নিঃসঙ্গ পদাবলীর যাত্রী
নিঃসঙ্গ
যাত্রার পদাবলী
--পীযূষকান্তি বিশ্বাস
রাত্রি নামে। চরাচর এক
উষ্ণ কম্বলের নীচে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। ঘুমিয়ে পড়ে নগর, ঘুমিয়ে পড়ে তার ব্যস্ত রাজপথ, তার সশব্দ আকাঙ্ক্ষা। শুধু জেগে থাকে এক আত্মা। একলা।
তথাকথিত মানুষেরা যখন স্বপ্নের মসৃণ সাগরে পাল তোলে, কবি
তখন জেগে ওঠেন এক অসমুদ্র ঝড়ের কিনারে। তিনি হাঁটেন।
এ কোনো গন্তব্যের হাঁটা
নয়। এ এক অন্তহীন পদচারণা। পায়ের তলায় পিচঢালা পথ নয়, যেন জমে থাকা শতাব্দীর যাত্রা। দুপাশে নিয়নের বাতিগুলো
মৃত জোনাকির মতো চেয়ে থাকে;
তাদের আলো কবির শরীর ছোঁয়, কিন্তু আত্মা ভেজাতে পারে না। তাঁর আত্মা ভেজে অন্য
আলোয়—চাঁদের সেই হিম পারদে,
যা চুইয়ে পড়ে চিনার গাছের
পাতায়, যা এঁকে দেয় চরাচরের এক ধূসর মানচিত্র।
কেন এই হাঁটা? কিসের নেশায়?
লোকে বলবে—এ পাগলামি।
বলবে—এ এক অনর্থক বিলাস। সমাজ সঙ্গ চায়,
উষ্ণতা চায়, চায় দেওয়া-নেওয়ার সহজ হিসাব। কিন্তু কবির হিসাব মেলে না।
তাঁর মুদ্রা ভিন্ন। তাঁর দেনা-পাওনা শব্দের সঙ্গে, অনুভূতির
সঙ্গে, সেই অব্যক্ত সত্যের সঙ্গে যা দিনের আলোয় মুখ
ঢেকে রাখে। তিনি সেই মুখের ঘোমটা সরাতেই বেরিয়ে পড়েন নিশিথ প্রদেশে।
মানুষ এক আশ্চর্য সামাজিক
বুনন। সে সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা পড়ে,
সামাজিক উষ্ণ চাদরের নীচে
খুঁজে নেয় আশ্রয়, খুঁজে নেয় নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি। কথা, কোলাহল,
সঙ্গ—এই ত্রিভুজে সে তার
জীবনকে স্থাপন করে। কিন্তু এই চেনা বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এক অন্য মানুষ। কবি।
সে মূলত একা। তথাকথিত মানুষের সংজ্ঞার চৌকাঠ ডিঙিয়ে সে এক ভিন্ন প্রজাতি। তার
রক্তে সামাজিকতার চেয়ে বেশি প্রবাহমান নিঃসঙ্গতার শীতল স্রোত। সৃষ্টিশীল মানুষ
একলা হাঁটেন। তাঁর পায়ের ছাপ পড়ে না সমাজের চেনা রাজপথে; তাঁর জন্য পাতা থাকে এক অদেখা, কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকা। আর সেই উপত্যকার গভীরে, নিশিথ প্রদেশে,
না জানি কিসের নেশায় একা
এক কবি হেঁটে যান।
সেই হাঁটা এক অদ্ভুত
দৃশ্য। চরাচর যখন ঘুমের অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত, শহরের
শেষ বাতিটিও যখন ক্লান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করেছে,
তখন তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
তাঁর সঙ্গী কেউ নয়—কেবল মাথার উপরের তারাভরা আকাশ, যা
অনাদিকাল ধরে এমনই নিঃসঙ্গ পথিকদের দেখে আসছে; আর
পায়ের নীচের পথ, যা জানে এমন কত লক্ষ পদচিহ্নের ভার সে বহন
করেছে। এ কোনো সাধারণ হাঁটা নয়। এ এক আত্ম-অনুসন্ধান। এ এক কথোপকথন—নিজের ভেতরের
সেই অন্য সত্তাটির সঙ্গে,
যে দিনের আলোয় মানুষের
ভিড়ে আত্মগোপন করে থাকে।
কিসের সেই নেশা? তা হলো শব্দের নেশা। অনুভূতির অতল থেকে সঠিক শব্দটি তুলে
আনার নেশা। যে ব্যথা সাধারণ মানুষ প্রকাশ করতে পারে না, যে আনন্দ সে ভাষায় ধরতে পারে না, সেই অব্যক্তকে বাঙ্ময় করার এক তীব্র, প্রায় যন্ত্রণাদায়ক তাড়না। এই তাড়নাই তাকে ঘরছাড়া করে, সমাজছাড়া করে। সে তখন সাধারণ মানুষ থাকে না। সে হয়ে ওঠে
এক মাধ্যম, এক চ্যানেল, যার
মধ্যে দিয়ে মহাকালের যাত্রা কথা বলে ওঠে। সে হয়ে ওঠে এক শিকারী, যে শব্দের বনে ঘুরতে থাকে একটি নিখুঁত চিত্রকল্পের জন্য, একটি অমোঘ পঙক্তির জন্য।
এই একাকীত্ব কোনো অভিশাপ
নয়, বরং কবির জন্য এক অপরিহার্য শর্ত। এক বরদান।
যেমনভাবে ভাস্কর একটি পাথর থেকে অনাবশ্যক অংশগুলো ছেঁটে ফেলে তার ভেতরের
মূর্তিটিকে প্রকাশ করেন,
কবিও তেমনই সামাজিক কোলাহল, জাগতিক দায়বদ্ধতা এবং অপ্রয়োজনীয় সম্পর্কের আবরণ সরিয়ে
ফেলে নিজের আত্মার বিশুদ্ধ রূপটিকে আবিষ্কার করেন। সেই বিশুদ্ধ, নগ্ন আত্মাই হলো কবিতার জন্মভূমি। তাইতো পাবলো পিকাসো
বলেছিলেন, "ভয়াবহ একাকীত্ব ছাড়া মারাত্মক সুন্দর কোনো
কাজ করা সম্ভব নয়।" এই ভয়াবহ একাকীত্বই কবির সাধনার পীঠস্থান।
যখনই নিঃসঙ্গ কবির কথা ওঠে, আমাদের চেতনায় প্রথম যে নামটি ভেসে ওঠে, তা হলো জীবনানন্দ দাশ। তিনি ছিলেন একাকীত্বের এক জীবন্ত
প্রতিমূর্তি। কলকাতা শহরের ট্রাম,
বাস, কোলাহলের মধ্যে থেকেও তিনি ছিলেন এক আশ্চর্য দ্বীপের মতো
বিচ্ছিন্ন। তাঁর কবিতা জুড়ে রয়েছে এই একাকী পথিকের পদচারণা। "হাজার বছর ধরে
আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,"—এই পঙক্তি কেবল একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, এ হলো আত্মার এক অনন্ত, নিঃসঙ্গ
অভিযাত্রার দলিল। সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে তিনি যে যাত্রা করেন, তা ভৌগোলিক নয়,
তা চেতনার।
তাঁর কবিতায় প্রকৃতিও এই
নিঃসঙ্গতার সাক্ষী। ধানসিঁড়ি নদী,
জলসিঁড়ি, কার্তিকের জ্যোৎস্না—এইসবকিছুর মধ্যে তিনি যে সৌন্দর্য
খুঁজে পান, তা এক নির্জন দর্শকের চোখ দিয়েই দেখা। তাঁর
বিখ্যাত 'বনলতা সেন' এক
সান্ত্বনার আশ্রয়, কিন্তু সেই আশ্রয় খুঁজে পেতেও কবিকে হাজার
বছরের পথ হাঁটতে হয়েছে,
একাকী। তাঁর জগৎ ছিল
ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, কিন্তু সেই ইন্দ্রিয়ের অনুভূতিগুলোও ছিল এক
গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধে সিক্ত। তিনি যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহলের ওপার থেকে দেখছেন এক
ভাঙা সময়কে, এক ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতাকে। এই দর্শন তাঁকে সমাজ
থেকে আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল,
তাঁর কবিতার ধূসর জগতে, যেখানে পেঁচাই একমাত্র সহচর, আর মৃত্যুর শীতল স্পর্শই একমাত্র ধ্রুবসত্য।
এদিকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন
এক বিপুল ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ছিল সামাজিক কর্মকাণ্ড, সৃষ্টি ও সম্পর্কে পরিপূর্ণ। বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাতা, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, তাঁর চারপাশে ছিল মানুষের অহরহ আনাগোনা। কিন্তু এই বিপুল
কর্মযজ্ঞের আড়ালে বাস করত এক নিশ্চিত নিঃসঙ্গ আত্মা। এই নিঃসঙ্গতা তাঁর কবিতা ও
গানে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। বুদ্ধদেব বসু যেমনটা তাঁর "সঙ্গ: নিঃসঙ্গতা
রবীন্দ্রনাথ" প্রবন্ধে নিপুণভাবে দেখিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের
নিঃসঙ্গতা জীবনানন্দের মতো বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে জাত নয়। এ ছিল এক দার্শনিক, প্রায় আধ্যাত্মিক একাকীত্ব।
তাঁর জীবনের বিভিন্ন
পর্যায়ে, বিশেষ করে প্রিয়জনদের হারানোর পর—স্ত্রী
মৃণালিনী দেবী, কন্যা রেণুকা ও পুত্র শমীন্দ্রনাথের
মৃত্যু—তাঁকে এক গভীর শূন্যতার মুখোমুখি করেছিল। 'স্মরণ' বা 'গীতাঞ্জলি'-র
অনেক কবিতায় এই নিঃসঙ্গ আত্মার আর্তি ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করতেন, এই একাকীত্বের মধ্যে দিয়েই জগতের ঊর্ধ্বে থাকা সেই পরম
সত্তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া সম্ভব। তাই তাঁর কাছে একাকীত্ব ছিল এক ধরনের সাধনা।
দিনের শেষে, যখন সমস্ত সামাজিক দায়বদ্ধতা শেষ, তিনি ফিরে যেতেন তাঁর নিজের কাছে, তাঁর লেখনীর কাছে। সেই নির্জন মুহূর্তগুলোতেই জন্ম
নিয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরা,
যেখানে তিনি রাজা নন, গুরুদেব নন,
কেবলই এক একা মানুষ, যিনি নিজের আত্মার সঙ্গে কথা বলছেন। "আমার একলা
ঘরের আড়াল ভেঙে বিশাল ভবে",
"আজ জোৎস্না রাতে সবাই গেছে
বনে"—এই গান তো সেই নিঃসঙ্গ আত্মারই বিশ্বজগতে ছড়িয়ে পড়ার আকুতি।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের
একাকীত্ব ছিল আরও নাটকীয়,
আরও যন্ত্রণাদায়ক। এ ছিল
বিদ্রোহ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল। তিনি প্রচলিত ধর্ম, সমাজ
এবং সাহিত্যের বিরুদ্ধে একাই একটি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য
রচনা করে মিল্টন হওয়ার স্বপ্নে তিনি স্বদেশ,
স্বধর্ম, স্বভাষা—সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন। এই স্বেচ্ছানির্বাসন
তাঁকে দিয়েছিল এক তীব্র,
অসহনীয় একাকীত্ব। বিলেতের
মাটিতে তিনি যা চেয়েছিলেন,
তা পাননি। পেয়েছেন অবহেলা, দারিদ্র্য আর বর্ণবিদ্বেষ।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল
এক ট্র্যাজেডি, কিন্তু এই নির্বাসিত ও নিঃসঙ্গ জীবনই তাঁর
ভেতরের সৃষ্টিশীলতাকে এক অভাবনীয় শক্তি দিয়েছিল। তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, 'মেঘনাদবধ কাব্য',
বাংলা সাহিত্যকে যা
চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে,
তা এই বিদ্রোহী ও একাকী
আত্মারই ফসল। তিনি যখন বাংলা সাহিত্যে ফিরে এলেন, তখনও
তিনি একা। অমিত্রাক্ষর ছন্দ,
সনেট—এসবকিছু ছিল বাংলা
কবিতার জগতে এক অচেনা, অজানা সুর। তিনি একাই একটি প্রতিষ্ঠানকে
চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। তাঁর একাকীত্ব ছিল একজন সৃষ্টিশীলতার -এর একাকীত্ব, একজন পথপ্রদর্শকের একাকীত্ব, যিনি সময়ের চেয়ে বহু বছর এগিয়ে ছিলেন এবং একারণেই
সমসাময়িকদের থেকে ছিলেন বিচ্ছিন্ন। তাঁর চিঠিপত্রে এই গভীর বেদনা ও নিঃসঙ্গতার ছাপ
স্পষ্ট।
কবির এই একাকীত্ব কোনো
ভৌগোলিক সীমারেখায় বাঁধা নয়। এ এক বৈশ্বিক অনুভূতি, যা
আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তের,
নানা ভাষার কবিদের মধ্যে
খুঁজে পাই। ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবিরা ছিলেন একাকীত্বের উপাসক। তাঁরা
সমাজের কৃত্রিমতা থেকে পালিয়ে প্রকৃতির বিশালতার মধ্যে নিজেদের নিঃসঙ্গ আত্মার
প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতেন। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ মেঘের মতো একাকী ঘুরে বেড়ানোর
কথা বলেছেন—'I Wandered
Lonely as a Cloud'। কিন্তু এই একাকীত্ব তাঁর
জন্য বিষণ্ণতার নয়, বরং পরমানন্দের উৎস ছিল। প্রকৃতির সঙ্গে
একাত্ম হওয়ার জন্য এই নির্জনতা ছিল অপরিহার্য। অন্যদিকে, জন কিটস-এর একাকীত্ব ছিল আরও গভীর, আরও বিষণ্ণ। তাঁর কবিতায় সৌন্দর্য, মৃত্যু এবং একাকীত্ব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর 'Ode to a Nightingale' কবিতায় তিনি পাখির গানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে এই যন্ত্রণাময়
পৃথিবী থেকে পালিয়ে যেতে চান,
যা এক বিচ্ছিন্নতাবোধের
পরিচায়ক।
জার্মান সাহিত্যের অন্যতম
শ্রেষ্ঠ কবি রাইনার মারিয়া রিলকের কাছে শৈল্পিক সৃষ্টির জন্য একাকীত্ব ছিল এক পরম
ধর্ম। তিনি তাঁর বিখ্যাত 'লেটারস টু এ ইয়াং পোয়েট'-এ এক তরুণ কবিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, "আপনার নিজের গভীরে যান...একা থাকতে শিখুন।" তিনি
বিশ্বাস করতেন, একটি মহৎ শিল্পকর্মের জন্ম হয় অসীম, গভীর একাকীত্ব থেকে। শিল্পীকে বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে
বিচ্ছিন্ন করে ভেতরের জগতের খননকার্য চালাতে হয়। একইভাবে, জোহান উলফগ্যাং ফন গোয়েটে, যদিও তিনি এক সামাজিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাঁর সৃষ্টি 'The
Sorrows of Young Werther'-এর
মধ্যে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে তীব্র আবেগ ও সংবেদনশীলতা একজন মানুষকে সমাজ
থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।
ইতালির ফ্রান্সেস্কো
পেত্রার্ক, রেনেসাঁসের অন্যতম পুরোধা, তাঁর সনেটগুলিতে লরার প্রতি তাঁর প্রেম এবং সেই সূত্রে
পাওয়া দীর্ঘ বিরহ ও একাকীত্বকে অমর করে রেখেছেন। তাঁর একাকীত্ব ছিল এক মহৎ, ভালোবাসাকেন্দ্রিক নিঃসঙ্গতা। কিন্তু আরেক ইতালীয় কবি, জিয়াকোমো লিওপার্দি, ছিলেন
এক চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ ও হতাশাবাদী আত্মা। শারীরিক অসুস্থতা এবং এক দমবন্ধ করা
পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে তাঁর জীবন ছিল তীব্র একাকীত্বে পূর্ণ। তাঁর কবিতায় এই
ব্যক্তিগত হতাশা এক মহাজাগতিক বিষণ্ণতায় রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে মানুষ এই উদাসীন মহাবিশ্বে এক ক্ষুদ্র, নিঃসঙ্গ কণা মাত্র।
স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো
গার্সিয়া লোরেকার কবিতায় আমরা পাই 'দুয়েন্দে'-র
ধারণা—এক গভীর, অন্ধকার, প্রায়
অব্যাখ্যাত আবেগ, যা শিল্পকে প্রাণ দেয়। এই 'দুয়েন্দে'র উৎসও এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও মৃত্যুর
সান্নিধ্য। তাঁর 'Poet
in New York' কাব্যগ্রন্থে তিনি
আধুনিক শহরের যান্ত্রিকতা ও অমানবিকতার মধ্যে ব্যক্তির তীব্র একাকীত্বকে তুলে
ধরেছেন। নোবেল বিজয়ী হুয়ান রামোন হিমেনেথও তাঁর "নগ্ন কবিতার" সন্ধানে
এক স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর 'সশব্দ একাকীত্ব' (Sonorous Solitude) নামক কাব্যগ্রন্থের শিরোনামটিই কবির জগতের
প্রতীক।
তাহলে, নিশিথ প্রদেশের সেই কবি কিসের নেশায় হাঁটেন? সেই নেশা হলো সৃষ্টির যজ্ঞের প্রস্তুতি। তিনি দিনের আলোয়
সমাজ থেকে যে অভিজ্ঞতা,
যে অনুভূতি, যে যন্ত্রণা কুড়িয়ে আনেন, রাতের
নির্জনতায় সেই সবকিছুকে তিনি তাঁর আত্মার যজ্ঞে আহুতি দেন। সেই যজ্ঞের আগুনই হলো
তাঁর সৃষ্টিশীলতার আগুন। সেই আগুনে পুড়েই কাঁচা অভিজ্ঞতা পরিণত হয় শিল্পে, সাধারণ শব্দ হয়ে ওঠে কবিতা।
এই প্রক্রিয়াটি বেদনাদায়ক।
এর জন্য প্রয়োজন হয় নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেওয়ার। আত্মীয়, বন্ধু,
সমাজ—সকলের থেকে দূরে গিয়ে
এক শূন্যতার মধ্যে দাঁড়াতে হয়। সেই শূন্যতার মধ্যেই কবি শুনতে পান মহাকালের সুর, দেখতে পান অরূপের ছবি। তিনি যখন লেখেন, তখন তিনি আর সামাজিক মানুষ নন। তিনি তখন এক দ্রষ্টা, এক ঋষি।
কবি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন
নন, কিন্তু তিনি সমাজের ঊর্ধ্বে এক স্বতন্ত্র
অবস্থানে থাকেন। তাঁর একাকীত্ব এক ধরনের আত্মত্যাগ। তিনি একা হাঁটেন, যাতে মানবসমাজ তাদের নিজেদের অনুভূতিগুলোকে এতটা একা
অনুভব না করে। তিনি নিজের রক্ত দিয়ে যে কবিতা লেখেন, তা
হয়ে ওঠে অগণিত মানুষের না-বলা কথার প্রতিধ্বনি। জীবনানন্দের ধূসর জগতে হেঁটে কোনো
এক বিষণ্ণ পাঠক খুঁজে পায় তার নিজেরই বিচ্ছিন্নতার সান্ত্বনা। রবীন্দ্রনাথের গানে
কোনো এক একাকী আত্মা খুঁজে পায় তার প্রার্থনার ভাষা।
তাই মানুষ মূলত সামাজিক
হয়েও কবির কাছে ঋণী। কারণ কবি একা হাঁটেন বলেই, তিনি
সমাজের সম্মিলিত আত্মার আয়না হয়ে উঠতে পারেন। তাঁর নিঃসঙ্গ পদধ্বনি আসলে কোনো
বিচ্ছিন্ন পাগলের প্রলাপ নয়;
তা হলো সভ্যতার
অগ্রযাত্রার সবচেয়ে সংবেদনশীল,
সবচেয়ে সৎ প্রতিধ্বনি।
ভোরের আলো ফোটার আগে তিনি ফিরে যাবেন তাঁর ঘরে, তাঁর
টেবিলে পড়ে থাকবে কয়েকটি শব্দ—এক দীর্ঘ,
নিঃসঙ্গ রাতের বিনিময়ে
পাওয়া কয়েকটি তারা। আর সেই তারার আলোতেই পথ দেখবে অগণিত সামাজিক মানুষ। কবির
নিয়তিই এই—একা থেকে, সকলের হয়ে ওঠা।
তাঁর মাথার ভেতর তখন ভাঙে
আর গড়ে। হাজার বছরের স্মৃতিরা কথা বলে ওঠে। ইতালির দ্রাক্ষাকুঞ্জের বিষণ্ণ গন্ধ, স্পেনের গিটারের কান্না, পোল্যান্ডের
বরফঢাকা মাঠের হাহাকার—সব এসে মেশে তাঁর রক্তে। তিনি তখন একা নন। তাঁর সঙ্গে হাঁটে
নির্বাসিত মধুসূদন, নির্জনতার অন্ধকারে পথ হাতড়ানো জীবনানন্দ, আধ্যাত্মিক একাকীত্বে মগ্ন রবীন্দ্রনাথ। এঁরা শরীর নন, এঁরা ছায়া। এঁরা কণ্ঠ নন, এঁরা
প্রতিধ্বনি।
প্রতিটি পদক্ষেপে কবি
কুড়িয়ে চলেন শব্দ। ঝরে পড়া পাতা,
পথের ধারের নিঃসঙ্গ কুকুর, দূরে বেজে ওঠা কোনো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—সবই তাঁর
কাছে একেকটি অক্ষর। তিনি তাদের গেঁথে মালা তৈরি করেন না, তিনি তাদের রক্তমাংস দিয়ে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। এই
সৃষ্টির যন্ত্রণা তীব্র,
এই জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়া
নিঃসঙ্গ। সমাজের উষ্ণ গর্ভে যা জন্মায়,
তা সম্পর্ক। কবির আত্মার
শীতল গর্ভে যা জন্মায়, তা কবিতা।
সৃষ্টিশীল মানুষ তাই একলা
হাঁটেন। তাঁর পথ—আত্মার অলিন্দে এক অন্তহীন যাত্রা। ভোরের আলো ফোটার আগে তিনি ফিরে
যাবেন তাঁর ঘরে, তাঁর টেবিলে পড়ে থাকবে কয়েকটি এলোমেলো শব্দ।
পৃথিবী যখন জাগবে, তখন হয়তো সেই শব্দগুলো পড়ে কেউ খুঁজে পাবে
নিজেরই অব্যক্ত কান্না,
নিজেরই না-বলা ভালোবাসা।
তাঁর নিঃসঙ্গ পদাবলীই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সম্মিলিত সঙ্গীত।
Comments
Post a Comment