পদ্মা

পদ্মা

--পীযূষকান্তি বিশ্বাস

আকাশ আজ পদ্মার চোখের মতো অভিমানী। মেঘেরা দল বেঁধেছে, যেন কত যুগের না বলা কথা আজ ঝরে পড়বে আরব সাগরের বুকে। মেরিন ড্রাইভের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পদ্মা'র ভেজা শরীর আর শহরের ভেজা রাস্তার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার চোখের জলকে আড়াল করে রেখেছে পরম মমতায়।

মানুষের অভিমান ক্ষয়ে যায় ভোরের আগে ফেলে আসা স্বপ্নের মতো, চুপচাপ। অধরা জীবনের মানে খোঁজে অহেতুক জনারণ্যে আলো-ছায়ার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক বন্ধ টেলিফোন বুথের পাশে। মানুষের হল্লা পেরিয়ে যেতে চাই একটা দীর্ঘ নদীর মতো বাঁশির সুরের কাছাকাছি। যেখানে ভাষাহীনতারও থাকে পরম আত্মীয়তা আর ছায়ারা চোখে চোখ রাখে— নির্বিকার, গভীর। পদ্মার মনে হচ্ছে, এই জনবহুল শহরটা একটা বিশাল শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রতিটি গাড়ির হেডলাইট স্মৃতির মতো ঝলসে উঠছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে। সে কি খুঁজছে? হয়তো রাহুলের হাতটা, যেটা এক বর্ষার দিনে এভাবেই ভিজে গিয়েছিল তার হাত ধরে। বড় মায়াময়  এই স্মৃতি প্রবাহ ।

প্রেম হারানো শহরের করুণ ডাস্টবিনের মতো চারপাশ গন্ধে, ধোঁয়ায়, ব্যথায়— নষ্ট ফুলের অবিক্রীত গুচ্ছ। কোলাবার কোনো এক পুরনো ক্যাফের টেবিলে আজও যেন অপেক্ষা করে আছে দুটো কফির কাপ। একটাতে লেগে আছে রাহুলের ঠোঁটের স্বাদ, অন্যটা তেতো হয়ে গেছে পদ্মার দীর্ঘশ্বাসে। সম্পর্কগুলোও কি তবে পচনশীল? সময়ের সাথে সাথে তাদেরও গন্ধ ছড়ায়, ভারী হয়ে আসে চারপাশ।

মানুষ যুদ্ধকেই বেছে নেয় চিরকাল। পদ্মাও লড়ে যাচ্ছে। নিজের সাথে, স্মৃতির সাথে, এই শহরের সাথে। যে শহর একদিন সাক্ষী ছিল তাদের ভালোবাসার, আজ সেই শহরই যেন তার সবচেয়ে বড় শত্রু। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি গলি যেন রাহুলের নাম ধরে ডেকে ওঠে, তারপর মিলিয়ে যায় বৃষ্টির শব্দে। মনে হয়, এই বৃষ্টির জল নয়, তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে এক নোনা সমুদ্র।

হয়তো কেউ কল্পনায় বুনে যায় পরস্পরের কাঁধে মাথা রাখার দৃশ্য, ফিরে আসে আধখোলা জানালায়, ভোরের হাওয়া হয়ে। রাহুলের দেওয়া প্রথম গোলাপের শুকনো পাপড়িটা আজও তার ডায়েরির ভাঁজে রাখা। মাঝে মাঝে মনে হয়, পাপড়িটা নয়, তার ভেতরকার পদ্মাটাই শুকিয়ে গেছে। সম্পর্কটা মরে গেছে, কিন্তু তার শবদেহটা বয়ে বেড়াচ্ছে পদ্মা, একা।

কেউ চিঠি লেখে— বুকের ভাঁজে রেখে দেয়, অভিমানের পাপড়ি ভিজে ওঠে পুরনো কালি ছুঁয়ে। কত কথা ছিল বলার। কত অভিযোগ, কত অনুযোগ। কিন্তু বলার আগেই শ্রোতা হারিয়ে গেল। এখন এই চিঠিগুলো কাকে দেবে পদ্মা? এই বৃষ্টিভেজা বাতাস কি পৌঁছে দেবে তার বার্তা রাহুলের কাছে? নাকি এই অভিমানগুলোও বৃষ্টির জলে ধুয়ে মুছে যাবে?

বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। মেরিন ড্রাইভের জনস্রোত কমে আসছে ধীরে ধীরে। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর পদ্মার নীরব কান্না মিলেমিশে একাকার। তার মনে হলো, সে আর দাঁড়িয়ে নেই। তার শরীরটা যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। শাড়ির নীল রঙ ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির জলে, মিশে যাচ্ছে আরব সাগরের ধূসরতায়। তার অভিমান, তার কান্না, তার স্মৃতি— সব যেন এই জলের স্রোতে ভেসে চলেছে।

পদ্মা দেখলো, তার পায়ের পাতা থেকে শুরু করে পুরো শরীরটা কেমন স্বচ্ছ হয়ে আসছে। সে আর রক্ত-মাংসের পদ্মা নেই। সে হয়ে উঠছে এই বৃষ্টি, এই হাওয়া, এই সমুদ্র। তার কান্নাটাই যেন আজ বোম্বে শহরের বৃষ্টি হয়ে ঝরছে। রাহুলের জন্য যে ভালোবাসা তার বুকে ছিল, তা এখন মিশে যাচ্ছে সাগরের বিশালতায়। সে আর কোনো ব্যক্তি নয়, সে এক অনুভূতি— এক দীর্ঘ অপেক্ষা, এক অসীম শূন্যতা। পদ্মা ধীরে ধীরে বৃষ্টির জলে ধুয়ে আরব সাগরে মিশে যাচ্ছে চিরকালের মতো। 

Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ