biggan chorcha
ল্যাবরেটরির টেবিলে এক নীল আলো
--পীযূষকান্তি বিশ্বাস
"স্বপ্ন সেটা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো,
স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে
ঘুমোতে দেয় না।"
----
এপিজে আব্দুল কালাম
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ঢাকার শাহবাগের মোড় কিংবা কলকাতার কফি হাউজ—দৃশ্যপট
অনেকটা একই। একদল তরুণ তুর্কী স্বপ্নে
বিভোর । টেবিলে ঝড় তুলছে। তাদের
এক হাতে দামী স্মার্টফোন, অন্য হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। আলোচনার বিষয়বস্তু?
রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন এবং সবশেষে বিজ্ঞান। কিন্তু সমস্যা হলো,
আলোচনাটা আর আলাদা আলাদা খোপে নেই। সব মিলেমিশে একাকার। যাকে
আমরা ‘এনট্যাঙ্গলমেন্ট’ বলি কোয়ান্টাম ফিজিক্সে,
সমাজ জীবনেও আজ তাই ঘটেছে। রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে নেতা বলছেন
বিজ্ঞানের কথা (যা আসলে অপবিজ্ঞান), ধর্মগুরু ইউটিউবে লাইভ এসে ব্যাখ্যা করছেন ব্লাক হোল (যা আসলে
কুসংস্কার), আর দর্শনের ক্লাসে ছাত্ররা প্রশ্ন করছে—"স্যার, বিগ ব্যাং
কি তবে অমুক ধর্মগ্রন্থে আগেই লেখা ছিল না?" এই
যে জগাখিচুড়ি—যেখানে বিশ্বাস, যুক্তি, ক্ষমতা আর দর্শন সব এক পাচনতন্ত্রে
সেদ্ধ হচ্ছে—এই খানে একটু পরিষ্কার
করে বলা প্রয়োজন বিজ্ঞান কি , কেন, কতোটা পরিমান ও প্রয়োজনীয়তার তালিকায় কতো নাম্বারে থাকবে । সবাই
জ্ঞানী, সবাই সব বিষয়ে উস্তাদ । সবাই স্বপ্ন দেখছে উঁচুতে উঠবে । উচ্চতা অধরা থেকে
যাচ্ছে ।
২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট। ভারতীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিট। গোটা বিশ্ব রুদ্ধশ্বাসে
তাকিয়ে ছিল একটি স্ক্রিনের দিকে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে অবতরণ করল ভারতের ল্যান্ডার
‘বিক্রম’। ভারত হয়ে উঠল বিশ্বের প্রথম দেশ যারা চাঁদের দুর্গম দক্ষিণ মেরুতে পা রাখতে
সক্ষম হয়েছে। এই একটি ঘটনা কেবল একটি রকেট উৎক্ষেপণের সাফল্য নয়,
এটি ছিল ভারতের কয়েক হাজার বছরের বিজ্ঞান সাধনা,
অধ্যবসায় এবং আত্মনির্ভরশীলতার এক চূড়ান্ত ঘোষণা।
আজকের ভারত কেবল বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিই নয়,
বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতেও এক প্রবল পরাশক্তি। মহাকাশ গবেষণা
থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি, পারমাণবিক শক্তি থেকে শুরু করে বায়োটেকনোলজি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই
ভারত তার সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। প্রাচীন ঋষিদের গাণিতিক সূত্র থেকে শুরু করে আধুনিক
আইআইটি-র ল্যাবরেটরি—ভারতের বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ,
বর্তমান তেমনই গতিশীল। ভারতের
বিজ্ঞান চর্চার যাত্রা এক রোলার কোস্টার রাইডের মতো। প্রাচীন ঋষিদের তপোবন থেকে শুরু
করে ইসরোর হাই-টেক কন্ট্রোল রুম—এই যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ কিন্তু গৌরবময়।
আজ ভারত যখন জি-২০ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করে,
তখন তার মূল এজেন্ডা থাকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানবকল্যাণ।
ভারত প্রমাণ করেছে যে, বিজ্ঞান চর্চা শুধু ধনী দেশগুলোর বিলাসিতা নয়,
এটি উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি।
ভারতের সামনে পথ এখনো দীর্ঘ। জিডিপির ১ শতাংশের কম খরচ করে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞান
শক্তি হওয়া কঠিন। তবে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা যুবশক্তি।
ভারতের লক্ষ লক্ষ তরুণ চোখ আজ স্বপ্ন দেখে নতুন কিছু আবিষ্কার করার। চন্দ্রযান-৩ এর
সাফল্য সেই স্বপ্নকে আরও রঙিন করেছে।
ইতিহাসের শিকড়—প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতঃ
ভারতের বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল হাজার বছর আগে। ভারত বলতে,
বাংলাদেশ, পাকিস্থান, বর্তমান ভারত এবং আফগানিস্থানের কিছু অংশ নিয়ে আর্যাবর্তের ধারণা
ছিলো । বিম্বিশার অশোক, কনিষ্কের যুগে ভারত ছিলো পৃথিবীর ভিতর 'ডেভেলপড কান্ট্রি' । যখন বিশ্বের অনেক সভ্যতা অন্ধকারের মধ্যে ছিল,
তখন সিন্ধু উপত্যকা থেকে শুরু করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত—জ্ঞান
ও বিজ্ঞানের আলো জ্বলছিল।
·
গণিত
ও জ্যোতির্বিজ্ঞান ভারতের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ‘শূন্য’ (Zero)
আবিষ্কার। আর্যভট্ট,
ব্রহ্মগুপ্ত এবং ভাস্করাচার্যের মতো গণিতবিদরা বীজগণিত,
ত্রিকোণমিতি এবং ক্যালকুলাসের প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট
তার ‘আর্যভট্টীয়’ গ্রন্থে পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘোরে এবং দিন-রাত্রির কারণ যে
পৃথিবীর আহ্নিক গতি—তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন। পিথাগোরাসের উপপাদ্যের অনেক আগেই
ভারতে শুল্বসূত্রের ব্যবহার ছিল।
·
চিকিৎসা
বিজ্ঞান ও শল্যচিকিৎসা চরক সংহিতা এবং সুশ্রুত সংহিতা আজও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে
বিস্ময়। মহর্ষি সুশ্রুতকে বলা হয় ‘প্লাস্টিক সার্জারির জনক’। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার
বছর আগে তিনি ছানি অপারেশন, রাইনোপ্লাস্টি (নাকের সার্জারি) এবং সিজারিয়ান সেকশন করার পদ্ধতি
বর্ণনা করে গেছেন। আয়ুর্বেদ আজও বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে
স্বীকৃত।
·
ধাতুবিদ্যা
ও নগর পরিকল্পনা দিল্লির কুতুব মিনার চত্বরে অবস্থিত ‘লৌহ স্তম্ভ’ (Iron
Pillar) ভারতীয় ধাতুবিদ্যার এক
অনন্য নিদর্শন। হাজার বছর ধরে রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকলেও এতে কোনো মরিচা পড়েনি,
যা তৎকালীন রসায়নবিদদের দক্ষতার প্রমাণ দেয়। এছাড়া হরপ্পা ও
মহেঞ্জোদারোর নগর পরিকল্পনা, ড্রেনেজ সিস্টেম এবং ইটের ব্যবহার সেই সময়ের প্রকৌশল বিদ্যার
উৎকর্ষতা প্রমাণ করে।
পরাধীন ভারতের বিজ্ঞান রেনেসাঁ (উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী)
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত রাজনৈতিকভাবে পরাধীন থাকলেও,
মানসিকভাবে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা ছিলেন অদম্য। উনবিংশ শতাব্দীর
শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরু ছিল ভারতীয় বিজ্ঞানের ‘স্বর্ণযুগ’। এই সময়েই আধুনিক ভারতীয়
বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
·
জগদীশ
চন্দ্র বসু ও সত্যেন বোস আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেছিলেন যে উদ্ভিদের প্রাণ
আছে এবং তারা উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। একই সঙ্গে তিনি বেতার তরঙ্গ (Microwave)
নিয়ে গবেষণা করেন, যা আধুনিক ওয়াইফাই প্রযুক্তির পূর্বসূরি। অন্যদিকে,
সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন।
তাদের আবিষ্কৃত ‘বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্স’ এবং ‘বোসন’ কণা (God
Particle) আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্সের
ভিত্তি।
·
সি. ভি.
রামন ও নোবেল জয় ১৯২৮ সালে চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন ‘রামন এফেক্ট’ আবিষ্কার করেন,
যা আলোর বিচ্ছুরণ সংক্রান্ত এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। এই কাজের
জন্য ১৯৩০ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানে নোবেল
বিজয়ী প্রথম এশীয়।
·
মেঘনাদ
সাহা ও শ্রীনিবাস রামানুজন জ্যোতির্বদার্থবিজ্ঞানে মেঘনাদ সাহার ‘আয়নাইজেশন সমীকরণ’ তারাদের
তাপমাত্রা ও উপাদান নির্ণয়ে আজও ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে,
গণিতের জাদুকর শ্রীনিবাস রামানুজন কোনো প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই
গণিতের এমন সব সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন যা আজও বাঘা বাঘা গণিতবিদদের বিস্মিত করে।
এই বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছিলেন যে, ল্যাবে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব থাকলেও কেবল মেধা দিয়ে বিশ্বজয়
করা সম্ভব।
স্বাধীন ভারতের বিজ্ঞান যাত্রা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারতের সামনে ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য,
দুর্ভিক্ষ এবং নিরক্ষরতা। কিন্তু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী
জহরলাল নেহরু বিশ্বাস করতেন, “বিজ্ঞানই একমাত্র যা ভারতের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করতে পারে।”
তিনি বিজ্ঞানকে জাতীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন।
·
সায়েন্টিফিক
টেম্পার ও আইআইটি (IIT) গঠন নেহরুর ভিশন বা দূরদর্শিতা ছিল ‘সায়েন্টিফিক টেম্পার’ বা বিজ্ঞানমনস্কতা
তৈরি করা। ১৯৫১ সালে খড়গপুরে প্রথম ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (IIT)
স্থাপিত হয়। আজ ভারতে ২৩টি আইআইটি রয়েছে,
যেগুলো বিশ্বমানের ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রযুক্তিবিদ তৈরির কারখানা
হিসেবে পরিচিত। গুগলের সুন্দর পিচাই থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় টেক জায়ান্টদের সিইও—অনেকেই
এই আইআইটি-র প্রাক্তন ছাত্র।
·
হোমি
ভাবা ও পারমাণবিক কর্মসূচি ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবাকে বলা হয় ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির
জনক। তার নেতৃত্বে ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’ (TIFR)
এবং পরে ‘ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার’ (BARC)
গঠিত হয়। ভারত তার পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে লাগানোর
পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ১৯৭৪ এবং ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায়।
এটি ভারতকে কৌশলগতভাবে বিশ্বের দরবারে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।
·
বিক্রম
সারাভাই ও মহাকাশ স্বপ্ন ড. বিক্রম সারাভাইয়ের হাত ধরে ভারতের মহাকাশ গবেষণা শুরু হয়।
১৯৬৯ সালে গঠিত হয় ‘ইসরো’ (ISRO)। শুরুতে
সাইকেলে করে রকেটের যন্ত্রাংশ বহন করা সেই সংস্থাটি আজ নাসা বা ইএসএ-র সমকক্ষ।
·
সবুজ
বিপ্লব ও শ্বেত বিপ্লব বিজ্ঞান চর্চার সবচেয়ে বড় সুফল ভারত পেয়েছিল কৃষিতে। ষাটের দশকে
এম.এস. স্বামীনাথনের নেতৃত্বে ‘সবুজ বিপ্লব’ ভারতকে খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্য উদ্বৃত্তের
দেশে পরিণত করে। উচ্চ ফলনশীল বীজ এবং আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার কোটি কোটি মানুষকে
অনাহরের হাত থেকে বাঁচায়। একইভাবে ভার্গিস কুরিয়েনের নেতৃত্বে ‘শ্বেত বিপ্লব’ ভারতকে
বিশ্বের বৃহত্তম দুধ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করে।
মহাকাশ গবেষণায় ভারতের উত্থান (ISRO)
ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান
বর্তমান বিশ্বে ভারতের বিজ্ঞান চর্চার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলো ‘ইন্ডিয়ান স্পেস
রিসার্চ অর্গানাইজেশন’ বা ইসরো। ইসরোর সাফল্য ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সক্ষমতাকে
এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
·
কম খরচে
বিশ্বমানের প্রযুক্তি (Frugal Engineering) ইসরোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত কম খরচে জটিল মিশন সফল
করা। ২০১৪ সালে ভারত প্রথম প্রচেষ্টাতেই মঙ্গলের কক্ষপথে ‘মঙ্গলযান’ পাঠাতে সক্ষম হয়।
এই পুরো মিশনের খরচ ছিল হলিউডের ‘গ্র্যাভিটি’ সিনেমার বাজেটের চেয়েও কম। এটি বিশ্বের
সামনে ভারতের ‘Frugal Engineering’ বা সাশ্রয়ী প্রকৌশলবিদ্যার দক্ষতা প্রমাণ করে।
·
চন্দ্রযান
মিশনসমূহ ২০০৮ সালে চন্দ্রযান-১ চাঁদে জলের কণা আবিষ্কার করে হইচই ফেলে
দেয়। এরপর ২০১৯ সালে চন্দ্রযান-২ এর ল্যান্ডার ব্যর্থ হলেও অরবিটারটি সফলভাবে কাজ করে।
অবশেষে ২০২৩ সালে চন্দ্রযান-৩ এর মাধ্যমে ভারত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফট ল্যান্ডিং
করে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এই সাফল্য ভারতকে মহাকাশ গবেষণার এলিট ক্লাবে (রাশিয়া,
আমেরিকা ও চীনের পাশে) বসিয়েছে।
·
পিএসএলভি
ও বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ ভারতের ‘পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল’ (PSLV)
বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য রকেট। ভারত আজ শুধু নিজের স্যাটেলাইট
নয়, আমেরিকা,
ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ বিশ্বের বহু দেশের স্যাটেলাইট অর্থের বিনিময়ে মহাকাশে
পাঠাচ্ছে। এটি ভারতের বিজ্ঞান চর্চাকে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করেছে।
·
৪.৪ গগনযান
ও আদিত্য-এল১ ভারতের পরবর্তী লক্ষ্য মানুষ পাঠানো। ‘গগনযান’ মিশনের মাধ্যমে
ভারত মহাকাশে নভোচারী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়া সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য
‘আদিত্য-এল১’ ইতিমধ্যেই সফলভাবে তার গন্তব্যে পৌঁছেছে।
কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন ভারত প্রমাণ করেছে কেন তাকে ‘বিশ্বের ফার্মেসি’ বলা
হয়। বিজ্ঞান চর্চার এই ক্ষেত্রটি ভারতের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি—উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
·
ভ্যাকসিন
মৈত্রী ও টিকা উৎপাদন করোনা মহামারির সময় ভারতের দুটি ভ্যাকসিন—‘কোভ্যাক্সিন’ (ভারত
বায়োটেক) এবং ‘কোভিশিল্ড’ (সিরাম ইনস্টিটিউট) কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। ভারত
বায়োটেকের কোভ্যাক্সিন ছিল সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। ভারত শুধু নিজের নাগরিকদের
নয়, ‘ভ্যাকসিন
মৈত্রী’ কর্মসূচির আওতায় বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে টিকা সরবরাহ করেছে।
·
জেনেরিক
ওষুধের পরাশক্তি বিশ্বের মোট জেনেরিক ওষুধের চাহিদার প্রায় ২০% ভারত সরবরাহ করে।
এইডস, ক্যান্সার এবং যক্ষ্মার মতো রোগের ওষুধ অত্যন্ত কম দামে তৈরি করে ভারত আফ্রিকা
ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে পাঠাচ্ছে। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের রসায়ন বিদ্যায় দক্ষতা এই
শিল্পকে দাঁড় করিয়েছে।
·
ডিএনএ
ফিঙ্গারপ্রিন্টিং ও বায়োটেক ড. লালজি সিং-এর নেতৃত্বে ভারত ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং প্রযুক্তিতে
নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করে, যা বিচার ব্যবস্থায় অপরাধী শনাক্তকরণে বিপ্লব এনেছে। বর্তমানে
ভারত জিন এডিটিং এবং স্টেম সেল গবেষণায়ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছে।
·
বিজ্ঞানের
অগ্রগতিঃ
বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও ভারতবর্ষ জুড়ে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ দেশটিকে
অর্থনৈতিক, সামাজিক স্বচ্ছলতার এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে । দেশের জিডিপি গ্রোথ, স্টার্সআপ,
অটোমেশন, ডিজিটাল বিপ্লব ও
ফিনটেক , আবহাওয়া বিশ্লেষণ, আই-টি
ডেভেলপমেন্টে তে জোয়ার এনেছে । এখন বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশ ভারতে ইনভেস্ট করতে চায়,
দেশের উন্নতির ভাগীদার হতে চায় । বিজ্ঞানের উন্নতি ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে সাধারণ
মানুষের জীবনে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। একটা সময় ছিল যখন ভারতকে 'সাপে-কাটুড়ে'র দেশ বা
দুর্ভিক্ষের দেশ বলা হতো, কিন্তু বিজ্ঞানের হাত ধরে আজ ভারত বিশ্বমঞ্চে এক শক্তিশালী
অবস্থানে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সবুজ বিপ্লবে মানুষকে
দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি মিলেছে, । স্বাধীনতার
পর ভারতে খাদ্যের অভাব ছিল। বিজ্ঞানীদের তৈরি উচ্চ ফলনশীল বীজ, সার
এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার ফলে ষাটের দশকে 'সবুজ বিপ্লব' (Green Revolution) হয়। এর ফলে ভারত আজ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং
খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ। বৃদ্ধি
পেয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার । এখন কৃষকরা মোবাইলেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস পান, ড্রোন
ব্যবহার করে কীটনাশক ছড়ান এবং ই-নাম (e-NAM) পোর্টালে ফসলের
ন্যায্য দাম পান। চিকিৎসা ও
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও দেখা যায় উন্নয়ন
। বিজ্ঞানের কল্যাণে ভারত আজ পোলিও
এবং গুটিবসন্ত মুক্ত। টিকা বা ভ্যাক্সিন তৈরিতে ভারত বিশ্বের অন্যতম সেরা। কোভিডের
সময় ভারত নিজেরা ভ্যাক্সিন তৈরি করে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে । আধুনিক চিকিৎসা, অ্যান্টিবায়োটিক
এবং অস্ত্রোপচারের সুবিধার কারণে ভারতীয়দের গড় আয়ু (Life Expectancy) যা স্বাধীনতার সময় ছিল মাত্র ৩২ বছর, তা আজ বেড়ে ৭০-এর কোঠায় পৌঁছেছে। সাশ্রয়ী
হয়েছে চিকিৎসা । জেনেরিক মেডিসিন তৈরিতে ভারতের উন্নতির ফলে গরিব মানুষ খুব
কম দামে জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে। দেশে ডিজিটাল বিপ্লব ও ফিনটেক (UPI) এর সহয়তায় ব্যবসা বানিজ্যে সুবিধা পাচ্ছে ছোট ব্যবসায়ীরা
। ভারতের ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থা
আজ বিশ্বের কাছে বিস্ময়। সবজি বিক্রেতা থেকে শপিং মল—সবার কাছে কিউআর কোড (QR Code) আছে।
পকেটে মানিব্যাগ না থাকলেও চলে। এটি কালো টাকা রুখতে এবং সাধারণ মানুষের সময়
বাঁচাতে সাহায্য করেছে। সস্তা ডেটার কারণে গ্রামের মানুষও আজ বিশ্বজগতের
সাথে যুক্ত। অনলাইনে শিক্ষা, বিনোদন এবং তথ্যের অধিকার সবার হাতের মুঠোয়।
মহাকাশ বিজ্ঞান উন্নতি হওয়ার সঙ্গে
সঙ্গে বেড়েছে প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া । একটা সময় ঘূর্ণিঝড়ে ওড়িশা বা অন্ধ্রপ্রদেশে হাজার হাজার
মানুষ মারা যেত। আজ ইসরো-র (ISRO)
উন্নত স্যাটেলাইটের কারণে নিখুঁত পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ফলে
ফনী বা আম্পানের মতো বড় ঝড়েও প্রাণহানি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। দুর্গম
পাহাড়ে বা সমুদ্রের মাঝেও যে যোগাযোগ ব্যবস্থা (TV, Mobile Network), তা মহাকাশ বিজ্ঞানেরই দান। যাতায়াত ও
পরিকাঠামোতে উন্নত হয়েছে জীবনযাত্রা।
গরুর গাড়ি থেকে আজ আমরা বন্দে ভারত এক্সপ্রেস বা বুলেট
ট্রেনের যুগে। মেট্রো রেল শহরের যানজট থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছে। দূষণ
কমাতে ব্যাটারি চালিত রিকশা এবং গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে, যা
পরিবেশ ও পকেট—উভয়ের জন্যই লাভজনক।
সমাজ বিজ্ঞানে, মানুষের অধিকারে উন্নতির একর চরম উচ্চতায় রয়েছে
ভারতবর্ষ । নারী ক্ষমতায়ন ও
জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে ভারত এখন
সর্বসামাজিক স্তরে জীবনমান উন্নত করেছে । মিক্সার গ্রাইন্ডার, ওয়াশিং মেশিন, এলপিজি গ্যাস কানেকশন—এই সাধারণ
বিজ্ঞানভিত্তিক যন্ত্রগুলো ভারতীয় মা-বোনেদের রান্নাঘরের ধোঁয়া ও হাড়ভাঙা খাটুনি
থেকে মুক্তি দিয়েছে। সিসিটিভি
ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং মোবাইলের এসওএস (SOS) ফিচার
নারীদের নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করছে।
সমাজে বিজ্ঞানের প্রভাব ও কুসংস্কার বিরোধী লড়াই
এরপর যেটা রয়ে যায়, সেটা কুসংস্কার ও শতাব্দী পেরোনো অচলায়তন
। যেখানে বিজ্ঞান শুধু ল্যাবে সীমাবদ্ধ
নয়, এটি সমাজের
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের হাতিয়ার। ভারতে বিজ্ঞান প্রসারের একটি বড় অংশ হলো কুসংস্কারের
বিরুদ্ধে লড়াই। কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদ বা ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটির মতো সংগঠনগুলো
সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরিতে কাজ করছে। যদিও জ্যোতিষশাস্ত্র বা অপবিজ্ঞানের
চর্চা এখনো সমাজে প্রবল, তবুও স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের প্রসার গ্রামীণ ভারতেও তথ্যের
অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করেছে, যা ধীরে ধীরে অন্ধবিশ্বাস দূর করতে সাহায্য করছে। বিজ্ঞান
এখনো সর্বস্তরে পৌঁছাতে পারেনি । এখনো উড়িষ্যার কালাহান্ডিতে চিকিৎসা অভাবে মারা যাচ্ছে
সাধারণ লোক । নিউজপেপারে এখনো ঝাঁড়ফুক ও আংটি বেচার বিজ্ঞাপন সদর্পে ছেপে বেরোচ্ছে
। বিজ্ঞান থেকে বিশ্বাস অধিক পরিচিতি পাচ্ছে এই উপমহাদেশে ।
বাংলাদেশ—দ্বিধাদ্বন্দ্বের দোলাচল নিয়ে পদ্মার ওপারে তাকালে চিত্রটা
খুব একটা ভিন্ন নয়, তবে তার রংটা আলাদা। বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চার পথে প্রধান বাধা
হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা।
·
বাংলাদেশের
সাম্প্রতিক শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে,
তা বিজ্ঞানের জন্য অশনি সংকেত। আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা,
বিবর্তনবাদ (Evolution), এবং প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গেলেই এক বিশেষ শ্রেণীর
ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগছে।
·
স্কুলের
পাঠ্যবই থেকে ডারউইনের তত্ত্ব বাদ দেওয়ার দাবি উঠছে। ইউটিউব এবং ফেসবুকের ওয়াজ মাহফিলগুলোতে
বিজ্ঞানকে প্রতিনিয়ত ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে,
"বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করেছে,
তা তো আমাদের কিতাবে আগেই ছিল।" এই মানসিকতা শিক্ষার্থীদের
মনে এক অদ্ভুত আলস্য তৈরি করে। তারা ভাবে,
"সবই যখন জানা আছে,
তখন আর কষ্ট করে গবেষণা করার কী দরকার?"
·
হুমায়ুন
আজাদের ওপর আক্রমণ থেকে শুরু করে অভিজিৎ রায় ও অন্যান্য বিজ্ঞানমনস্ক ব্লগারদের হত্যাকাণ্ড—বাংলাদেশের
বিজ্ঞান চেতনার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। একজন তরুণ যখন দেখে যে,
মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব বা বিগ ব্যাং নিয়ে লিখলে তাকে 'নাস্তিক' তকমা দিয়ে কোপানো হতে পারে,
তখন সে চুপ করে যায়।
·
এই ভয়ের
সংস্কৃতি (Culture of Fear) একটা জাতির মেধা বিকাশের পথে সবথেকে বড় অন্তরায়। বিজ্ঞানী কুদরাত-ই-খুদা
বা জামাল নজরুল ইসলামের মতো বিজ্ঞানীরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন,
আজকের বাংলাদেশে তা যেন কিছুটা ফিকে হয়ে আসছে।
·
বাংলাদেশের
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতির চর্চা যতটা হয়,
বিজ্ঞান চর্চা ততটা হয় কি?
ছাত্র রাজনীতি সেখানে এতটাই প্রবল যে,
লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরির চেয়ে মিছিল-মিটিংয়ে সময় দেওয়াটা 'কেরিয়ার'-এর জন্য বেশি লাভজনক মনে হয়। গবেষণার জন্য বরাদ্দ বাজেট নামমাত্র।
কৃষি বিজ্ঞানে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে (যেমন পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং),
কিন্তু মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান বা মহাকাশ গবেষণায় তারা এখনো অনেক
পিছিয়ে। কারণ একটাই—রাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাব এবং অপবিজ্ঞানের দাপট।
দর্শন ও ধর্মের গোলকধাঁধা
এখন প্রশ্ন হলো,
বিজ্ঞান কি ধর্ম বা দর্শনের শত্রু?
উত্তর হলো—না।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট
আইনস্টাইন বলেছিলেন, "Science without
religion is lame, religion without science is blind." কিন্তু এখানে 'রিলিজিয়ন' বলতে তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গোঁড়ামি বোঝাননি,
বুঝিয়েছেন মহাজাগতিক বিস্ময় বা আধ্যাত্মিকতাকে।
সমস্যাটা কোথায় জানেন? সমস্যাটা হলো 'ডোমেইন' বা সীমানা না মানা।
বিজ্ঞান উত্তর দেয়—"কীভাবে" (How)।
দর্শন উত্তর দেয়—"কেন" (Why)।
ধর্ম উত্তর দেয়—"বিশ্বাস ও নৈতিকতা" নিয়ে।
যখন ধর্মগুরু বলেন যে তিনি ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক কারণ জানেন (পাপের ফল!),
অথবা রাজনীতিবিদ বলেন যে তিনি দর্শনের শেষ কথা জানেন—তখনই জগাখিচুড়িটা
তৈরি হয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের বুঝতে হবে যে,
ল্যাবরেটরিতে বসে ঈশ্বরের খোঁজ করা যেমন বোকামি,
তেমনি ধর্মগ্রন্থ দিয়ে রকেটের গতিপথ মাপতে যাওয়াও বোকামি। এই
দুটি সমান্তরাল রেখা, এদের জোর করে মেলাতে গেলেই সংঘর্ষ বাধে।
উত্তরণের পথ—একটি রূপরেখা
তাহলে উপায়? ভারত ও বাংলাদেশ, এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র কীভাবে এই অন্ধকার কাটিয়ে আবার জ্ঞানের
মশাল জ্বালাবে? এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। নিচে কিছু প্রস্তাবনা বা ভাবনার খোরাক
দেওয়া হলো:
·
'সায়েন্টিফিক টেম্পার'
বা বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলাঃ ভারতের
সংবিধানের ৫১এ (এইচ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,
প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য হলো "to
develop the scientific temper, humanism and the spirit of inquiry and
reform."
·
আমাদের
শুধু বিজ্ঞান পড়লে হবে না, 'বিজ্ঞানমনস্ক' হতে হবে। বিজ্ঞানমনস্কতা মানে এই নয় যে আপনাকে সব সময় ফিজিক্সের
সূত্র আউড়াতে হবে। এর মানে হলো—যেকোনো তথ্য শোনার পর প্রশ্ন করা: "এর প্রমাণ কী?
সূত্র কী?" স্কুল পর্যায় থেকে শিশুদের শেখাতে হবে যে,
শিক্ষকের কথা বা বইয়ের লেখাও ভুল হতে পারে যদি তা প্রমাণের সঙ্গে
না মেলে। বাংলাদেশে বা ভারতে যে 'মুখস্থ বিদ্যা'র সংস্কৃতি চালু আছে,
তা ভেঙে 'হাতে-কলমে' শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
·
রাজনীতিকে
শ্রেণিকক্ষের বাইরে রাখাঃ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় রাজনীতির আখড়া থেকে মুক্ত করতে হবে।
উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ—সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে মেধার
বিচার করতে হবে। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, বিজ্ঞানী বা গবেষকরা কোনো দলের ভোটব্যাংক নন,
তাঁরা দেশের সম্পদ। তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে তাঁরা
দেশ ছাড়বেন, আর আমরা পড়ে থাকব মেধাশূন্য এক ভূখণ্ডে।
·
ধর্ম
ও বিজ্ঞানের সহাবস্থানঃ ধর্মীয় নেতাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাঁদের বোঝাতে হবে যে,
বিজ্ঞান ধর্মের শত্রু নয়। মানুষ অসুস্থ হলে যেমন ডাক্তারের কাছে
যায়, তেমনি
প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে হলে বিজ্ঞানের কাছেই যেতে হবে। মধ্যযুগের ইউরোপে গ্যালিলিওকে চার্চ
শাস্তি দিয়েছিল, কিন্তু আজ পোপও বিবর্তনবাদ মেনে নিচ্ছেন। আমাদের আলেম-ওলামা ও পুরোহিতদেরও সময়ের
সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই বার্তা দিতে হবে যে, জ্ঞান অর্জন করা ইবাদতেরই অংশ,
তা সে পরীক্ষাগারেই হোক বা পাঠাগারে।
·
গণমাধ্যমের
ভূমিকাঃ টিভির পর্দায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জ্যোতিষী আর ভাগ্যগণকদের
আসর না বসিয়ে বিজ্ঞানের ডকুমেন্টারি দেখানো হোক। খবরের কাগজে 'রাশিফল'-এর পাতাটা কমিয়ে 'বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি'
পাতাটা বড় করা হোক। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের দায়িত্ব
নিতে হবে ভুয়ো খবর বা অপবিজ্ঞান ছড়ানো বন্ধ করার।
·
ভারত-বাংলাদেশ
বৈজ্ঞানিক মৈত্রীঃ রাজনীতিতে
দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন থাকতেই পারে, কিন্তু বিজ্ঞানের কোনো বর্ডার নেই। সুন্দরবনের জলবায়ু পরিবর্তন
হোক বা গঙ্গার দূষণ—সমস্যাগুলো আমাদের যৌথ। তাই সমাধানও যৌথভাবেই খুঁজতে হবে। ভারত
ও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা মিলে যদি একটি 'সাউথ এশিয়ান সায়েন্স ফোরাম'
গঠন করেন, তবে তা দুই দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। সত্যেন বোস আর মেঘনাদ
সাহা যদি সেই পরাধীন ভারতে বসে বিশ্বজয় করতে পারেন,
তবে আজকের স্বাধীন ভারত ও বাংলাদেশের তরুণরা কেন পারবে না
বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চার পথে অন্তরায় ও চ্যালেঞ্জসমূহ
কেন বাংলাদেশ জিডিপির মাত্র ০.৩০ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করে?
কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিশ্বমানের উদ্ভাবন আসছে
না? এর পেছনে
রয়েছে বহুমুখী সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ। নিচে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা
হলো:
·
অপর্যাপ্ত
তহবিল ও বাজেট স্বল্পতা বাংলাদেশে গবেষণার সবচেয়ে বড় বাধা হলো অর্থের অভাব। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
গবেষণার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ থাকে, তা হাস্যকর রকমের কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই বাজেট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা
এবং প্রশাসনিক কাজেই শেষ হয়ে যায়। ল্যাবের রাসায়নিক দ্রব্য কেনা বা ফিল্ড ওয়ার্কের
জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যায় না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা আরও করুণ। গুটিকয়েক
বাদে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ‘ডিগ্রি প্রদানের যন্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার
করা হয়, যেখানে গবেষণার কোনো বালাই নেই। সরকারি সংস্থা (যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়)
যে ফেলোশিপ বা অনুদান দেয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য এবং তা পাওয়ার প্রক্রিয়াও দীর্ঘমেয়াদি।
আন্তর্জাতিক তহবিল বা গ্রান্ট পাওয়ার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও নেটওয়ার্কিং প্রয়োজন,
অনেক গবেষকের তা নেই।
·
ল্যাব
সুবিধার অপর্যাপ্ততা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংকট বিজ্ঞান চর্চা কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়,
এটি ব্যবহারিক। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক ও প্রাইভেট
বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাবরেটরির অভাব প্রকট। যেসব ল্যাব আছে,
সেখানেও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব। আরও বড় সমস্যা হলো রক্ষণাবেক্ষণ।
অনেক সময় বড় প্রজেক্টের আওতায় দামি যন্ত্রপাতি (যেমন- Electron
Microscope, NMR machine) কেনা
হয়। কিন্তু সেই যন্ত্র চালানোর মতো দক্ষ টেকনিশিয়ান থাকে না অথবা যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে
গেলে মেরামতের জন্য কোনো বাজেট থাকে না। ফলে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত
হয়ে পড়ে থাকে এবং একসময় নষ্ট হয়ে যায়। এই ‘কবরস্থান সমতুল্য’ ল্যাবগুলো গবেষণার পরিবেশ
নষ্ট করে দেয়।
·
দক্ষ
জনশক্তি ও ব্রেইন ড্রেইন (Brain Drain) গবেষণার জন্য শুধু টাকা বা ল্যাব থাকলেই হয় না,
প্রয়োজন মেধাবী গবেষক। বাংলাদেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গবেষক এবং
ইঞ্জিনিয়ারের তীব্র সংকট রয়েছে। এর মূল কারণ ‘মেধাপাচার’ বা Brain
Drain। দেশের সেরা মেধাগুলো যখন দেখে দেশে গবেষণার পরিবেশ নেই,
উপযুক্ত পারিশ্রমিক নেই এবং ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা নেই,
তখন তারা বিদেশ পাড়ি জমায়। আমেরিকা,
ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার ল্যাবগুলোতে বাংলাদেশি গবেষকরা দুর্দান্ত
কাজ করছেন, কিন্তু দেশে ফিরে তারা সেই সুযোগ পান না। দেশে পিএইচডি গবেষকদের জন্য সম্মানজনক
পদ বা বেতন স্কেল নেই। ফলে মেধাবীরা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন,
আর দেশ মেধাশূন্য হতে থাকে।
·
গবেষণার
সংস্কৃতি ও মানসিকতার অভাব আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মুখস্তনির্ভর। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকে
শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন করার মানসিকতা বা কৌতূহল জাগিয়ে তোলার পরিবর্তে জিপিএ-৫
পাওয়ার প্রতিযোগিতা শেখানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও সেই একই ধারা অব্যাহত থাকে। শিক্ষকরাও
অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার চেয়ে রাজনীতি বা প্রশাসনিক পদোন্নতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন।
পদোন্নতির জন্য যেটুকু প্রকাশনা প্রয়োজন, অনেকে তা ‘প্রিডেটরি জার্নাল’ (টাকার বিনিময়ে পেপার ছাপানো জার্নাল)
এ প্রকাশ করে দায় সারেন। প্রকৃত জ্ঞান সৃষ্টির সংস্কৃতি বা ‘Research
Culture’ এখনো আমাদের একাডেমিয়ায়
গড়ে ওঠেনি।
·
তথ্যাবলীর
অভিগম্যতা বা জার্নাল এক্সেস গবেষণার পূর্বশর্ত হলো লিটারেচার রিভিউ বা আগের কাজ সম্পর্কে
জানা। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন
জার্নালগুলো (যেমন- Nature, Science, Elsevier, IEEE) সাবস্ক্রাইব করে না। একজন ছাত্র বা গবেষক যখন পেপার ডাউনলোড
করতে গিয়ে দেখেন প্রতিটি পেপারের জন্য ৩০-৪০ ডলার দাবি করা হচ্ছে,
তখন তিনি নিরুৎসাহিত হন। পাইরেটেড সাইট ছাড়া বৈধ উপায়ে সাম্প্রতিক
গবেষণাপত্র পড়ার সুযোগ খুব সীমিত।
·
বুদ্ধিমত্তা
সম্পত্তি বা আইপি (Intellectual Property) সুরক্ষার অভাব উদ্ভাবন এবং গবেষণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মেধাস্বত্ব
বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) রাইটস। কেউ যদি নতুন কিছু আবিষ্কার করেন,
তবে তার আইনি সুরক্ষা পাওয়া জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে পেটেন্ট
(Patent) করার
প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘমেয়াদি এবং আমলাতান্ত্রিক। আইপি আইন এবং এর প্রয়োগ দুর্বল
হওয়ার কারণে উদ্যোক্তা ও কোম্পানিগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D)
বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। কারণ,
তাদের উদ্ভাবিত পণ্য বা প্রযুক্তি সহজেই নকল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি
থাকে। ফলে প্রাইভেট সেক্টর গবেষণায় আগ্রহ হারায়।
·
শিল্প
ও একাডেমিয়ার বিচ্ছিন্নতা (Industry-Academia Gap) উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে গবেষণা হয়,
তার বড় যোগানদাতা হলো শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের
উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে ফান্ড দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিয়ার
মধ্যে কোনো সংযোগ নেই। আমাদের দেশের শিল্পমালিকরা মনে করেন,
গবেষণায় টাকা ঢালা মানে অপচয়;
এর চেয়ে বিদেশ থেকে প্রযুক্তি কিনে আনা সহজ। অন্যদিকে,
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও শিল্পের চাহিদা না বুঝেই গবেষণা করেন,
যার কোনো বাস্তবিক প্রয়োগ হয় না।
·
সরকারি
নীতি ও প্রণোদনার অভাব গবেষণাকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রাইভেট সেক্টরের
জন্য কোনো কার্যকর ট্যাক্স হলিডে বা কর রেবাতের ব্যবস্থা নেই। কোনো কোম্পানি যদি তাদের
লভ্যাংশের একটি অংশ গবেষণায় ব্যয় করে, তবে তাদের কর মওকুফ করার জোরালো কোনো নীতি নেই। ফলে বেসরকারি
খাত গবেষণায় বিনিয়োগে কোনো আগ্রহ দেখায় না।
·
গবেষণায়
বেসরকারি খাতের ভূমিকা: একটি বড় শূন্যতা । বাংলাদেশের
জিডিপির আকার ৪৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দেশে অনেক বড় বড় শিল্প গ্রুপ তৈরি হয়েছে
যারা হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। ওষুধ শিল্প,
তৈরি পোশাক শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প—এগুলো বিশ্ববাজারে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু
প্রশ্ন হলো, এই কোম্পানিগুলোর নিজস্ব R&D উইং কতটা শক্তিশালী?
দুর্ভাগ্যবশত, হাতেগোনা দু-একটি ওষুধ কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশেরই নিজস্ব কোনো
গবেষণা সেল নেই। তারা মূলত রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং বা ফর্মুলা কপি করে পণ্য উৎপাদন করে।
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও,
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বা ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স গবেষণায় এই খাতের
মালিকদের বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। অথচ ভিয়েতনাম বা চীনে বেসরকারি খাতই গবেষণার মূল চালিকাশক্তি।
যতক্ষণ না দেশের বেসরকারি খাত গবেষণাকে ‘খরচ’ না ভেবে ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখবে,
ততক্ষণ জাতীয়ভাবে বিজ্ঞান চর্চার উন্নতি সম্ভব নয়।
বিজ্ঞান চর্চায় বাংলাদেশ বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে অর্থনীতির
উল্লম্ফন, অন্যদিকে গবেষণায় স্থবিরতা—এই বৈপরীত্য দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য শুভ নয়। জিডিপির
০.৩০ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা অসম্ভব।
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে ১০৬তম অবস্থান আমাদের সম্ভাবনার প্রতি সুবিচার করে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল আমাদের অবকাঠামোগত সক্ষমতার প্রতীক,
কিন্তু একটি জাতির প্রকৃত মেরুদণ্ড হলো তার মেধা ও উদ্ভাবনী
শক্তি। যদি আমরা ল্যাবরেটরিতে আলো জ্বালাতে না পারি,
যদি আমরা আমাদের মেধাবী তরুণদের গবেষণার টেবিলমুখী করতে না পারি,
তবে উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা টেকসই হবে না।
সময় এসেছে বিজ্ঞান ও গবেষণাকে জাতীয় অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে নিয়ে আসার। সরকার,
বেসরকারি খাত, একাডেমিয়া এবং নীতি নির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ
বিজ্ঞান চর্চায় বিশ্বমঞ্চে সম্মানজনক আসনে অধিষ্ঠিত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। চ্যালেঞ্জ
অনেক, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা আর সদিচ্ছা থাকলে এই অচলায়তন ভাঙা সম্ভব। ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ
বাংলাদেশ গড়তে হলে আজই আমাদের বিজ্ঞানের হাত ধরতে হবে।
বর্তমান বিশ্ব , ভারত ও বাংলাদেশঃ
বিজ্ঞান চর্চায় ভারত গত সাত দশকে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে,
তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদাহরণ। ভৌগোলিক,
ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক মিল থাকার কারণে বাংলাদেশের জন্য ভারতের
বিজ্ঞান চর্চার মডেলটি বিশেষ প্রাসঙ্গিক। অন্ধ অনুকরণ না করে,
ভারত কীভাবে সীমিত সম্পদ দিয়ে বিশ্বমানের বিজ্ঞান অবকাঠামো গড়ে
তুলেছে, সেই কৌশলগুলো বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশ অনেক উপকৃত হতে পারে।
আজকের আড্ডা অনেক হলো । এবার হয়তো ঘুমানোর সময়, কিংবা সঠিক সময়
নয় । ইউটিউবে কখনো রাত হয় না । ফেসবুকে রাত হয না । গুগল, মাইক্রোসফট, আইবিএম নাসা
। কেউ ঘুমায় না । ভারত ঘুমায় না ।নাসা, ইসরো
ঘুমায় না । স্বপ্ন তাকে ঘুমাতে দেয় না । বিজ্ঞান নিয়ে ২৪ বাই ৭, তার জেগে থাকা ।
আড্ডার গল্পদিয়ে শেষ করি । এক শিষ্য গুরুর কাছে গিয়ে বলল,
"গুরুদেব,
এই জগৎ বড়ই অন্ধকার। আমি পথ খুঁজে পাচ্ছি না।" গুরুদেব
মুচকি হেসে শিষ্যর হাতে একটা প্রদীপ ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
"এই প্রদীপটা তোমার চারপাশকে আলোকিত
করবে না, শুধু তোমার পরের পদক্ষেপটুকু ফেলার মতো আলো দেবে। বিজ্ঞানের কাজও তাই। সে তোমাকে
সব উত্তর দেবে না, কিন্তু অন্ধকারে এক পা এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেবে।"
আজ ভারত ও বাংলাদেশে সেই সাহসের বড় অভাব। আমরা অতীত নিয়ে বড় বেশি ব্যস্ত,
অথচ ভবিষ্যৎ দরজায় কড়া নাড়ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স,
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং,
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং—নতুন এক পৃথিবী আসছে। সেখানে টিকে থাকতে
হলে আমাদের রামায়ণ-মহাভারত বা পুঁথিপুস্তকের গর্ব বুকে রেখেও মস্তিষ্কের জানলাটা খোলা
রাখতে হবে।
আসুন, আমরা রাজনীতিকে সংসদে রাখি, ধর্মকে প্রার্থনাগৃহে রাখি,
জগাখিচুড়িটাকে হোয়াটস
এপ ইউনিভার্সিটিতে রাখি আর বিজ্ঞানকে
রাখি আমাদের দৈনন্দিন চিন্তায় ও যাপনে। জগাখিচুড়িটা স্বাদ বদলের জন্য ভালো,
কিন্তু ওটা খেয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা যায় না। পুষ্টির জন্য চাই
বিশুদ্ধ জ্ঞান।
কাঁটাতারের এপারে হোক বা ওপারে—সত্য একটাই। আর সেই সত্যের সন্ধানেই হোক আমাদের
আগামীর পথচলা। কারণ, দিনশেষে আমরা কেউ ভারতীয় বা বাংলাদেশি হওয়ার আগে—আমরা 'হোমো সেপিয়েন্স'—অর্থাৎ 'জ্ঞানী মানুষ'। সেই নামের
মর্যাদাটুকু অন্তত আমাদের রাখতে হবে।
Comments
Post a Comment