নদীহীনতায়

 নদীহীনতায়


আমার নিজস্ব একটা নদী আছে। সে কোনো গুগল ম্যাপে নেই, জিপিএস ট্র্যাকারে তার অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ ধরা পড়ে না। কোডের গভীরে যখন সিনট্যাক্স এরর খুঁজতে খুঁজতে রাত কাবার হয়ে যায়, তখন সেই নদী আমার মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে বয়ে যায়। তিস্তা। উত্তরবঙ্গের শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা এক পাগলাটে সবুজ জল। সেই জলের ভিতরে ভাসতে থাকে শৈশবের জলপাই রঙের স্মৃতি, কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থাকা আমাদের মাটির বাড়ির উঠোন। আর এখানে? এখানে আছে কংক্রিটের জঙ্গল, সেক্টর ফিফটি সিক্স, গুড়গাঁও। এখানে কাঞ্চনজঙ্ঘা নেই, আছে ডিএলএফ সাইবার হাবের নিওন আলোয় মোড়া ধাতব চূড়া। এখানে তিস্তা নেই, আছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসের ভিতর রিসার্কুলেটেড বাতাস আর কফি মেশিনের হিসহিস শব্দ। এমন এক ভার্চুয়াল ইকোসিস্টেমে আমি, জলপাইগুড়ির এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ভাসতে থাকা এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আমার রুট সার্ভার পড়ে আছে উত্তরে, আর আমি এক অফশোর ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে কম্পাইল হয়ে চলেছি প্রতিদিন।

স্নিগ্ধা ছিল এই কংক্রিটের জঙ্গলের সবচেয়ে সুন্দর অর্কিড। born and brought up in NCR Delhi। ওর চলনে গল্ফ কোর্স রোডের মসৃণতা, ওর কথায় খান মার্কেটের কসমোপলিটান এলিগেন্স। ওর হাসিতে ছিল সাইবার হাবের উইকএন্ড নাইটের মতো ঝলমলে ব্যাপার। স্নিগ্ধা শর্মা। আমাদের প্রজেক্টের ইউআই/ইউএক্স ডিজাইনার। ইউজার ইন্টারফেস যতটা সিম্পল, ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ততটাই কমপ্লেক্স—স্নিগ্ধা ছিল তার জীবন্ত উদাহরণ। ওর ডিজাইন করা অ্যাপের মতো, ওর জীবনটাও ছিল মিনিমালিস্টিক, এফিসিয়েন্ট আর ইউজার-ফ্রেন্ডলি। ওর জগতে আলপথ নেই, আছে সিক্স-লেন এক্সপ্রেসওয়ে। ওর সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নেই, আছে পাবের লাউড মিউজিক। ওর আকাশে জোনাকি জ্বলে না, জ্বলে ইন্ডিগো বা ভিস্তারার নেভিগেশন লাইট। আমাদের দুজনের পৃথিবী ছিল দুটো ভিন্ন অপারেটিং সিস্টেমে চলা দুটো ডিভাইস—একটা লিনাক্সের কমান্ড লাইনের মতো জটিল, পুরনো কিন্তু স্টেবল; অন্যটা লেটেস্ট আইওএস, ঝকঝকে, ফাস্ট, কিন্তু প্রতি আপডেটে বদলে যায়।

আমাদের আলাপ হয়েছিল অফিসের প্যান্ট্রিতে। কফি মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে। মেশিনটা বিগড়েছিল। আমি ওর টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো ঠিক করে দিতে গিয়েছিলাম, আর ও আমার জীবনের বাগ ফিক্স করতে ঢুকে পড়ল।
“Thanks a lot, yaar. You are a lifesaver,” বলেছিল স্নিগ্ধা। ওর ঠোঁটে ছিল ন্যুড শেডের লিপস্টিক, চোখে ছিল শার্প উইংগড আইলাইনার। ওর পারফিউমের গন্ধে ছিল ভ্যানিলা আর কোনো এক অচেনা ফুলের ককটেল। আমার নাকে তখনও লেগে আছে বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। আমাদের প্রথম কথোপকথনটাই ছিল একটা সিস্টেম ইনকমপ্যাটিবিলিটির ওয়ার্নিং।
স্নিগ্ধা বলেছিল, “So, you are from Siliguri? Must be beautiful. All those tea gardens and stuff.”
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। ওর চোখে গুড়গাঁওয়ের রাতের আকাশের মতো গভীরতা, কিন্তু একটাও তারা নেই। সবটাই আলোর দূষণে ঢাকা। আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ, সুন্দর। তবে এখানে যেমন সুযোগ, তেমনটা নেই।”
আমার ভিতর তখন তিস্তা বয়ে যাচ্ছে। ফুঁসছে। বলছে, ‘বেইমান! কার টাকায় তোর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া? কার চা বেচে তোর বাবা তোকে এখানে পাঠিয়েছে?’ তিস্তা জানে, এই উত্তরটা একটা ডিফেন্স মেকানিজম, একটা ফায়ারওয়াল যা আমি নিজের চারপাশে তৈরি করেছি এই নতুন জগতে টিকে থাকার জন্য।

আমাদের সম্পর্কটা ছিল একটা অ্যাজাইল স্প্রিন্টের মতো। খুব দ্রুত শুরু হলো, প্রতিদিন নতুন নতুন ফিচার অ্যাড হতে লাগল। উইকএন্ডে লং ড্রাইভ, শীতের সকালে সেক্টর টুয়েন্টি নাইনের কোনো ক্যাফেতে বসে কফি খাওয়া, গভীর রাতে ওর ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে থাকা। স্নিগ্ধা আমাকে শেখাচ্ছিল এই শহরের ভাষা, এই শহরের আদবকায়দা। কোনটা আরবান ডিকশনারির স্ল্যাং, কোনটা কর্পোরেট এটিকুইট। আর আমি ওকে শোনাতাম আমার গ্রামের গল্প। পৌষ সংক্রান্তির পিঠের গল্প, বর্ষায় তিস্তার ভয়ঙ্কর রূপের গল্প, হেমন্তের সকালে ধানক্ষেতের উপর জমে থাকা শিশিরের গল্প। ও খুব মন দিয়ে শুনত, ঠিক যেমন ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে রিকোয়ারমেন্ট শোনে। ওর কাছে আমার অতীত ছিল একটা ইন্টারেস্টিং ইউজার স্টোরি, একটা এক্সোটিক ডেটা পয়েন্ট।
এক রাতে ওর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে, নিচে ছুটে চলা গাড়ির হেডলাইটের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধা বলেছিল, “You know, I can’t imagine living anywhere else. This is life. The speed, the ambition, the chaos. It makes me feel alive.”
আমি ওর হাতটা ধরেছিলাম। ওর ত্বক ছিল মসৃণ, কিন্তু হাতটা ছিল ঠান্ডা। আমি বলেছিলাম, “আমার মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, এই কংক্রিটের দেওয়ালগুলো আমাকে গিলে ফেলছে। আমার শুধু মনে হয়, কবে বাড়ি ফিরব।”
“বাড়ি? You mean Siliguri? For a vacation, right?” ওর গলায় ছিল বিস্ময়, যেন আমি অন্য কোনো গ্রহের ভাষায় কথা বলছি।
“না, পার্মানেন্টলি। একদিন। সব ছেড়েছুড়ে,” আমার ভিতর থেকে উত্তরটা বেরিয়ে এসেছিল, যেন কোনো আনহ্যান্ডেলড এক্সেপশন।
স্নিগ্ধা হেসেছিল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না। ছিল একটা বাগ রিপোর্টের মতো নির্লিপ্ততা। বলেছিল, “You are kidding, right? What would you even do there? তোমার এই কেরিয়ার, এই স্যালারি, এই লাইফস্টাইল, সব ছেড়ে দেবে? For what? Some vague sense of nostalgia?”

এই ‘নস্টালজিয়া’ শব্দটা ছিল আমাদের সম্পর্কের প্রথম সিভিয়ারিটি-ওয়ান ডিফেক্ট। ওর কাছে যা নস্টালজিয়া, আমার কাছে তা ছিল আমার আইডেনটিটি, আমার সোর্স কোড। ওর কাছে যা ‘লাইফ’, আমার কাছে তা ছিল একটা টেম্পোরারি প্রজেক্ট, যার ডেডলাইন একদিন শেষ হবে। আমাদের ভালোবাসার আর্কিটেকচারে একটা বড় ভুল ছিল। আমরা দুজন দুটো ভিন্ন এন্ড-ইউজারের জন্য ডিজাইন করছিলাম। স্নিগ্ধা চাইত স্কেলেবিলিটি, গ্লোবাল রিচ, হাই পারফর্ম্যান্স। আর আমি চাইতাম একটা স্টেবল, সিকিওর হোম সার্ভার, যার পিং টাইম হবে মিনিমাল।
আমাদের ঝগড়াগুলো হতো অদ্ভুত বিষয়ে। আমি ওকে বলতাম, “চলো, পুজোর ছুটিতে বাড়ি যাই। তোমাকে আমাদের গ্রাম দেখাব।”
ও বলত, “No way! পুজোর ছুটিতে আমরা বালি যাব। I have already booked the tickets.”
আমি বলতাম, “আমার মা তোমার সাথে কথা বলতে চায়।”
ও বলত, “Why? We are just dating. Let’s not involve families and make it complicated.”
ওর কাছে ‘ফ্যামিলি’ একটা কমপ্লিকেশন, আমার কাছে ‘ফ্যামিলি’ হলো জীবনের একমাত্র কনস্ট্যান্ট ভ্যারিয়েবল। ওর কাছে আমার গ্রাম একটা ‘ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন’, আমার কাছে ওটা আমার অস্তিত্বের রুট ডিরেক্টরি।

তবুও আমরা একে অপরকে আঁকড়ে ধরেছিলাম, যেমন একজন ড্রাউনিং ইউজার সাপোর্টের শেষ ভরসা আঁকড়ে ধরে। কারণ এই শহরে আমরা দুজনেই একা ছিলাম। স্নিগ্ধা তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভিড়ে একা, আর আমি আমার স্মৃতির ভিড়ে একা। গভীর রাতে যখন ওর ঘুম আসত না, ও আমার বুকে মাথা রেখে বলত, “Sometimes I feel like I am just a collection of deadlines and targets. Tell me something about your river.”
আর আমি ওকে তিস্তার গল্প শোনাতাম। বলতাম, কীভাবে বর্ষায় সে সব ভেঙেচুরে দেয়, আবার শীতে শান্ত হয়ে যায়, তার চরে কাশফুল ফোটে। এই গল্প শুনতে শুনতে ও ঘুমিয়ে পড়ত। হয়তো ওর অবচেতনে, ওর ডিজাইন করা পারফেক্ট গ্রিড সিস্টেমের বাইরে, ও এমন একটা хаотичной, unpredictable স্রোতের জন্য অপেক্ষা করত। হয়তো আমার মধ্যেই ও সেই স্রোতটা খুঁজে পেয়েছিল।

আমাদের সম্পর্কটা ছিল একটা сюрреалистичной কোলাজ। একদিকে ছিল আমার মায়ের পাঠানো নারকেল নাড়ু, আরেকদিকে ছিল ওর বানানো অ্যাভোকাডো টোস্ট। একদিকে ছিল আমার প্লে-লিস্টে ভূপেন হাজারিকার গান, অন্যদিকে ছিল ওর স্পটিফাই-এ লেটেস্ট ইডিএম ট্র্যাক। আমরা ছিলাম দুটো ভিন্ন টাইমজোনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ, যারা একটা দুর্বল ওয়াইফাই কানেকশনের মাধ্যমে নিজেদের সিঙ্ক করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ডেটা প্যাকেট লস হচ্ছিল, ল্যাটেন্সি বাড়ছিল, কিন্তু আমরা কানেকশনটা ছাড়তে পারছিলাম না।

একদিন আমাদের প্রোজেক্টের গো-লাইভ ছিল। সারারাত ধরে অফিসে কাজ। ভোর চারটের সময় যখন সব ডিপ্লয়মেন্ট শেষ হলো, ক্লায়েন্টের সাইন-অফ এলো, তখন টিমের সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। স্নিগ্ধাও আমাকে এসে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখে ছিল সাফল্যের ঝিলিক।
“We did it! Now, party time! And next quarter, I am aiming for the team lead position,” ওর গলায় ছিল জেট প্লেনের মতো তীব্র গতি।
আমি ক্লান্ত ছিলাম। আমার শরীর আর মন, দুটোই ব্যান্ডউইথ এক্সসিড করে গিয়েছিল। আমি শুধু বলেছিলাম, “চলো, কোথাও গিয়ে একটু বসি। শান্তিতে।”
আমরা অফিসের বাইরে এলাম। ভোরের আলো ফুটছে। গুড়গাঁওয়ের আকাশ ধূসর, ধোঁয়াশায় ঢাকা। কয়েকটা পাখি ডাকছে, কিন্তু তাদের ডাক গাড়ির হর্নের শব্দে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
স্নিগ্ধা একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “শান্তি? Peace is for retired people. We are hustlers. We have to keep running.”
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি এই মুখটা চিনি না। এই মেয়েটা, যে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার কেউ নয়। সে এই শহরের প্রোডাক্ট, এই কর্পোরেট সংস্কৃতির বাই-প্রোডাক্ট। ওর চোখে যে আগুন, তা আমার গ্রামের চুলার আগুন নয়, এ হলো ডেটা সেন্টারের সার্ভার র‍্যাকে জ্বলে ওঠা ইন্ডিকেটর লাইট। অবিরাম, নির্লিপ্ত, যান্ত্রিক।
আমার ভিতর তিস্তা আবার ফুঁসে উঠল। এবার আর কোনো ফায়ারওয়াল মানল না। সব অথেন্টিকেশন প্রোটোকল ভেঙে দিয়ে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, “আমি আর দৌড়াতে পারছি না, স্নিগ্ধা। I am tired. I want to go home.”
“Again with that home nonsense!” ওর গলা চড়ে গেল। “কী আছে তোমার ওই গ্রামে? What future do you have there? A patch of land and a slow internet connection? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?”
“হয়তো হয়ে গেছি,” আমি শান্তভাবে বললাম। “হয়তো এই শহরের জন্য আমি কম্প্যাটিবল নই। আমার অপারেটিং সিস্টেমটা পুরনো হয়ে গেছে। It keeps crashing.”
“Then upgrade yourself, dammit! People would kill for the life you have!”
“But I am the one who is dying, স্নিগ্ধা। Every single day.”

সেই ভোরবেলাটাই ছিল আমাদের ব্রেকআপ। কোনো নাটকীয়তা ছিল না, কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি ছিল না। ছিল শুধু দুটো সিস্টেমের মধ্যে একটা ফাইনাল, ফেটাল এরর মেসেজ। Connection timed out.
পরের এক মাস ছিল আমার নোটিশ পিরিয়ড। আমি আর স্নিগ্ধা একই ফ্লোরে কাজ করতাম, কিন্তু আমাদের মাঝে ছিল এক অদৃশ্য দেওয়াল, এক দুর্ভেদ্য ফায়ারওয়াল। আমরা একে অপরের দিকে তাকাতাম না, কথা বলতাম না। মাঝে মাঝে লিফটে বা ক্যাফেটেরিয়ায় দেখা হয়ে যেত। ও অন্যদিকে তাকিয়ে থাকত, যেন আমি ওর জীবনের একটা ব্রোকেন লিঙ্ক, একটা 404 Not Found error। ওর চোখে আমি কোনো দুঃখ দেখিনি, দেখেছিলাম বিরক্তি। যেন আমি একটা স্লো-লোডিং ওয়েবসাইট, যা ওর ইউজার এক্সপেরিয়েন্স খারাপ করে দিচ্ছে।

আমার শেষ দিনে, আমি আমার ডেস্ক পরিষ্কার করছিলাম। ডায়েরি, বই, আর একটা ছোট মাটির টবে রাখা মানিপ্ল্যান্ট। স্নিগ্ধা এসেছিল। আমার হাতে একটা বাক্স ধরিয়ে দিল। বলল, “All the best for your… future.”
বাক্সটা খুলে দেখেছিলাম, একটা দামি পাওয়ার ব্যাংক। ওর চোখেমুখে কোনো অভিব্যক্তি ছিল না। যেন ও একটা টাস্ক কমপ্লিট করছে।
আমি হেসেছিলাম। বলেছিলাম, “আমার যেখানে যাচ্ছি, সেখানে ইলেক্ট্রিসিটি মাঝে মাঝেই থাকে না। এটা কাজে লাগবে। Thanks.”
আমিও ওকে একটা জিনিস দিয়েছিলাম। আমার ড্রয়ারে রাখা একটা কাচের বোতলে ভরা ছিল তিস্তার জল আর চরের বালি। আমি যখন এসেছিলাম, সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম।
“এটা কী?” ও ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করেছিল।
“আমার সোর্স কোড,” আমি বলেছিলাম। “এটাকে ডিলিট করা যায় না।”

গুড়গাঁও থেকে শিয়ালদহগামী ট্রেনের জানালার ধারে বসে আছি। প্ল্যাটফর্ম ছাড়ার সাথে সাথে শহরটা পেছনে সরে যাচ্ছে। উঁচু উঁচু বিল্ডিং, ফ্লাইওভার, শপিং মল—সব যেন একটা ডিজলভ ট্রানজিশনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমার ল্যাপটপ ব্যাগে আছে রেজিগনেশন লেটারের প্রিন্ট আউট, আর বুকের ভিতর আছে একটা আনইনস্টলড ভালোবাসার লগ ফাইল।
আমার ফোন বাজছে। স্নিগ্ধা। আমি ফোনটা ধরিনি। কেটে দিয়েছি। তারপর ফোনটা সুইচ অফ করে দিয়েছি। সব কানেকশন বন্ধ। নো সিগন্যাল।
ট্রেনটা গতি বাড়াচ্ছে। বিহার, ঝাড়খণ্ড পেরিয়ে যখন बंगालে ঢুকবে, তখন বাতাস বদলে যাবে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ পাওয়া যাবে। ধানক্ষেতের সবুজ রঙ চোখে আরাম দেবে। তারপর আসবে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। সেখান থেকে অটো ধরে আমার গ্রাম।

এখন আমি আমার গ্রামের বাড়ির উঠোনে বসে আছি। সামনে দিগন্তবিস্তৃত ধানক্ষেত। আকাশে মেঘ করেছে। একটু পরেই বৃষ্টি নামবে। মাটির চুলার উপর মা চা বানাচ্ছে। বাতাসে এলাচ আর আদার গন্ধ। আমার ল্যাপটপটা ঘরের কোণায় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। পাওয়ার ব্যাংকটা তার বাক্সের মধ্যেই রয়ে গেছে, খোলা হয়নি।
আমার সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তিস্তা। বর্ষার জলে সে ফুলেফেঁপে উঠেছে। তার স্রোতের শব্দে কোনো যান্ত্রিকতা নেই। আছে এক আদিম, দুরন্ত ছন্দ। আমি সেই শব্দের দিকে তাকিয়ে থাকি। এই শব্দটা আমার হার্ডওয়্যারের সাথে কম্প্যাটিবল।
আমার আর গুড়গাঁওয়ের কথা মনে পড়ে না। স্নিগ্ধার মুখটা ঝাপসা হয়ে আসে। মাঝে মাঝে শুধু মনে হয়, ওই শহরের কোনো এক উঁচু ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে হয়তো এখনো আরও দ্রুত, আরও উঁচুতে ওঠার স্বপ্ন দেখছে। ওর হাতে হয়তো লেটেস্ট আইফোন, কানে এয়ারপড, আর প্লে-লিস্টে বাজছে কোনো নতুন গান।
আমার হাতে এখন কফির মগ নেই, আছে মাটির ভাঁড়। তাতে মায়ের বানানো গরম চা। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিই। নোনতা লাগে। হয়তো বৃষ্টির জল মিশে গেছে, অথবা হয়তো আমার চোখের জল। কে জানে! তিস্তার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়, সব স্রোতই শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে মেশে না। কিছু স্রোত নিজের উৎসতেই ফিরে আসে। নিজের রুটে ফিরে আসাটাও একটা যাত্রা। شاید এটাই আমার গো-লাইভ। এখানেই আমার প্রোডাকশন সার্ভার। এখানেই আমি, আমার সোর্স কোড, আমার নদী। এখানেই আমার বৃত্তান্ত। সমাপ্ত।


--------------------------



উত্তরবঙ্গের নদীমাতৃক: প্রাণের স্রোত, জীবনের গান

উত্তরবঙ্গ মানেই এক স্বতন্ত্র ভূগোল, এক অনন্য সংস্কৃতি। আর এই অঞ্চলের প্রাণশক্তি ও সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো তার অজস্র নদ-নদী। এগুলো কেবল পানির প্রবাহ নয়, এরা ইতিহাসের বাহক, সংস্কৃতির ধারক, এবং জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।

এই অঞ্চলের প্রধান নদীগুলো হলো তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা, আত্রাই, করতোয়া, পুনর্ভবা, সঙ্কোশ এবং ডুডুকে। প্রতিটি নামের সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, পুরাণ আর জনজীবনের নানা উপাখ্যান। তিস্তা তার রূপবদলের জন্য বিখ্যাত, কখনো উচ্ছ্বল যুবতী, কখনো ভয়ংকরী রাক্ষসী। তোর্সা বা ত্রিস্রোতা তার স্বচ্ছ নীল জলরাশি নিয়ে যেন হিমালয়ের কাছ থেকে আনা এক টুকরো শীতলতা। মহানন্দা বয়ে চলে গভীর ঔতিহাসিকতাকে সঙ্গী করে।

লাটাগুড়ি থেকে দিল্লিতে চাকরি করতে আসা শুভেন্দু   এই গুড়গাও শহরে সবকছুই বেমানান দেখে । এই শহরে নদী নাই । তার মনে পড়ে জলঢাকার স্মৃতি , তোর্সার জীবন যাপন । তার গ্রাম, সবুজ বনানী । এই শহরে তার একমাত্র ভালো লাগা গুড়্গাও তন্বী হাইহিল স্নিগ্ধা পোড়েল । স্নিগ্ধা তাকে গুড়গাওএর পাব,  ডি  এল এফ সাইবার সিটি  , এমবিয়েন্স সুপার মল সময় কাটাতে ডাকে । 

এই শহরে শুভেন্দু পছন্দের প্রেমিকা তো আছে, বাংলার নদী মাঠ নেই ।  এইখানে তার রোজগার তো আছে, কিন্তু তার শৈশবের স্মৃতি নাই । সে ফিরে যেতে যায় তার মাতৃভূমিতে । 


 নদীহীনতায়

উত্তরবঙ্গের নিজস্ব রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া আছে। শিরার মতো, ধমনীর মতো, তার ভূগোলের ভিতরে নিরন্তর বয়ে চলে জলীয় জীবন। এ শুধু জল নয়, এ হলো এক আদিম চেতনা, এক দ্রবীভূত ইতিহাস। হিমালয়ের বরফগলা আত্মা, যা পাথরে পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে নেমে আসে সমতলে, আর নিজের সঙ্গে বয়ে আনে পাহাড়ের নির্যাস, জঙ্গলের গোপন কথা আর হাজার হাজার বছরের acumulado পলিমাটি। এই নদীগুলোই হলো এই অঞ্চলের সোর্সকোড, যার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে মানুষের ভাগ্য, শস্যের বিন্যাস, আর সংস্কৃতির জটিল অ্যালগরিদম। তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা, করতোয়া, পুনর্ভবা, সঙ্কোশ, ডুডুকে—এগুলো শুধু নাম নয়, এগুলো এক-একটি জীবন্ত সত্তা। এদের নিজস্ব স্মৃতি আছে, নিজস্ব ক্রোধ আছে, নিজস্ব ভালোবাসা আছে।

তিস্তা এক খামখেয়ালি যুবতী, যার রূপ বদলায় চাঁদের কলার সাথে। বর্ষায় সে উন্মাদিনী, দু'কূল ছাপিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, স্বপ্ন, স্মৃতি। আবার শীতে সে শান্ত, স্ফটিকস্বচ্ছ, তার গভীরে দেখা যায় নুড়িপাথরের সংসার। তোর্সা যেন এক অভিজাত নারী, তার নীল জলে লেগে থাকে ভুটানের পাহাড়ের আভিজাত্য। জলঢাকা এক দুরন্ত কিশোর, যার বুকে ডুয়ার্সের জঙ্গলের ছায়া কাঁপে। আর মহানন্দা, সে যেন এক বৃদ্ধ ইতিহাসবিদ, বয়ে চলে চুপচাপ, তার গভীরে তলিয়ে আছে গৌড়-পাণ্ডুয়ার হারানো গৌরব। এই নদীগুলোর সাথে মানুষের সম্পর্ক নাড়ির। জন্ম থেকে মৃত্যু, বিবাহ থেকে অন্নপ্রাশন, সবকিছুর সাক্ষী এই জলপ্রবাহ। এখানকার মানুষ নদীর ভাষায় কথা বলে, নদীর গর্জনে ভয় পায়, নদীর শান্ত রূপে ভরসা খোঁজে। নদী শুকিয়ে যাওয়া মানে শুধু জল শুকিয়ে যাওয়া নয়, এর মানে সংস্কৃতির নাড়ি শুকিয়ে যাওয়া।

এইসব জিনের উত্তরাধিকার বহন করে আমি, শুভেন্দু, আটকে আছি এক নদীহীন ভূগোল, গুড়গাঁও। সেক্টর ফিফটি সিক্স। এখানে জলের একমাত্র উৎস আরও-প্ল্যান্ট আর প্লাস্টিকের বোতল। নদী বলতে যা আছে, তা হলো ন্যাশনাল হাইওয়ে-এইট, এক কংক্রিটের শুষ্ক নদী, যেখানে দিনরাত বয়ে চলে গাড়ির ধাতব স্রোত। এখানে আকাশ দেখা যায় না, দেখা যায় উঁচু উঁচু বিল্ডিং-এর ফাঁকে আটকে থাকা এক চিলতে ধূসর ক্যানভাস। লাটাগুড়ির জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যখন বিকেল নামতো, তখন空气তে একটা ভেজা গন্ধ থাকত। এখানে বাতাসে পোড়া ডিজেল আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ছুড়ে দেওয়া গরম দীর্ঘশ্বাস। আমার কিউবিক্যালটা একটা কাঁচের বাক্সের মধ্যে আরেকটা বাক্স। আমি একজন ডেটা সায়েন্টিস্ট। আমার কাজ হলো ভার্চুয়াল তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা, ডেটা পাইপলাইন তৈরি করা, অ্যালগরিদম লেখা। আমি এখানেও এক নদীর কারিগর, কিন্তু সে নদীতে জল নেই, আছে শুধু বাইটস আর বিটস। আমার বানানো নদীতে মাছেরা সাঁতার কাটে না, সাঁতার কাটে মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট।

আমার এই কংক্রিটের নির্বাসনে এক টুকরো মরূদ্যান আছে, তার নাম স্নিগ্ধা পোড়েল। গুড়গাঁও-এর নিখুঁত প্রোডাক্ট। দুধ-সাদা ত্বক, ক্যালোরি মেপে খাওয়া শরীর, পায়ে হাই-হিল, চোখে আরবান ডিকের আইলাইনার। স্নিগ্ধা আমার এই যান্ত্রিক জীবনে একটা লাইভলি অ্যানিমেশন। সে যখন কথা বলে, তখন তার ইংরেজি উচ্চারণে দিল্লির আভিজাত্য ঝরে পড়ে। সে আমাকে এই শহরের ভূগোল চেনায়। ডিএলএফ সাইবার হাবের নিওন-আলোর গোলকধাঁধা, অ্যাম্বিয়েন্স মলের ব্র্যান্ডেড দোকানগুলোর কাঁচের জৌলুস, গল্ফ কোর্স রোডের ঝাঁ-চকচকে পাব। সে মনে করে, জীবনের সম্পূর্ণতা লুকিয়ে আছে এই উইকেন্ড পার্টি আর লাক্সারি শপিং-এ। তার কাছে নদী মানে হলিডে ট্রিপে তোলা রাফটিং-এর ছবি, যা ইনস্টাগ্রামের ওয়ালে সাজানো থাকে হ্যাশট্যাগ ওয়ান্ডারলাস্ট দিয়ে।

স্নিগ্ধা যখন তার আইফোন-ফিফটিনে আমাদের সেলফি তোলে, তখন তার মুখে যে আলোটা খেলে যায়, সেটা সাইবার হাবের কোনো এক পাবে’র কৃত্রিম আলোর প্রতিফলন। আমার মনে পড়ে যায়, জলঢাকার ধারে বসে থাকলে পড়ন্ত বিকেলের আলো যখন নদীর জলে পড়ত, তখন জলটাকেও গলানো সোনার মতো দেখাত। সেই আলোর সাথে মিশে থাকত পোকা-মাকড়ের ডাক, দূর থেকে ভেসে আসা মাদলের শব্দ। এখানে আলোর সাথে মিশে থাকে ইলেকট্রনিক মিউজিকের বিট আর মানুষের কোলাহল। স্নিগ্ধা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় কোনো এক ভিড় পাবে। লাউড মিউজিকে কান পাতা দায়। সে আমার কানে কানে চিৎকার করে বলে, "আর ইউ হ্যাভিং ফান, শুভা?"

আমি হাসি। একটা মেকি হাসি। আমার তখন মনে পড়তে থাকে, ছোটবেলায় বাবার সাথে তোর্সার চরে পিকনিক করতে যাওয়ার কথা। নদীর ধারে বালি খুঁড়ে আমরা উনুন বানাতাম। মা রান্না করত, আর আমি আর বাবা মিলে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করতাম। মাছ প্রায়ই পেতাম না, কিন্তু ওই যে অনন্ত প্রতীক্ষা, জলের দিকে তাকিয়ে থাকা, ওই মুহূর্তগুলোর কোনো দাম হয় না। এখানে প্রতীক্ষা মানে প্রমোশনের প্রতীক্ষা, অ্যাপ্রাইজালের প্রতীক্ষা। এখানে সবকিছুই ট্রানজাকশনাল। স্নিগ্ধা আমাকে ভালোবাসে, কারণ আমি একজন সাকসেসফুল প্রফেশনাল, আইআইটি থেকে পাশ করা, ভালো স্যালারির প্যাকেজ। আমার এই ট্যাগগুলো সরিয়ে নিলে যা পড়ে থাকবে, সেই শুভেন্দুকে সে शायद চিনতেই পারবে না।

এই শহরে আমার প্রেমিকা আছে, কিন্তু জলঢাকার ধারে কুয়াশা মাখা সেই সকালটা নেই, যেখানে নদীর জল থেকে ধোঁয়ার মতো বাষ্প উঠত। এইখানে আমার স্যালারি একাউন্টে প্রতিমাসে মোটা মাইনে ঢোকে, কিন্তু শৈশবে মায়ের কাছে বায়না করে পাওয়া দশ টাকার সেই অনাবিল আনন্দটা নেই। আমার মনে হয়, আমি একটা হাই-স্পিড ডেটা ট্রান্সফারের মধ্যে আটকে গেছি, যেখানে আমার আত্মাটা সোর্স থেকে টার্গেটে যাওয়ার পথে কোথাও করাপ্ট হয়ে গেছে। আমি ফিরে যেতে চাই। কিন্তু ফেরার পথটা এক জটিল অ্যালগরিদমের মতো, যার কোনো সলিউশন আমার জানা নেই।

একদিন রাতে কাজ থেকে ফিরতে অনেক দেরি হলো। প্রোজেক্টের ডেডলাইন ছিল। ক্লায়েন্ট ক্যালিফোর্নিয়ার। আমাদের রাত জাগা মানে ওদের দিনের শুরু। একটা ক্রিটিক্যাল বাগ ফিক্স করতে গিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলার জোগাড়। অবশেষে যখন কাজ শেষ হলো, তখন দিল্লির ঘড়িতে রাত দুটো। ক্যাব করে ফিরছি। ড্রাইভার রেডিওতে একটা পুরনো হিন্দি গান চালিয়ে দিয়েছে। গাড়ির কাঁচের বাইরে গুড়গাঁওয়ের রাস্তাগুলো ফাঁকা, শুধু ছুটে চলেছে আরো কয়েকটা ক্যাব আর মালবাহী ট্রাক। আমার হঠাৎ করে দমবন্ধ লাগতে শুরু করল। মনে হলো, এই শহরটা একটা বিশাল ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, যা আমার ভেতর থেকে সমস্ত সবুজ, সমস্ত জলীয় অংশ শুষে নিচ্ছে। আমার ফুসফুস অক্সিজেনের বদলে কার্বন মনোক্সাইড চাইছে, আমার চোখ সবুজ দেখার জন্য আকুলি-বিকুলি করছে।

ফ্ল্যাটে ফিরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। সাতাশ তলার উপর থেকে নিচের শহরটাকে একটা সার্কিট বোর্ডের মতো লাগে। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা আলোগুলো যেন ডেটা পয়েন্ট। দূরে আরাবল্লীর একটা কাটাছেঁড়া আবছা সিলুয়েট দেখা যায়। একসময় নাকি এই আরাবল্লী থেকেই কোনো নদী জন্মাত। আজ সেখানে শুধু পাথরের খাদান আর রিয়েল এস্টেটের বিজ্ঞাপন। আমার হঠাৎ হাসি পেল। আমরা উন্নয়নের নামে আসলে নিজেদের কবর খুঁড়ছি। কংক্রিটের কবর।

স্নিগ্ধাকে ফোন দিলাম। সে ঘুম জড়ানো গলায় ফোন তুলল।
"হ্যালো... শুভা... এনিথিং রং?"
"না, এমনি। ঘুমোচ্ছিলে?"
"হুম। হোয়াট হ্যাপেন্ড? কাজ শেষ হলো?"
"হ্যাঁ। আচ্ছা স্নিগ্ধা, তোমার কখনো নদী দেখতে ইচ্ছে করে?"
ওপাশ থেকে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর একটা হালকা হাসির শব্দ। "হোয়াট আ র‍্যান্ডম কোয়েশ্চেন, শুভা! মাঝরাতে? উইকএন্ডে ঋষিকেশ যাওয়ার প্ল্যান তো করছিই আমরা।"
"না, আমি ওই হলিডে-র নদীর কথা বলছি না। আমি বলছি, এমন একটা নদী, যা তোমার জানলার নিচ দিয়ে বয়ে যায়। যার দিকে তাকিয়ে তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারো। যার শব্দ শুনে তুমি ঘুমোতে যাও।"
"আর ইউ ড্রাঙ্ক, শুভা? গুড়গাঁওতে তুমি নদী কোথায় পাবে? আর তাছাড়া, এখানে ওসব ভাবার সময় কার আছে? কাল সকালে আমার জিম আছে, তারপর একটা ব্রান্ড মিটিং। গুড নাইট।"

ফোনটা কেটে দিল স্নিগ্ধা। আমি জানি, ও আমার কথা বোঝেনি। বুঝতে পারবেও না। ওর পৃথিবীটা সুন্দর করে সাজানো, ফিল্টার করা, এডিটেড। সেখানে অপরিকল্পিত, বন্য, খামখেয়ালি নদীর কোনো জায়গা নেই। ওর জীবনে সবকিছুই প্রি-প্ল্যানড, ক্যালকুলেটেড। সম্পর্কগুলোও এখানে একটা প্রজেক্টের মতো, যার একটা কিক-অফ ডেট থাকে আর একটা সম্ভাব্য এন্ড-অফ-লাইফ।

আমার মনে হলো, এই যে আমি ডেটা নিয়ে কাজ করি, কোটি কোটি মানুষের আচরণ, তাদের পছন্দ-অপছন্দ, তাদের কেনাকাটার অভ্যেস—এই সমস্ত কিছু বিশ্লেষণ করে আমরা তাদের জন্য ভার্চুয়াল জগৎ তৈরি করি। আমরা তাদের এমন একটা মায়াজাল দেখাই, যা তারা সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এই গুড়গাঁও শহরটাও তো তাই। একটা বড় আকারের ভার্চুয়াল রিয়ালিটি। এখানে শপিং মলের ভেতরে কৃত্রিম ঝর্ণা আছে, রেস্তোরাঁর দেওয়ালে সমুদ্রের ছবি লাগানো আছে, কিন্তু আসল জল নেই, আসল সমুদ্র নেই।

পরদিন অফিসে গিয়েও মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে রইল। আমার ডেস্কটপের ওয়ালপেপারটা ছিল লাটাগুড়ির মূর্তি নদীর ছবি। একটা বাঁক, তার ধারে ঘন জঙ্গল, আর আকাশে মেঘের আনাগোনা। আমার টিম লিড, প্রকাশ স্যার, পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, "নাইস পিকচার, শুভেন্দু। হুইচ প্লেস?"
"স্যার, মাই হোমটাউন। নর্থ বেঙ্গল।"
"ওহ, বিউটিফুল! শুনেছি ওখানে নাকি খুব বৃষ্টি হয়?"
আমি বললাম, "স্যার, ওখানে শুধু বৃষ্টি হয় না, ওখানে আকাশটা মাটি ধুইয়ে দিয়ে যায়। আমাদের ওখানে নদীগুলো শুধু জল বয়ে নিয়ে যায় না, স্যার, জীবন বয়ে নিয়ে যায়।"

প্রকাশ স্যার হাসলেন। একটা কর্পোরেট হাসি। "দ্যাটস ভেরি পোয়েটিক, শুভেন্দু। বাই দ্য ওয়ে, কালকের বাগ ফিক্সের জন্য ক্লায়েন্ট খুব খুশি। দে সেন্ট অ্যান অ্যাপ্রিসিয়েশন মেল। কিপ আপ দ্য গুড ওয়ার্ক।"
তিনি চলে গেলেন। অ্যাপ্রিসিয়েশন মেল। গুড ওয়ার্ক। আমার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। এই প্রশংসার জন্য, এই স্যালারির জন্য আমি আমার নদীগুলোকে ছেড়ে এসেছি। এই যে ডাটার সমুদ্রে আমি রোজ সাঁতার কাটি, এর বিনিময়ে আমি আমার সত্যিকারের নদীগুলোকে হারিয়ে ফেলেছি।

সেদিন সন্ধ্যায় স্নিগ্ধার সাথে দেখা করার কথা ছিল। অ্যাম্বিয়েন্স মলে। একটা নতুন ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ খুলেছে। আমি পৌঁছানোর পর দেখি, সে একটা লাল ড্রেস পরে বসে আছে। তাকে অসাধারণ সুন্দর লাগছিল। কিন্তু আমার কিছুই ভালো লাগছিল না। মলের ভেতরের কৃত্রিম আলো, মানুষের ভিড়, সবকিছু অসহ্য মনে হচ্ছিল।
স্নিগ্ধা আমার মুড বুঝতে পারল। "তোমার কী হয়েছে, শুভা? কাল রাত থেকেই দেখছি, তুমি কেমন আপসেট।"
আমি ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম। "স্নিগ্ধা, আমি এখানে আর থাকতে পারছি না।"
"হোয়াট ডু ইউ মিন? তুমি কি চাকরি ছাড়ার কথা ভাবছ? আর ইউ ম্যাড? ডু ইউ নো তোমার প্যাকেজটা কতজনের স্বপ্ন?"
"স্বপ্ন? মাই ফুট! দিস ইজ আ নাইটমেয়ার! একটা দুঃস্বপ্ন, যা থেকে আমি বেরোতে পারছি না।" আমার গলার স্বর চড়ে গেল। আশেপাশের টেবিল থেকে দু-একজন আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।

"স্নিগ্ধা, তোমরা এই শহরটাকে বলো মিলেনিয়াম সিটি। কিসের মিলেনিয়াম? যেখানে একটা নদী নেই, যেখানে মানুষ মাটির গন্ধ পায় না, যেখানে বাচ্চারা জানে না ধান গাছ কেমন দেখতে হয়, সেটা কিসের শহর? এটা একটা সোনার খাঁচা। যেখানে সবকিছু পাওয়া যায়, শুধু প্রাণটা ছাড়া।"
স্নিগ্ধার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। "তুমি আমাকে ইনসাল্ট করছ, শুভা। আমি এই শহরেই জন্মেছি, বড় হয়েছি। দিস ইজ মাই হোম।"
"হোম? এটা একটা হোটেল। একটা ট্রানজিট ক্যাম্প। যেখানে মানুষ আসে টাকা কামাতে আর তারপর হারিয়ে যায়। এখানে কেউ কাউকে চেনে না। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, তার খবরও কেউ রাখে না। সবাই নিজের নিজের কিউবিক্যালে বন্দী। তোমাদের সম্পর্কগুলোও তো ওয়াইফাই সিগন্যালের মতো। যতক্ষণ রেঞ্জে আছো, ততক্ষণ কানেক্টেড। রেঞ্জের বাইরে গেলেই ডিসকানেক্টেড।"

আমার ভেতর থেকে যেন লাভা বেরিয়ে আসছিল। এতদিন ধরে জমে থাকা সব ক্ষোভ, সব যন্ত্রণা।
"তোমরা পুঁজিবাদ পুঁজিবাদ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলো। আরে আসল পুঁজিবাদ তো তোমাদের মগজে। তোমরা সবকিছুকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছ। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, প্রকৃতি—সবকিছুই তোমাদের কাছে একটা কেনাবেচার জিনিস। ডোন্ট টিচ মি অ্যাবাউট লাইফ, স্নিগ্ধা! তোমরা জীবন চেনোই না! জীবন মানে শুধু উইকেন্ডে পার্টি করা আর ইনস্টাগ্রামে ছবি আপলোড করা নয়। জীবন মানে হলো ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে নদীর জলের ছলছল শব্দ শুনে ঘুম ভাঙা। জীবন মানে হলো বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভিজে মাটিতে সোঁদা গন্ধটা বুক ভরে নেওয়া। তোমরা শালা সেই জীবনের মানে কী বুঝবে? তোমাদের তো নাক আর চোখ দুটোই ব্র্যান্ডের চশমায় ঢাকা।"

স্নিগ্ধার চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করেছে। সে উঠে দাঁড়াল। "আই থিঙ্ক উই আর ডান।"
সে চলে গেল। আমি একা বসে রইলাম। রেস্তোরাঁর মিউজিক সিস্টেমে একটা নরম সুর বাজছে। আমার নিজেকে খুব একা মনে হলো। আমি কি একটু বেশি বলে ফেললাম? হয়তো। কিন্তু যা বলেছি, একটা কথাও মিথ্যে বলিনি।

আমি জানি, স্নিগ্ধার কোনো দোষ নেই। সে এই ইকোসিস্টেমেই বড় হয়েছে। তার কাছে এটাই স্বাভাবিক। দোষটা আমার। আমিই মানিয়ে নিতে পারছি না। আমার ডিএনএ-তে যে নদীর জল বয়ে চলেছে, তাকে আমি অস্বীকার করতে পারছি না।

অনেক রাতে ফ্ল্যাটে ফিরলাম। ল্যাপটপ খুলে মূর্তি নদীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, নদীটা আমাকে ডাকছে। তার ঠান্ডা জল দিয়ে আমার এই শহরের দেওয়া সমস্ত জ্বালা জুড়িয়ে দিতে চাইছে। আমি জানি, আমাকে ফিরতে হবে। এই ভার্চুয়াল নদীর জগৎ ছেড়ে, আমার সত্যিকারের নদীর কাছে ফিরতে হবে। হয়তো আমার স্যালারি কম হবে, হয়তো আমার লাইফস্টাইলে চাকচিক্য থাকবে না। কিন্তু সেখানে আমার আত্মাটা শ্বাস নিতে পারবে।

পরদিন সকালে আমি রেজিগনেশন লেটারটা টাইপ করলাম। তারপর ফ্লাইট বুকিং-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে বাগডোগরার টিকিট খুঁজতে লাগলাম। স্ক্রিনে প্লেনের ছবিটা ভেসে উঠল। আমার মনে হলো, এটা প্লেন নয়, এটা একটা যান্ত্রিক পাখি, যা আমাকে আমার নদীহীনতার নির্বাসন থেকে মুক্তি দিয়ে আমার সবুজ, জলভরা মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। যেখানে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা আজও বয়ে চলেছে। নিরন্তর, অফুরন্ত, আদিম এক ছন্দে। আমার মুক্তির সোর্সকোড সেখানেই লেখা আছে।

Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ