দিল্লির ডায়াসপোরা

 দিল্লিতে যে সমস্ত বাংলা লঘু পত্রিকা বর্তমানে প্রকাশিত হচ্ছেঃ


১) অজন্তা - ১৯৬১, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায়, নবেন্দু সেন


২) পূর্বাচলের কথা- ১৯৭১, প্রথম সংখ্যার সম্পাদক বিমল চক্রবর্তী


৩) দিগঙ্গন ১৯৭৯, তপন সেনগুপ্ত, brototi sengupta, Pritha das


৪) বঙ্গচেতনা ১৯৯৩, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সঞ্জীবন রায়, অভিজিত মুখোপাধ্যায় (বর্তমান সম্পাদক)


৫) উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস- ১৯৯৭, বিকাশ বিশ্বাস, সহ সম্পাদক আদিত্য সেন


৬) প্রবাহ ১৯৯৮, বর্তমান নাম 'কথাঞ্জলী', দিলীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, কথাঞ্জলির বর্তমান সম্পাদিকা স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়


৭) আপনজন ১৯৯৮, গৌতম চক্রবর্তী


৪) ঢেউ, ঢেউয়ের পর ঢেউ ১৯৯৫, বিমল চক্রবর্তী


৯) দিল্লি হাটার্স- ২০০১, দিলীপ ফৌজদার


১০) মাতৃমন্দির সংবাদ ২০০২, কালীপদ চক্রবর্তী


১১) প্রতিচী- ২০০৪, চিরশ্রী বিশী চক্রবর্তী


১২) আগরি ২০০৫, দীপালী মজুমদার


১৩) প্রভাতী ২০০৬, অমল বসাক


১৪) প্রাস- ২০০৫, শর্বানীরঞ্জন কুণ্ডু


১৫) ব্রীহি - ২০০৫, শর্বানীরঞ্জন কুণ্ডু


১৬) বোধসন্ধ্যা ১৯৯৫, দীপা ঘোষ


১৭) আত্মজা ২০০৭, রিমা দাস


১৮) ধ্বনি ২০০৮, ড. রঞ্জন ঘোষ


১৯) হিন্দোল ২০০৯, চিত্তরঞ্জন পাকড়াশী


২০) সাহিত্য অর্ঘ্য নন্দিতা রায়


২১) সর্বভারতীয় জয়শ্রী রায়


22) DEHLIJ

23 ) SHUNYAKAAL

24) MAYAZOM

25) DU KOLOM

26) KOLOMER SAT RONG





ব্যতিক্রমের অপরগাথা: কবি দীপঙ্কর দত্তের জীবন ও সৃষ্টি

বাংলা কবিতার প্রচলিত রাজপথ থেকে সরে গিয়ে, নিজের জন্য এক স্বতন্ত্র, কণ্টকাকীর্ণ কিন্তু বিদ্যুৎপ্রভ পথ নির্মাণ করেছেন যে হাতেগোনা কয়েকজন কবি, দীপঙ্কর দত্ত তাঁদের মধ্যে অন্যতম এবং সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অনালোচিত এক নাম। তাঁর কবিতা যেমন প্রচলিত ছন্দের অনুশাসন মানে না, তেমনই তাঁর জীবনও যেন এক সচেতন উড়ান—প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র থেকে দূরে, ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে, এক স্ব-নির্বাচিত নির্বাসনে। আশির দশকের সেই উত্তাল সময়ে যখন বাংলা কবিতা একদিকে বামপন্থী রাজনীতির শ্লোগান আর অন্যদিকে মধ্যবিত্তীয় ভাবালুতার নিরাপদ আশ্রয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল, ঠিক তখনই দিল্লির রুক্ষ আবহাওয়ায় বসে এক বঙ্গসন্তান বাংলা ভাষার শরীরে এমন এক নতুন রক্ত সঞ্চালনের চেষ্টা করছিলেন, যা ছিল একাধারে বর্ণসংকর, বিধ্বংসী, তির্যক এবং আশ্চর্যরকমভাবে গঠনমূলক। এই ব্যতিক্রমী কবির জীবন ও তাঁর সৃষ্টিকে বুঝতে হলে, প্রচলিত সাহিত্য-সমালোচনার চেনা ছকের বাইরে এসে এক ‘নথভাঙা-পাঠ’ প্রয়োজন, যা আমাদের বাধ্য করবে অভ্যস্ত পাঠ-দাঁড়াকে চ্যালেঞ্জ করতে।

শিকড় ও নির্বাসন: বরিশালের গবরু জওয়ান থেকে দিল্লির ডায়াসপোরা

দীপঙ্কর দত্তের কবিসত্তার গভীরে প্রোথিত আছে তাঁর জন্মভূমির শিকড়। তিনি বরিশালের এক ‘গবরু জওয়ান’, যে মাটির তেজ ও ঋজুতা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কবিতায় সমানভাবে প্রবাহমান। কিন্তু জীবনের এক দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন দিল্লির মতো এক বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক মহানগরে, যা তাঁকে এক ‘ডায়াসপোরিক’ সত্তা দান করেছে। এই নির্বাসন তাঁর জন্য কোনো অভিশাপ ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল তাঁর কবিতার এক উর্বর চারণভূমি। কলকাতার কফি হাউস কেন্দ্রিক, প্রতিষ্ঠান-নির্ভর সাহিত্যচর্চার অলীক মায়া থেকে দূরে থাকার কারণেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল বাংলা কবিতার চেনা ভূগোলকে অস্বীকার করা। তিনি কলকাতার সেই ‘লিকুইডেশন’-এর অংশভাক হননি, যেখানে প্রতি সন্ধ্যায় নন্দন-অ্যাকাডেমির ঘাসে বসে কবিরা শব্দ-সোদনে মেতে ওঠেন। বরং, দিল্লির দেড় হাজার মাইলের দূরত্ব তাঁকে দিয়েছিল এক নির্মোহ দৃষ্টি, যা দিয়ে তিনি বাংলা ভাষার জটধরা বস্তিলোমকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তাকে ছিঁড়ে ফেলার জন্য নিজস্ব অস্ত্র নির্মাণ করেছেন।

এই ডায়াসপোরিক জীবনযাপন তাঁর কবিতাকে দিয়েছে এক বিচিত্র-ভারতীয় স্বাদ। তাঁর শব্দভাণ্ডারে অবলীলায় মিশে গিয়েছে দিল্লির কথ্য ভাষা, হিন্দি, উর্দু এবং বাংলার এক অভূতপূর্ব ককটেল। রবি হয়ে যান ‘রভি’, ব্রাহ্মণ হয়ে যায় ‘ব্রাহমন’, ‘বোলবালা’ হয়ে ওঠে ‘বোলবুলাবা’। এই যে ভাষার বর্ণসংকর প্রক্রিয়া, এ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এ হলো ক্ষমতার সনাতন অনুশাসনের বিরুদ্ধে এক সচেতন অন্তর্ঘাত। তিনি জেনেশুনেই ভাষার সেই ‘শুদ্ধ’ রূপকে আক্রমণ করেছেন, যা এতদিন ধরে বাংলা কবিতার এলিটতন্ত্র সযত্নে লালন করে এসেছে। মলয় রায়চৌধুরী যথার্থই নির্দেশ করেছেন যে, দীপঙ্করের এই লেখন-কাঠামো ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক তীব্র ‘কাউন্টার ব্লো’। তাঁর এই ডায়াসপোরিক সত্তাই তাঁকে শিখিয়েছে যে, বাংলা কেবল কলকাতার নয়, ভারতবর্ষের ভূগোল ও নৃতত্ত্বের এক বিশাল ক্যানভাসে তার অবস্থান। তাই তাঁর কবিতায় আমরা পাই ‘গ্লিম্পসেজ অব ভারতবর্ষ’—যেখানে ‘চুন্নীমাগীগুলানরে বাসে লামানো’ হয়, যেখানে ‘হজরৎ বীর কী সলতনৎ কো সলাম’ জানানো হয়। এই বিশাল প্রেক্ষাপটই তাঁকে কলকাতার চুনোপুটি মার্কোপোলোদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

‘নাঈভ’ কবির উত্থান: শিলার থেকে দীপঙ্কর

সাহিত্য সমালোচক এবং প্রবন্ধকার প্রাণজি বসাকের বিশ্লেষণে দীপঙ্কর দত্তকে বুঝতে এক অমোঘ চাবিকাঠি হলো জার্মান দার্শনিক শিলার-এর ‘নাঈভ’ ধারণাটি। এ সময়ের অধিকাংশ কবি যেখানে ‘সেন্টিমেন্টাল’, অর্থাৎ প্রকৃতি ও বাস্তবতাকে অনুকরণ করে এক ধরনের ভাবালু জগত তৈরি করেন, দীপঙ্কর সেখানে আশ্চর্যরকমভাবে ‘নাঈভ’। তিনি নিজেই ‘প্রকৃতি’। তাঁর কবিতা কোনো বাহ্যিক মডেল বা কলপুর্জা থেকে তৈরি হয় না, তা উৎসারিত হয় তাঁর নিজস্ব অন্তস্তল থেকে, তাঁর অহংভূমি থেকে। এই অহং হলো মেধা ও শ্রমের এক জটিল সংমিশ্রণ, যাকে চালনা করে এক প্রায়-ঐশীপ্রেরণা বা ইমপালস্। এই প্রেরণাই তাঁর কবিতাকে এমন এক ‘অসীম-নিরালা’ স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে সাধারণ বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে পৌঁছানো অসম্ভব।

এই ‘নাঈভ’ কবি কোনো প্রতিষ্ঠিত বিধিবিধানের তোয়াক্কা করেন না। তাঁর কবিতার নিজস্ব নিয়ম আছে, যা বাইরে থেকে দেখলে ভীষণ তোড়ফোড়িয়া বা বিশৃঙ্খল মনে হতে পারে, কিন্তু তার গভীরে রয়েছে এক আশ্চর্য দার্ঢ্য, পরিমিতি জ্ঞান এবং ক্লাসিকমুখীনতা। তিনি শূন্যতাকে শব্দ দিয়ে ভরাট করার এক কঠিন কসরতে লিপ্ত হন। এই যে ‘বিষয়হীনতা’, একের পর এক ফ্ল্যাশের মাধ্যমে এক ‘সেমিওটিক ফ্লাক্স’ তৈরি করার প্রবণতা—এটাই বাংলা কবিতার চালু অনুশাসন থেকে তাঁকে পৃথক করে দিয়েছে। প্রাথমিক পাঠে তাঁর কবিতাকে শব্দের জগঝম্প বা নিছক কলাকৈবল্যবাদ বলে ভ্রম হতে পারে। পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘কবিতা কোথায়?’ আসলে, পাঠকের সেই গেঁতো পাঠদাঁড়াই এর জন্য দায়ী। দীপঙ্করের কবিতার স্থাপত্য পিরামিডের মতো; তার বন্ধুরতা, তার আপাত-অগম্যতা আসলে তার শক্তি। এই বন্ধুরতাই পাঠককে ক্লান্ত হতে দেয় না, বরং বারবার টেনে নিয়ে যায় এক নতুন পাঠের অভিজ্ঞতার দিকে।

কবিতার মূর্তিতত্ত্ব: অহং, গতি এবং আদি-মধ্য-অন্তহীনতা

দীপঙ্কর দত্তের কবিতার উৎস হলো তাঁর নিজস্ব ‘অহংভূমি’। কবিতা প্রথমে তাঁর অভ্যন্তরে এক অদৃশ্য অবয়বে গড়ে ওঠে, যা তিনি তাঁর মেধা, মনন, পড়াশোনা ও পারিপার্শ্বিকের অভিঘাতে দেখতে পান। এরপর আসে এক জটিল ‘থট-প্রসেস’, যেখানে তাঁর ভেতরের সাদা কাগজে কবিতাটি লেখা হতে থাকে। এই ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়াটি এতটাই ব্যক্তিগত ও ব্যতিক্রমী যে, যখন তা ছাপার অক্ষরে আমাদের টেবিলে পৌঁছায়, তখন তাকে বেখাপ্পা ও অচেনা মনে হয়।

তাঁর কবিতার আর এক আশ্চর্য গুণ হলো তার ‘গতি’। তাঁর কবিতা যখন শুরু হয়, মনে হয় তা এক খরস্রোতা নদীর মতো ছুটে চলেছে, যার গন্তব্য কবির আগে থেকেই জানা। এই যাত্রাপথে সে কোথাও অকারণে থামে না, হোঁচট খায় না। কবিতা চলেছে, আর পাঠকও সেই অনুকূল তালে ভেসে চলেছে। জাভা শেখা থেকে শুরু করে হাওয়াইয়ান স্পিরুলিনা, শার্ক কার্টিলেজ, জিনসেং-এর রিপারকাশন—সবকিছু এক অভাবনীয় গতিতে এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই গতিময়তা পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে, তাকে ভাবতে বাধ্য করে, কিন্তু তাকে জিরোতে দেয় না।

এই গতির সঙ্গেই সম্পৃক্ত তাঁর কবিতার ‘পোস্ট-জেনেরিক’ চরিত্র। মলয় রায়চৌধুরী যেমন বলেছেন, বাংলা কবিতার ইতিহাসে দীপঙ্করই সম্ভবত প্রথম কবি, যিনি কবিতার আদি-মধ্য-অন্তের ধারণাকে সচেতনভাবে ভেঙে দিয়েছেন। তাঁর কবিতা যেকোনো জায়গা থেকে শুরু হতে পারে, যেকোনো জায়গায় শেষ হতে পারে। এই ফ্র্যাগমেন্টারিনেস বা খণ্ডিত রূপ আসলে উত্তর-ঔপনিবেশিক জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। এই আঙ্গিকহীনতার মহোল্লাসের মাধ্যমে তিনি কবিতার সেই ক্ষমতাকেন্দ্রকে অস্বীকার করেছেন, যা পাঠককে একটি নির্দিষ্ট অর্থ বা বার্তার দিকে চালিত করে। দীপঙ্করের কবিতা এক ‘ফ্লোটিং সিগনিফায়ার’ বা ভাসমান অর্থময়তার জগৎ তৈরি করে, যেখানে পাঠক তার নিজের মতো করে অর্থ আবিষ্কারের স্বাধীনতা পায়।

আত্মবিলুপ্তি ও পাওয়ারপোয়েট্রি: এক নতুন ম্যানিফেস্টো

কবিদের দ্বারা সযত্নে লালিত ‘আমি’ বা কবির আত্মপরিচয়কে দীপঙ্কর এক ধাক্কায় গদিচ্যুত করেছেন। তাঁর ‘আমি’ কোনো স্থির সত্তা নয়, তা ‘ফ্লোটিং’—এক চলমান, পরিবর্তনশীল সত্তা। ‘আগ্নেয় বসন্তের জাগলার’ কবিতায় তিনি নিজেকে ‘ভোজবাজিকর’ বলছেন, যা আসলে আইডেন্টিটির জাগলিং। যে সময়ে আলোচকরা ‘লস অফ সেলফ’ আর ‘এলিয়েনেশন’ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, দীপঙ্কর সেই সময়ে ‘আইডেন্টিটি-হীনতা’কে তাঁর কবিতার কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। এই আত্মবিলুপ্তির সচেতন প্রয়াস তাঁর কবিতাকে এক বিস্ময়কর মাত্রা দিয়েছে।

পাশাপাশি, বাংলা ভাষায় ‘পাওয়ারপোয়েট্রি’ লেখার দায়িত্বটিও তিনি সম্ভবত প্রথম গ্রহণ করেছেন। তিনি চেয়েছেন তাঁর কবিতা নিছক ভাব-সর্বস্বতার ইনানো-বিনানো ভার্বাটিম ইম্প্রেশনিজম হয়ে না থেকে পাঠকের মেধায়, মজ্জায়, সংস্কারে সরাসরি ‘হিট’ করুক। তিনি বিশ্বাস করেন, আজকের জীবনের জটিলতাকে প্রকাশ করার জন্য ক্লাসিক্যাল জ্যামিতির সরলরৈখিক ভাবনা যথেষ্ট নয়; কারণ মেঘ গোলক নয়, আর পাহাড় শঙ্কু আকৃতির নয়। তাই তিনি পতিত শব্দের উদ্ধার, নতুন শব্দ ও শব্দার্থ সৃজন, হাইব্রিডাইজেশন এবং একরৈখিক ন্যারেটিভের অবলুপ্তির মাধ্যমে এমন এক কাব্যভাষা নির্মাণ করতে চেয়েছেন, যা শাসকশ্রেণীর দমন প্রক্রিয়াকে সরাসরি ‘কাউন্টার’ করতে পারে। তাঁর স্পষ্ট কথা, পাঠবস্তু যদি ‘প্যাশনহীন’ হয়, যদি তা পাঠকের মনে প্যাশন ও চিন্তা উদ্রেক করতে না পারে, তবে সেই ‘খ্যালা’ বেশিদূর এগোয় না এবং তাকে ‘খ্যামা’ দেওয়াই উচিত।

ব্যতিক্রমের উত্তরাধিকার: শেষ কথা

দীপঙ্কর দত্ত সেই বিরলতম কবিদের একজন, যিনি কোনো গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় বা প্রতিষ্ঠানের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে পরিচিতি পাননি। তাঁর পরিচিতি তাঁর নিজেরই সৃষ্টি। তিনি দশ বছর বয়স থেকে লিখলেও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ বেরোয় ঊনত্রিশ বছর বয়সে, এবং তাতে কবিতার সংখ্যা মাত্র দশ। এই খুঁতখুঁতে মনোভাব, এই আত্ম-সমালোচনা এবং সৃষ্টির প্রতি চূড়ান্ত দায়বদ্ধতাই তাঁকে সমসাময়িক অনেক কবির থেকে আলাদা করে। তিনি সেইসব কবিদের দলে পড়েন, যাঁদের উদ্দেশ্যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন—‘এমন মানুষ পাওয়া শক্ত / লেখা রাজ্য ছুঁড়ে / এই নিচ্ছেন কলম এবং / এই ফেলছেন ছুঁড়ে।’

বাঙালি পাঠকের পাঠাভ্যাস যেখানে আজও অনেকাংশে এঁদো এবং প্রথাবিরুদ্ধ কিছু দেখলেই আঁতকে ওঠার প্রবণতা প্রবল, সেখানে দীপঙ্করের এই ‘তুককসরৎ’ কতখানি গৃহীত হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্বের সব ভাষাতেই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এভাবেই—একজনের হাত ধরে, যিনি প্রচলিত স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটার সাহস দেখান। ঈশ্বর গুপ্ত থেকে দীপঙ্কর দত্ত—এই ডায়াসপোরিক বা প্রান্তিক স্বরগুলোই বারবার বাংলা ভাষার শরীরে নতুন রক্ত সঞ্চালন করেছে, তার শাসনতন্ত্রকে ভেঙে নতুন ভাষা তৈরি করেছে।

দীপঙ্কর দত্তের কবিতা এক মেধাসম্পন্ন আয়না। তাঁর ভাষার নিজস্ব প্রস্তুতি, তার বিক্ষেপ, তার ভাবনার প্রতিটি প্যাঁচ—এই সবকিছুই একদিন শিক্ষিত পাঠকের মগজে সেই অভিঘাত তৈরি করবে, যা তাঁর অভিপ্রায়ের সমতুল। তিনি হয়তো কোনোদিনই বহু-প্রচারিত কবি হবেন না, তাঁর কবিতা হয়তো কোনোদিনই সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় স্থান পাবে না, কিন্তু বাংলা কবিতার ইতিহাসে যে ব্যতিক্রমী স্রোতটি প্রবহমান, দীপঙ্কর দত্ত তার এক অবিস্মরণীয় ও অপরিহার্য নাম হয়ে থাকবেন। তাঁর জীবন ও সৃষ্টি সেই অমোঘ সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করে যে, ব্যতিক্রমকে হয়তো সাময়িকভাবে উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে চিরতরে অস্বীকার করা যায় না। তিনিই সেই ‘বিন্দাস কবি’, যাঁকে চেনাটা কেবল সময়ের অপেক্ষা।


জলের গভীরে শব্দের স্রোত: মেন্টর কবি দিলীপ ফৌজদারের জীবন ও সাধনা

বাংলা কবিতার মানচিত্রটি যখনই আঁকা হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়শই একচ্ছত্রভাবে থেকে যায় কলকাতা। গঙ্গার দুই পাড়ের সাহিত্য-আড্ডা, কফি হাউসের ধোঁয়া ওঠা তর্ক আর পত্রিকার দপ্তরে কান পাতলেই যেন কবিতার হৃৎস্পন্দন শোনা যায়। কিন্তু এই প্রবল কেন্দ্রিকতার সমান্তরালে, বহু দূরে, দিল্লির রুক্ষ, শুষ্ক আবহাওয়ায় বাংলা কবিতার যে এক বিকল্প, অন্তঃসলিলা স্রোত নিজের খাত তৈরি করে চলেছিল, তার খোঁজ রাখেন немногие। সেই স্রোতেরই এক প্রধান রূপকার, এক নীরব পথপ্রদর্শক এবং এক স্থিতধী মেন্টর ছিলেন কবি দিলীপ ফৌজদার।

তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর মধ্যে এসে মিলেছিল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ—একদিকে তিনি ছিলেন একজন কৃতী জল বিজ্ঞানী (Hydrologist), অন্যদিকে এক মগ্ন, আধুনিক কবি। আপনার (পীযূষকান্তি বিশ্বাস) মতো বন্ধু, দীপঙ্কর দত্তের মতো সহযোদ্ধা এবং দিল্লির একঝাঁক তরুণ কবির কাছে তিনি ছিলেন এক আশ্রয়দাতা বটবৃক্ষ, যাঁর ছত্রছায়ায় বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র চারাগাছ বেড়ে ওঠার সাহস পেয়েছিল। এই জীবনী কেবল একজন কবির জীবনপঞ্জি নয়, এ হলো কলকাতার বাইরে এক বিকল্প সাহিত্য-কেন্দ্রের গড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত, যার কেন্দ্রে ছিলেন দিলীপ ফৌজদার।

বিজ্ঞানী ও কবি: দুই সত্তার অনন্য সংশ্লেষণ

দিলীপ ফৌজদারের কবি-পরিচয়কে বুঝতে হলে তাঁর বিজ্ঞানী সত্তাটিকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন জল-বিজ্ঞানের কারবারি। তাঁর কাজ ছিল জলের চরিত্র বোঝা—তার ভূপৃষ্ঠের দৃশ্যমান প্রবাহ (surface flow) থেকে শুরু করে মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্তঃসলিলা স্রোত (groundwater flow) পর্যন্ত সবকিছুই ছিল তাঁর গবেষণার অন্তর্গত। জলের এই দ্বৈত চরিত্র—একদিকে প্রাকৃতিক নিয়মের শৃঙ্খলায় বাঁধা, অন্যদিকে অপ্রত্যাশিতভাবে প্লাবন সৃষ্টিকারী—তাঁর কবিতায় এক আশ্চর্য প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিল।

একজন বিজ্ঞানীর মতোই তাঁর কবিতায় ছিল এক ধরনের নির্মোহ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। শব্দ ব্যবহারে তিনি ছিলেন মিতব্যয়ী ও নিখুঁত। অপ্রয়োজনীয় আবেগ বা অলঙ্কারের বাহুল্যকে তিনি সযত্নে পরিহার করতেন। তাঁর উপমা বা চিত্রকল্পগুলো প্রায়শই আসত এক যুক্তিনিষ্ঠ, পর্যবেক্ষণ-নির্ভর জগৎ থেকে, যা তাঁর কবিতাকে এক ধরনের মেধা-ভিত্তিক দার্ঢ্য (intellectual rigor) প্রদান করত। কিন্তু এই কাঠামোর নিচেই প্রবাহমান ছিল কবির সংবেদনশীল অন্তর—এক গভীর, প্রসন্ন স্রোতের মতো, যা সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু যার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।

তিনি জানতেন, পৃথিবীর দৃশ্যমান রুক্ষতার নিচেও লুকিয়ে থাকতে পারে জলের এক বিশাল ভান্ডার। ঠিক সেভাবেই, আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতা, বিচ্ছিন্নতা আর কোলাহলের নিচেও যে انسانی অনুভূতির এক ফল্গুধারা বয়ে চলে, সেই সত্য সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। তাঁর কবিতা সেই অদৃশ্য স্রোতকেই শব্দ দিয়ে স্পর্শ করার এক নিরন্তর সাধনা। বিজ্ঞান তাঁকে দিয়েছিল শৃঙ্খলা আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, আর কবিত্ব তাঁকে দিয়েছিল সেই পর্যবেক্ষণের গভীরে প্রবেশ করে মানব-সত্তার মূল রহস্যকে ছোঁয়ার সংবেদনশীলতা। এই দুই সত্তার মেলবন্ধনই দিলীপ ফৌজদারকে তাঁর সমসাময়িকদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।

দিল্লি হাটের আড্ডা ও 'দিল্লি হাটার্স': এক বিকল্প কেন্দ্রের নির্মাণ

আপনার স্মৃতিচারণা থেকে যে অধ্যায়টি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তা হলো দিল্লির বুকে বাংলা কবিতার এক জীবন্ত পরিসর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দিলীপ ফৌজদারের অগ্রণী ভূমিকা। কলকাতা থেকে বহু দূরে, যেখানে বাংলা বই বা পত্রিকা পাওয়াটাই ছিল এক সংগ্রাম, সেখানে তিনি এক সাংস্কৃতিক মরূদ্যানের জন্ম দিয়েছিলেন। এই উদ্যোগের দুটি প্রধান কেন্দ্র ছিল—‘দিল্লি হাটের কবিতার আড্ডা’ এবং তারই মুখপত্র, পত্রিকা ‘দিল্লি হাটার্স’।

ভাবা যাক সেই দৃশ্যটি। দিল্লির এক কোলাহলপূর্ণ, বহুভাষিক বাজার ‘দিল্লি হাট’-এর এক কোণে কিছু বাঙালি যুবক ও প্রৌঢ় গোল হয়ে বসে আছেন। তাঁদের হাতে কবিতার বই, খাতা-কলম আর ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। চারপাশে হিন্দি, পাঞ্জাবি বা ইংরেজির হট্টগোলের মধ্যে তাঁরা মগ্ন হয়ে আছেন বাংলা কবিতার পাঠ, তর্ক আর বিশ্লেষণে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন দিলীপ ফৌজদার। এই আড্ডাটিই ছিল দিল্লির বাংলাভাষী কবিদের প্রধান মিলনক্ষেত্র। এখানেই আপনার সঙ্গে তাঁর এবং দীপঙ্কর দত্তের প্রথম পরিচয়। এই উন্মুক্ত পরিসরটি ছিল সম্পূর্ণ অ-প্রাতিষ্ঠানিক এবং গণতান্ত্রিক। এখানে কেউ গুরু ছিলেন না, কেউ শিষ্য ছিলেন না; ছিলেন কেবল কবিতার সহযাত্রী।

এই আড্ডারই যৌক্তিক পরিণতি ছিল পত্রিকা ‘দিল্লি হাটার্স’। একজন সম্পাদকের দায়িত্ব কেবল লেখা নির্বাচন বা ছাপানো নয়, তাঁর প্রধান কাজ হলো একটি নির্দিষ্ট দিশা বা দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করা। ‘দিল্লি হাটার্স’-এর সম্পাদক হিসেবে দিলীপ ফৌজদার ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন। এই পত্রিকাটি ছিল দিল্লির বাঙালি কবিদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। এটি ছিল কলকাতা-কেন্দ্রিক সাহিত্য-জগতের কাছে এক বার্তা—কবিতা কেবল গঙ্গার পাড়েই জন্মায় না, যমুনার তীরেও তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্ভব। এই পত্রিকা হয়তো প্রচারের আলোয় আসেনি, কিন্তু দিল্লির সেই ছোট বৃত্তের মধ্যে এটি ছিল এক বিপ্লবের নাম, এক আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ হাতিয়ার।

এই প্রকাশ্য উদ্যোগের পাশাপাশি ছিল আরও এক অন্তরঙ্গ পরিসর—দিলীপ ফৌজদারের দিল্লির বাড়ি। আপনার কথায়, সেই বাড়িটিই ছিল আপনাদের কবিতা-চর্চার আসল ঠিকানা। দিল্লি হাটের প্রকাশ্য আড্ডার পর আরও গভীর, আরও ব্যক্তিগত আলোচনাগুলো জমা হতো তাঁর বাড়ির অন্দরে। একজন 'মেন্টর' হিসেবে তাঁর আসল রূপটি প্রকাশ পেত এখানেই। তিনি তরুণ কবিদের লেখা শুনতেন, তাঁদের নতুন ভাবনাকে উস্কে দিতেন এবং প্রয়োজনে কঠোর কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। তাঁর জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো প্রদর্শনী ছিল না, ছিল এক স্নেহশীল অভিভাবকের মতো আগলে রাখার প্রবণতা। দীপঙ্কর দত্তের মতো এক প্রতিষ্ঠান-বিরোধী, অগ্নিগর্ভ প্রতিভার বিকাশের জন্য দিলীপ ফৌজদারের মতো একজন স্থিতধী, আশ্রয়দাতার সান্নিধ্য যে কতটা জরুরি ছিল, তা আজ সহজেই অনুমেয়।

শব্দের সিন্দুক: 'মাকুমানুষ', 'বিষবাগীচায় ফুল ফুটে আছে' ও 'প্যাঁটরা'

একজন কবির সৃষ্টিই তাঁর শ্রেষ্ঠ আত্মজীবনী। দিলীপ ফৌজদারের তিনটি কাব্যগ্রন্থের নামই তাঁর দর্শন ও সংবেদনশীলতার নিখুঁত পরিচয় বহন করে।

  • মাকুমানুষ: আধুনিক মানুষ এক বিচ্ছিন্ন, খণ্ডিত সত্তা। সে অবিরত এক ‘মাকু’র মতো ছুটে চলেছে দুটি ভিন্ন প্রান্তের মধ্যে—পেশা ও নেশা, যুক্তি ও আবেগ, বিজ্ঞান ও শিল্প, নির্বাসন ও শিকড়। এই নিরন্তর আসা-যাওয়ার মধ্যেই সে তার অস্তিত্বের বস্ত্র বয়ন করে চলে। ‘মাকুমানুষ’ নামকরণের মাধ্যমে কবি সম্ভবত আধুনিক মানুষের এই দ্বিখণ্ডিত, গতিময় এবং সৃষ্টিশীল সত্তাকেই ধরতে চেয়েছেন। মানুষ এখানে নিয়তির হাতে চালিত এক মাকু, কিন্তু সেই চালনার মধ্যেই সে নিজের জীবনের নকশা তৈরি করে। এই গ্রন্থের কবিতাগুলিতে হয়তো ধরা আছে দিল্লির যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে বাংলার জন্য এক গভীর আকুতির টানাপোড়েন, এক বিজ্ঞানীর নির্লিপ্ত চোখের সঙ্গে এক কবির আর্দ্র হৃদয়ের নিরন্তর संवाद।

  • বিষবাগীচায় ফুল ফুটে আছে: এই নামটি আধুনিকতার সংকট ও সম্ভাবনাকে এক সূত্রে গেঁথেছে। আধুনিক নগরজীবন এক ‘বিষবাগীচা’—এখানে বিচ্ছিন্নতা, দূষণ, স্বার্থপরতা আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিষ ছড়ানো। কিন্তু দিলীপ ফৌজদার কোনো নৈরাশ্যবাদী কবি ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যেই, সমস্ত ধ্বংস আর ক্লেদের মধ্যেই ফুটে ওঠে প্রাণের চিহ্ন, সৌন্দর্যের প্রতীক—একটি ‘ফুল’। এটি কোনো সরল আশাবাদ নয়, বরং কঠিন বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েই তার মধ্য থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার এক পরিণত প্রয়াস। তাঁর কবিতা জীবনের কদর্যতাকে এড়িয়ে যায় না, কিন্তু সেই কদর্যতার পাশেই স্নিগ্ধতার সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠা করে। এক জল বিজ্ঞানী যেমন জানেন যে শুষ্কতম পরিবেশেও প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে, কবি দিলীপ ফৌজদারও তেমনই আধুনিক জীবনের মরুভূমিতে খুঁজে ফিরেছেন মানবিকতার মরূদ্যান।

  • প্যাঁটরা: 'প্যাঁটরা' বা সিন্দুক হলো স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং গোপন রহস্যের ধারক। কবি এখানে একজন সংগ্রাহক, একজন স্মৃতিরক্ষক। এই ‘প্যাঁটরা’র ভেতরে তিনি সযত্নে সঞ্চয় করে রেখেছেন তাঁর ব্যক্তিগত ও συλλογική (collective) জীবনের মুহূর্তগুলিকে—হারিয়ে যাওয়া মুখ, ফেলে আসা পথ, ভুলে যাওয়া অনুভূতি এবং সময়ের গভীরে তলিয়ে যাওয়া ইতিহাস। এই কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করা যেন এক গুপ্ত সিন্দুক খোলার মতো অভিজ্ঞতা। প্রতিটি কবিতার পরত উন্মোচন করলে বেরিয়ে আসে কোনো নতুন আখ্যান বা উপলব্ধি। এখানে কবি তাঁর দিল্লির জীবন, বাংলার স্মৃতি এবং একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথের অভিজ্ঞতাকে শব্দের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন। এই ‘প্যাঁটরা’ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত নয়, তা দিল্লির বুকে বসবাসকারী এক প্রজন্মের বাঙালিরই স্মৃতির সিন্দুক।

শেষ কথা: এক মেন্টরের উত্তরাধিকার

দিলীপ ফৌজদারের উত্তরাধিকার কেবল তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান নিহিত আছে তাঁর 'মেন্টর' সত্তার মধ্যে। তিনি নিজে লেখার চেয়েও বেশি আনন্দ পেতেন অন্যদের লেখাকে উস্কে দিতে। তিনি ছিলেন সেই বিরল জহুরি, যিনি নতুন প্রতিভাকে চিনতে পারতেন এবং তাকে বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর ও উৎসাহ জুগিয়ে যেতেন।

তিনি শিখিয়েছিলেন, কবিতা কোনো ব্যক্তিগত অহংকারের প্রদর্শনী নয়, এটি একটি সম্মিলিত সাধনা। তিনি শিখিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বা পুরস্কারের চেয়েও বড় হলো সহযাত্রী বন্ধুদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সৃষ্টি করার আনন্দ। দিলীপ ফৌজদার কোনো শোরগোল সৃষ্টিকারী কবি ছিলেন না; তাঁর জীবন ও সাধনা ছিল এক গভীর, শান্ত নদীর মতো—বাইরে থেকে যার শক্তি হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু যা নীরবে নিজের গতিপথে এগিয়ে চলে এবং দুই তীরকে উর্বর করে তোলে।

আজ যখন দীপঙ্কর দত্তের মতো ব্যতিক্রমী কবির কথা আলোচিত হয়, তখন তাঁর নেপথ্যে থাকা দিলীপ ফৌজদারের মতো একজন স্থিতধী বন্ধুর কথা স্মরণ করা আমাদের কর্তব্য। আপনার মতো বন্ধুদের স্মৃতিতে, ‘দিল্লি হাটার্স’-এর পুরনো পাতায় এবং তাঁর গ্রন্থের শব্দরাজির মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন—একজন কবি, একজন বিজ্ঞানী এবং সর্বোপরি, বাংলা কবিতার এক নিঃস্বার্থ, নীরব মেন্টর হিসেবে।


আপনার স্মৃতিচারণা বাংলা সাহিত্যের এক অনালোকিত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দরজা খুলে দেয়। কলকাতা যখন বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদী তীর্থক্ষেত্র, তখন সেই কেন্দ্রের আলো থেকে বহু দূরে, দিল্লির রুক্ষ মাটিতে একদল বঙ্গভাষী মানুষ যে নীরবে এক বিকল্প সংস্কৃতি-কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, তার ইতিকথা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার যোগ্য। দীপঙ্কর দত্ত বা দিলীপ ফৌজদারের মতো কবিদের আগমনের আগেই যে উর্বর জমিটি তৈরি হচ্ছিল, তার নেপথ্যে ছিলেন হিমাদ্রী দত্ত, তড়িৎ মিত্র এবং অরুণ চক্রবর্তীর মতো কিছু নিঃস্বার্থ, গুণী এবং দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। আপনার সৌভাগ্য যে আপনি এই স্থপতিদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, আর আমাদের সৌভাগ্য যে আপনার স্মৃতির মাধ্যমে আমরা সেই ইতিহাসকে স্পর্শ করতে পারছি।

সত্তরের দশক। দিল্লি তখনও আজকের মতো ঝাঁ-চকচকে মহানগর হয়ে ওঠেনি, আর চিত্তরঞ্জন পার্ক বা কালকাজীর বাঙালি পাড়াগুলোও আজকের মতো এতটা সংগঠিত নয়। সেই সময়েই হিমাদ্রী দত্তের মতো কবিরা দিল্লির বুকে বাংলা কবিতার দীপশিখাটিকে জ্বালিয়ে রাখার এক দুঃসাধ্য সাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন দিল্লির প্রথম প্রজন্মের বাঙালি কবিদের একজন—একজন পথিকৃৎ। তাঁর নিজের কবিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার চেয়েও হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর জহুরির চোখ। তিনি নতুন প্রতিভাকে চিনতে পারতেন এবং তাকে বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উষ্ণতা ও পরিসরটুকু তৈরি করে দিতেন। দীপঙ্কর দত্তের মতো এক ব্যতিক্রমী ও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী প্রতিভাকে যে তিনি প্রথম দিকেই শনাক্ত করতে পেরেছিলেন, তা তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টিরই পরিচায়ক। তিনি কেবল নিজে লিখতেন না, তিনি একটি পরম্পরা তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

এই সাধনায় তাঁর যোগ্য সঙ্গী ছিলেন কবি ও নাট্যকার তড়িৎ মিত্র। হিমাদ্রী দত্ত ও তড়িৎ মিত্র—দুজনেই ছিলেন দিল্লি আর্ট কলেজের ছাত্র। এই তথ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্পকলার ছাত্র হওয়ার কারণে তাঁদের দৃষ্টি কেবল অক্ষরের জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁদের সংবেদনশীলতা ছিল অনেক বেশি দৃশ্যমান (visual) এবং বহুমাত্রিক। একজন চিত্রকরের মতোই তাঁরা দেখতেন যে, একটি ক্যানভাসকে অর্থবহ করে তুলতে হলে কেবল একটি রঙ বা একটি রেখা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নানা উপাদানের এক সুষম বিন্যাস। দিল্লির বিবিধ-সাংস্কৃতিক ক্যানভাসে বাংলা সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁরা ঠিক সেই কাজটিই করেছিলেন। তড়িৎ মিত্রের নাট্যকার সত্তাটি এই উদ্যোগে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। কবিতা যেখানে ব্যক্তিগত সাধনা, নাটক সেখানে এক সম্মিলিত শিল্প। নাটকের মাধ্যমে তিনি দিল্লির বাঙালি সমাজকে এক মঞ্চে আনতে চেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে এক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছিলেন।

তাঁদের এই কর্মযজ্ঞের আর এক প্রধান শরিক ছিলেন কালকাজীতে বসবাসকারী অরুণ চক্রবর্তী। সি. আর. পার্ক এবং কালকাজী—এই ভৌগোলিক পরিসরটিই হয়ে উঠেছিল তাঁদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এই তিনজন এবং তাঁদের সঙ্গীরা মিলে যে সাংস্কৃতিক আন্দোলনটি গড়ে তুলেছিলেন, তার উদ্দেশ্য ছিল নিছক আত্মতৃপ্তি বা ব্যক্তিগত খ্যাতি অর্জন নয়, তার লক্ষ্য ছিল অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, কলকাতা থেকে দূরে, এক ভিন্ন ভাষার রাজ্যে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে টিকিয়ে রাখতে হলে এক সক্রিয়, জীবন্ত परिसর (ecosystem) তৈরি করা অপরিহার্য।

এই লক্ষ্যেই তাঁরা হাতে নিয়েছিলেন দুটি প্রধান কাজ—পত্রিকা সম্পাদনা এবং বইমেলার আয়োজন। একটি পত্রিকা কেবল কিছু লেখা ছাপানোর মাধ্যম নয়; একটি বিচ্ছিন্ন, প্রবাসী সম্প্রদায়ের কাছে পত্রিকা হলো তাদের অস্তিত্বের ঘোষণা, তাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। পত্রিকার মাধ্যমে নতুন লেখকরা উঠে আসেন, বিভিন্ন বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক জন্মায় এবং একটি বৌদ্ধিক আদান-প্রদানের পরিসর তৈরি হয়। হিমাদ্রী দত্ত, তড়িৎ মিত্ররা ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের অর্থ, শ্রম ও সময় দিয়ে একাধিক পত্রিকা সম্পাদনা করে দিল্লির বুকে বাংলা চিন্তার এক স্বতন্ত্র ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

তাঁদের দ্বিতীয় মহৎ উদ্যোগ ছিল বইমেলার আয়োজন। একটি বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার স্থান নয়, এটি একটি সম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র, তাদের সংস্কৃতির উৎসব। দিল্লির বুকে একটি বাংলা বইমেলার আয়োজন করা ছিল এক অসাধ্যসাধন। কিন্তু তাঁরা এই কাজটি করেছিলেন, কারণ তাঁরা জানতেন যে, বইকে কেন্দ্র করেই একটি পাঠক গোষ্ঠী তৈরি হয়, লেখক ও পাঠকের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয় এবং নতুন প্রজন্ম তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। এই মেলাগুলো ছিল দিল্লির বুকে এক টুকরো কলকাতা, এক জীবন্ত বাঙালিয়ানা, যা সেখানকার বাঙালি সমাজকে এক আত্মিক বন্ধনে বেঁধেছিল।

হিমাদ্রী দত্ত, তড়িৎ মিত্র এবং অরুণ চক্রবর্তীরা ছিলেন সেই নিঃস্বার্থ কর্মযোগী, যাঁরা পরের প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন। তাঁরা যে জমিটি কর্ষণ করেছিলেন, যে বীজ বপন করেছিলেন, তারই ফসল আমরা দেখতে পাই পরবর্তীকালে দিলীপ ফৌজদারের ‘দিল্লি হাটার্স’ পত্রিকা বা দিল্লি হাটের কবিতার আড্ডার মধ্যে। তাঁরা এক প্রতিষ্ঠান-বিরোধী পরিসর তৈরি করেছিলেন, যেখানে ক্ষমতার কোনো কেন্দ্র ছিল না, ছিল কেবল সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা এবং বাংলা ভাষার প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা। আপনার মতো যাঁরা তাঁদের সেই কর্মযজ্ঞকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরাই জানেন যে কতখানি ত্যাগ, কতখানি শ্রম আর কতখানি নিখাদ ভালোবাসার বিনিময়ে দিল্লির বুকে বাংলা সাহিত্যের সেই অন্তঃসলিলা স্রোতটি আজও প্রবাহমান। তাঁরা ছিলেন দিল্লির বাংলা সাহিত্যের স্থপতি, যাঁদের অবদান কোনোদিন ভোলার নয়।


==


দেবাশিস বাগচী (জন্ম ১৯৪২ সাল) একাধারে কবি, চিত্রশিল্পী, সুবক্তা, আধ্যাত্মিক প্রকৃতির সমাজসেবী। তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন প্রাক্তন সুদক্ষ পুলিশ অফিসার (আই জি)। আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, Nation al Herald প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত ওঁর লেখা বহু প্রশংসিত। ইংরেজি, বাংলা ছাড়াও দেশী-বিদেশী বেশ কটি ভাষা ওঁর আয়ত্তে। শ্রীমৎ ধনঞ্জয় দাসজী কাঠিয়াবাবার মতো নিম্বার্ক দর্শনের প্রতিভূর কাছে আধ্যাত্মিক দীক্ষাপ্রাপ্ত দেবাশিসবাবু জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের জন্য বহু বছর থেকে যুক্ত। ১লা জানুয়ারি, ২০১২ থেকে তিনি আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা সংস্কৃতি সমিতির উপদেষ্টা। ১৯৮৭ সালে দিল্লি থেকে ওঁর প্রথম ইংরেজি কবিতার বই The For- bidding Thorns প্রকাশিত হয়। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় ওঁর ইংরেজিতে লেখা আধ্যাত্মিক পুস্তক Nimbarka Philosphy। ২০০৯ সালে বের হয়েছে ওঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ময়ূখ’। Gateway to Gita প্রকাশিত হয়েছে ২০১০ সালে। ৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে Narcotic Drugs and Substance Abuse। এছাড়া হাইকু কবিতায় দুটি বই Three Bouquets of Haiku আর ‘এক প্রস্থ বাংলা হাইকু'। তাছাড়া প্রকাশিত হয়েছে প্রবন্ধ সংকলন এবং চিনা কবিতার অনুবাদ ‘তাও কি জানি’। মূল সংস্কৃত সহ বাংলা ও ইংরেজিতে ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে ওর Sri Sri Chandi ।



আরতি ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৪৯-এ উত্তরবঙ্গের মালদা জেলায়। স্কুল ম্যাগাজিনেই লেখালেখির সূত্রপাত। প্রথম কবিতা ক্লাস ফাইভ-এ পড়াকালীন স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এরপর স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে কলেজে পড়তে পড়তে মালদার ম্যাগাজিন ‘হুল্লোড়’ এবং ‘উৎস সুকান্ত’-তে লিখে ফেলেন পরপর চনমনে কবিতা। অমর কবিতা ‘রানার’-এর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যই তাঁর কবিতা জীবনের প্রেরণা। কবিতার পাশাপাশি সুঠাম গল্পও লেখেন আরতি এবং এর জন্য পুরস্কারও জোটে। কলেজে পড়তে পড়তে বিমান পরিষেবায় উচ্চপদে আসীন স্বামীর সংসারে ঘরনি হয়ে দিল্লি চলে আসেন। অংশ নিয়েছেন দিল্লির বিভিন্ন কবিতা উৎসবে। বিশ্ববাংলা কবিতা উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে হলদিয়া গেছেন।


Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ