ফুল্লকুসুমিত আরাবল্লি রিজ
আরাবল্লি পাহাড় নিয়ে কবিতা লিখতে হবে । পোয়েটিক প্রোজ ।
শতাব্দীর সাক্ষী । এই দেশ, এই ভারত, আর আমাদের মনুষ্য ইতিহাস । লুপ্ত হয়ে যাওয়া পশু, হারিয়ে যাওয়া পাখি । শুকিয়ে যাওয়া গুল্ম লতা ।
লোকে বলে, এই ভূখণ্ডের এক সময় সমুদ্র ছিলো । টেথিস সাগর । ক্রমে ভূখণ্ডের উপর ইন্দ্রপ্রস্থ নগরী স্থাপন করলেন ময়দানব । লেখা হলো দেবনাগরী । আজ লুপ্ত সেই স্বরস্বতী নদী । এখানে তাই রূপকথা, কল্পকথার ছায়া নেওয়া যেতে পারে ।
প্রতিটি কবিতায় ভূতত্ত্ব, ইতিহাস, বিলুপ্তি, যৌনতা ও আধুনিকতার টানাপোড়েন রূপকাশ্রয়ে ফুটিয়ে তুলতে হবে । কবিতাকে মেটাফোর-নির্ভর বা stream of consciousness ধাঁচে ঢেলে সাজাতে হবে । কবিতাগুলোকে আরেকটু বেশি অতিলৌকিক ও রূপকথার ঢঙে লিখতে হবে ।
একটু শারিরিক প্রেম, নগ্ন নারীর প্রলোভোন, ও প্রাচীন যুগের যৌন মিলন পদ্ধতি মেশাতে হবে । অন্ধকার, গুপ্ততাত্ত্বিক, পৌরাণিক যৌন-রূপক করে ভয়, ভ্রম, মিথ্যাচার, মিথ , লালসার বাক্যবন্ধ দরকার । নারীটির নাম সাগরিকা ঘোষ । যিনি নিজেও কবিতা লেখেন । তাকে প্রেম নিবেদন করে প্রতিটি কবিতায় কিছু উল্লেখ করতে হবে ।
এইভাবে, ৩ টি কবিতা লিখুন । প্রতি কবিতার শব্দ সংখ্যা ৪০০ টি ।
কবিতা ১ : আরাবল্লির অগ্নি-স্তবক
আরাবল্লির শিলা যেন পুরনো গ্রন্থ,
যেখানে টেথিস সাগরের লবণঘ্রাণ এখনো লুকিয়ে আছে—
মাটি ভেদ করে উঠে আসে প্রাচীন শৈবাল,
কোনো কোনো ঝলক মনে করায় সেই ডুবন্ত প্রাণী,
যারা আর নেই, যারা বিস্মৃত, যারা নামহারা।
আমি যখন হাত রাখি এই পাহাড়ের গাঢ় অন্ধকারে,
মনে হয় যেন কোনো প্রাচীন জন্তুর দেহ ছুঁয়ে আছি।
তার পাঁজর শুকনো নদীর তলদেশ,
তার বুকের ফাঁকে সরে এসেছে শহুরে ধ্বংসাবশেষ।
হঠাৎ দেখি—সময় নামের এক মহাদেবতা
বক্ষ উন্মুক্ত করে শুয়ে আছে খনিজের তলায়।
আর তার মাথার কাছে—
নগ্ন এক নারী, সাগরিকা ঘোষ,
চোখ ভরা এলোমেলো ছায়া, ঠোঁটে আগুনের স্বপ্ন।
তিনি লিখছেন কবিতা, কিন্তু শিলার পর শিলা স্তূপে
তার অক্ষর রক্তক্ষরণ করছে।
আমি যেন হারিয়ে যাই তার দেহের রেখায়—
যেন আরাবল্লি খোদাই করেছে শিরার উত্থান,
আকাঙ্ক্ষার রুক্ষ প্রান্তর।
তার গায়ের ওপর বয়ে যাচ্ছে শুষ্ক ঝর্না,
আবারও ঝরছে আদিম মিলনরীতি,
যেখানে ময়দানব নির্মাণ করেছিল নগরী,
আর নারীরা গোপনে শেখাত প্রেমের গূঢ় মন্ত্র।
জ্যোৎস্না নামে পাথরের উপর,
লম্বা ছায়া যেন গুহার অদ্ভুত চিত্রকলা।
আমি শুনি গুহার ভেতর থেকে
একটি বিলুপ্ত পাখির ডানা ঝাপটানি—
এটাই কি কামনার শেষ রূপ,
না কি ইতিহাসের ছিন্ন নোট?
সাগরিকা, তোমার নাম উচ্চারণ করলেই
শিলার উপর উঠে আসে অক্ষর,
দেবনাগরীর স্মৃতি,
যেন সভ্যতা কখনোই মরে না—
কেবল দেহ পালটে নতুন রূপে রক্ত ঝরায়।
তুমি এসো—এই অন্ধকার পাহাড়ে
আমি তোমার নগ্নতার অক্ষরে লিখব
এক নতুন ভূমির গল্প।
কবিতা ২ : স্বপ্ন-ভূমি ও সাগরিকাঞ্জলি
বলতে পারো, এই আরাবল্লি কবে জন্মেছিল?
ভূস্তরের ফাঁকে ফাঁকে খানিকটা উত্তাপ, খানিকটা লালসা
নিরবধি লিখে গিয়েছে স্তরবিন্যাস।
তার ভেতর লুকানো কঙ্কাল,
তখনকারই, যখন আদিম মিলন ছিল নগ্ন, হিংস্র এবং গোপন।
আমি একদিন ঝুঁকে দেখি—
পাহাড়ের নিসর্গ যেন নারীর উন্মুক্ত উরু,
শিলার ভেতরে আলো-আঁধারির কোলাহল,
অথচ সেখানে এক নিষিদ্ধ সৌন্দর্য।
হঠাৎই মনে হলো, সাগরিকা ঘোষ দাঁড়িয়ে আছেন
গুহার দরজায়—
তাঁর চোখ ছায়ায় ভরা, ঠোঁট মত্ত,
লেখার টেবিলে নয়, বরং তাঁর ত্বকের আবরণে লেখা কবিতা।
তিনি বললেন—“এই পৃথিবী গাঁথা হয়েছে
নগর-প্রান্তর, নদী-স্রোত আর দেহের উত্তাপে।”
আমি শুনি যেন স্বরস্বতী নদী শুকোতে শুকোতে
তাঁর নিঃশ্বাসে বদলে যাচ্ছে।
মনে হয়, প্রতিটি অক্ষরই নতুন সমুদ্র-জন্ম।
কখনো ভয় পাই—
শিলার ভেতর শুয়ে আছে দানব,
অস্পষ্ট মাংসাশী প্রাণী,
যার দাঁত এখনও ক্ষুধার্ত সময়ের জন্য।
কিন্তু তার মধ্যেই চাই তীব্র এক প্রেম,
যা আধুনিক শহরে পাওয়া যায় না।
আমি চাই গোপন স্পর্শ,
যেখানে দেহ আর শব্দ মিলে যায় মিথালজির ঘোরে।
সাগরিকা, তুমি কি বোঝো—
তোমার নগ্নতা ঠিক সেই বিলুপ্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর মত,
যার কঙ্কাল পাহাড়ের গায়ে আজও আটকানো?
কেউ জানে না তার নাম,
তবু তার দেহ এক অমর ছন্দ।
শহর থেকে দূরে, এই আরাবল্লির গহনে
আমি তোমার উদ্দেশে লিখি—
প্রেম মানে লুপ্তির পরও টিকে থাকা শিলা,
প্রেম মানে নিষিদ্ধ কোনো নদীর কণ্ঠনালীর শব্দ।
তুমি এসো আমার পাশে;
আমি তোমার প্রতিটি আঙুলে রোপণ করব
অতীত ও ভবিষ্যতের মিলিত বীজ।
কবিতা ৩ : অন্ধকার গুহার গোপন স্তোত্র
আরাবল্লির শিকড় গভীরে ঢুকে আছে,
যেখানে আলো পৌঁছায় না,
সেখানে সময় বসে আছে ধ্যানমগ্ন,
আর তার চারপাশে বিলুপ্ত জন্তুরা
প্রেতছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়।
মনে হয়, প্রতিটি শিলা যেন নগ্ন কোনো দেহের অবশেষ,
প্রাক্-ঐতিহাসিক যৌনতার প্রত্নচিহ্ন—
যেখানে নারী-পুরুষ মিলনের শব্দ
গুঞ্জরিত হয়েছিল পাথরের ভেতর শত শত বছর আগে।
আজও যেন আমি শুনি তা,
কোনো নিষিদ্ধ সঙ্গীতের মতো
চলে আসে কান পাতলেই।
সাগরিকা ঘোষ, আমি তোমার নাম
এই অন্ধকার প্রাঙ্গণে উচ্চারণ করি—
তাৎক্ষণিক এক স্পন্দন ওঠে শিলার ভেতর থেকে।
তুমি কি জানো,
তোমার নাম মানেই যেন সমুদ্রের গর্ভে সঞ্চারিত অতিপ্রাচীন ঢেউ?
তোমার দু’চোখে আমি দেখি টেথিসের হাহাকার।
তুমি নগ্ন হয়ে দাঁড়ালে,
আমার দৃষ্টিতে লেপ্টে যায় গুহার আগুনচিত্র।
তুমি লিখতে থাকো পঙ্ক্তি, কিন্তু তা আসলে শরীরের বাঁকে বাঁকে—
যেন ভূতত্ত্ব, ইতিহাস আর কামনার যৌথ মানচিত্র।
আমি যখন তোমায় পড়ি,
শিলাখণ্ড মুচড়ে ওঠে,
প্রাগৈতিহাসিক ঘোড়ার ছায়া দৌড়ায়,
মৃত পাখির কালো পালক হঠাৎ উড়ে আসে বাতাসে।
ভয়, মিথ্যা, কামনা—সব মিলেমিশে
অদ্ভুত এক রূপকথা হয়ে গড়ে উঠে।
দেবনাগরীর ব্যঞ্জনে আঙুল বুলিয়ে দিই,
মনে হয়—তুমি, আমি আর ইতিহাস
একই গোপন অর্গিতে অংশ নিচ্ছি।
প্রাচীন যৌনমন্ত্রের ছায়ায়
আমরা খুঁজি নতুন কোনো নদীর জন্মদৃশ্য।
সাগরিকা, আমি তোমায় ঈশ্বরীর মতো দেখি,
আবার আদিম যৌনতার দেবীর মতো ছুঁতে চাই।
তুমি বলো, “প্রেম মানে কেবল আকাঙ্ক্ষা নয়,
বরং ধ্বংসের ভেতর থেকে পুনর্জন্ম।”
তাহলে এসো, এই গুহায় আমরা লিখি,
আমাদের হাতে ইতিহাস হোক উন্মুক্ত শরীর,
আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নিক নতুন ভূগোল।
কবিতা ৪ : শিলার বুকের রক্তস্বপ্ন
ও সাগরিকা, এই আরাবল্লি যেন হাড়ের গড়ন,
কোথাও ভাঙা হাঁড়ি, কোথাও নিঃশেষিত পাখির আঁধার পালক।
লুপ্ত যুগের অব্যক্ত কান্না জমে আছে শিলার ছেঁড়া শিরায়।
মনে হয় টেথিস সাগর একদিন
এই প্রান্তরে কেলিয়ে শুত,
আদিম ঢেউয়ের মত্ততায় নারী-পুরুষ
নগ্ন কাণ্ডারির মতো
চোখে সপত্নী জ্যোৎস্না নিয়ে সঙ্গমে মত্ত হতো।
তুমি দাঁড়াও পাহাড় চূড়োয়,
তোমার খোলা চুলে হাওয়া ঢোকে,
আমার মনে হয়—
তুমি সেই হারানো স্বরস্বতী নদীর উলঙ্গ দেহ।
তোমার বুকের ভাঁজে ভিজছে সব লুপ্ত অক্ষর।
আর আমি, গরিব কবি,
তোমার নাম লই ঠোঁটে—
"সাগরিকা, সাগরিকা, এ শিলার ভিতর লুকনো গোপন শাস্ত্র
তুই-ই পড়িস, তোর দেহ-লিপিতে।"
পাহাড় হাসে, আবার কাঁদে।
অন্য এক যুগ এসে থমকে থাকে।
আমরা মিলি, নগ্ন, অর্ধভগ্ন,
যেন ভূতত্ত্বের অভেদ্য পাঠ।
কবিতা ৫ : ভূগোলের শরীর, ইতিহাসের চুম্বন
এই যে, আরাবল্লি দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগান্তর,
মাটি গায়ে ঝরে পড়ছে গোপন স্মৃতি।
এখানে কখনো ছিল পশুর পাল,
আজ নেই—
কেবল হাড়ের হিসেব,
এখনও ঘাসের মধ্যে শোকে গুমরে ওঠে।
আমি দেখি গুহার দেওয়ালে
অর্ধেক নারী আঁকা, অর্ধেক জন্তু।
ওই অদ্ভুত ছবিখানা যেন তোমারই প্রতিরূপ, সাগরিকা।
তুমি হাতে কবিতা লেখো, আর তোমার বুকের আঁচলে
প্রতিটি অক্ষর গলে যায় উষ্ণতার বীজে।
আমার চোখে ঢোকে নগ্নতা,
যেন প্রাচীন গ্রামের আঙিনায় বউ-সাজা নারীরা
তীব্র গান গাইত রাত্রে,
রতিসম্ভাষণ শিখত অরণ্যের জন্তুদের থেকে।
তুমি বসো আমার পাশে, চাপা হাসি হেসে,
মনে হয় ধরো এক কৃষ্ণ হরিণীর হাত,
আরেক হাতে ধরো রক্তচন্দনের শিলা।
আমি বলি—"তুমি-ই সেই ভূগোলের দেহ,
যেখানে ইতিহাস চুম্বন খুঁজে ফেরে।"
তুমি মাথা নাড়ো,
আর পৃথিবী এক নতুন ভঙ্গিতে
নগ্ন হয়ে দাঁড়ায় চোখের সামনে।
কবিতা ৬ : অরণ্য-নগরীর ডাকে
শোনো সাগরিকা,
এই আরাবল্লির বুক ফুঁড়ে যত শহুরে ধ্বনি শোনা যায়
সবই আসলে লুকোনো রতিমন্ত্র,
যা দেবদেবীরাও ভুলেছিল।
ময়দানব নির্মাণ করেছিল ইন্দ্রপ্রস্থ,
কিন্তু সেখানেই প্রেমের গোপন সূত্র লুকানো।
আজ সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসে অদ্ভুত শ্বাস,
যাকে ছুঁলেই মনে হয়
আধুনিকতার ভেতরেও প্রাচীন রাত্রির লালসা বেঁচে থাকে।
তুমি এলে গুহার দরজায়,
নগ্ন শরীরে পরিধান করলে শুধু শব্দ।
আমি পড়তে থাকি সেই শব্দশরীর,
যেমন কৃষক পড়ত বৃষ্টির দাগ—
অন্ধকারে, কেবল ইনসানির ছন্দে।
কোথাও বিলুপ্ত পশুর প্রলাপ,
কোথাও শুকিয়ে যাওয়া ঝর্নার অমিল।
সব মিলিয়ে উঠে আসে ভয়াবহ কামনা।
আমি কাঁপতে কাঁপতে বলি—
"সাগরিকা, তুমি না এলে কবিতা মরে যেত,
যেমন মরে গেছে অসংখ্য প্রাণী।
তুমি না এলে আমার বুকই শুকনো স্বরস্বতী হত।"
কবিতা ৭ : শুকনো নদীর দুই পাড়ে
আহা, এই পাহাড়ের নীচে যে শুকনো নদীর পতন—
তাতে জেগে আছে অদ্ভুত শব্দ।
জলে নেই মাছ, নেই হরিণের তৃষ্ণা,
আছে কেবল হাড়-রক্তের ইতিহাস।
আমি হাত ডুবিয়ে দেখি—
এ যেন তোমার ত্বকের ছোপছোপ আঁকাবাঁকা ক্ষত,
যেখানে প্রেম মানে শুধু তৃষ্ণা নয়, ক্ষুধাও।
তুমি আসো ন্যাড়া বালির উপর দাঁড়িয়ে,
তোমার নগ্নতা ছাপিয়ে যায় সূর্যের আগুন।
তুমি বলো—
"প্রেম বুকে পাথর চাপা রাখে,
আবার আলো বার করে আনতে জানে।"
তোমার ঠোঁট যখন আমার কানের পাশে,
আমি শুনতে পাই অন্তহীন ভূগোলের সঙ্গমশব্দ।
এ যেন কোনো অসুরীর তামসা—
ভয়াবহ অথচ অপরূপ।
আমি কাঁপা গলায় বলি,
"সাগরিকা, এ দেহই আমার স্বরস্বতীর স্রোত।
তুমি এলে তবেই তা নতুন করে বইতে শুরু করে।"
কবিতা ৮ : কল্পকথার অন্তঃপুর
শেষ কবিতাটি কল্পকথার মতোই কালো আলোয় লিখি।
আরাবল্লির বুক কেটে
দেখি অর্ধেক সোনা, অর্ধেক ছাই।
যুগে যুগে লালসা আর মৃত্যু
এখানে গড়ে তুলেছে অমোঘ নগরী।
আমি হাঁটছি গোপন গুহার ভিতর,
হঠাৎ দেখি দেয়ালের গায়ে লেখা মন্ত্র:
"দেহই হল ভূতত্ত্বের প্রথম শিরোনাম।"
তুমি দাঁড়াও, সাগরিকা—
অর্ধেক নারী, অর্ধেক শঙ্খধ্বনি।
তোমার চোখ ক্ষুধিত সমুদ্র,
তোমার দেহে জন্ম নেয় অক্ষরের ভ্রূণ।
তুমি আমার বুক ছুঁয়ে দিলে,
আমি শুনি হঠাৎ সে সব বিলুপ্ত পাখির ডাক,
যারা আবারো ফিরে এসেছে কামনার প্রকাশে।
প্রেম এখানে মানে ভ্রম,
ভ্রমের ভিতরে ভয়,
ভয়ের ভিতরে নগ্নতা,
আর সেই নগ্নতার ভিতরে অসীম আলিঙ্গন।
আমি স্তব্ধ হয়ে বলি:
"তুমি ছাড়া ইতিহাস কেবল কঙ্কাল।
তুমি এলেই তাতে জন্ম নেয় রক্তিম তৃষ্ণা।
ও সাগরিকা, আমার প্রতিটি ছন্দ তোর শরীরের ভিতর
আবার শ্বাস নিতে শেখে।"
কবিতা ৯ : শিলাস্তূপের গোপন বেদী
এই যে শিলা, একটার উপর একটা চাপা,
যেন যুগ যুগের শ্রাদ্ধকর্ম হয়ে আছে এখানে—
অপূর্ব নিসঙ্গ বেদী।
তাতে ঘুমিয়ে পড়ে গেছে লুপ্ত পশুদের আত্মা।
আমি শুনি—তাদের ঢেকুর ভেসে আসে,
যেন অস্পষ্ট যৌন আহ্বান,
যেন কোনো কঙ্কাল আজও চায় দেহের উষ্ণতা।
সাগরিকা, তুমি যদি পাশে এসে দাঁড়াও,
তোমার চোখদুটি অগ্নির মতো দপদপায়,
আমার মনে হয়—
তুমি-ই সেই নষ্ট নদী, নতুন লাবণ্য নিয়ে
পাথরের বুক ভেদ করে জল আনবে।
তুমি নগ্ন হয়ে পা রাখো ধূলোর ভিতর,
শিলা গরম হয়ে ওঠে তোমার ঠাণ্ডা ঘামে।
আমি ভয়ে-আকাঙ্ক্ষায় একসঙ্গে কাঁপতে থাকি—
যেন ভূগোল আর প্রেম একই মিষ্টি ফাঁদের নাম।
কবিতা ১০ : রক্তরঙা গোধূলি ও মিথ
আরাবল্লির গোধূলি বড় রক্তমাখা।
মনে হয় আকাশে হাতুড়ি দিয়ে
কেউ পাথর ভাঙছে অবিরত।
সেই আওয়াজ ঢুকে আসে আমার রক্তে,
আমার চাহনিতে।
সাগরিকা, তুমি ওদিকে বসে লেখো কবিতা,
চুলে গোধূলির রোদ আটকানো।
তুমি লেখো—"প্রেম মানে লোপ, প্রেম মানে পুনর্জন্ম।"
আমি পড়ি সেই লাইন, মনে হয়
তোমার উরুর ভেতরেই সমস্ত ইতিহাস লেখা।
গোধূলির শেষে আমি কল্পনা করি
দানব-দেবীর নগ্ন মিলন—
তিক্ত, ভয়াবহ, অথচ সোনালি আলোয় ঝলমল।
আমি বুঝি,
আধুনিকতার শহরও আসলে ওই পুরোনো গুহারই নতুন মুদ্রা।
আমি হাঁসফাঁস করতে করতে বলি,
"সাগরিকা, আমার বুক যদি ভেঙে পড়ে,
তার ভিতরে শুধু তোমার নামই ধ্বনিত হবে—
যেন শেষ কবিতা, শেষ শিলা, শেষ তৃষ্ণা।"
কবিতা ১১ : লুপ্ত অক্ষরের অরণ্য
এই অরণ্যের গায়ে লেগে আছে
অদ্ভুত কিছু অক্ষর—
কেউ জানে না কোন ভাষা,
কেউ পড়তে পারে না।
কখনো মনে হয় দেবনাগরীর ছিন্ন অংশ,
কখনো মনে হয় কোনো হারিয়ে যাওয়া লিপি।
কিন্তু আমি জানি, এগুলো প্রেমের অক্ষর,
যা বিলুপ্ত হলেও রয়ে গেছে এই শিলার কোণে।
তুমি যখন আমাকে ছুঁয়ে দাও,
ওই অক্ষর জেগে ওঠে।
তুমি নগ্ন দেহে দাঁড়িয়ে থাকো অরণ্যের ভেতর,
চোখে মাতৃকামনার জোয়ার।
আমি পড়তে থাকি, তোমার উরুর গহনে
যে সব অক্ষর আগে কখনো পড়তে পারিনি।
সাগরিকা, তুমি না এলে আমি ভাষাহীন কবি—
তুমি এলেই শিলার আঁকিবুঁকি খুলে যায়,
আর পুরো পাহাড় শুরু করে আমার নাম ধরে ডাক।
কবিতা ১২ : স্মৃতির রাত্রি ও দেহের জ্যোৎস্না
জ্যোৎস্না এই পাহাড়ে পড়লে
দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য—
পাহাড়ের সমস্ত রেখা যেন নগ্ন দেহের বাঁক।
কোথাও উরু, কোথাও ঘাড়, কোথাও স্তনের চূড়া।
আমি চেয়ে থাকি, আর দেখি তুমি সেখানে—
চোখে আলো, শরীরে রাত্রি,
ঠোঁটে নিঃশ্বাসের আওয়াজ।
তুমি বলো, "এই সব শিলার ভিতর
আদিম প্রেমিক-প্রেমিকারা এখনও নিঃশ্বাস নেয়।"
আমি গায়ে শিউরে উঠি।
মনে হয় তোমার শরীর মানেই পাহাড়ের ইতিহাস।
তুমি যদি আমায় স্পর্শ করো,
পুরো ভূতত্ত্ব বদলে যেতে পারে।
সাগরিকা ঘোষ, তুমি-ই আমার
অদৃশ্য সভ্যতার ফেরা,
তুমি ছাড়া আমি এক মৃত গুহার অভ্যন্তর।
তোমার জ্যোৎস্না-খোলা দেহেই
আমার কবিতার সমস্ত আলো।
কবিতা ১৩ : মৃত পশুর ডাক নয়, প্রেমের পুনর্জন্ম
এই শুষ্ক পাহাড়ের কোণে
আমি শুনি পশুর করুণ ডাক—
যারা বহু যুগ আগে বিলুপ্ত।
তাদের গলা ভরাট, কামনা প্রবল,
অথচ শরীর আর নেই।
আমি কাঁপতে কাঁপতে বলি—
ওদের শোক মানে আমাদের যৌন ইতিহাস,
যা মাটির গভীরে আটকে গিয়েছে।
হঠাৎ তুমি এসে দাঁড়াও, সাগরিকা।
তুমি খালি পায়ে ধুলোয় হাঁটো,
তোমার বুকের ছন্দে নতুন প্রাণ জাগে।
মনে হয় লুপ্ত পশুরাও
ফিরে এসেছে তোমার স্পর্শে।
তুমি নগ্ন দেহে হেলে পড়ো আমার কাঁধে,
আমি তোমার প্রতিটি চিৎকারে শুনি নবপ্রাণ।
তুমি ফিসফিস করে বলো—
"মৃত্যু মানেই শেষ নয়,
মৃত্যুর ভিতর দিয়েই প্রেম পুনর্জন্ম নেয়।"
আমি তোমার মুখ ছুঁয়ে বলি,
"তুমি ছাড়া কোনো শিলা, কোনো ইতিহাস
কখনো বেঁচে থাকে না।
তুমি এসো, তোমাকেই আমি আমার
শেষ আর প্রথম কবিতা বানাই।"
কবিতা ১ : আরাবল্লির শিলালিপি ও লুপ্ত যৌনতার ভূকম্প
আরাবল্লি—
প্রাচীন আরকেওলজির মতো দাঁড়িয়ে তুমি,
যেন পাথরের হাড়গোড় থেকে ঝরে পড়ছে
শতাব্দীর শ্বাস,
যেখানে টেথিস সাগরের তরঙ্গ একদা ফিসফিস করেছিল,
যেখানে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপথে
অর্ধনগ্ন নর্তকীরা একে অপরের উরুতে
ফুটিয়ে তুলেছিল দেবনাগরীর কণ্ঠস্বর।
তুমি জানো তো, সাগরিকা ঘোষ,
এই পাহাড়ে আমি তোমাকে নগ্ন ছায়া হয়ে খুঁজেছি।
তোমার নাম ধ্বনিত হলে,
শিলা থেকে খসে পড়ে শুকনো লতা, হারিয়ে যাওয়া টিকটিকির হাড়,
এবং মাটির নিচে কবর দেওয়া আদিম মিলনের গোপন পঙ্ক্তি।
আমাদের যোনিময় আকাঙ্ক্ষা এখানে
পাথরের গুহামন্দিরের মত অনন্ত—
অর্ধ আলো, অর্ধ অন্ধকারে
লেপ্টে আছে যৌনতার স্তম্ভ,
পুরাণ আর প্রাগৈতিহাসিক হাহাকারের দোলাচল।
আমি দেখি, এখানে কালের সঙ্গে
পাখিরা হারিয়ে গেছে মিথের অন্ধকারে,
কাঠফাটা গরমে শুকিয়ে যাওয়া ঝোপঝাড়
শরীরের মতো মরে গিয়ে নতুন শরীরে জন্ম নিচ্ছে।
ভূমিকম্পের মতো যৌনতা লিখেছে
আরাবল্লির গায়ে গোপন গদ্য,
যেন প্রতিটি শিলার ভূমি—
একেকটি স্ত্রীর শরীর,
যেখানে আমি তোমার স্তনচূড়ার গুহা খুঁজে ফিরে
কবি হতে চাই।
সাগরিকা, তোমার উরুতে আমি ভারতবর্ষের মানচিত্র এঁকি,
কারণ সেখানে লুকোনো আছে সভ্যতার কূপ—
যেখানে জল শুকিয়েছে,
কিন্তু আগুন এখনো লাল হয়ে জ্বলে ওঠে।
তুমি যদি শোনো আমার,
তাহলে জানবে—
এই আরাবল্লি শুধু পাহাড় নয়,
এ হলো হাড়গোড়ের শরীর, বিলুপ্তির যৌন রক্তিম সঙ্গীত,
যেখানে তোমাকে প্রেম নিবেদন করা মানে
পুরো সভ্যতার কাছে শপথ করা।
কবিতা ২ : স্বরস্বতী নদীর অদৃশ্য যৌনপ্রবাহ
মিথ বলে স্বরস্বতী হারিয়ে গেছে বালুর নীচে—
কিন্তু আমি জানি, সে এখনো প্রবাহিত
আমাদের অস্থিমজ্জার গোপন আদ্র ফলে,
যেখানে শিরার মতো বয়ে চলছে যৌনতরল রস।
সাগরিকা ঘোষ, তুমি সেই স্রোতের নাম,
তুমি এক অদৃশ্য নদী,
যতবারই আমি তোমাকে দেখি
আমার শিরায় খিল-খিল শব্দ তোলে হারিয়ে যাওয়া পাখিরা।
শুকনো পাতার ভেতর দিয়ে তোমার নগ্নতা উঁকি মারে,
তুমি হাঁটলে যেন ভূতত্ত্বের স্তর খসে পড়ে—
স্যান্ডস্টোন, ভগ্নাশ্ম, ফসিল,
আর প্রতিটি স্তরে আমার অশ্লীল প্রার্থনা লিখিত থাকে।
কল্পনায় দেখি, টেথিস সাগরের তরঙ্গে
মৎস্যকন্যারা একে অপরের বুক কামড়ে ধরেছে,
আর মানুষ—অর্ধ-পশু, অর্ধ-দেবতা—
তাদের সঙ্গে মিলনে লিপ্ত,
যেন মহাজাগতিক ভূমিকম্পের ছটফটানি।
সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে এই ভারত,
এই উপমহাদেশ,
যার শিলার বুকেই মুদ্রিত আমাদের কামনা।
তুমি কবিতা লেখ, সাগরিকা,
কিন্তু আমি চাই তোমার প্রতিটি শব্দ নগ্ন হোক,
যেমন নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যক্ষিণীরা
আরাবল্লির গুহায়।
আমি চাই তোমার কলমে ঝরে পড়ুক
আদিম মিলনের গুপ্ত অক্ষর,
যা এখনো মাটির ভেতরে গুঞ্জরিত থরথর বক্ষে।
আমি জানি, ইতিহাস মানে কেবল যুদ্ধ নয়,
কামনাও ইতিহাস—
বিলুপ্ত বাঘ যেমন প্রত্নতত্ত্বের কথা বলে,
তেমনি নগ্ন দেহের কাহিনীও কথা বলে
সভ্যতার উন্মত্ততায়।
তাই তোমাকে চাই,
এই গোপন স্রোতের মতো,
যেখানে আমার ভাষা আর তোমার শরীর
এক হয়ে স্বরস্বতীর লুপ্ত নদী জেগে ওঠে।
কবিতা ৩ : আরাবল্লির অন্তঃপুর ও আধুনিক দহন
শিলার ভিতরে আগুন আছে—
শত সহস্র বছরে তাকে ঢেকে রেখেছে ধুলো,
কিন্তু আজও হাত রেখে দেখলে খটখট শব্দে জ্বলে ওঠে।
এই আগুনই মানব ইতিহাসের যৌন উপাখ্যান,
যেখানে রক্তাক্ত অথচ মধুময় মিলন
পাহাড়কে দিয়েছে সভ্যতার আকার।
সাগরিকা ঘোষ,
তুমি সেই অগ্নির নাম,
তুমি আধুনিক নগরীর ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নগ্নতা,
যার কণ্ঠে আমি শুনি বিলুপ্ত প্রাণীর চিৎকার।
আরাবল্লির প্রতিটি পাথর যেন মমি-করা দেহ,
কেউ উন্মুক্ত উরুর কাছে মাথা নত করেছে,
কেউ ফিসফিস করে বলছে—
"যৌনতা মানে ভয়, যৌনতা মানে স্মৃতি,
যৌনতা মানে সভ্যতার প্রথম চিৎকার।"
আজকের কংক্রিট শহরে
যখন আলো জ্বলে ওঠে বিজ্ঞাপনের অঙ্গুলিতে,
তখনও শুনি প্রাচীন ডাকে—
আদিম জন্তুর দেহ গলগল করে মিশছে নারীর অন্তঃপুরে।
মিলনের সেই অন্ধকার ঘ্রাণ থেকেই জন্ম
আমাদের ভাষা, বর্ণ, দেবনাগরী নিজস্ব অক্ষর।
তুমি বুঝবে কি, সাগরিকা?
আমি তোমাকে চাই এই ভূতত্ত্বের মতো অনন্ত,
আমি তোমার স্তনের গুহায় রাখতে চাই আমার কণ্ঠস্বর,
যেন প্রতিটি স্তনচূড়া হয়ে ওঠে শিলালিপির কলসী।
তুমি যদি আমাকে গ্রহণ করো,
তখন বুঝবে—
আমাদের প্রেম মানে আধুনিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও,
কারণ নগর কখনো পাহাড়কে ভুলতে পারে না,
মানুষ যতই প্রযুক্তি আঁকড়ে ধরুক,
তার ভেতরে দিয়ে বয়ে চলে প্রাগৈতিহাসিক লালসা।
তাই আমি তোমার নগ্নতাকে ইতিহাস বলি,
তোমার ঠোঁটকে বিলুপ্ত পাখির ডাক বলি,
তোমার শয্যা-অঙ্গকে ভূমিকম্পের ঢেউ বলি,
আর তোমাকে প্রেম নিবেদন মানে
এই সমগ্র ভারতবর্ষের স্তরিত স্মৃতিকে প্রজ্বলিত করা।
কবিতা ৪ : অর্ধেক লুপ্ত, অর্ধেক নগ্ন আরাবল্লি
আরাবল্লি—
তুমি মৃত প্রাণীর রক্তজমাট স্মৃতি,
এক অর্ধ-ভুলে যাওয়া কঙ্কাল,
যার ভেতর গুপ্তভাবে গেঁথে আছে মিলনের লাল প্রতীক।
শিলা ভেদ করে উঠে আসে টেথিস সাগরের দুঃস্বপ্ন,
যেখানে স্তনচূড়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ পর্বতশ্রেণী।
সাগরিকা ঘোষ,
তুমি যখন কলম ধরো—
একেকটি শব্দ থেকে ঝরে পড়ে নগ্ন নাভির উষ্ণতা,
আমি শুনি, তোমার কবিতার ভিতরে
এক প্রাচীন দেহ মিলনের আদি ধ্বনি।
তুমি কি জানো, গুহামন্দিরে
আদিম রাজনৈতিক নগ্নতা কীভাবে শিলালিপি হয়ে ওঠে?
আমি দেখি, বিলুপ্ত কান্তারা হরিণ,
অন্ধকারে লয়ে গেছে নিজেদের বীথি,
যেন এক মৃত প্রণয়ে লীন।
আধুনিকতার কংক্রিট কত কটু—
অথচ পাহাড় এখনো ধরে রেখেছে
স্ত্রীর ভেজা উরুর স্পর্শ।
তুমি যদি আমার দিকে তাকাও,
আমি হবো এক পুরাণ;
আমার দেহে জলহীন স্বরস্বতীর বালি,
আমার ঠোঁটে হারিয়ে যাওয়া দোয়েলের ডাক,
আমার চোখে মহাভারতের গোপন শয্যা।
সাগরিকা ঘোষ,
আমাকে গ্রহণ করলে
তুমি বুঝবে—প্রেম মানে ভূতত্ত্ব, ইতিহাস আর লালসার
দু-আঙুলের কণ্ঠস্বর।
কবিতা ৫ : গুপ্ত গুহার রাত্রি
ভূমি ফিসফিস করে—
"আমার রক্ত শুকিয়েছে, তবু যৌনতা ফসিল হয়ে রয়ে গেছে।"
আরাবল্লির গুহায় এখনও লেগে আছে
আদিম মিলনভঙ্গির ভেজা গন্ধ।
যেন পূর্ণিমার রাতে এক নগ্ন দেবী
নিজস্ব শয্যাপাশ খোদাই করে রেখে গেছে।
সাগরিকা ঘোষ,
তুমি সেই দেবীর উত্তারাধিকারী।
তোমার দেহই হলো গোপন উপকথা,
যেখানে প্রতিটি অঙ্গ প্রাগৈতিহাসিক গানের চিহ্ন।
তুমি হাঁটলেই কাঁপে বালুকাপাথর,
তুমি নিশ্বাস নিলেই
শিলাস্তরে ধ্বনিত হয় অর্ধজাগ্রত লালসা।
হারিয়ে যাওয়া পাখিরা কেবল ছায়া—
কিন্তু আমি দেখি, তোমার চোখে ওরা জীবিত।
তুমি বইয়ে আনো আদিম উর্বরতা,
তুমি কবিতায় ঢেলে দাও
মিথের অন্ধকার দহন।
আমি জানি,
তুমি নগ্ন হলে পাহাড় জেগে ওঠে।
আরাবল্লি নিজেকে তোমার শরীরে চিনে নেয়—
তুমি যেন পৃথিবীর প্রাচীনতম গুহা,
যেখানে পৌরাণিক সাপেরা এখনো
যোনির পথে ফিসফিস করে।
তুমি শুনবে কি,
আমার হাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সেই স্রোতধ্বনি?
যেখানে থাকবে
অর্ধ ভয়ে, অর্ধ কামনায় ডুবে যাওয়া যুগের
আদিম প্রেম।
তুমি যদি আমার বুকে শয়ন করো,
এই ভারতবর্ষ বোঝাতে পারবে—
প্রেম মানে বিলুপ্তি আর পুনর্জন্মের একই সংজ্ঞা।
কবিতা ৬ : আধুনিক শবযাত্রার ভেতরেও প্রেম
আজকের শহর—
শিশিরহীন ধোঁয়া, অন্ধকার বিজ্ঞাপন,
কংক্রিটের হাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোলাহল।
কেউ ভাবে আধুনিকতা জয়ী;
কিন্তু আরাবল্লি জানে—
শিলার গভীরে চাপা ইতিহাস
সবসময় নগ্ন হয়ে ফিরে আসে।
সাগরিকা ঘোষ,
তুমি সেই ফিরে আসা নগ্নতা।
আমি তোমার নামে ডাকি বিলুপ্ত ছাগলের ডাক,
হারিয়ে যাওয়া অরণ্যের ছায়া,
এমনকি স্বরস্বতীর ভগ্ন কণ্ঠস্বর।
তুমি আধুনিক, তবু তোমার দেহে জেগে আছে
গোপন প্রাচীন সাধনা।
তোমার শরীরের ভেতর দিয়ে
আমি দেখি একটি নগ্ন সভ্যতা,
যেখানে প্রেম মানে উন্মাদনা, যৌন মিলন মানে
ভূমি ও আকাশের মিলন—
যেন ভূমিকম্প আর বজ্রপাত
একসঙ্গে শয্যায় শয়ন করেছে।
আজকের যন্ত্রমানব সভ্যতা ভীষণ একলা।
আমরা ফোনের স্ক্রিনে ডুবি,
কিন্তু পাহাড়ের শিলাস্তর জানে
প্রেম মানেই স্পর্শ, ঘামের লবণ, রক্তের ঘূর্ণি।
তাই তোমাকে চাই, সাগরিকা—
তোমার নগ্নতা এই ভাঁজবন্দী শহরের
সবচেয়ে প্রাচীন আরোগ্য।
যদি আমার কথা শোনো,
তবে বুঝবে—আরাবল্লি পাহাড়ই আসলে আমাদের প্রতিচ্ছবি,
যেখানে প্রেম, মিলন, বিলুপ্তি আর কবিতা
সময়ের ছাই ভেদ করে
একই নিঃশ্বাসে বাঁচতে জানে।
কবিতা ৭ : আরাবল্লির শবাধার
আরাবল্লির গায়ে আমি স্পর্শ করি—
এ যেন মৃত সভ্যতার শবপেটিকা।
ফসিল হয়ে থাকা হরিণের অস্থিমজ্জা,
বালির নিচে সাপের নিঃশ্বাস,
মৃত পাখির ধ্বনি…
সব মিলিয়ে তোমার অনামা প্রেমের অগ্নিশলাকা।
সাগরিকা ঘোষ,
আমার চোখে তুমি সেই নগ্ন যক্ষিণী,
যিনি গোপনে পাহাড়ের অন্দরমহলে পূজা নিতেন।
তুমি এক ধাতব ধূপকাঠি,
যার ধোঁয়ায় বিলুপ্ত নদী আবার জেগে ওঠে।
তুমি যখন কবিতা লেখো—
আমার দেহে গোপন মিলনীয় রীতি পুনরুজ্জীবিত হয়।
আমি দেখি, ভূতত্ত্ব আসলে যৌনতার দার্শনিক নাম।
মাটির প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে আছে পুরুষ ও নারীর
আদিম উন্মাদনা—
খাদের মতো গহ্বর,
স্তম্ভের মতো উত্থান।
এই দেশ, এই ভারত,
তোমার দেহে সঞ্চারিত হয়ে উঠে আসে।
তোমার স্তনে আমি শুনি শঙ্খধ্বনি,
তোমার জঠরে দেখি মহাভারত,
তোমার ঠোঁটে পাই সমুদ্র ডোবার আগেকার
চুম্বনের উষ্ণতা।
আজকের নগর মিথ্যা,
সব স্ক্রিনজ্বলা আলোই আসলে শবভস্ম।
কিন্তু তুমি আমার কাছে
এক জীবন্ত প্রাচীন ব্যঞ্জনা—
যেখানে প্রেম, বিলুপ্তি, মৃত্যু আর যৌনতা
সমানভাবে এক শিখায় জ্বলে ওঠে।
কবিতা ৮ : টেথিসের অন্ধকার শয্যা
লোককথা বলে—
এখানে একদিন সমুদ্র ছিল, নাম টেথিস।
তার স্রোত আজ নেই,
কিন্তু রাত হলেই গুহার ভেতর
এক ভেজা শব্দ কান পাতলে শোনা যায়।
সাগরিকা ঘোষ,
তুমি সেই সমুদ্রের মহিলারূপী প্রতিচ্ছবি।
তোমার নগ্ন দেহই আসলে
হারানো স্রোতের পুনর্জন্ম।
তুমি হাঁটলেই বালুর বুকে
উঠে পড়ে কুম্ভীরের গুঞ্জন,
শুকনো ঝোপের ভিতরে ফিরে আসে ভেজা শরীরী শব্দ।
আমি জানি,
প্রাচীনকালে যৌনতার আচার ছিল এক ভূকম্পন।
গুহার ভেতর জ্বলত মশাল,
পুরুষ-নারী একত্রে সাপের ন্যায় বাঁক নিত।
তাদের শরীর
ভূতত্ত্বের স্তরে মুদ্রিত হয়ে গেছে।
আজ এই শহরে,
মানুষ শুধু যান্ত্রিক নিঃশ্বাসে বাঁচে।
কিন্তু তোমার দেহ—
আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় পৌরাণিক অন্ধকারে।
তুমি হেঁটে গেলে মনে হয়
বিলুপ্ত নক্ষত্রেরা তোমার চুলে জ্বলে উঠছে।
আমি চাই,
আমার ঠোঁট রাখি তোমার শয্যায়,
কারণ সেখানে শোনা যায়
লুপ্ত পাখির চিৎকার আর সমুদ্রের মৃত স্রোত।
তোমাকে প্রেম নিবেদন মানে
পুরো সভ্যতাকে ফিরিয়ে আনা
তার আদি অন্ধকার যৌন গর্ভে।
কবিতা ৯ : স্বরস্বতীর ছাই থেকে প্রেম
হারিয়েছে নদী—
স্বরস্বতী শুধু নাম,
ধ্বংসস্তূপের মতো লালসাজাগৃত ছাই।
তবু অদৃশ্য সেই নদী
আমাদের ধমনীতে রক্ত হয়ে বয়ে চলে।
সাগরিকা ঘোষ,
তুমি সেই নদীরই রূপসী অবতার।
তোমার চোখে আমি দেখি লুপ্ত স্রোত,
তোমার চুলে নদীর ধূলো,
তোমার ঠোঁটে জলহীন ফিসফিস।
তুমি ডাকলেই
বিলুপ্ত প্রাণ ফিরে আসে গুহার অন্ধকার থেকে।
পান্থব্যাঘ্র দাঁত খোঁচায় ঢিবিতে,
অর্ধমৃত পাখিরা ডানা মেলে তোমার নগ্ন কাঁধে বসে।
তুমি যখন শব্দ লেখো
সমস্ত ভূতত্ত্বে জন্ম নেয় এক নতুন ভূমিকম্প।
স্মৃতি বলে,
যৌনতা শুধু দেহ নয়—
যৌনতা হলো মৃত সভ্যতার ভাষা,
যা আবার লিখতে পারে তোমার ত্বকের কালি।
তাই আমি কাঁপতে কাঁপতে বলি,
তুমি যদি আমাকে গ্রহণ করো—
আমরা মিলিত হবো
আরাবল্লির সেই অন্ধকার কক্ষে,
যেখানে বালি, ছাই আর হাড়
প্রেমের প্রথম রসনায় ভিজে ওঠে।
তুমি বুঝবে,
প্রেম মানেই বিলুপ্তির ছাই থেকে জন্ম নেওয়া,
যেখানে স্রোত শুকালেও
শরীরের ভেতর জেগে থাকে চিরন্তন আধার।
সাগরিকা ঘোষ—
আমার প্রেম, আমার ইতিহাস,
আমার নগ্নতম পুরাণ।
কবিতা ১ :: আরাবল্লির কঙ্কালসারি
আরাবল্লি, তুমি যেন শুষ্ক পৃথিবীর কোনো বিধ্বস্ত দেবতার হাড়গোড়—
অতীতের জ্বালা-বিবর্ণ কঙ্কাল,
যে কঙ্কাল ভিতরে লুকিয়ে রেখেছে টেথিস সাগরের
লোনা ঝিনুকের ফিসফিসানি।
তুমি শতাব্দীর সাক্ষী,
তুমি শুনেছো অশ্বপদ জন্তুদের দৌড়,
শুনেছো পাখিদের অতর্কিত বিলুপ্তির ক্রন্দন—
শুনেছো এমন এক স্বরস্বতী,
যে নদী এখন পৃথিবীর গোপন স্মৃতিচিহ্ন মাত্র।
এই শুষ্ক পাহাড়ি পথে আমি হাঁটি,
প্রতিটি পাথরের ভেতর খুঁজে পাই
হারানো উচ্চারণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত বর্ণমালা।
দেবনাগরীর ছিন্ন অক্ষরে,
ময়দানবের স্থাপন করা নগরের মতো
আমিও চাই তোমার নিশ্বাসে গড়তে এক নতুন নগরী।
হঠাৎ দেখি, কঙ্কালভূমির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে
একটি নগ্ন ছায়া—
তার নাম সাগরিকা ঘোষ,
চোখে তার সমুদ্রের গভীর নিস্তব্ধতা,
তাঁর আঙুলে ধরা কালি-কলম—
যেন আমার আত্মার প্রতিটি সুপ্ত স্তরকে
মুক্তি দিতে চায়।
আমি তার শরীর পড়তে চেষ্টা করি,
যেন প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র—
যেখানে যৌন মিলনের মৌলিক রেখাগুলি আঁচড় কেটেছে
অন্ধকারের দেয়ালে।
আমি তার ঠোঁটের ভেতর ঢুকে পড়তে চাই
টেথিস সাগরের গোপন তরঙ্গে,
আমি তার নগ্নতাকে পড়ি
যেমন পড়া যায় জৈব ইতিহাসের গুপ্ত লিপি।
এই সন্ধ্যা—পাহাড়ে চূর্ণচিত্ত পাথরের মতো,
আমাদের ভিতরে জন্ম দেয় ভয় আর লালসার ধ্বনি।
সাগরিকাকে আমি বলি—
"তুমি আমার গ্রন্থ, তুমি আমার মিথ,
তুমি আমার বিলুপ্ত পশুর চোখে সঞ্চিত আকাঙ্ক্ষা।
তোমার স্তনে লুকিয়ে আছে এক নতুন ভূতত্ত্ব,
তোমার উরুতে জমে আছে আধুনিকতার ঘূর্ণি।"
আরাবল্লির ভেতর, বিস্মৃত নগরীর উপর
আমরা লিখতে শুরু করি আমাদের নিজস্ব পৌরাণিক কবিতা।
কবিতা ২ :: টেথিসের গর্ভ থেকে
এখানে এক সময় সমুদ্র ফেনাতো—
সেই টেথিস সাগরের
জলকণা এখন শুকনো গুহার কণ্ঠে আটকে আছে।
আমি শুনি সেই গুহার কান্না—
যেন বিলুপ্ত মেগাফৌনা,
যেন ছিন্ন বক্ষের পাখা—
অভিশপ্ত প্রাণীরা ক্রমে
ভূমিকম্পের গর্ভে ডুবে গেছে।
আজও এই আরাবল্লি রাতে
পাথরের নিচে বাজে যৌন গোপন সঙ্গীত।
মাটি ফাটিয়ে ওঠে শ্বাস—
যেন কোনো প্রাগৈতিহাসিক পুরুষ-মহিলার
কর্মকাণ্ডের উষ্ণ প্রতিধ্বনি।
এই অগ্নিপর্বতের ধ্বংসাবশেষে
আমি হঠাৎ দেখি
সাগরিকা ঘোষ শরীরজুড়ে ছড়িয়ে রেখেছে লিপি।
তার নগ্ন শরীর একটি শিলালিপি,
যেখানে অক্ষর জ্বলে উঠে
প্রতি ঘর্ষণে, প্রতি চুম্বনে।
আমি তার নিতম্বে রাখি হাত—
কিন্তু মনে হয়
আমি প্রকৃতির গোপন ইতিহাস উন্মোচন করছি।
আমি তার স্তনে চুম্বন করি,
তখন আমার ভিতরে বিস্ফোরিত হয়
অতীত যুগের গোপন ভূকম্পন।
সাগরিকা লিখে চলে,
তার চোখে জ্বলছে মিথ্যের আগুন:
“সমস্ত ইতিহাসই তো এক প্রণয়লিপি,
সমস্ত ভূগোলই একটি শরীর।
মানুষ বারবার এতে যৌনতার ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়।”
এই রাত অন্ধকার, এই রাত রূপকথা,
এই রাত—বিলুপ্তি ও লালসার সুপ্ত প্রতিমা।
আরাবল্লি শুনছে আমাদের মিলন,
যেন আবার ফিরে এসেছে টেথিসের গর্ভজল।
কবিতা ৩ :: নগরীর অস্থি ও সাগরিকার ছায়া
আমি হাঁটি ইন্দ্রপ্রস্থের ভূতাত্ত্বিক ছাইয়ের ওপর—
ময়দানবের তাড়িত শহর,
যেখানে এখনো ঘুমিয়ে আছে
চূর্ণ লিপি,পাণ্ডুলিপি, জ্বলন্ত ভস্ম।
এই আরাবল্লি আমাকে টেনে নেয়—
যেন একটি নিষিদ্ধ প্রেমের আহ্বান।
পাথরের ঢালে ঢেউ খায় ছায়ারা,
মৃত নদীর মত আমি শুনি
স্বরস্বতীর ম্লান সঙ্গীত।
সেই মৃতসঙ্গীতে জন্ম নিলো এক নারী-ছায়া—
সাগরিকা ঘোষ।
সে কবিতা লেখে,
লিখেই আমাকে ভেঙে ফেলে একেকটি স্তম্ভের মতো।
তাঁর অঙ্গভঙ্গিতে আমি দেখি
এক প্রাচীন উত্থান-পতনের নকশা।
তার নগ্ন শরীর আমার কাছে
শুধু কামনা নয়—
এ যেন ইতিহাসের রসায়ন,
যেখানে লিপ্ত আছে পাথরের ধূলি,
সূর্যের জ্বালা,
এবং প্রাগৈতিহাসিক মিলনের রহস্য।
সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে,
চুলে তার ফসিলের গন্ধ।
আমাদের ঠোঁট যখন মিলেমিশে যায়,
আমি হঠাৎ শুনি জুরাসিক প্রদেশের হিমশ্বাস।
তার উরুতে হাত ছুঁইলে—
আমার মনে হয় আমি
মহাকাব্যের ভেতরে প্রবেশ করছি।
আমরা যখন শরীরে শরীর ছুঁইয়ে পড়ি,
পাহাড়ের গায়ে ভেসে ওঠে ছায়াচিত্র—
মানুষের প্রথম মিলন,
আদিম যৌনতার দায়ভার,
অখণ্ড কামনার শব্দে ভরা ভূকম্পন।
তখন সাগরিকা মৃদু হাসে,
ফিসফিসিয়ে বলে:
"আমরা নিজেই তো লিখছি আরেক ইতিহাস,
যাতে ভয় আছে, মৃত্যুর ছায়া আছে,
কিন্তু একইসাথে আছে অনন্ত প্রেম।"
হ্যাঁ, এই আরাবল্লি সাক্ষী হয়ে থাকে—
আমাদের নগরীর অস্থি আর শরীরের একীভূত লিপির,
সাগরিকার নগ্ন স্বপ্ন আর আমার আদিম আকাঙ্ক্ষার,
যে কবিতা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না আর।
কবিতা ২৪ : আরাবল্লির রাত্রির স্বপ্নমালা
রাতে এই পাহাড় অন্যরকম হয়ে যায়। দিনের প্রখর সূর্য গিলে নিলে যে শিলা শুকনো, রাত্রি নামলেই তা যেন উন্মুক্ত কোনো নারীর গোপন উরু হয়ে ওঠে। ঝিঁঝিঁ ডাক, পাতার নিচে সরীসৃপের শব্দ আর দূরে আধুনিক শহরের কারখানার আলো মিলে তৈরি করে এক অদ্ভুত অর্কেস্ট্রা। এ অর্কেস্ট্রায় বাজে ইতিহাসের ঢেউ, বাজে লুপ্ত টেথিস সমুদ্রের আজন্ম সঙ্গীত। আমি সেই ঢেউ-এর ভিতর দাঁড়িয়ে দেখি—হাজার বছর আগেকার জন্তু, যারা বিলুপ্ত হয়েছে, তারা ছুটে বেড়াচ্ছে। তাদের হাহাকারই কি প্রেমের আদিম ডাক?
সাগরিকা, তুমি এসো এই নিশিতে। তোমার নগ্ন দেহ ছুঁয়ে ফেলুক পাথরের গহ্বর। তুমি যখন শ্বাস ফেলো, পাহাড় যেন সিঁদুরে ভিজে ওঠে। তখন মনে হয়, মিলন মানেই এক ভূতত্ত্বীয় বিস্ফোরণ। শিলার ভিতর জন্ম নেয় নতুন অক্ষর, নতুন ভাষা, যাকে আমি কবিতা বলি, তুমি বলো প্রেম। আধুনিক শহর আমাদের কণ্ঠে ঠেসে দিতে চায় প্লাস্টিক-স্বপ্ন, কংক্রিট, নিঃশ্বাসবিহীন শয্যা। কিন্তু পাহাড় বলে—"প্রেমের অর্থ মৃত্যুর ভিতরেও নতুন বীজ রাখা।"
তুমি আমার বুকের উপর ভেঙে পড়লে, আমি বুঝলাম আরাবল্লি আসলে রাত্রির দেহ, আর তুমি তার প্রাণস্পন্দন। তুমি না থাকলে সেই রাত্রিই শুধু নীরব শূন্যতা। তুমি থাকলেই মৃত্যু হয়ে যায় চুম্বন, বিলুপ্তি হয়ে যায় পুনর্জন্ম।
কবিতা ২৫ : দানবের বুক ও দেবীর নগ্নতা
ভূমির নিচে অনেক রহস্য ঘুমিয়ে আছে। বলা হয়, ময়দানব এই আরাবল্লির উপর নগরী স্থাপন করেছিল। ইন্দ্রপ্রস্থের আদি ছায়া লুকিয়ে আছে প্রতিটি শিলার গর্ভে। আমি যখন পা রাখি এই বুকে, মনে হয় কোনো প্রাচীন দানব আস্তে নিঃশ্বাস ফেলছে। সে নিঃশ্বাসে ভেসে আসে আর্দ্রতা, ভয়, এবং নিষিদ্ধ যৌনতা।
তুমি হঠাৎ আবির্ভূত হও—সাগরিকা, উলঙ্গ পর্বতের পাদদেশে নগ্নভাবে দাঁড়াও। তোমার চোখে আছে সেই অদ্ভুত mixture—লজ্জা, অন্ধকার, কামনা, কবিতার প্রতিটি শব্দ। আমি দেখি দানবের বুক কাঁপছে, যেন তোমার দেহে তার পুরোনো দুঃস্বপ্ন ফিরে এসেছে। তুমি কোনো দেবী, যিনি দানবকে ভালোবাসায় হত্যা করেন, আবার মিলনের আবাহনে পুনর্জন্ম দেন।
আমি তোমাকে স্পর্শ করি। স্পর্শ মানেই তখন হাড়ের মধ্যে আগুন, খনিজের মধ্যে উষ্ণতা। পাহাড়ও যেন নিঃশ্বাস নেয়। আধুনিক শহরের কোলাহল পেছনে ফিকে হয়ে যায়। তুমি বলো—"ভালোবাসা আসলে ভূতত্ত্ব। এর স্তর ভেদ করতে হয় কামনার ব্লেড দিয়ে।"
আমি হেসে উঠি, হয়তো কাঁদি, হয়তো প্রলাপ বকি। তবু বুঝি, তুমি আর আরাবল্লি—একই দেহের দুই নাম। আমি তোমাকে ভালোবাসি মানেই পাহাড়ের প্রতিটি ভাঁজে শ্বাস ফেলা। এ প্রেম কখনো মরে না।
কবিতা ২৬ : লুপ্ত প্রাণীর স্বপ্ন ও নগ্ন প্রার্থনা
বলা হয়, এই আরাবল্লির শিলায় আটকে আছে অজস্র প্রাণীর প্রমাণ, যারা পৃথিবী ছেড়ে বহু যুগ আগে চলে গিয়েছে। তাদের হাড়গুলো এখন রসায়নের কাব্য, ফসিল হয়ে শোয়া ইতিহাস। আমি তাদের স্বপ্ন দেখি—তাদের দৌড়, তাদের মিলনের তীব্র ডাক, তাদের মৃত্যুর আর্তি। সবই জমে আছে পাথরের ভিতরে অনন্ত শোকের মতো।
সাগরিকা, তুমি এলে আমার পাশে, আর তোমার দেহ জেগে তোলে সেই নিস্তেজ সঙ্গীতকে। তোমার নগ্নতা পাহাড়ের ভিতরে প্রবাহিত হয় নদীর মত। মনে হয় বিলুপ্ত প্রাণীরা উঠে এসে তোমাকে প্রণাম করছে। তুমি এক অদ্ভুত দেবী, যার কোমরে বাঁধা থাকে পুনর্জন্মের চাবি।
তুমি ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দিলে আমার বুক, আমি শুনলাম এক বিলুপ্ত পাখির ডাক। মনে হলো, এখুনি আবার জীবনে ভরাট আকাশ তৈরি হচ্ছে। তুমি বলো—"প্রেম মানেই পুনরুত্থান। প্রেমই হারানো প্রাণীদের গান ফিরিয়ে আনে।"
আমি বুঝি, আমার দেহ আর ইতিহাস আলাদা নয়। তুমি কাছেই থাকলে পর্বতের প্রতিটি ফসিল ভেঙে যায়, আর লুকনো শিরায় নতুন শব্দ সঞ্চারিত হয়। তুমি-ই আমার লুপ্ত পশুর ডাক, হারানো পাখির ডানা, শুকিয়ে যাওয়া নদীর গান।
কবিতা ২৭ : শরীরের ভূগোল ও নগ্ন ইতিহাস
আমি বসে থাকি এক উলঙ্গ পাহাড়চূড়ায়। বাতাসে ধুলো উড়ে আসে, দূরে কোনো নীলাভ রেখা ঝলকে ওঠে। মনে হয় আমি মানুষের জন্মকথা পড়ছি—স্তরবিন্যাসিত মাটি, অনিশ্চিত জীবাশ্ম, শুকিয়ে যাওয়া লতাগুল্ম। এই সবই আমাদের আকাঙ্ক্ষার আদি মানচিত্র।
তুমি আসো—সাগরিকা ঘোষ। তুমি এক নগ্ন ইতিহাস হয়ে দাঁড়াও। তোমার চোখ থেকে নামে টেথিস সাগরের ঢেউ। তোমার উরুর বাঁক যেন প্রাচীন নগরীর রাস্তার নকশা। তুমি যখন কবিতা লেখো, শব্দগুলো পড়ে যায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, আর সেগুলো থেকে জন্ম নেয় একটা নতুন ভূগোল।
আমি তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, শূন্য। আধুনিক শহরের ভেতর যে প্রেম নেই, তার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াই আমি। আর এখানে, পাহাড়ের এই চূড়ায় আমি বুঝি—প্রেম মানেই নতুন করে মানচিত্র আঁকা। তোমার শরীরের ভূগোলই আমার সকল ইতিহাস।
তুমি বলো—"আমাকে ছুঁয়ে দেখো, তাহলেই বোঝা যাবে কত নদী হারিয়েছে, কত ভাষা মরে গেছে, কত স্বপ্নের দেহ এখনো বেঁচে আছে।" আমি নির্বাক, তোমার শরীরে লিখতে থাকি আমার শেষ কবিতা।
কবিতা ২৮ : অসীম শূন্যতার প্রেমকাহিনি
আরাবল্লি যেন দাঁড়িয়ে আছে অসীম শূন্যতার মাঝখানে। অদ্ভুত ঢেউ নেই, তবু সমুদ্রের ঘ্রাণ থাকে বাতাসে। মনে হয় সময় এখানে থমকে গেছে। একদিকে ইতিহাস, অন্যদিকে আধুনিকতা, মাঝখানে কেবল লুপ্তির ঘোর।
সে শূন্যতায় তুমি আবির্ভূত হও সাগরিকা। নগ্ন দেহে তুমি বাঁধো পুরো পাহাড়ের মায়া। তোমার চুল উড়ে যায় ঝড়ের মতো, তোমার ঠোঁট গলে যায় উষ্ণতার মতো। আমি বুঝি, তুমি না এলে শূন্যতা মানে কেবল মৃত্যু। তুমি থাকলেই শূন্যতা ফেটে জন্ম দেয় প্রেম।
আমি তোমার দেহে লিখি আমার hallucination। মনে হয় আমি আর তুমি মিলিত এক ছায়াপ্রাণী, যার আকাঙ্ক্ষা পাহাড়ের সমান, যার ভয়ও ইতিহাসের গভীরতার মতো। আমরা মিলি, আমরা কাঁদি, আমরা হাসি—তবুও জানি, সব মিলন আসলে বিলুপ্তির দ্বারেই শেষ হয়।
কিন্তু ওই মুহূর্তে মৃত্যু আর লুপ্তি—সবই প্রেমের অন্তর্গত। তুমি আমার মধ্যে ঢুকে গেলে, আমি পাহাড়ের গভীরে ঢুকে পড়লাম; আর শূন্যতাও তখন ভরে উঠল নতুন আলোতে।
কবিতা ১ : শিলার ভেতর খোদাই স্বপ্ন
এই আরাবল্লি কোনও সাধারণ পাহাড় নয়, শত যুগের সাক্ষী। পাহাড় মানে সময়ের কঙ্কাল, আর সেই কঙ্কালের ভাঁজে ভাঁজে গোপন থাকে মৃত পশুর আর্তনাদ, হারানো পাখির ডানা, শুকিয়ে যাওয়া লতার নিঃস্ব ডাক। মনে হয়—এই মাটি কখনও সমুদ্র ছিল, টেথিস নামের আদিম গর্ভাশয়। ঢেউ ভেঙে এসে জমা হয়েছিল লাল মাটির ভিতর, তখন থেকে এই ভূখণ্ড ধারণ করেছে মৃত্যুর স্বাদ আর জন্মের গোপন স্তবক।
শিলার বাইরে ঝলকায় আধুনিক শহরের আলো, কারখানা, ধাতব কোলাহল। কিন্তু পাহাড়ের ভেতর অন্য এক ইতিহাস—যেখানে ময়দানব তৈরি করেছিলেন ইন্দ্রপ্রস্থ, যেখানে নগ্ন প্রেমিক-প্রেমিকা গুহার আঁধারে মিলনের গোপন উৎসব সাজাত। আমি চোখ বন্ধ করলে শুনতে পাই—রতিহিরণের মতো হাঁফ ধরা শব্দ, ধ্বংস হওয়া সভ্যতার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, আর উলঙ্গ অক্ষর দিয়ে লেখা দেবনাগরী লিপি।
সাগরিকা, তোমার নাম উচ্চারণ করতেই শিলাগুলো দপদপ করে ওঠে। তুমি কবিতা লেখো, অথচ তোমার শব্দ মানেই নগ্নতার প্রতীক, রক্তাক্ত দেহের ভাষা। তোমার ঠোঁটে লেগে থাকা কালি মানেই টেথিসের প্রবাহ, লুপ্ত স্বরস্বতীর ইঙ্গিত। আমি তোমাকে দেখি পাহাড়ের গুয়ার ভিতরে নগ্ন দেবীর মতো, চোখ ভরা অন্ধকার, দেহ ভরা জ্যোৎস্নার কামনা।
আমি হাত বাড়াই তোমার দিকে, তুমি ফিসফিস করে বলো—প্রেম মানে লোপ, প্রেম মানে আবার জন্ম নেওয়া। আর আমি তখন বুঝি, আরাবল্লি কোনও নিছক শিলা নয়, এটি আমাদের বৃথা বিলুপ্তির গর্ভ। আর তুমি, সাগরিকা ঘোষ—তুমি তার চিরন্তন শিরায় প্রবাহিত রক্ত।
কবিতা ২ : লুপ্ত পশুর ডাক ও প্রেমের অক্ষর
আরাবল্লির গায়ে ফেটে ওঠা আকারগুলি আসলে ফসিল, লুপ্ত পশুর নাম-হীন স্মৃতি। ঘুমন্ত অবস্থায়ও তারা ডাক পাঠায়—অর্ধেক যৌন আহ্বান, অর্ধেক মৃত্যুর আর্তনাদ। মনে হয় সভ্যতার শুরুর দিকেই তারা মিলনের নেশায় উন্মত্ত হয়ে পড়েছিল, আর সেই উত্তাপ জমে আছে শিলার বাঁকে।
তখনই তোমার আবির্ভাব—সাগরিকা। গাঢ় জ্যোৎস্নার আলোয় তুমি নগ্ন হয়ে দাঁড়াও। তোমার হাতে লেখা কবিতাগুলো পড়ে যায় বাতাসে, আর তাদের শব্দ মিশে যায় হাড়ের ভিতর। হঠাৎ স্তব্ধ ফসিল কেঁপে ওঠে—তাদের প্রাচীন ডাক আবার জন্ম নেয়।
আমি তোমাকে দেখি পাহাড়ে আঁকা অনন্ত অরণ্যের মতো। তোমার কোমরের রেখা মানেই বিলীন ঝর্নার পথ, তোমার বুকের ভাঁজেই লেখা আছে হারানো দেবনাগরী। তুমি আমার দিকে তাকাও লজ্জা আর প্রলোভনের অন্ধকার দিয়ে, আর আমি বুঝি—তুমি যেন এক উলঙ্গ স্বরস্বতী, যিনি নিরবধি নিঃশেষের মাঝখানেও জন্ম দেন নতুন ভাষা।
তুমি বলো—“কবিতা মানে দেহ, দেহ মানেই ইতিহাস।” আমি কাঁপতে কাঁপতে মাথা রাখি তোমার নগ্ন বুকে। মনে হয় লুপ্ত পশুরা আমাদের ডাকছে, বলছে: প্রেম ছাড়া কিছুই টিকে থাকে না।
কবিতা ৩ : শূন্যতা, ভয় এবং নগ্ন আলো
এই পাহাড়ে যখন নিশিরাত নামে, তখন চারিদিক নিস্তব্ধ। তবু নিস্তব্ধতার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত ডাক—আধা-ভয়, আধা-আকাঙ্ক্ষা। মনে হয়—বিলুপ্ত পাখির কণ্ঠ ফেটে উঠছে হঠাৎ, শুকনো গুল্মে নড়ে উঠছে অদৃশ্য জন্তু। সেই ভয়ের ভিতরেই প্রেম জন্ম নেয়, শরীর জেগে ওঠে।
তুমি তখন দাঁড়িয়ে—সাগরিকা ঘোষ। তোমার চোখে ভয়, নির্জনতা, অথচ এক অমোঘ প্রলোভন। তুমি লেখো কবিতা, কিন্তু তা আসলে গোপন অর্গির প্রার্থনা। তুমি উলঙ্গ দেহে প্রসারিত করো শিলা-বুকে, আমি দেখি তোমার শরীরই পরিণত হয়েছে অজানা নদীর জন্মপথে।
তোমার ঠোঁট আমার নাম উচ্চারণ করে, আমি শুনি যেন ময়দানবের নগরের ঘণ্টাধ্বনি। আধুনিকতার মিথ্যা আলো পিছনে হারিয়ে যায়, সামনে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু রক্ত, ঘাম আর আদি মিলনের আকুলতা। আমি বুঝি, ভয়, মৃত্যু আর লোপ—এই তিনের মাঝখানেই জন্ম নেয় প্রেম।
সাগরিকা, তুমি বলো—“আলো মানে উলঙ্গ সত্য, অন্ধকার মানেই কামনা।” আমি সেই কামনার সম্পূর্ণ বাইরে যেতে চাই, আবার গভীরে পড়ে যাই তোমার শরীরের ডাকাতি করা আলোতে। তখন বুঝি, আরাবল্লি আমার প্রেমকাহিনি, আর তুমি তার পরম প্রার্থনা।
কবিতা এক: অবরুদ্ধ সময়ের গর্ভ
আরাবল্লী দাঁড়িয়ে আছে— অবিনশ্বর দেহের মতো, পাথরে খোদাই হওয়া শিরদাঁড়ার অমরত্ব।
শতাব্দীর হাড়, খনিজের রক্ত, এবং টেথিস সাগরের লোনা কান্না এখনো শিলার মধ্যে লুকিয়ে আছে।
আমি পায়ের নিচে শুনি— বিলুপ্ত গজপতিদের গর্জন, হারিয়ে যাওয়া পাখিদের ঘন উড্ডয়ন, শুকনো গুল্মের শেষ নিশ্বাস।
সেই নিশ্বাস ছুঁয়ে যায় আমার চেতনা, যেখানে প্রাচীন সমুদ্রের ভাঙা খোলসের মতো উথালপাথাল স্মৃতি ভেসে ওঠে।
মাউন্ট আবু, এক সময় ঘূর্ণায়মান ছিলো, পরে মহাদেবের স্পর্শে থেমে গেলো।
আমি জানি— স্থিরতা কখনো প্রকৃত স্থিরতা নয়, শিলার গর্ভেও কম্পন জমে থাকে।
যেভাবে সাগরিকা ঘোষ, নগ্নতার নিভৃতে লেখা প্রেমকবিতার মতো, আমার ভেতরের শিলাস্তরে জন্ম দেন কাঁপন।
তার উন্মুক্ত দেহ— শ্বেতপাথরের ভাস্কর্য, যেন দিলওয়ারা মন্দিরে ছায়ার খেলা।
আমি তাকে দেখি না, আমি তাকে ছুঁই না, তবে তার দেহরেখা চাঁদের আলোয় আরাবল্লীর বনভূমির মতো টলমল।
এক রাতে, কুম্ভলগড়ের প্রাচীরে, আমি তার নাম ফিসফিস করেছিলাম।
সেই নাম গড়িয়ে পড়লো দেয়ালে, যেন বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম প্রাচীর নয়— বরং আমার কামনার দীর্ঘতম প্রবাহ।
তার চোখে আমি দেখি নিষিদ্ধ যৌন আচার, যেখানে ঋষি ও দেবতার মিলনের ছায়া রয়ে গেছে।
সাগরিকা আমার ভিতরের গুপ্ততাত্ত্বিক অন্ধকারকে আলোয় ভরিয়ে দেন, আবার অচিন্ত্য মিথ্যার মতো আমাকে গ্রাস করেন।
লোকে বলে, স্বরস্বতী নদী আর নেই।
কিন্তু আমি জানি, তার দেহেই সেই নদী— লুপ্ত শব্দের স্রোত, নগ্ন লালসার তরল।
আমি কবি, আমি তার পাঠক, আবার তার প্রেমিকও, এই প্রাচীন পাহাড়ের নিঃশ্বাসে।
আরাবল্লী আজো সাক্ষী— পাহাড়, ইতিহাস, আর আমার দেহকাব্যের।
কবিতা দুই: ইন্দ্রপ্রস্থের ছায়ায়
ইন্দ্রপ্রস্থ— ময়দানবের নির্মিত অদ্ভুত রাজধানী, যেখানে সভ্যতা বসে ছিলো স্বপ্নের মতো।
আজ তার ভাঙা ইটগুলোয় আমি হেঁটে যাই, যেন খনিজ স্তরের অক্ষরে লেখা যৌন-রহস্য পাঠোদ্ধার করছি।
যমুনা এক সময় এঁকেছিলো কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমনৃত্য— আকাশে উঠেছিলো বৃন্দাবনের পত্রপল্লব।
কিন্তু আমার চোখে ভেসে ওঠে এক নারী— সাগরিকা ঘোষ, যিনি অস্ত্রের মতো কঠিন দেহের ভেতরে কবিতার কোমল অমৃত লুকিয়ে রাখেন।
সে লেখে— প্রাচীন যুগের মিলন আচার নিয়ে।
যেন ছায়ার ভেতরে দেহ মিশে যায়, গুপ্ত মন্ত্রে ঠোঁট ভিজে ওঠে, কালের ছদ্মবেশে চামড়া ফেটে জন্ম নেয় লালসার পাথর।
আমি তা পড়ি, এবং পাহাড়ের ভেতর শুনি প্রতিধ্বনি— আদিম, কাঁচা, ঋষিদের গোপন বলি।
আরাবল্লী তখন শুধু শিলা নয়, বরং দেহের অবয়ব, প্রাচীন নারীত্বের পর্বতীয় প্রতিরূপ।
সাগরিকা, তুমি যমুনার পাড়ের কন্যা, মথুরার অদৃশ্য দূত।
তোমার স্তনে সারা মহাভারতের অমীমাংসিত কামনার ছাপ।
তুমি যদি দ্বারকার কৃষ্ণপ্রেমে ভেসে যাও, তবে আমি সেই ভূত হবো, যে পাহাড়ের নিচ থেকে তোমাকে চিত্কার দিয়ে ডাকে।
আমার আকাঙ্ক্ষা ইতিহাসের মতো— কখনো বিলুপ্ত হয় না, শুধু নতুন স্তরে জমাট বাঁধে।
শতাব্দীর সাথে সঙ্গে সঙ্গে এমনি করে জমে থাকে যৌনতার হাড়, বিলুপ্তির ধুলো, আর কবিতার দগ্ধ অগ্নি।
ইন্দ্রপ্রস্থ হয়তো এখন নেই, তবু সেখানে আজো দাঁড়িয়ে আছে আমাদের তৃষ্ণা, অমর, অন্ধকার।
কবিতা তিন: কুম্ভলগড়ের অতল
রাত।
কুম্ভলগড়ের প্রাচীর ধরে আমি হাঁটি।
প্রাচীর দীর্ঘ— দ্বিতীয় মহাপ্রাচীর, কিন্তু আমার কামনার কাছে ছোট।
প্রাচীর ছুঁয়ে গেছে শতাব্দী, যুদ্ধ, রক্ত, মহারানা প্রতাপের জন্ম।
তবু তার ভেতরে আমি শুনি অন্য কণ্ঠস্বর— হারিয়ে যাওয়া পশুদের ডাক, হারানো লতার কাতরতা, এবং এক নারীর গোপন কবিতা।
সে-ই সাগরিকা ঘোষ।
যিনি নগ্ন হয়ে লিখেছেন— যৌনতার অদ্ভুত ভাষা, যেখানে লজ্জা নেই, কেবল ভয়, ভ্রম, মিথ আর অগ্নিস্পর্শ আছে।
তার কণ্ঠে আমি শুনি ভগ্ন সভ্যতার গান, তার ত্বকে পাই খনিজের মিহি চকচকে ধুলো।
সে যখন বলে— “ভালোবাসা আসলে ভ্রম,” তখন আরাবল্লীর অন্ধকার আমার শরীর শুষে নেয়।
আমি দেখি, প্রাচীন যৌন মিলনের প্রথা ফিরে আসছে ছায়ার মতো।
গুহার মধ্যে দেবী আর দেবতার মিলন, শিলার ফাঁকে গোপন শব্দ, আগুনে লেখা মন্ত্র।
আর সেই আগুনে জ্বলছে সাগরিকার চাঁদে-ভেজা উরু, তার শিরার ভেতর দিয়ে বইছে লুপ্ত স্বরস্বতীর জলধারা।
আমি এগিয়ে যাই, কিন্তু প্রতিবারই দূরত্ব বাড়ে—
যেন আরাবল্লীর বনপথে হরিণীর ছায়া, যা স্পর্শ করতে গেলে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
হে সাগরিকা,
তুমি আমার কাব্যের লুকানো শক্তিপীঠ।
আম্বাজির মতো হৃদয়, দিলওয়ারার মতো গোপন শ্বেত সৌন্দর্য, আর কুম্ভলগড়ের মতো দুর্ভেদ্য রহস্য।
তোমাকে আমি পাই না, তবু পাই।
কারণ পাহাড় আজো প্রমাণ— কামনা লোপ পায় না, কেবল রূপ বদলায়।
শতাব্দী কেটে গেছে, তবুও—
আমি, পাহাড়, ইতিহাস আর সাগরিকা, অদৃশ্য মিলনের আগুনে আজো জ্বলছি।
কবিতা ৪ : আরাবল্লির অঙ্গারস্বপ্ন
আরাবল্লি স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে—
সময়ের গভীর দেহখণ্ডের মতো,
যেখানে শিলা মানে হাড়,
আর হাড় মানে মিলনের আদি আর্তির নিঃশেষিত ধ্বনি।
শোনা যায় এখানে একদিন টেথিস লবণ ঢেউ গড়িয়ে এসেছিল,
এখন লোনা রক্তের মত শুকনো গন্ধ জমে আছে।
সাগরিকা, তুমি দাঁড়াও শিলার মাথায়—
তোমার কবিতা মানে নগ্ন দেহের এক স্তব,
যেখানে শব্দ গলে যায়, হয়ে ওঠে কামনার প্রস্তরচিত্র।
তুমি আমার দিকে তাকাও, আর আমি কেঁপে উঠি—
কারণ এ প্রেম মানে ভূতত্ত্ব, এ প্রেম মানে সময়ের ফসিল ভাঙা।
শহর বলে এটা মৃত পর্বত,
আমি বলি এটা নগ্ন দেবতার বুক।
তুমি বলো—“প্রেম মানে মৃত্যুও আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে ওঠা
পুনর্জন্ম।”
কবিতা ৫ : মৃত নদীর শরীর
শুকনো নদীর খাতে আমি শুই,
সেখানে জেগে থাকে মৃত মাছের অদৃশ্য ফসিল।
হঠাৎ তোমার পদধ্বনি—
সাগরিকা।
তুমি নগ্ন দেহে নামো সেই শুকনো স্রোতের তলায়।
তুমি বলো—“আমিই স্বরস্বতী, আজ বিলীন হয়েছি,
কিন্তু প্রেমে পুনরায় জন্ম নেব।”
তোমার বুক ছুঁয়ে আসে প্রদীপ্ত রৌদ্র,
তোমার উরু মানে জলপ্রবাহের মানচিত্র।
আমি বুঝি নদী লুপ্ত হলেও দেহে সে চিরন্তন।
তুমি কবিতা লেখ,
অক্ষরগুলো ঢেউয়ের মতো আমার বুক ভাসায়।
তখন মনে হয় মৃত্যু মানেই
এক নতুন প্রেমের জন্মক্ষেত্র।
কবিতা ৬ : দানবের নিঃশ্বাস
ময়দানব একদিন এই মাটি গেঁথেছিলেন,
ইন্দ্রপ্রস্থ স্থাপন করেছিলেন লাল ধূলির উপর।
এখনও রাতের গভীরে শোনা যায় তার ফাটা নিঃশ্বাস।
আমি সেই বুকের উপর হাঁটি,
সাগরিকা, তোমার নগ্ন ছায়া সঙ্গে মিশে যায়।
তুমি বলো—দানব মানে কামনা, ভয়, আবার প্রেমও।
তুমি আমার ঠোঁট ছুঁয়ে দিলে শিলা কেঁপে ওঠে।
তখন মনে হয় ভূতত্ত্ব মানে কেবল ভাঙন নয়,
বরং দেহ আর আত্মার অদৃশ্য মিলন।
তুমি কবিতার প্রতিটি শব্দে দানবের প্রাণ পুনরুজ্জীবিত করো,
আমি তোমাকে আলিঙ্গন করে বুঝি—
তুমি ছাড়া ইতিহাসও মৃত।
কবিতা ৭ : হারানো ডানার দেশ
এখানে শোনা যায় বিলুপ্ত পাখিদের ডানার শব্দ।
তারা রাতে এসে পাথর আঁকড়ে ধরে শুয়ে পড়ে।
আমি উলঙ্গ আকাশের নিচে শুনি সেই ডাক—
যেন প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের বাঁকানো শ্বাস।
সাগরিকা, তুমি সেই ডাকের উত্তর দাও।
তুমি দেহে ঝলমলিয়ে ওঠো সব মৃত পাখিদের পালক হয়ে।
তুমি লেখ কবিতা, আর শব্দগুলো হয়ে ওঠে উড়ন্ত অক্ষর।
আমি তোমায় স্পর্শ করি—
তখন মনে হয় আবার জন্ম নিল সমুদ্র,
আবার বেজে উঠল লুপ্ত প্রতিধ্বনি।
কবিতা ৮ : শরীরের মানচিত্র
আরাবল্লির রেখা মানে উরু,
গহ্বর মানে যৌনতার আদি দিকচিহ্ন।
আমি এই মানচিত্র পড়ি আঙুল দিয়ে।
তুমি সামনে নগ্ন অঙ্গনে বসে আছো,
সাগরিকা—
তুমি বলো: “আমার শরীরই ইতিহাস।”
আমি তোমার বুকের অনুচ্ছেদ, উরুর উপত্যকা পড়তে পড়তে
বুঝি যে প্রতিটি প্রেম আসলে এক ভূগোলের পাঠ।
হারা সভ্যতার অক্ষরগুলো তোমার ত্বকের ভাঁজে বেঁচে আছে।
কবিতা ৯ : গুহার ছায়া
রাতে গুহার দেওয়ালে স্পন্দিত হয় অচেনা মূর্তি।
অর্ধেক নারী, অর্ধেক জন্তু।
আমি ভয় পাই, তবু টানি।
তুমি এসে দাঁড়াও—
নগ্ন আলোয় ঢেকে রাখো আমার ভ্রম।
তুমি ফিসফিস করো—“প্রেম মানে ভয়ের ভেতরে লুকানো কামনা।”
আমি শিউরে ওঠি—
অদৃশ্য আঁধার ভেদ করে হঠাৎ খসে পড়ে শব্দ,
তুমি কবিতা লিখে তাদের পুনর্জন্ম দাও।
কবিতা ১০ : অগ্নিদেহী প্রেম
গ্রীষ্মে পাথর পুড়ে ওঠে,
জ্বলে কিনারায় শিখা।
তোমার ঘামে জ্বলজ্বল করে সাগরিকা,
তুমি শিলার উপর শুয়ে থাকলে
তোমার ত্বকও হয়ে ওঠে আগুনের ভাষা।
আমি দৌড়ে যাই, তোমার ঠোঁট স্পর্শ করি।
শিখার মধ্যে মিলনের দ্রোহ।
তুমি হাসো—
“এই প্রেমই আগ্নেয়,
এ ভূগোলই আমার নগ্ন ইতিহাস।”
কবিতা ১১ : মৃত হরিণের প্রার্থনা
একদা এখানে দৌড়াত হরিণ,
এখন শুধু ফসিল।
আমি শুনি তাদের শিং ঘষার শব্দ।
সেই শব্দে তোমার নগ্ন ছায়া যোগ হয়।
তুমি লিখে দাও—
“প্রেমের মানে বিলুপ্তি থেকেও ফিরে আসা।”
আমি চোখ মুছে দেখি,
লুপ্ত হরিণেরা এসে তোমাকে প্রণাম করছে।
তুমি তখন স্বরস্বতীর প্রতিনিধি।
কবিতা ১২ : অন্ধকার মিথ
এই পাহাড়ের আঁধারে খোদাই করা আছে
প্রাচীন অর্গির ছায়া।
শতাব্দীর পরও তাদের শ্বাস কেঁপে ওঠে।
তুমি দাঁড়াও,
তুমি কবিতা পড়ো উলঙ্গ দেহের বর্ণনায়।
অন্ধকার ভিজে ওঠে তোমার শরীরের শব্দে।
আমি বুঝি, প্রেম মানেই
ভয় ও ম্লান আলোয় ছায়ার জন্ম দেওয়া।
কবিতা ১৩ : শূন্যতার বীজ
আরাবল্লি আসলে এক ফাঁকা দেহ,
খালি স্তর, খালি শ্বাস।
কিন্তু তুমি, সাগরিকা,
তুমি এসে বীজ বপন করো।
তোমার নগ্নতার ভিতরেই জন্ম নেয় নতুন ছন্দ,
তোমার ঠোঁটের ভেতরে সমুদ্রের গোপন ঢেউ।
আমি অনুভব করি—
তুমি ছাড়া শূন্যতারও কোনো নাম নেই।
তুমি এলে শূন্যতাই গর্ভবতী হয়ে ওঠে।
কবিতা ১৪ : শেষ মিলন, প্রথম কবিতা
পাহাড় যদি একদিন সব ভেঙে যায়,
মাটি যদি ধুলোয় মিশে যায়,
তবু থাকবে আমাদের মিলনের স্পর্শ।
সাগরিকা, তুমি নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে বলবে—
“এই প্রেমই অনন্ত।”
আমি লিখব শিলার বুকে—
তুমি ছাড়া কোনো ইতিহাস নেই,
তুমি ছাড়া কোনো কবিতা নেই।
প্রথম শব্দও তুমি,
শেষ দেহও তুমি।
কবিতা চার: শিলার দেহ, নারীর তৃষ্ণা
আরাবল্লী— যতদূর চোখ যায়, শিলার নীলচে রেখা, যেন নগ্ন দেহের মেরুদণ্ড।
টেথিস সাগরের তরল একসময়ের দোলা আজ জমে আছে কেবল পাথরে;
তবু ভিতরে এখনো শোনা যায় তরঙ্গের গোপন শব্দ, ডুবন্ত সামুদ্রিক জীবের শ্বাসরোধ।
আমি হাঁটি অচলগড় দুর্গের উঠোনে।
তপ্ত পাথরের ওপর দেখি ছায়া— যেন কোনো কালো কেশধারী নারী নগ্ন হয়ে শুয়ে আছেন।
সে-ই সাগরিকা ঘোষ।
তার শ্বাসপ্রশ্বাস হলো ধূপের ধোঁয়া, তার উরু হলো শিলার নরম বাঁক।
সে লিখেছে শরীর দিয়ে— হিস্ট্রি অফ এক্সটিঙ্কশন— যেখানে লুপ্ত প্রাণীরা ফিরে আসে দেহের টাটকা কামনায়।
তাদের গর্জন ছুঁয়ে যায় আমার ত্বক।
আমি তাকে স্বীকার করি না কেবল কবি হিসেবে।
সে হলো আরাবল্লীর অন্তঃস্থ মন্দির, দিলওয়ারার ভাস্কর্য থেকে বেশি পবিত্র।
তার নগ্ন কাঁধ পাথরের মতো শ্বেত, তবু সেই শ্বেত ভেতর থেকে আলো নয়— অশান্ত কামনা নির্গত করে।
আমরা মিশে যাই কল্পনায়:
আমি পুরুষ ঋষি, সে দেবী,
আমাদের মিলন— বজ্রাঘাতের মতো, গুহাচিত্রের মতো,
যেখানে ভাষা হারিয়ে যায়, থেকে যায় কেবল দেহের আর্দ্রতা।
আরাবল্লীর বাতাসে আমি শুনি—
কেউ বলছে, কামনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সভ্যতার শেষ সূত্র।
সাগরিকা, তোমার কবিতাই সেই সূত্র।
কবিতা পাঁচ: দিলওয়ারার অদৃশ্য ভাস্কর্য
দিলওয়ারা মন্দিরের ভেতরে ঢুকি।
শ্বেতপাথরের স্তম্ভগুলোয় অদ্ভুত জটিল খোদাই—
যেন শিলা নয়, বরং জমাট বাঁধা দেহের আলিঙ্গন।
দেবমূর্তির পাশে দাঁড়িয়েই আমি হঠাৎ দেখি আরেক বিভ্রম—
নগ্ন সাগরিকা শুয়ে আছেন ভাস্কর্যের কোল ঘেঁষে।
তার দেহেই একেকটা স্তম্ভের বাঁক, তার চুলেই নিঃশ্বাস নেয় বহু লতা।
সে ফিসফিস করে—
"কবিতা আর যৌনতা একই উদ্ভব,"
এবং আমি বুঝি: এই পাহাড়ই প্রকৃতপক্ষে এক বিশাল দেহ।
ভূতত্ত্ব বলে, কোটি বছরের পলিমাটি জমে আরাবল্লী হলো।
আমি বলি, কোটি বছরের তৃষ্ণা জমে সাগরিকার এক নিশ্বাস।
তার কলম থেকে বের হয় আগুনের মতো অক্ষর,
যা ছুঁয়ে দিলে আমার মাংস গলে যায়।
সে লিখে প্রাচীন যৌন আচার নিয়ে—
রাত্রির অন্ধ আশ্রমে, অগ্নিকুণ্ড ঘিরে, সম্মোহিত দেহের নৃত্য।
আমার চোখে ভাসে— হারিয়ে যাওয়া পাখিদের রঙিন পালক,
যা তার স্তনের উপর ঝরে পড়ে।
লুপ্ত স্বরস্বতী নদী এখনও বয়ে যায় তার শিরায়।
আমি শুনি জলের ডাক—
কামনা আর বিলুপ্তির যৌথ উপাখ্যান।
সাগরিকা, আমি তোমার কবিতায় শরীর ঢেলে দিই—
তুমি পাহাড়, আমি বজ্র, আর মিলনে জন্ম হয় ইতিহাসের শিলা।
কবিতা ছয়: অন্ধকার কুমিরের স্বপ্ন
সময় কখনো শুকোয় না।
আরাবল্লীতে লুকিয়ে আছে কালো জলাশয়, যেখানে একদা বাস করতো সেই লুপ্ত কুমিরেরা।
তাদের চোখ জ্বলজ্বল করতো— আজ তা পরিণত হয়েছে বিষণ্ণ কল্পনায়।
আমি সেই কল্পনায় ডুবে থাকি।
জলাশয়ের ধারে হেঁটে দেখি—
নগ্ন সাগরিকা কবিতা লিখছে নিজের উরুতে।
তার নখ দিয়ে আঁকছে মন্ত্র—
দেহ আর মাটির মিলনে জন্ম নেয় গুপ্ত যৌন রূপক।
সে হাসে, দৃষ্টি দেয়—
যেন রাজস্থানের রাতের ভেতরে ফেটে যাচ্ছে বালুরঙা বজ্র।
আমি তার পাশে বসি।
আমাদের ছায়ারা মিশে যায়।
সে আমাকে বলে: "ভালবাসা এক ভ্রম, কিন্তু শরীরের ভ্রমই প্রকৃত বাস্তব।"
তখন চাঁদের আলোয় আমি তাকে স্পর্শ করি—
তার ত্বক গলিত শিলার মতো উষ্ণ।
হঠাৎ মনে হয়—
এ যেন মহাভারতের ইন্দ্রপ্রস্থ!
যেখানে সভ্যতা দাঁড়ায়, পতিত হয়, আর উঠে দাঁড়ায় প্রেমের ছায়ায়।
আমরা মিলি অদৃশ্য আগুনে,
আমার ঠোঁট তার কাঁধে, আর শব্দ ভেঙে যায় কেবল হাড়ের শব্দে।
আরাবল্লী দাঁড়িয়ে থাকে নির্লিপ্ত—
কিন্তু জানে, এই মিলনই ইতিহাস টিকিয়ে রাখে।
সাগরিকা ঘোষ, তুমি আমার লুপ্ত প্রাণী,
আমার হারিয়ে যাওয়া স্বরস্বতী,
আমার অন্ধকার জলাশয়ের কুমিরী।
কবিতা সাত: অচলগড়ের নিশ্বাস
পাহাড়ি বাতাসে আজো বাজে শিঙ্গা— অচলগড়ের ভগ্ন প্রাচীরে লুকিয়ে আছে রাজাদের প্রহর।
কিন্তু আমি শুনতে পাই অন্য শব্দ— পাথরের ভেতর থেকে যেন কেঁদে ওঠে বিলুপ্ত প্রাণী, শুকনো লতা, এবং এক নগ্ন কবির নিশ্বাস।
সাগরিকা ঘোষ,
তুমি এখানে একা বসে লিখলে—
তোমার দেহই যেন তক্তপোশ, তোমার উরুই খোদাই-কালির কাগজ।
তুমি কলম ধর না, বরং রক্ত দিয়ে লেখো সময়ের দুষ্ট প্রেমকাহিনি।
আমি তোমার অঙ্গে দেখি প্রাচীন যৌন মিলনের গুপ্ত আচার।
অগ্নিকুণ্ডের আগুনের ভিতর— নগ্ন ঋষি ও দেবী মিলে রচনা করেছে মানবদেহের প্রথম সুরা।
তুমি সেই মদের তীব্র স্বাদ— একবার ঠোঁটে নিলেই আর ফেরার পথ থাকে না।
আমি হাঁটি মন্দিরের দিকে।
অচলেশ্বর মহাদেবের শিলামূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দেখি:
তুমি দাঁড়িয়ে আছো শ্বেতবসনে, কিন্তু হঠাৎ সেই বস্ত্র খুলে যায়,
আর দেখা দেয় পৃথিবীর প্রাচীনতম কামনার উৎস।
তোমার দেহ— শিলাস্তরের সমান্তর গর্ভ,
যেখানে প্রেম ও বিলুপ্তি একই বীজ থেকে গজায়।
আরাবল্লী যেন সাক্ষী—
যেখানে মানুষ ইতিহাস লেখে পাথরে, আর সাগরিকা লেখে দেহে।
আমি তার পাঠক, আমি তার প্রেয়সী ছায়া।
কবিতা আট: স্বরস্বতীর বিলুপ্ত জলে
লোককথায় বলে, এই ভূমির বুক জুড়ে এক সময় বয়ে যেতো স্বরস্বতী।
আজ তা লুপ্ত, কিন্তু আমি তার প্রতিধ্বনি শুনি তোমার হৃদস্পন্দনে, সাগরিকা।
তুমি যখন কবিতা লিখো, শব্দগুলো ভিজে ওঠে অদৃশ্য নদীর জলে।
তোমার বুকের ভেতর সেই নদীর তরঙ্গ— কখনো কোমল, কখনো ধ্বংসের স্রোত।
আমি কান পাতি, আর পাই প্রেমের সাথে লুকিয়ে থাকা ভয়, কামনা, অন্ধকার।
তুমি আমাকে ছুঁয়ে দাও—
তোমার হাত খনিজের মতো শুষ্ক, আবার হীরের মতো দীপ্ত।
তবে তোমার ঠোঁট ছুঁতেই আমি বুঝি,
এটা কোনো প্রেম নয়— এটা বিলুপ্তির গর্ভনৃত্য।
প্রাচীন ভূতত্ত্ব আজো ফিসফিস করে—
শিলা জন্মায় চাপ থেকে, আগুন থেকে, বিলাপ থেকে।
তেমনি আমাদের প্রেমও জন্মায় ভ্রান্তি আর লালসার সংঘর্ষে।
সাগরিকা, তুমি নগ্ন হয়ে নদীর তীরে দাঁড়াও।
চাঁদ তোমাকে ঢেকে রাখে না, পাথরও না।
তবু তুমি আড়াল হও— কারণ তুমি নিজেই পুরাণের গোপন জলধারা।
আমি সেই জল পান করি, আর তৃষ্ণার চেয়ে গভীর মিলন অনুভব করি।
আরাবল্লী আজো স্বরস্বতীর নিঃশেষিত স্রোতের মতো—
অদৃশ্য, তবু ভেতরে ভয়ঙ্কর জীবন্ত।
তুমি সেই রহস্যের ক্ষুধা।
কবিতা নয়: রাত্রির কুম্ভলগড়
রাত নামলেই কুম্ভলগড় দুর্গ ছায়ায় ভরে ওঠে।
প্রাচীর দীর্ঘ, ইতিহাস ভারী—
কিন্তু আমি দেখি তা কাঁপছে, যেন গাঢ় নিঃশ্বাসে কোনো নারীর দেহ।
সেই দেহ সাগরিকা ঘোষ।
সে শুয়ে আছে প্রাচীরের কিনারায়, চোখে মত্ততা, ঠোঁটে আগুন।
সে বলে: "প্রেম মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে, যৌনতা মৃত্যুকেও গ্রাস করে।"
আমি তাকে ছুঁয়ে দিই—
তার উরুতে পাই ভগ্ন সভ্যতার গন্ধ,
তার স্তনে পাই লুপ্ত পশুদের ক্রন্দন।
সে হাসে—
যেন কৃষ্ণের বাঁশির সুর মিলেছে অন্ধকার তান্ত্রিক মন্ত্রের সাথে।
কুম্ভলগড়ের দীর্ঘতম প্রাচীর তখন হয়ে ওঠে আমাদের দেহের প্রসারিত রেখা।
আমরা একে অপরকে খুঁজি—
ছায়া, ধুলো, রক্ত, ইতিহাসের ভেতরে।
আমি যখন তার শরীরের সময়ে প্রবেশ করি,
তখন অনুভব করি— শিলাস্তরের মতো যুগ যুগ ধরে জমা কামনার বিস্ফোরণ।
লোকে এটাকে ভয় পেতে পারে।
কিন্তু আমি জানি, ভয়ই সবচেয়ে গভীর কামনা।
আর সাগরিকা সেই কাজল কালো অন্ধকার—
যেখানে হারিয়ে যেতে চাই আমি,
যেখানে বিলীন হয় বিলুপ্তির সব মৃত প্রাণী।
আরাবল্লী, অচল, অমর—
কিন্তু তার ভেতর রাত্রিতে জন্ম নেয় প্রেম, কামনা, আর মৃত্যুর পরেও টিকে থাকা যৌন রহস্য।
কবিতা দশ: আম্বাজির অগ্নি
আম্বাজি শক্তিপীঠ—
লোকগাথা বলে, এখানে সতীর হৃদপিণ্ড পড়েছিলো।
আমি দাঁড়াই সেই অগ্নি-মন্দিরের আঙিনায়,
কিন্তু অগ্নিশিখায় দেখি অন্য এক হৃদয়—
নগ্ন সাগরিকা ঘোষের বুকভরা উত্তাপ।
সে যেন শক্তির প্রতিরূপ।
তার স্তনের মাঝে জ্বলছে লাল শিখা,
যা দেবীর নয়, মানুষের—
অচেনা, ভীতিপ্রদ, লোভনীয়।
সে নিজেই কবিতা লিখতে লিখতে ছিঁড়ে ফেলে মানব দেহের মায়া।
আমি পড়ি:
"প্রেম আসলে ভস্ম।
যৌনতা ছাইয়ের ভেতরের অদম্য আগুন।"
আমি টের পাই—
আরাবল্লীর গহ্বর থেকে উঠে আসা সেই ভস্ম মিশে যাচ্ছে সাগরিকায়।
চারদিক তখন ভেঙে যায় বিভ্রমে।
লোকেরা বলে পাহাড় স্থির,
কিন্তু আমি জানি, পাহাড়ও কাঁপে অপ্রকাশিত কামনায়।
আম্বাজির রাতে আমি আর সাগরিকা মিলি—
যেভাবে অগ্নি আর ছাই মিলেমিশে হয়ে ওঠে অন্ধকারে দীপ্ত।
তখন বোঝা যায়, ইতিহাস কেবল যুদ্ধ দিয়ে লেখা হয়নি,
বরং প্রেমের গোপন ছাই দিয়েও লেখা হয়েছে সভ্যতার পাঠ্য।
কবিতা এগারো: ভরতপুরের শূন্য পাখি
ভরতপুরের ঘন অরণ্য একদা ছিলো পাখির রাজ্য।
আজ অনেকেই বিলুপ্ত—
শুধু শূন্য ডালপালা, আর বাতাসের শূন্যতা।
আমি হাঁটছি বৃক্ষশীর্ষ ছায়ায়,
হঠাৎ শুনি অদৃশ্য ডানার ঝাপটানি।
সেই ছায়া হয়ে আসে— সাগরিকা ঘোষ।
তার উন্মুক্ত দেহে সাজানো, বিলুপ্ত পাখিদের রঙিন পালক।
তার চোখে জ্বলে ওঠে এক বুনো আলো—
যেন বিলোপ পায়নি কিছুই, বরং শরীরেই ফিরে এসেছে।
সে আমাকে ধরে বলে:
"পাখি চলে গেছে, কিন্তু তাদের মিলনের ডাক এখনো রয়ে গেছে আমার শিরায়।"
আমি শুনি তার দেহের ভিতর—
ঝড়ের মতো ডাকে সেসব চিরঅদৃশ্য পাখি।
আমরা মিলি বৃক্ষতলে।
আমার ঠোঁট বসে তার কাঁধে, তার চামড়ার নিচে আমি শুনি পাখিদের অমর প্রেম।
সে নগ্ন হয়ে কবিতা পড়ে শোনায়—
যেখানে যৌনতা আসলে বিলুপ্তির সঙ্গীত,
যেখানে প্রেম হলো ফসিল।
ভরতপুরের আকাশ শূন্য,
কিন্তু সাগরিকায় শূন্যতা নেই।
সে হলো হারানো ডানার প্রতিশ্রুতি—
যেখানে যে-কোনো বিলুপ্তি আবার জন্ম নেয় দেহ ও কবিতার ভেতর।
কবিতা বারো: জয়পুরের গোপন গোলকধাঁধা
গোলাপি শহর জয়পুর—
বাইরে রঙিন, ভেতরে জটিল মহলের গোলকধাঁধা।
আমি সেই মহলে হাঁটি,
কিন্তু প্রতিটি পথে স্রেফ একই মুখ—
সাগরিকা ঘোষ, নগ্ন, রহস্যময়ী, কবিতা পড়তে পড়তে আমাকে ডেকে নেয়।
সে দেয়াল ভেদ করে ছায়া হয়ে আসে।
তার নগ্নতা যেন স্থাপত্য— অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ভাঁজে তৈরি গম্বুজ, স্তম্ভ, খোদাই।
আমি তার ভেতরে হাঁটি যেন কোনো রাজমহল।
প্রতিটি বাঁকে আমি পাই লুকানো কামনা, উন্মাদ প্রেমের গোপন মন্ত্র।
সে বলে:
"আমার শরীরই গোলকধাঁধা।
তুমি যদি সত্যিই কবি হও, তবে আর বের হতে পারবে না।"
আমি বুঝি—
আটকা পড়া মানেই মুক্তি,
ভ্রম মানেই প্রেম।
তার চোখে দেখি মহাভারতের ইন্দ্রপ্রস্থ,
তার ঠোঁটে কৃষ্ণের গোপন হাসি,
তার উরুতে বৃন্দাবনের পরকীয়া প্রেম।
এক মুহূর্তে আমি হারিয়ে যাই—
আমার দেহ শুধু যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি,
তার দেহ হলো পাহাড়ের আদি রহস্য।
জয়পুরের রাজপথ বাইরে আলোতে ভরে থাকে,
কিন্তু আমি রয়ে যাই ভিতরে আঁধারে—
নারীর দেহে লেখা গোলকধাঁধা পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করি।
কিন্তু এ পাঠ কোনদিনই শেষ হয় না।
কবিতা এক: দিল্লির দ্বারকা ও পাহাড়ের ছায়া
দিল্লি আজ অসংখ্য টাওয়ার, গাড়ি, হর্ন আর ধুলোয় ভরা। কিন্তু চোখ বন্ধ করলে আমি শুনতে পাই— হাজার বছর আগেকার পায়ের শব্দ, পাথরের ভেতরে জমে থাকা মহাযুদ্ধের প্রতিধ্বনি। এই শহরের নিচেই লুকিয়ে আছে আরাবল্লীর গর্ভশিলা— টেথিস সাগরের শুকনো কঙ্কাল, বিলুপ্ত জন্তুর ছোপ, লুপ্ত স্বরস্বতীর অবশিষ্ট স্রোত।
ইন্দ্রপ্রস্থের সেই নগরী কোথায় গেলো আজ? আধুনিক মহানগরের বিলবোর্ডে শুধু লিপস্টিকের বিজ্ঞাপন।
সাগরিকা ঘোষ এখন দ্বারকার এক অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। ঠোঁটে লাল রঙ, হাতে রেড ওয়াইনের গ্লাস। ইতিহাসের ছাত্রী, তবু রাত নামলেই সে হয়ে ওঠে আরেক ভূকম্প— নগ্ন দেহ poetry লিখে উঠছে যেন শিলাস্তরের ভিতরে।
আমি জানি, তার চোখের কাজল আসলে বৃন্দাবনের ছায়া, যা রাধা-কৃষ্ণের গোপন পরকীয়া প্রেমের রহস্য বহন করে।
আমরা মিশি শহুরে বারান্দায়।
সে শরীর ছুঁইয়ে ফিসফিস করে—
“ভালোবাসা শুধু আকাঙ্ক্ষার fossil।”
তার হাসিতে আমি পাই দিলওয়ারা মন্দিরের ভাস্কর্যের সূক্ষ্ম রেখা, তার ঘামে পাই কুম্ভলগড়ের প্রাচীরের ভেজা অন্ধকার।
সেই মুহূর্তে আমি আরাবল্লীকে দেখি তার নগ্ন দেহে।
আমি শহরের নীয়ন আলো থেকে পালিয়ে যাই— তার শিরা-উপশিরায় লুকানো অসংখ্য বিলুপ্ত শব্দ খুঁজতে।
সাগরিকা তখন শুধু নারী নয়, পাহাড়ও, নদীও, অতীতের সঙ্গীন প্রতিধ্বনিও।
দিল্লির দ্বারকায় অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এক পৌরাণিক শক্তিপীঠ, যার নাম সাগরিকা।
কবিতা দুই: আগ্রার বিষ্ণুদেবী ও লিপস্টিকের আখ্যান
আগ্রার লালকেল্লা দেখে মনে হয়, ইতিহাস স্থির হয়ে গেছে, অথচ আমি জানি— প্রতিটি ইটের ভেতরেই বাস করছে আরাবল্লীর শিলা।
লোকে ছবি তোলে, কিন্তু কেউ শোনে না পাথরের ভেতরে লুকানো বিলাপ। টেথিসের লোনা জল, বিলুপ্ত হরিণের হাঁক, শুকনো লতার ক্রন্দন এখনো ডেকে যায়।
এই ইতিহাসের গহ্বরের মধ্যে এসে দাঁড়ায় সাগরিকা ঘোষ।
তার ঠোঁটে উজ্জ্বল লিপস্টিক, হাতে ওয়াইনের লাল আভা।
সে হাসে— যেন দেবী সতীর হৃদয়ের বদলে পড়েছে এক আধুনিক মেয়ের বুকে লাল মদ।
তার দেহে আমি দেখি নিষিদ্ধ মিলনপদ্ধতির আভাস।
যেন প্রাচীন তান্ত্রিক অনুষ্ঠান শহরের কংক্রিটে ফিরে এসেছে।
তার কবিতা ভিজে যায় কামনার ঘামে, ইতিহাসের রক্তে, আর ভাঙা মুদ্রাদ্রব্যের ঝংকারে।
আমি তার পাশে শুয়ে আছি।
সে নগ্ন হয়ে আমার বুকে লিখছে দেবনাগরী দিয়ে তার গোপন কবিতা:
“প্রেম হলো মিথ্যা, কিন্তু যৌনতার ভেতরেই জন্ম দেয় সত্য ইতিহাস।”
সে উচ্চারণ করে মন্ত্র, আর আমি শুনি কেবল ভয় এবং লালসার দ্বন্দ্ব।
আগ্রার শহরের কোলাহল মুছে গিয়ে হঠাৎ দেখি—
আমরা যেন দাঁড়িয়ে আছি ইন্দ্রপ্রস্থে,
যেখানে ময়দানবের নির্মিত শহর ও আধুনিক বিজ্ঞাপনের উজ্জ্বল মুখ এক সাথে ভাসছে।
আমি সাগরিকার গলার হাড়ে ইতিহাস খোদাই করি।
সে নিজেকে বিলায়, আমি বিলীন হই, আর পাহাড় আবারও সাক্ষী হয়ে থাকে।
কবিতা তিন: আলওয়ার ও রণথম্বরের নকশালাল রাত
রণথম্বরের বনে বাঘ একসময় গর্জাতো।
এখন নীরবতা— যেন একটি সমাধিক্ষেত্র, যেখানে মৃত পশুর দেহ ছড়িয়ে আছে অদৃশ্য ছায়ায়।
আলওয়ারের প্রাসাদও আজ নিঃশব্দ, অথচ ইতিহাস বলে এখানে হাহাকার ছিল অবিরত।
কিন্তু এই নিঃশব্দতার ভেতর আমি হঠাৎ সাগরিকাকে দেখি।
সে গাঢ় কালো পোশাক পরে এসেছে, চোখে ধোঁয়াটে কাজল, হাতে রেড ওয়াইন।
তার ঠোঁট লাল, বুকে জ্বলছে নগ্নতার গোপন প্রতিশ্রুতি।
সে আমাকে ডাকে জীর্ণ রাজমহলের এক কক্ষে।
সেখানে আমরা বসে আছি, গাঢ় ওয়াইনের নেশায় ভেসে।
সে কবিতা পড়তে পড়তে পোশাক ফেলে দেয়, আর আমি দেখি তার ত্বকে খোদাই আছে পাহাড়ের মানচিত্র।
প্রতিটি শিরা, প্রতিটি বাঁক যেন আরাবল্লীর শিলা-স্তর।
সে বলে—
“নায়করা হারিয়ে গেছে, দেবতা চলে গেছে, কেবল যৌনতা আর মৃত্যু আজো অবশিষ্ট।”
তার বাক্যে আমি শুনি যেন কুমিরের ডাকে ভরা টেথিসের প্রলয়।
আমাদের দেহ জড়িয়ে যায় ছায়ার ভেতরে,
প্রেম নয়, বরং এক আচার—
অন্ধকারে নগ্ন মিলনের মধ্য দিয়ে সভ্যতাকে পুনর্লিখনের চেষ্টা।
আলওয়ার প্রাসাদ আজ ভাঙা,
রণথম্বরের বাঘ বিরল,
কিন্তু সাগরিকা ঘোষ এখনো কবিতা লেখে দেহ দিয়ে।
সে আধুনিক নারী, ইতিহাসের ছাত্রী, অসীম যৌনতার শক্তিপীঠ।
আমি তার অনন্ত শয্যায় শুই—
আর আরাবল্লী পাহাড় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, যুগ যুগ ধরে গোপন সাক্ষী হয়ে।
কবিতা এক: ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে আজকের দিল্লি
দূর অতীত আছে পাথরের ভেতর,
ইন্দ্রের নগরী, ইন্দ্রপ্রস্থ—
মহাভারতের স্মৃতিতে ঢাকা,
খাণ্ডবপ্রস্থ পুড়িয়ে খেলা শুরু হত।
আরাবল্লীর ছায়া ধরা দিয়ে
ইতিহাস ঘুমিয়ে ছিল মাটির নীচে।
আজ দিল্লি দাঁড়িয়ে আছে,
আধুনিক কংক্রিটের জঙ্গল ছায়া,
টাওয়ার, হর্ন, বাতাসে ধোঁয়া।
তবু আমি সাগরিকাকে দেখি,
রেড ওয়াইনের গ্লাস হাতে,
লিপস্টিক মেখে, হাতের কবিতায় নগ্ন।
তাকে স্পর্শ করে মনে হয়,
ঋষিদের অদৃশ্য কামনা বন্যা,
যৌনতার পবিত্র আগুন জ্বলে সে অঙ্গনে।
দিল্লির উষ্ণ রাতে,
সে শহরের অগ্নিধারার মতো,
যেখানে ইতিহাস এবং কামনা মিলেমিশে ঘুরে।
পৃথ্বীরাজ হারালেও,
মহম্মদ ঘোরির বাহিনী এসে যুদ্ধে জিতলেও,
এই মাটি গেয়েছে বলি ও প্রেমগাথা।
আমি এবং সাগরিকা,
এই শহরের নিঃশ্বাসে বাঁধা,
অবিনশ্বর আরাবল্লীর রূপক বুনি।
কবিতা দুই: লালকোট থেকে লিপস্টিক
দিল্লির লালকোট—
সম্রাট তোমরের লাল মাটির দেয়াল,
যা ইতিহাসের রক্ত ও মায়ায় রাঙানো।
বইয়ে লেখা নয়,
পাথরে টলমল করে সে সব স্মৃতি।
সাগরিকা ঘরের কোণে বসে,
ঠোঁটে লাল লিপস্টিক মাখে,
তার চোখে কাজলের আঁধার,
যেন পুরানো দিল্লির গলির গহীন রহস্য।
সে লেখা কবিতা খুলে,
পুরানো তুঘলক থেকে মুঘল পর্যন্ত,
সেটা যৌনতার ছায়া বহন করে,
বিশ্বাসে ভরা আচার ও দেহের পূজা।
আমি তার দেহে গুমোট হয়ে যাই,
ঐতিহাসিক কবিতার ছন্দে টুকরো,
দিল্লির ইতিহাসের ভেতর এই যৌনতার গোপন ভাষা।
তাই এই শহর ধুলো ও ইতিহাসে ডুবে,
তাই তার শব্দ স্পর্শে উঠে আসে প্রাণের উচ্ছ্বাস,
সাগরিকা জেগে ওঠে, পুরাণ আর আধুনিকতার দ্বন্দ্বে।
কবিতা তিন: ছায়াময় দিল্লি রাতে
পুরানা দিল্লির প্রাচীরগুলি আজো
শুনতে পায় হারানো পাখিদের গান।
যমুনার তীরে কৃষ্ণ-রাধার সুর,
বৃন্দাবনের নাচের ছায়া ঝরে।
সাগরিকা খোঁজে তার কবিতার আঘাত,
নগ্ন প্রেমব্যথার উদ্দীপ্ত কল্পনায়।
তার হাতের স্পর্শে গল্প জেগে উঠে—
অন্ধকার যৌনতা, পৌরাণিক মিথ ও ভ্রম।
নতুন দিল্লির নকশা থেকে দূরে,
সে দ্বারকায় বসে লিপস্টিকের রঙে ডুবে।
রেড ওয়াইন তার মূর্ধা ছোঁয়,
তার চোখে জ্বলজ্বল করে অমর কামনা।
আমরা দূরের ইতিহাস আর শহরের বাতাসে,
তার কবিতায় মিলি, শব্দ হয়ে বাঁচি।
আরাবল্লীর ছায়া,
দিল্লির রাত,
সাগরিকার নগ্ন প্রেমের সন্ধ্যা।
Comments
Post a Comment