ইন্ডিয়া গেটের বৃত্তান্ত: ছায়ার খেলা

লুটিয়েন্স বৃত্তান্ত: অ্যালগরিদমের খেলা

দিল্লি একটা সার্ভার। একটা করাপ্টেড সার্ভার। এর বাতাসে অক্সিজেন নয়, ভেসে বেড়ায় ডেটা প্যাকেট—কিছু এনক্রিপ্টেড, কিছু ওপেন-সোর্স, বেশিরভাগই ম্যালওয়্যার। যমুনা এখানে মরা নদী নয়, একটা লিকুইড কুলিং সিস্টেম যা এই শহরের পলিটিক্যাল সিপিইউ-কে অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচায়, সমস্ত নোংরা আবর্জনা নিজের মধ্যে নিয়ে। আমি এই সার্ভারের একজন ব্যাক-এন্ড ডেভেলপার। আমার নাম আয়ান। লোকে বলে স্ট্র্যাটেজিস্ট। আমি বলি, আমি শুধু অ্যালগরিদম লিখি। এমন অ্যালগরিদম, যা মানুষের লোভ, ভয় আর নিরাপত্তাহীনতাকে ইনপুট হিসেবে নেয় আর আউটপুট হিসেবে দেয় ক্ষমতা। ক্লিন কোড? এথিক্যাল হ্যাকিং? ওসব লিঙ্কডইন প্রোফাইলের জন্য। এখানকার কোডবেসটাই হলো স্প্যাগেটি কোড—জটিল, নোংরা, কিন্তু কাজ করে। পার্লামেন্ট স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্র্যাফিক লাইটের লাল, হলুদ আর সবুজ—এগুলো সিগন্যাল নয়, এগুলো হলো একেকটা কন্ডিশনাল স্টেটমেন্ট: if ‘টাকা’ then ‘সবুজ’, else if ‘চাপ’ then ‘হলুদ’, else ‘লাল’।

আমার বস, আমার সিইও, আমার বানানো সবচেয়ে সফল প্রোডাক্টের নাম ভাস্কর চৌধুরী। আজ দেশের হোম মিনিস্টার। পাঁচ বছর আগে ও ছিল একটা আননোন ভ্যারিয়েবল, একটা আনডিফাইন্ড ফাংশন। বিহারের ধুলোমাখা কোনো এক গলি থেকে উঠে আসা একটা ছেলে, যার চোখে ছিল ফর্টি-পার্সেন্ট ব্যাটারি লেভেল নিয়েও হাই-পারফরম্যান্স গেমিং খেলার মতো খিদে। আমি তখন একটা পোলিং এজেন্সিতে ডেটা ক্রাঞ্চিং করতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক্সেল শিটে ডুবে থেকে ভোটার বিহেভিয়ারের প্যাটার্ন খুঁজতাম। আমার কাছে মানুষ ছিল না, ছিল ডেটা পয়েন্ট। ভাস্কর আমার অফিসে এসেছিল একটা ক্লায়েন্ট হিসেবে নয়, একটা আইডিয়া নিয়ে। ওর কাছে টাকা ছিল না, মাসল পাওয়ার ছিল না। ছিল শুধু একটা অবিশ্বাস্য রিস্ক নেওয়ার ক্ষমতা আর একটা গলা, যে গলার স্বরে মিথ্যেকেও ওরাকল ডেটাবেস থেকে বেরোনো সত্যির মতো শোনাত।
“আয়ান-জি,” সে বলেছিল, "আপনি নাম্বার নিয়ে খেলেন। আমি মানুষ নিয়ে খেলি। চলুন, একটা পার্টনারশিপ করা যাক। আপনার ডেটা আর আমার ডেয়ারিং। আমরা এই শহরের অপারেটিং সিস্টেমটাই বদলে দেব।"
সেদিন ওর চোখে আমি একটা বাগ দেখেছিলাম। একটা ইনফাইনাইট লুপের বাগ—ক্ষমতার জন্য অফুরন্ত, যুক্তিহীন একটা চক্র। আমি জানি, এই ধরনের বাগ সিস্টেমকে ক্র্যাশ করিয়ে দেয়। কিন্তু আমি জুয়াটা খেলেছিলাম। কারণ আমার চাকরিটা ছিল বোরিং, আমার জীবনটা ছিল একটা স্টেবল রিলিজ—সিকিওর, কিন্তু এক্সাইটিং নয়। আমি একটা বেটা টেস্টিং করতে চেয়েছিলাম। লাইভ এনভায়রনমেন্টে।

আমাদের দল, 'রাষ্ট্রশক্তি মঞ্চ'। নামটা শুনলে মনে হয় যেন ইস্পাতের মতো কঠিন, দেশের জন্য নিবেদিত। ভেতরে ভেতরে এটা একটা ডার্ক ওয়েব ফোরামের মতো। এখানে সবাই অ্যানোনিমাস ইউজার, একে অপরের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালাচ্ছে। এখানে লিডারশিপ মানে সার্ভিস নয়, লিডারশিপ মানে সার্ভারের অ্যাডমিন অ্যাক্সেস। যার কাছে রুট পাসওয়ার্ড, সেই রাজা। আর সেই পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করার জন্য সবাই একে অপরের সিস্টেমে ট্রোজান হর্স পাঠাচ্ছে, কীলগার ইনস্টল করছে। বিশ্বাসঘাতকতা এখানে বাগ নয়, ফিচার।

আমরা শুরু করেছিলাম জিরো থেকে। ভাস্কর ছিল ফ্রন্ট-এন্ড, ইউজার ইন্টারফেস। আমি ব্যাক-এন্ড। আমি ওকে ডেটা দিতাম—কোন এলাকায় কোন জাতের লোক বেশি, কোন ইস্যুতে পাবলিক সেন্টিমেন্ট হাই, কোন বিরোধী নেতার কোন দুর্বলতা আছে। আমার ল্যাপটপে ছিল দিল্লির সব বড় নেতার ভার্চুয়াল কুণ্ডলী। কার কোথায় বেনামি সম্পত্তি, কার কোন অবৈধ সম্পর্ক, কার অ্যাকাউন্টে কোথা থেকে টাকা ঢোকে—আমার কাছে সবকিছুর লগ ফাইল ছিল। এটা চুরি? হ্যাঁ। এটা অনৈতিক? অবশ্যই। কিন্তু পলিটিক্স কোনো ওপেন-সোর্স প্রজেক্ট নয়, স্যার। এটা একটা ক্লোজড ডোর, হাই-স্টেকস হ্যাকাথন। এখানে এথিক্সের কথা বললে লোকে হাসে।

আমাদের প্রথম বড় ব্রেক ছিল এক সিনিয়র নেতা, ভারদ্বাজ-জি'কে সরানো। ভারদ্বাজ-জি ছিলেন দলের ফায়ারওয়াল—পুরনো, কিন্তু মজবুত। তাঁকে টপকানো যাচ্ছিল না। আমি তাঁর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অ্যানালাইসিস শুরু করলাম। তাঁর ইমেল, তাঁর চ্যাট, তাঁর লোকেশন হিস্ট্রি। একটা ছোট ক্লু পেলাম। একটা নির্দিষ্ট রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সাথে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ। ঘুষ? হ্যাঁ, তবে প্রমাণ করা কঠিন। ঘুষ এখানে কারেন্সি, স্যার। ইউপিআই ট্রানজাকশনের চেয়েও বেশি চলে।
আমি ভাস্করকে বললাম, "সরাসরি অ্যাটাক করে লাভ নেই। ভারদ্বাজ-জি'র সিস্টেম প্যাচড। আমাদের একটা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাটাক করতে হবে।"
আমরা একটা মিথ্যে গল্প বানালাম। ভারদ্বাজ-জি নন, ওই রিয়েল এস্টেট কোম্পানিটা নাকি বিরোধী দলের কাছ থেকে টাকা খাচ্ছে। আমরা এই ‘খবর’টা আমাদের কেনা কিছু মিডিয়া পোর্টালে ‘সোর্স’ হিসেবে লিক করে দিলাম। এটা ছিল একটা পারফেক্ট ডিডিওএস (DDoS) অ্যাটাক। আসল টার্গেট ভারদ্বাজ-জি, কিন্তু আমরা হিট করলাম তাঁর সবচেয়ে দুর্বল কানেকশনটাকে। পাবলিকের মধ্যে একটা ন্যারেটিভ তৈরি হলো। ভারদ্বাজ-জি'র সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। তিনি ডিফেন্সিভ হয়ে গেলেন। তাঁর নিজের সিস্টেমেই তিনি আর বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এই সুযোগে, দলের অন্দরের মিটিং-এ ভাস্কর উঠে দাঁড়াল।
সে ভারদ্বাজ-জি'কে ডিফেন্ড করল। "ভারদ্বাজ-জি'র মতো সৎ নেতা আমাদের দলে নেই," সে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো অভিনয় করল। "এটা বিরোধীদের চাল। আমাদের লিডারকে বদনাম করার ষড়যন্ত্র।"
এটা ছিল একটা মাস্টারপিস অফ আ লাই। একটা নিখুঁত জুয়া। সে নিজেকে ভারদ্বাজ-জি'র রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরল, আর পর্দার আড়ালে সেই তাঁর সিস্টেমের অ্যাডমিন পাসওয়ার্ডটা চুরি করে নিল। মিটিং শেষে হাইকম্যান্ড যখন চিন্তিত, ভাস্কর একা গিয়ে বলল, "পাবলিক পারসেপশন ইজ এভরিথিং। এই মুহূর্তে ভারদ্বাজ-জি'কে কিছুদিন সাইডলাইনে রাখাই দলের জন্য ভালো।"
ভারদ্বাজ-জি সাইডলাইন হয়ে গেলেন। সেই শূন্যস্থান পূরণ করল ভাস্কর। এটা ছিল একটা ঠান্ডা মাথার ডিজিটাল অ্যাসাসিনেশন। কোনো রক্তপাত নেই, কোনো প্রমাণ নেই। শুধু কিছু ডেটা, কিছু মিথ্যে আর নিখুঁত টাইমিং।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ভাস্কর বদলে গেল। পাওয়ার একটা ভাইরাসের মতো। ওটা একবার সিস্টেমে ঢুকলে আপনার কোর ফাইলগুলোকেই করাপ্ট করে দেয়। যে ভাস্কর আমার সাথে বসে ফুটপাতের দোকানে চা খেত, সে এখন ইটালিয়ান মার্বেলের অফিসে বসে স্কচ খায়। যে আমার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডেটা নিয়ে আলোচনা করত, সে এখন পাঁচ মিনিটের বেশি সময় দেয় না। তার চারপাশে এখন নতুন কোডার, নতুন ডেভেলপার। আমি হয়ে গেলাম একটা লেগাসি সিস্টেম, যাকে শুধু মেনটেন করা হয়, আপগ্রেড করা হয় না।
ওর সেলফিশনেস এখন আর ব্যক্তিগত স্তরে নেই, ওটা এখন পলিসি লেভেলে। এমন সব প্রজেক্ট পাশ হয় যেখানে ওর ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের লাভ। এমন সব আইন আনা হয় যা ওর ক্ষমতাকে আরও নিরঙ্কুশ করে। চুরি এখন আর ফাইল বা ডেটার নয়, এখন চুরি হয় পাবলিকের টাকা, দেশের রিসোর্স। ও এখন আর শুধু মিথ্যে বলে না, ও এখন 'অল্টারনেটিভ ফ্যাক্টস' তৈরি করে। ওর বানানো মিথ্যের ইকোসিস্টেমে বাস করে কোটি কোটি মানুষ।

আমি এখন ওর ওয়ার-রুমে বসে থাকি। একটা কাঁচের ঘর, যার দেওয়ালে দেওয়ালে বড় বড় স্ক্রিন। তাতে রিয়েল-টাইম ডেটা ফিড আসে—সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড, নিউজ চ্যানেল হেডলাইন, অপজিশনের মুভমেন্ট। আমি এখানে বসে যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি বানাই। কিন্তু আমার নিজের ভেতরের যুদ্ধটা আমি হেরে যাচ্ছি। আমার অ্যালগরিদমগুলো এখন আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। ওগুলো একটা সেলফ-লার্নিং মডিউলে পরিণত হয়েছে, যা ক্রমাগত আরও বেশি ক্ষমতা, আরও বেশি নিয়ন্ত্রণের জন্য অপটিমাইজড হয়ে চলেছে।
গতকাল রাতে ভাস্কর ডেকে পাঠিয়েছিল। ওর বাংলোর লনে। লুটিয়েন্সের দিল্লির রাত। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের বদলে শোনা যায় নিরাপত্তারক্ষীদের ওয়াকিটকির শব্দ।
"আয়ান," সে গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, "সামনের নির্বাচনে আমাদের একটা নতুন ন্যারেটিভ লাগবে। ইমোশনাল। ধর্ম বা দেশপ্রেম—কিছু একটা ভাবো। ডেটা কী বলছে?"
আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। সেই আননোন ভ্যারিয়েবলের চোখ আর নেই। এখন এটা একটা কম্পাইলড কোড—এফিসিয়েন্ট, পাওয়ারফুল, কিন্তু সোল-লেস।
আমি বললাম, "ডেটা বলছে, মানুষ ক্লান্ত। তারা চাকরি চায়, শান্তি চায়।"
ভাস্কর হাসল। সেই হাসিটা আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল। "ফাক দ্য ডেটা, আয়ান। ডেটা পাবলিকের মুড দেখায়, লিডার পাবলিকের মুড তৈরি করে। তুমি অ্যালগরিদম বানাও, আমি ইমোশন বিক্রি করব। দ্যাটস দ্য ডিল।"

আমি আমার ল্যাপটপ খুলি। একটা নতুন ফাইল। ফাইলের নাম: 'Operation_Judgement_Day'। আমার আঙুলগুলো কি-বোর্ডের ওপর দৌড়ায়। আমি আবার একটা অ্যালগরিদম লিখছি। একটা মিথ্যের অ্যালগরিদম। একটা বিশ্বাসঘাতকতার অ্যালগরিদম।
আমি জানি, আমি যা করছি তা পাপ। আমি একটা গোটা প্রজন্মকে ধোঁকা দিচ্ছি। আমি এই গণতন্ত্র নামক অপারেটিং সিস্টেমের ভেতরে একটা র‍্যানসমওয়্যার ইনস্টল করছি, যা একদিন গোটা সিস্টেমটাকেই লক করে দেবে। কিন্তু আমি থামতে পারি না। কারণ আমিও এই জুয়ার নেশায় আসক্ত। এই রিস্ক, এই ক্ষমতা, এই অ্যাড্রিনালিন রাশ—এটা আমার ড্রাগ।
দিল্লির আকাশে ভোরের আলো ফুটছে। কিন্তু এই শহরে কোনোদিন সকাল হয় না। এখানে একটা চব্বিশ ঘণ্টার রাত চলে। ইন্ডিয়া গেটের মাথায় যে আলোটা জ্বলে, ওটা আশার আলো নয়। ওটা একটা সার্ভারের স্ট্যান্ডবাই লাইট। জানান দিচ্ছে, সিস্টেমটা স্লিপ মোডে আছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি। যে কোনো মুহূর্তে আবার জেগে উঠবে, নতুন কোনো খেলা শুরু করার জন্য। আর আমি, সেই খেলার একজন ডেভেলপার, কি-বোর্ডে ঝুঁকে পড়ে পরের আপডেটের জন্য কোড লিখে চলেছি। আমার নিজের আত্মার বিনিময়ে। কারণ এটাই দিল্লি। এখানে এথিক্স একটা কমেন্টেড আউট লাইন; কম্পাইলার ওটাকে এক্সিকিউট করে না।

Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ