভাবে সহজ কথায় গভীর অনুভূতি প্রকাশ করা যায়। "বরষা হয়ে তুমি আকাশ ভরে /হৃদয় মরুতে মম পরেছ ঝরে/সরস করিয়া মোরে যে ফুল ফোটালে ভোরে/এমালা তারি রেখে যাই"—এই পঙক্তিগুলিতে আত্মনিবেদনের যে সারল্য, তা লতার স্নিগ্ধ, নির্মল গায়কীতে পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

বাংলা সঙ্গীত জগতে সলিল চৌধুরী কেবল একজন সুরকার বা গীতিকার নন; তিনি একজন সঙ্গীত-স্থপতি । তাঁর সৃষ্টি নিছক কিছু গান নয়, বরং প্রতিটি গান এক-একটি স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম—যেখানে কথা, সুর, যন্ত্রানুষঙ্গ এবং গায়কী মিলেমিশে এক অখণ্ড, সিম্ফোনিক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। তিনি ছিলেন এক বিশ্ব নাগরিক, যার সঙ্গীত ক্যানভাসে অনায়াসে মিশে যেত বাংলার ভাটিয়ালি, আসামের বিহু, রাশিয়ার লোকগীতি, মোৎজার্টের সিম্ফনি আর ল্যাটিন আমেরিকার জ্যাজ। তাঁর সঙ্গীতের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল সুরের কারিগর ছিলেন না, ছিলেন একাধারে কবি, দার্শনিক, চিত্রকর এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বর। লতা মঙ্গেশকরের মতো একজন অসামান্য গায়িকার কণ্ঠকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন তাঁর জটিল ও বহুস্তরীয় সঙ্গীত-ভাবনাকে মূর্ত করে তোলার জন্য। এই কিংবদন্তী জুটির কয়েকটি গানের বিশদ বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা সলিল চৌধুরীর সঙ্গীত-জগতের বিশালতাকে অনুধাবনের চেষ্টা করব।


"কেন যে কাঁদাও , বারে বারে"—এই সরল পঙক্তির মধ্যে যে গভীর আর্তি লুকিয়ে আছে, তা লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের নিয়ন্ত্রিত কম্পনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। "কেন যে কাঁদাও , বারে বারে /থেমেছে ক্রন্দনে ছন্দ হীনা বীণা তবু কেন /তুমি আবার তারে বাজাও কি সুরের সন্ধানে / জানি না "—এই কথাগুলোর মাধ্যমে তিনি স্মৃতির বিমূর্ত এবং যন্ত্রণাদায়ক চরিত্রকে তুলে ধরেছেন। স্মৃতি যে কেবল মধুর অতীত নয়, বরং বর্তমানের বুকে এক চলমান ক্ষত, সেই দর্শন এখানে স্পষ্ট। 'বলো কেমন করে / আজ রাখি ধরে  /মনপাখি যে বিবাগী /তারে কিসের জোরে, বৃথাই শুধু এ নয়ন ঝরে' । এই তার আধুনিক কবিতার অনন্যকাব্য প্রতিভা ।

সলিল চৌধুরীর লিরিকে আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ, নাগরিক জীবনের ক্লান্তি এবং অস্তিত্বের সংকটও মূর্ত হয়ে উঠেছে। ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ গানে প্রকৃতি ও মানবাত্মার মধ্যে যে দার্শনিক সংলাপ, তা আধুনিক কবিতার এক নিদারুণ উদাহরণ। "পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি/সোজা পথের ধাঁধাঁয় আমি অনেক ধেঁধেছি"—এই পঙক্তিতে ফুটে ওঠা আত্মপরিচয়ের সংকট এবং অন্তহীন পথচলার ক্লান্তি যে কোনো সংবেদনশীল পাঠক বা শ্রোতাকে নাড়া দেবে। তাঁর শব্দচয়ন ছিল একাধারে সহজবোধ্য এবং গভীর ব্যঞ্জনাময়। তিনি কথ্য ভাষার শক্তিকে যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনই তৎসম শব্দের গাম্ভীর্যকেও অনায়াসে মিলিয়ে দিয়েছেন। এই শৈলী তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু তথাকথিত বিদগ্ধ সাহিত্য সমালোচকদের কাছে হয়তো তাঁর কাজকে ‘বিশুদ্ধ কবিতা’র মাপকাঠিতে ফেলার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে।


সমস্যাটি এখানেই যে, সলিল চৌধুরীর সুর এতটাই শক্তিশালী এবং আবেদনময় যে তা প্রায়শই গানের কথাকে ছাপিয়ে যায়। শ্রোতা সুরের গভীরে অবগাহন করেন, কিন্তু কথার প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি শব্দবন্ধের কাব্যিক ব্যঞ্জনা অনেক সময়ই তাঁর মনোযোগ এড়িয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, যখন আমরা শুনি "আহা ঐ আঁকা বাঁকা যে পথ যায় সুদূরে।" তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক গতিময় দৃশ্য, আর মন ভেসে যায় সেই সুরের ছন্দে। কিন্তু এই পঙক্তি দুটির স্বতন্ত্র কাব্যিক শক্তি – "আপন নীড়ে ফিরে গেছে পাখি/ নীড় হারায়ে আমি পথে থাকি" – তা সুরের আড়ালে কিছুটা হলেও প্রচ্ছন্ন থাকে। অথচ, সুর ব্যতিরেকে পড়লেও এই চিত্রকল্প এক সার্থক কবিতার জন্ম দেয়।

সলিল চৌধুরীর কাব্য প্রতিভার উৎস সন্ধানে ফিরে তাকাতে হয় তাঁর ছেলেবেলা এবং বেড়ে ওঠার দিনগুলির দিকে। অসমের চা বাগানে পিতার সান্নিধ্যে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। বাড়ির সঙ্গীত ও নাট্যচর্চার পরিবেশ তাঁর সংবেদনশীল মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। একইসঙ্গে গ্রামবাংলার লোকগান, কীর্তন, এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য তাঁর কবিসত্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

"বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা।" যেখানে একটি বিপ্লবী ইশতেহার । সলিল চৌধুরীর রাজনৈতিক চেতনা এবং মানবতাবাদের এক উজ্জ্বলতম নিদর্শন এই গান। তিনি ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA)-এর সক্রিয় সদস্য, এবং তাঁর বহু গানেই শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ধ্বনিত হয়েছে। পাখি এখানে মুক্তির এক শাশ্বত প্রতীক। গীতিকার এক বন্দি সত্তার প্রতিনিধি, যিনি পাখির মাধ্যমে বাইরের মুক্ত পৃথিবীর কাছে তাঁর বার্তা পাঠাতে চান। "আজ জেগেছে এই জনতা, এই জনতা / তোমার গুলির, তোমার ফাঁসির, /তোমার কারাগারের পেষণ শুধবে তারা /ও জনতা এই জনতা এই জনতা।।"—এই লাইনটি কেবল ব্যক্তিগত দুঃখের প্রকাশ নয়, এটি সমস্ত পরাধীন, অত্যাচারিত মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। "নিঃস্ব যারা সর্বহারা তোমার বিচারে /সেই নিপীড়িত জনগণের পায়ের ধারে // ক্ষমা তোমায় চাইতে হবে /নামিয়ে মাথা হে বিধাতা।।"—এই পঙক্তিগুলিতে এক ইউটোপিয়ান বা আদর্শ জগতের স্বপ্ন আঁকা হয়েছে, যেখানে শোষণ নেই, কেবল আনন্দ আর রঙের মেলা। এটি সলিল চৌধুরীর সমাজতান্ত্রিক ভাবনার শৈল্পিক প্রতিফলন।

সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতকে বুঝতে হলে তাঁর সৃজন প্রক্রিয়ার মূল দর্শনটি অনুধাবন করা জরুরি। তিনি সুরের ওপর কথা বসাতেন না, বা কথার জন্য সুর করতেন না। তাঁর কাছে শব্দ ও সুর ছিল যমজ সত্তা, যারা একই সঙ্গে জন্ম নিত। তাঁর গানগুলি প্রায়শই একটি ‘ক্যাণ্টাটা’ বা ক্ষুদ্র ‘অপেরা’র মতো, যেখানে বিভিন্ন অংশ, ভিন্ন ভিন্ন গতি এবং পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। সলিল চৌধুরীর সুরে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া "বুঝবে না/কেউ বুঝবে না/কি যে মনের ব্যথা" গানটিতে দেখা যায় একটি বিরহের সিম্ফনি , এটি বিরহের এক মনস্তাত্ত্বিক দলিল। গানটির নির্মাণশৈলী পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। গানের কথাগুলি একটি আকুতি। "যদি এমন হত /যত বেদনা/বীজেরই মতন করে /যেত গো বোনা / লালে লাল ফুলে ফুলে /ভরে যেত গান/দূর থেকেই দেখে তারে/যেত গো চেনা"—এই আহ্বানটি কেবল প্রিয়জনকে ধরে রাখার চেষ্টা নয়, এটি ফুরিয়ে যাওয়া সময়ের বিরুদ্ধে এক অসহায় আর্তনাদ। সলিল চৌধুরী এখানে "অন্ধ খনির" শব্দটিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এটি যেমন আক্ষরিক অর্থে অনন্ত, তেমনই সম্পর্কের বিরহ মুহূর্ত বা সহজ সরল ভাষায় জীবনের গভীরতার প্রতীক।


"সাত ভাই চম্পা জাগো রে" আমার মনে হয় রূপকথার অপেরা । বাংলা লোকগাথা ও রূপকথাকে সলিল চৌধুরী যেভাবে সঙ্গীতের আধারে পরিবেশন করেছেন, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ‘সাত ভাই চম্পা’। এটি কেবল একটি চলচ্চিত্র সংগীত নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ সাঙ্গীতিক আখ্যান বা মিনি-অপেরা। "সাত ভাই চম্পা"র প্রচলিত গল্পটিকেই তিনি গানের ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। "পারুল বোন" এর আকুতি, তার ভাইদের জাগিয়ে তোলার জন্য যে আর্তি, তা গানের প্রতিটি শব্দে মূর্ত। "জাগো রে" এই আহ্বানটি কোরাসের মাধ্যমে বারংবার ফিরে এসে একটি শক্তিশালী আবেদন তৈরি করে। গানটি কেবল একটি গল্প বলে না, বরং অন্যায়-এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদের সুরকেও ধারণ করে।

সলিল চৌধুরী একজন গীতিকার হিসেবে যে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, তা আকাশচুম্বী। কিন্তু একজন কবি হিসেবে তাঁর মূল্যায়ন আজও অসম্পূর্ণ। এর কারণ তাঁর প্রতিভার অভাব নয়, বরং শিল্পমাধ্যমের বিভাজন, প্রাতিষ্ঠানিক বিচারপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা এবং সুর ও শব্দের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কারণে তাঁর লিরিকের স্বতন্ত্র কাব্যিক সত্তাকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করার অনীহা। সলিল চৌধুরী আসলে শব্দ ও সুরের মধ্যে কোনো সীমারেখা টানেননি। তাঁর কাছে গান ছিল এক অখণ্ড শিল্পকর্ম, যেখানে কবিতা সুরের ডানায় ভর করে উড়ে চলে।

"আজ–তবে এইটুকু থাক।" গীতিকায় অস্তিত্বের দার্শনিক অন্বেষণ হিসেবে দেখি । এই গানটি সলিল চৌধুরীর কাব্য ও সঙ্গীত প্রতিভার শিখরস্পর্শী এক সৃষ্টি। এখানে তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক এবং সুরকার। গানটি আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট, একাকীত্ব এবং শিল্পের মাধ্যমে অমরত্ব লাভের এক গভীর অন্বেষণ। "আজ–তবে এইটুকু থাক।/বাকি কথা পরে হবে। /ধূসর ধূলির পথ– /ভেঙে পড়ে আছে রথ– /বহুদূর– দূর যেতে হবে।"—এই পঙক্তিতে শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। "শরতের কোন এক নাম না জানা গাঁয় /শিউলীর ফুল যেথা /ঝরে ঝরে যায়–/কিশোরী মনের মত–/দু’টি চোখে অবনত–"—এই লাইনগুলিতে এক মহাজাগতিক চেতনার প্রকাশ ঘটে। শিল্পী এখানে প্রকৃতির বিশালতার সামনে এক ক্ষুদ্র সত্তা, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এই বিশালতারই অংশ। এই গানটি যে কোনো শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবিতার সমতুল্য।

সলিল চৌধুরীর গানগুলির উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি কেবল একজন সুরকার ছিলেন না, ছিলেন এক সম্পূর্ণ সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান। তাঁর প্রতিটি গান এক-একটি পৃথিবী, যেখানে কাব্য, দর্শন, লোকগীতি এবং বিশ্বসঙ্গীত একাকার হয়ে গেছে।


হয়তো ‘কবি’ বা ‘গীতিকার’—এই তকমাগুলোই অপ্রয়োজনীয়। সলিল চৌধুরী এমন এক স্রষ্টা, যিনি বাংলা গানে কবিতার এক নতুন পরিভাষা রচনা করেছেন। তাঁর কবিতা পাঠ্যবইয়ের পাতায় নয়, লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে মুদ্রিত। প্রথাগত কবির সম্মান তিনি না পেতেই পারেন, কিন্তু তাঁর শব্দমালা সুরের আশ্রয়ে যে অমরত্ব লাভ করেছে, তা কজন কবির ভাগ্যেই বা জোটে? তাই এই বিতর্ক হয়তো শেষ পর্যন্ত অর্থহীন। সলিল চৌধুরী এক ব্রাত্য কবি, যিনি নিজের সাম্রাজ্য নিজেই তৈরি করে গেছেন—মানুষের মুখে মুখে ফেরা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গীত হওয়া এক জীবন্ত কবিতার সাম্রাজ্য।

Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ