চাকা ও শেকড়ের সন্ধানে
আমি পীযূষকান্তি বিশ্বাস আর আমার স্ত্রী বিউটি বিশ্বাস মধ্যপ্রদেশ ভ্রমন শেষে দিল্লি ফিরে এলাম।
এটা নিয়ে ৪০০০ শব্দের একটি ট্রাভেল লগ লিখে দিন । যে স্থানগুলো উল্লেখ করলাম, সেখানকার বর্ণনা তুলে ধরবেন ।
এখানে তার সামারি দিচ্ছি ।
নিজের গাড়ি (মাহিন্দ্রা এক্স ইউ ভি ৭০০) করে প্রায় ২৭০০ কিলোমিটার ঘুরে এলাম । প্রথমে খাজুরাহো পৌছালাম । সেখানে, অনেক হিন্দু মন্দির, লাইট এন্ড সাউন্ড, রেনেহ ফলস, পান্ডব ফলস । দেখলাম পুরানো ১০০০ পুরানো স্ক্রিপটে দেওয়াল লিখন । দুই রাত্রি এখানে, হোটেল খাজুরাহ সেন্ট্রাল ।
এরপর এলাম পান্নার জঙ্গল পার করে জবল পুর । সঙ্গে ছিলো চা বানানোর মিনি স্টোভ, প্রকৃতির ভিতর তাতে চা বানিয়ে খেলাম । এখানে মার্বেল রক দেখার জন্য নর্মদা নদীর নৌকা বিহার অসাধারণ লাগলো । দেখলাম ৬৪ যোগিনি মন্দির অপূর্ব । সেখানে স্বর্গীয় অনুভূতির ধুয়াধার ফলস । অপূর্ব । এক রাত্রি থাকলাম ভেদাঘাট, হোটেল মার্বেল সিটি ।
সেখান থেকে এলাম নর্মদাপুরম হয়ে, আমডোহ গ্রামে । আমার মামা, জসমন্ত বিশ্বাস ১৯৬৪ এ পূর্ব পাকিস্তান থেকে এখানে এসে বসবাস করা শুরু করেন ।
এখান থেকেই ঘুরতে গেলাম পাঁচমারি হিলস স্টেশন । জটাশংকর গুহা মন্দির, বড় মহাদেব কেভ দেখলাম । প্রিয় দর্শিনী পয়েন্টে এসে দেখলাম সাতপুরা পাহাড়ের অপরুপ রূপ । রোদে সোনা হয়ে উঠেছে ।
আমডোহ গ্রামের আশে পাশে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা পুনর্বাসনে থাকা বাঙালিদের সঙ্গে পুনঃ আত্মীয় স্থাপন করলাম । এখানে একেবারেই বাংলা গ্রাম । ৩৬ খানা বাংলা গ্রাম একসঙ্গে । লাউ, কচু, ওল, লেবু, কুমড়ো সব দেশী । মামার পুত্রবধুরাও বাঙালি । চওড়া উঠান, ধানের গোলা , চারিপাশে ফুলগাছ, তুলশীতলা । সেজো মামার ছেলে রেন্টুদা স্ত্রী আমাদের ১২ পদের রান্না খাওয়ালেন । আহারে, এ এক অন্য বঙ্গভুমি । রাত বারোটায় একজন মহিলা একা রাস্তায় হেঁটে যেতে পারে । দরোজায় এখনো তালা লাগানোর প্রয়োজন নেই । রাতে, উঠানে মোটর সাইকেল পার্ক করা । আত্মীদের নিয়ে দেশী মুর্গী আর খাশীর মাংস দিয়ে পিকনিক করে হলো রাতে, বন ফায়ার করে, চারিপাশে চাটাই পেতে লাইন দিয়ে পলুশন ফ্রি আকাশের নিচে খাওয়া হলো । এখানে আমরা মামাবাড়ি ৪ রাত্র থাকলাম ।
এরপর আমডোহ থেকে এলাম ভোপাল । ভীমবেটকা গুহাচিত্র দেখলাম ভোপালে কাটার হিলসে এক রাত্রি সুকুমার বিশ্বাস মামার বাড়িতে রাত্রিবাস ।
এক রাত্রি থেকে সাঁচীর স্তুপ দেখতে গেলাম । সেখান থেকে দিল্লি এক ড্রাইভে । দিল্লি মুম্বাই এক্সপ্রেস ওয়ে তে রাত্রিবাস গাড়ীতেই ।
DELHI -> ETAWAH(335KM) + KHAJURAHO(325KM) == 660 KM (2 Nights Stay)
KHAJURAHO -> JABALPUR = 258KM ( 1 Night Stay)
JABALPUR -> CHOPNA = 352KM (4 Night Stay)
CHOPNA- PANCHMARI (Back 197KM + 197KM) = 394 KM
CHOPNA -> OBAIDULLA GANJ(118KM) + KATARA HILLS(39KM) = 157KM ( 1 Night Stay)
KATARA HILLS -> SNACHI(67KM)+ SWAI MADHOPUR(466KM) + DELHI(343KM) = 876KM
TOTAL TRAVEL: 2697KM
চাকা ও শেকড়ের সন্ধানে: মধ্যপ্রদেশের হৃদয়ে ২৭০০ কিলোমিটার
লেখক: পীযূষকান্তি বিশ্বাস
দিল্লি শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে মনটা কিছুদিন ধরেই ছুটি চাইছিল। আমি আর আমার স্ত্রী, বিউটি—আমাদের দুজনেরই নেশা হলো সুযোগ পেলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া। এবারের গন্তব্য ভারতের হৃদয়—মধ্যপ্রদেশ। তবে এবারের ভ্রমণটা শুধু নিছক ঘুরে বেড়ানো নয়, এর সঙ্গে মিশে ছিল এক গভীর পারিবারিক টান এবং ইতিহাসের ধুলোমাখা পথ চেনার অদম্য ইচ্ছা। আমাদের সঙ্গী আমার সাধের বাহন, গাঢ় রঙের ‘মাহিন্দ্রা এক্স ইউ ভি ৭০০’ (Mahindra XUV 700)। প্রায় ২৭০০ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ আমাদের জীবনের ডায়েরিতে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় যোগ করল।
প্রথম পর্ব: ইতিহাসের অলিন্দে (দিল্লি থেকে খাজুরাহো)
দিনটা ছিল ভ্রমণের শুরুর দিন। ভোররাতের আবছা অন্ধকারে দিল্লির রাস্তা যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, আমাদের এক্স ইউ ভি-র ইঞ্জিন তখন গর্জনে প্রস্তুত। ম্যাপে সেট করা হলো গন্তব্য—খাজুরাহো। দিল্লি থেকে ইটাওয়া হয়ে প্রায় ৬৬০ কিলোমিটারের পথ। যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে এবং আগ্রা-লখনউ এক্সপ্রেসওয়ের মাখন-মসৃণ রাস্তায় গাড়ি চালানো এক আলাদা তৃপ্তি। এক্স ইউ ভি ৭০০-এর অ্যাডভান্সড ড্রাইভিং ফিচারগুলো দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছিল।
সারাদিনের ড্রাইভ শেষে যখন খাজুরাহো পৌঁছালাম, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। আমরা উঠলাম ‘হোটেল খাজুরাহো সেন্ট্রাল’-এ। চমৎকার আতিথেয়তা এবং সুন্দর পরিবেশ। হোটেলের ব্যালকনি থেকে দূরের মন্দিরগুলোর চূড়া দেখা যায়, যা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ জাগায়।
পরের দিন সকাল থেকেই শুরু হলো আমাদের খাজুরাহো দর্শন। চান্দেল রাজাদের অমর কীর্তি এই খাজুরাহো। মন্দিরগুলোর গায়ে খোদাই করা ভাস্কর্যগুলো যেন পাথরের গায়ে লেখা কবিতা। কাম, ধর্ম, মোক্ষ—জীবনের প্রতিটি পর্যায় কী নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে! বিউটি মুগ্ধ হয়ে দেখছিল প্রতিটি কারুকাজ। কন্দরিয়া মহাদেব মন্দির, লক্ষ্মণ মন্দির আর বিশ্বনাথ মন্দিরের গায়ের সূক্ষ্ম কাজগুলো দেখে মনে হয়, হাজার বছর আগে ছেনি-হাতুড়ির জাদুতে পাথরও কথা বলত।
মন্দিরের গায়ের কারুকাজের পাশাপাশি আমরা দেখলাম প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো স্ক্রিপ্ট বা দেওয়াল লিখন। সেই প্রাচীন লিপিগুলোর দিকে তাকিয়ে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। কত যুগ আগে কোন শিল্পী বা পুরোহিত হয়তো এই লেখাগুলো লিখেছিলেন, আজ আমরা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তা স্পর্শ করছি। ইতিহাসের এই যোগসূত্র সত্যিই অবিশ্বাস্য।
বিকেলের দিকে আমরা গেলাম রেনেহ ফলস (Raneh Falls) দেখতে। কেন (Ken) নদীর ওপর অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি যেন ভারতের মিনি গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। নানা রঙের গ্রানাইট পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা জলধারা এক অপার্থিব দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। সেখান থেকে গেলাম পান্ডব ফলস-এ। ঘন সবুজে ঘেরা এই জলপ্রপাতটি শান্ত, স্নিগ্ধ। জনশ্রুতি আছে, পাণ্ডবরা তাঁদের বনবাসের সময় এখানে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। প্রকৃতির এই আদিম রূপ মনকে শান্ত করে দেয়।
সন্ধ্যায় আবার ফিরে এলাম মন্দির চত্বরে। এবার উদ্দেশ্য ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ শো দেখা। অমিতাভ বচ্চনের ব্যারিটোন ভয়েসে যখন খাজুরাহোর ইতিহাস বর্ণিত হচ্ছিল, আর আলোর খেলায় মন্দিরগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল আমরা টাইম মেশিনে করে পিছিয়ে গেছি সেই দশম শতাব্দীতে। দুই রাত্রির এই খাজুরাহো বাস আমাদের মনকে ইতিহাসের রসে জারিত করে দিল।
দ্বিতীয় পর্ব: অরণ্য, নদী এবং ধোঁয়ার জাদুকরী (খাজুরাহো থেকে জব্বলপুর)
খাজুরাহোর মায়া কাটিয়ে তৃতীয় দিন সকালে আমরা রওনা দিলাম জব্বলপুরের উদ্দেশ্যে। দূরত্ব প্রায় ২৫৮ কিলোমিটার। তবে এই রাস্তার বিশেষত্ব হলো পান্নার জঙ্গল। পান্না টাইগার রিজার্ভের বুক চিরে চলে গেছে রাস্তা। দুপাশে ঘন জঙ্গল, মাঝে কালো পিচঢালা পথ। এক্স ইউ ভি-র সানরুফটা একটু খুলে দিলাম, জঙ্গলের সোঁদা গন্ধ আর পাখির ডাক গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
পথের মাঝে এক নির্জন জায়গায় গাড়ি থামালাম। সাথে ছিল আমাদের মিনি স্টোভ। জঙ্গলের নির্জনতায়, পাখির কিচিরমিচির শব্দের মাঝে সেই স্টোভে চা বানালাম। বিউটি আর আমি—চারপাশে শুধুই প্রকৃতি, হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। এই মুহূর্তটা ছিল এই ট্রিপের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। ফাইভ স্টার হোটেলের লবিতে বসে চা খাওয়ার চেয়ে এই বুনো পরিবেশে চা খাওয়ার আনন্দ যে কতগুণ বেশি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
জব্বলপুর পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। আমরা সোজা চলে গেলাম ভেদাঘাট, নর্মদা নদীর তীরে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল ‘হোটেল মার্বেল সিটি’-তে। হোটেলটি নদীর খুব কাছেই, জানালা দিয়ে নর্মদার কলতান শোনা যায়।
বিকেলে গেলাম নর্মদা নদীতে নৌকাবিহার করতে। একেই বলে ‘মার্বেল রক্স’ বা শ্বেতপাথরের উপত্যকা। নর্মদা নদী এখানে দুপাশে বিশাল বিশাল শ্বেতপাথরের পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে। সূর্যের আলো যখন সেই সাদা পাথরে পড়ে, তখন তা হীরের মতো চকচক করে। মাঝির মুখে শোনা গেল এখানকার বিখ্যাত ‘বান্দর কুদনি’র গল্প—যেখানে পাহাড়গুলো এত কাছাকাছি ছিল যে বানরেরা এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে লাফিয়ে যেত। নৌকায় বসে জলের ছলছল শব্দ আর শ্বেতপাথরের সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করে রাখল।
সেখান থেকে গেলাম চৌষট্টি যোগিনী মন্দির (Chausath Yogini Temple) দেখতে। অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে হয়। গোলাকার এই মন্দিরের স্থাপত্য অপূর্ব। এখান থেকে নর্মদা নদী আর জব্বলপুর শহরের ভিউ এককথায় অসাধারণ।
তবে জব্বলপুরের আসল চমক অপেক্ষা করছিল ‘ধুয়াধার ফলস’-এ। নর্মদা নদী এখানে বিশাল গর্জনে নিচে আছড়ে পড়ছে। জলের তোড়ে এতই ধোঁয়া বা কুয়াশার সৃষ্টি হয় যে এর নাম হয়েছে ধুয়াধার। বিউটি আর আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলাম সেই প্রমত্তা জলরাশির দিকে। জলের সেই গর্জন আর গায়ে এসে পড়া বিন্দু বিন্দু জলকণা এক স্বর্গীয় অনুভূতির জন্ম দিল। মনে হলো, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে আমরা কত তুচ্ছ! এক রাত্রি ভেদাঘাটে কাটিয়ে, নর্মদার জলকে সাক্ষী রেখে আমরা পরের গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হলাম।
তৃতীয় পর্ব: শেকড়ের টানে ‘মিনি বাংলা’ (জব্বলপুর থেকে আমডোহ)
পরের দিন আমাদের যাত্রা ছিল সবথেকে আবেগময়। জব্বলপুর থেকে নর্মদাপুরম হয়ে আমরা চলেছি আমডোহ গ্রামে। দূরত্ব প্রায় ৩৫২ কিলোমিটার। কিন্তু এই পথ শুধু কিলোমিটার দিয়ে মাপা যায় না, এ পথ ছিল রক্তের টানে ফিরে যাওয়ার পথ।
আমার মামা, জসমন্ত বিশ্বাস, ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে সর্বস্ব হারিয়ে এখানে এসে নতুন করে জীবন শুরু করেছিলেন। দণ্ডকারণ্যের পুনর্বাসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রদেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁরা বসতি স্থাপন করেন। আজ সেই আমডোহ গ্রাম আমার কাছে এক তীর্থভূমি।
গাড়ি যখন গ্রামের মাটির রাস্তায় প্রবেশ করল, এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম। মামার বাড়িতে পৌঁছাতেই যে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম, তা শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে পাওয়া যায় না। মামা জসমন্ত বিশ্বাস আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর চোখে ছিল হারানো দিনের স্মৃতি আর আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মধ্যপ্রদেশের এই গভীর অরণ্যময় এলাকায় এক টুকরো বাংলাদেশ বেঁচে আছে। আমডোহ এবং তার আশেপাশে মোট ৩৬টি গ্রাম রয়েছে, যেখানে শুধুই বাঙালিদের বাস। মামার সাথে কথা বলে জানলাম সেই সংগ্রামের ইতিহাস। কীভাবে জঙ্গল পরিষ্কার করে, বাঘ-ভাল্লুকের সাথে লড়াই করে তাঁরা এই রুক্ষ জমিকে শস্যশ্যামলা করে তুলেছেন।
এখানে চার রাত্রি আমরা ছিলাম। এই কটা দিন মনেই হয়নি যে আমরা মধ্যপ্রদেশে আছি। মনে হচ্ছিল যেন বাংলাদেশের কোনো এক নিভৃত পল্লীতে আছি। লাউ, কুমড়ো, ওল, কচু, লেবু—সবই দেশি ফলন। মামি নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ালেন। সেই রান্নায় ছিল মাটির গন্ধ, ভালোবাসার স্বাদ। টাটকা সবজি আর পুকুরের মাছের ঝোল—অমৃতের চেয়ে কম কিছু নয়।
আমরা গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটতাম। আমডোহ গ্রামের আশেপাশে থাকা অন্যান্য পুনর্বাসিত বাঙালিদের সাথে দেখা করলাম। অনেকের সাথেই নতুন করে আত্মীয়তা স্থাপন হলো। সবার মুখেই সেই ফেলে আসা দেশের গল্প, আর নতুন দেশে মাথা তুলে দাঁড়ানোর গর্ব। তাঁরা আজ এখানে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে আজও বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতি অমলিন। সন্ধ্যায় উঠোনে বসে হারিকেনের আলোয় (যদিও এখন বিদ্যুৎ আছে, তবুও স্মৃতির খাতিরে) পুরনো দিনের গল্প শোনা—এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
চতুর্থ পর্ব: পাহাড়ের চূড়ায় মহাদেব (পাঁচমারি ভ্রমণ)
আমডোহে থাকাকালীন একদিন আমরা ঠিক করলাম কাছেই অবস্থিত বিখ্যাত হিল স্টেশন পাঁচমারি (Pachmarhi) ঘুরে আসব। আমডোহ থেকে পাঁচমারি গিয়ে ফিরে আসা—মোট ৩৯৪ কিলোমিটারের ড্রাইভ। সাতপুরার রানী বলা হয় এই পাঁচমারিকে।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে এক্স ইউ ভি চালিয়ে উপরে ওঠার মজাই আলাদা। পাঁচমারিতে আমাদের প্রধান গন্তব্য ছিল জটাশঙ্কর গুহা মন্দির (Jata Shankar Cave)। বিশাল পাথরের নিচে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই শিবলিঙ্গ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভস্মাসুরের হাত থেকে বাঁচতে মহাদেব এখানে লুকিয়ে ছিলেন। গুহার ভেতরে শীতল পরিবেশ আর ভক্তদের ভক্তিভাব এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
এরপর গেলাম বড় মহাদেব (Bada Mahadev) গুহা দেখতে। এটিও একটি বিশাল গুহা মন্দির। এখান থেকে পাহাড়ের দৃশ্য অসাধারণ। পাঁচমারির শান্ত পরিবেশ, পাইন ও ওক গাছের জঙ্গল, আর পাহাড়ের গায়ে মেঘের লুকোচুরি—সব মিলিয়ে এক রোমান্টিক আবহাওয়া। বিউটি খুব খুশি ছিল পাহাড় আর জঙ্গল একসঙ্গে পেয়ে। সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় আমরা আবার ফিরে এলাম আমাদের আমডোহ গ্রামের সেই পরম আশ্রয়ে।
পঞ্চম পর্ব: আদিম মানুষের গুহাচিত্র ও লেক সিটি (আমডোহ থেকে ভোপাল)
আমডোহের মায়া কাটানো খুব কঠিন ছিল। মামা-মামির চোখের জল আর গ্রামের মানুষদের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে আমরা রওনা দিলাম ভোপালের পথে। দূরত্ব প্রায় ১৫৭ কিলোমিটার।
পথে ওবায়দুল্লাগঞ্জ পার হয়ে আমরা থামলাম ভীমবেটকা (Bhimbetka) রক শেল্টারে। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। আদিম মানুষের আঁকা গুহাচিত্র দেখার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। হাজার হাজার বছর আগে, যখন মানুষের ভাষা ছিল না, তখন তারা পাথরের গায়ে ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করত। শিকারের দৃশ্য, নাচের দৃশ্য—লাল ও সাদা রঙে আঁকা সেই ছবিগুলো আজও কত স্পষ্ট! ইতিহাসের ছাত্র না হয়েও, মানুষের বিবর্তনের এই চাক্ষুষ প্রমাণ দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
ভীমবেটকা দেখে আমরা পৌঁছালাম ভোপালের কাটার হিলস (Katara Hills) এলাকায়। এখানে আমার আরেক মামা, সুকুমার বিশ্বাস থাকেন। মামার বাড়িতেই আমাদের রাত্রিবাস। ভোপাল শহরটি আমার খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে এর বড় তালাব (Upper Lake) এবং তার পাড়ের সৌন্দর্য। সুকুমার মামার বাড়িতেও সেই একই রকম আতিথেয়তা পেলাম। রাতে আড্ডা হলো, ভোপালের বিখ্যাত খাবার-দাবার আর পারিবারিক গল্পে রাত গভীর হলো।
ষষ্ঠ পর্ব: শান্তির স্তূপ এবং হাইওয়েতে রোমাঞ্চ (ভোপাল থেকে দিল্লি)
ভ্রমণের শেষ পর্যায়। এবার ঘরে ফেরার পালা। সকাল সকাল সুকুমার মামার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রওনা দিলাম সাঁচীর উদ্দেশ্যে। ভোপাল থেকে মাত্র ৬৭ কিলোমিটার দূরে সাঁচী স্তূপ (Sanchi Stupa)।
সম্রাট অশোকের তৈরি এই স্তূপ বৌদ্ধ ধর্মের এক পবিত্র স্থান। মূল স্তূপের বিশাল তোরণ বা গেটগুলোর কারুকাজ দেখার মতো। বুদ্ধের জীবনের নানা কাহিনী পাথরে খোদাই করা আছে। জায়গাটার মধ্যে এক অদ্ভূত শান্তি বিরাজ করে। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই স্তূপ চত্বর থেকে চারপাশের দৃশ্য খুব সুন্দর দেখায়। আমরা সেখানে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম, ভ্রমণের ক্লান্তি যেন নিমেষেই উবে গেল সেই প্রশান্তিতে।
সাঁচী থেকে এবার আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য দিল্লি। প্রায় ৮৭৬ কিলোমিটারের বিশাল ড্রাইভ। সাঁচী থেকে সওয়াই মাধোপুর হয়ে আমরা ধরলাম দিল্লি-মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়ে।
গাড়ি চালানোর নেশা আমার বরাবরই, আর এক্স ইউ ভি ৭০০-এর মতো সঙ্গী থাকলে তো কথাই নেই। সওয়াই মাধোপুর পার করার পর আমরা এক্সপ্রেসওয়েতে উঠলাম। চার লেনের চওড়া রাস্তা, কোথাও কোনো বাধা নেই। গাড়ির গতি আর রাতের নিস্তব্ধতা মিলেমিশে একাকার।
এই যাত্রাপথের সবথেকে রোমাঞ্চকর অংশ ছিল আমাদের রাত্রিবাস। কোনো হোটেলে না থেকে, আমরা ঠিক করলাম গাড়িতেই রাত কাটাব। দিল্লি-মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়ের একটি নিরাপদ রেস্ট এরিয়াতে গাড়ি থামালাম। এক্স ইউ ভি-র পেছনের সিটগুলো ফোল্ড করে একটা বিছানার মতো তৈরি করে নিলাম। গাড়ির ভেতরেই রাত কাটানোর এই অভিজ্ঞতা ছিল এক নতুন অ্যাডভেঞ্চার। হাইওয়ের পাশে, তারার নিচে গাড়ির ভেতর ঘুমানো—এক জিপসি (Gypsy) জীবনযাপনের স্বাদ পেলাম।
পরদিন সকালে আবার ড্রাইভ শুরু। দুপাশে রাজস্থান ও হরিয়ানার খেত, সরষে ফুলের হলুদ আভা আর ভোরের কুয়াশা চিরে আমরা এগিয়ে চললাম। দুপুরে যখন দিল্লির সীমান্তে পৌঁছালাম, তখন ট্রিপ মিটারে জ্বলজ্বল করছে ২৬৯৭ কিলোমিটার।
উপসংহার
গাড়ি পার্কিং লটে রেখে যখন লিফটে করে নিজেদের ফ্ল্যাটে উঠছি, তখন মনটা ভালোলাগা আর বিষাদে ভরে ছিল। ভালোলাগা—কারণ আমরা নিরাপদে, আনন্দে এত বড় একটা ট্রিপ শেষ করেছি। আর বিষাদ—কারণ সেই আমডোহ গ্রামের মাটির গন্ধ, নর্মদার গর্জন আর খাজুরাহোর ইতিহাসকে পেছনে ফেলে এসেছি।
এই ভ্রমণ শুধু মাইল ফলক পার করা ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের সাথে বর্তমানের, প্রকৃতির সাথে মানুষের এবং সবশেষে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আত্মীয়দের সাথে পুনঃমিলনের এক মহাকাব্য। মধ্যপ্রদেশের বুকেই খুঁজে পেলাম এক টুকরো বাংলা, খুঁজে পেলাম নিজেদের নতুন করে। বিউটি বলল, "আবার কবে যাব?" আমি হাসলাম। জানি, এই রাস্তার ডাক আমরা বেশিদিন উপেক্ষা করতে পারব না। মাহিন্দ্রা এক্স ইউ ভি আবার গর্জন করে উঠবে, নতুন কোনো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
ভ্রমণ সারসংক্ষেপ:
- যাত্রাপথ: দিল্লি -> ইটাওয়া -> খাজুরাহো -> জব্বলপুর -> আমডোহ (চপনা) -> পাঁচমারি -> ভোপাল (কাটার হিলস) -> সাঁচী -> দিল্লি।
- মোট দূরত্ব: প্রায় ২৭০০ কিলোমিটার।
- গাড়ি: মাহিন্দ্রা এক্স ইউ ভি ৭০০।
- যাত্রী: পীযূষকান্তি বিশ্বাস ও বিউটি বিশ্বাস।
- স্মরণীয় মুহূর্ত: জঙ্গলে চা বানানো, আমডোহে বাঙালি গ্রামের আতিথেয়তা, নর্মদায় নৌকাবিহার এবং এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়িতে রাত্রিবাস।
নিচে আপনার এবং আপনার স্ত্রী বিউটি বিশ্বাসের এই মহাকাব্যিক ভ্রমণের ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত ট্রাভেলগ বা ভ্রমণকাহিনি তুলে ধরা হলো। আপনার দেওয়া প্রতিটি স্থানের বিবরণ, আবেগের মুহূর্ত এবং পারিবারিক সংযোগের কথা মাথায় রেখে এটি রচনা করা হয়েছে।
চাকা, পাহাড় ও শেকড়ের সন্ধানে: মধ্যপ্রদেশের বুকে ২৭০০ কিলোমিটারের মহাকাব্য
লেখক: পীযূষকান্তি বিশ্বাস
দিল্লি শহরের কংক্রিটের জঙ্গল আর ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে মনটা ছটফট করছিল। আমি আর আমার অর্ধাঙ্গিনী, বিউটি—আমাদের দুজনাকেই এক অদৃশ্য সুতো টানে, সে হলো পথের নেশা। এবারের গন্তব্য ভারতের হৃদস্পন্দন—মধ্যপ্রদেশ। তবে এই ভ্রমণ শুধু নিছক পর্যটন নয়, এ এক শেকড়ের সন্ধান, ইতিহাসের ধুলোমাখা পথ আর পারিবারিক উষ্ণতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। আমাদের সঙ্গী আমার বিশ্বস্ত বাহন, গাঢ় রঙের ‘মাহিন্দ্রা এক্স ইউ ভি ৭০০’ (Mahindra XUV 700)। প্রায় ২৭০০ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ যাত্রাপথের গল্প এক নিঃশ্বাসে বলার নয়, এ এক বিশাল ক্যানভাসে আঁকা রঙিন ছবি।
প্রথম অধ্যায়: ইতিহাসের অলিন্দে যাত্রা (দিল্লি থেকে খাজুরাহো)
ভোররাতের আবছা অন্ধকারে দিল্লির রাস্তা যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, আমাদের এক্স ইউ ভি-র ইঞ্জিন তখন গর্জনে প্রস্তুত। ম্যাপে সেট করা হলো গন্তব্য—খাজুরাহো। দিল্লি থেকে ইটাওয়া হয়ে প্রায় ৬৬০ কিলোমিটারের পথ। যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে এবং আগ্রা-লখনউ এক্সপ্রেসওয়ের মাখন-মসৃণ রাস্তায় গাড়ি চালানো এক আলাদা তৃপ্তি। এক্স ইউ ভি ৭০০-এর অ্যাডভান্সড ড্রাইভিং ফিচারগুলো, বিশেষ করে অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোল, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছিল। গাড়ির সানরুফ দিয়ে আসা ভোরের প্রথম আলো যখন বিউটির মুখে পড়ল, বুঝলাম আমাদের অ্যাডভেঞ্চার শুরু।
সারাদিনের ড্রাইভ শেষে যখন খাজুরাহো পৌঁছালাম, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। মধ্যপ্রদেশের মাটিতে পা রাখতেই এক অদ্ভুত শিহরণ। আমরা উঠলাম ‘হোটেল খাজুরাহো সেন্ট্রাল’-এ। চমৎকার আতিথেয়তা এবং সুন্দর পরিবেশ। হোটেলে চেক-ইন করে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমরা যেন এক টাইম মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
পরের দিন সকাল থেকেই শুরু হলো আমাদের খাজুরাহো দর্শন। চান্দেল রাজাদের অমর কীর্তি এই খাজুরাহো। মন্দিরগুলোর গায়ে খোদাই করা ভাস্কর্যগুলো যেন পাথরের গায়ে লেখা কবিতা। মন্দিরগাত্রে খোদাই করা মিথুন ভাস্কর্য নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল থাকে, কিন্তু বিউটি আর আমি মুগ্ধ হচ্ছিলাম এর দার্শনিক দিকটি দেখে। কাম, ধর্ম, মোক্ষ—জীবনের প্রতিটি পর্যায় কী নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে! কন্দরিয়া মহাদেব মন্দির, লক্ষ্মণ মন্দির আর বিশ্বনাথ মন্দিরের গায়ের সূক্ষ্ম কাজগুলো দেখে মনে হয়, হাজার বছর আগে ছেনি-হাতুড়ির জাদুতে পাথরও কথা বলত।
মন্দির চত্বরে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের চোখে পড়ল এক বিস্ময়কর জিনিস। প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো স্ক্রিপ্ট বা দেওয়াল লিখন। সেই প্রাচীন লিপিগুলোর দিকে তাকিয়ে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। কত যুগ আগে কোন শিল্পী বা পুরোহিত হয়তো এই লেখাগুলো লিখেছিলেন, আজ আমরা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তা স্পর্শ করছি। ইতিহাসের এই যোগসূত্র সত্যিই অবিশ্বাস্য।
বিকেলের দিকে আমরা গেলাম রেনেহ ফলস (Raneh Falls) দেখতে। কেন (Ken) নদীর ওপর অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি যেন ভারতের মিনি গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। নানা রঙের গ্রানাইট পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা জলধারা এক অপার্থিব দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। গোলাপি, লাল, ধূসর পাথরের স্তরের মাঝ দিয়ে যখন জল গর্জন করে নিচে নামছে, তখন প্রকৃতির সেই রুদ্ররূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। সেখান থেকে গেলাম পান্ডব ফলস-এ। ঘন সবুজে ঘেরা এই জলপ্রপাতটি শান্ত, স্নিগ্ধ। জনশ্রুতি আছে, পাণ্ডবরা তাঁদের বনবাসের সময় এখানে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। প্রকৃতির এই আদিম রূপ মনকে শান্ত করে দেয়।
সন্ধ্যায় আবার ফিরে এলাম মন্দির চত্বরে। এবার উদ্দেশ্য ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ শো দেখা। অমিতাভ বচ্চনের ব্যারিটোন ভয়েসে যখন খাজুরাহোর ইতিহাস বর্ণিত হচ্ছিল, আর আলোর খেলায় মন্দিরগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল আমরা টাইম মেশিনে করে পিছিয়ে গেছি সেই দশম শতাব্দীতে। দুই রাত্রির এই খাজুরাহো বাস আমাদের মনকে ইতিহাসের রসে জারিত করে দিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়: অরণ্য, চা এবং শ্বেতপাথরের স্বপ্ন (খাজুরাহো থেকে জব্বলপুর)
খাজুরাহোর মায়া কাটিয়ে তৃতীয় দিন সকালে আমরা রওনা দিলাম জব্বলপুরের উদ্দেশ্যে। দূরত্ব প্রায় ২৫৮ কিলোমিটার। তবে এই রাস্তার বিশেষত্ব হলো পান্নার জঙ্গল। পান্না টাইগার রিজার্ভের বুক চিরে চলে গেছে রাস্তা। দুপাশে ঘন জঙ্গল, মাঝে কালো পিচঢালা পথ। এক্স ইউ ভি-র সানরুফটা একটু খুলে দিলাম, জঙ্গলের সোঁদা গন্ধ আর পাখির ডাক গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
পথের মাঝে এক নির্জন জায়গায়, যেখানে গাছের ছায়া রাস্তা ঢেকে দিয়েছে, সেখানে গাড়ি থামালাম। সাথে ছিল আমাদের ভ্রমণের নিত্যসঙ্গী—চা বানানোর মিনি স্টোভ। জঙ্গলের নির্জনতায়, পাখির কিচিরমিচির শব্দের মাঝে সেই স্টোভে চা বানালাম। বিউটি আর আমি—চারপাশে শুধুই প্রকৃতি, হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। কোনো ফাইভ স্টার ক্যাফেটেরিয়া এই অভিজ্ঞতার সমকক্ষ হতে পারে না। এই ক্ষণিক বিরতি আমাদের আত্মাকে যেন নতুন করে জাগিয়ে তুলল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই আমরা পৌঁছালাম জব্বলপুরের কাছে ভেদাঘাটে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল ‘হোটেল মার্বেল সিটি’-তে। হোটেলটি নর্মদা নদীর খুব কাছেই।
বিকেলে গেলাম নর্মদা নদীতে নৌকাবিহার করতে। একেই বলে ‘মার্বেল রক্স’ বা শ্বেতপাথরের উপত্যকা। নর্মদা নদী এখানে দুপাশে বিশাল বিশাল শ্বেতপাথরের পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে। সূর্যের আলো যখন সেই সাদা পাথরে পড়ে, তখন তা হীরের মতো চকচক করে। পূর্ণিমা রাতে নাকি এই দৃশ্য মায়াবী হয়ে ওঠে, কিন্তু দিনের আলোতেও এর রূপ কিছু কম নয়। নৌকায় বসে জলের ছলছল শব্দ আর শ্বেতপাথরের সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করে রাখল।
সেখান থেকে গেলাম চৌষট্টি যোগিনী মন্দির (Chausath Yogini Temple) দেখতে। পাহাড়ের ওপরে গোলাকার এই মন্দিরের স্থাপত্য অপূর্ব। এখান থেকে নর্মদা নদী আর জব্বলপুর শহরের প্যানোরামিক ভিউ এককথায় অসাধারণ।
তবে জব্বলপুরের আসল চমক অপেক্ষা করছিল ‘ধুয়াধার ফলস’-এ। নর্মদা নদী এখানে বিশাল গর্জনে নিচে আছড়ে পড়ছে। জলের তোড়ে এতই ধোঁয়া বা কুয়াশার সৃষ্টি হয় যে এর নাম হয়েছে ধুয়াধার। বিউটি আর আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলাম সেই প্রমত্তা জলরাশির দিকে। জলের সেই গর্জন আর গায়ে এসে পড়া বিন্দু বিন্দু জলকণা এক স্বর্গীয় অনুভূতির জন্ম দিল। মনে হলো, প্রকৃতির এই শক্তির সামনে মানুষের দম্ভ কত নগণ্য! এক রাত্রি ভেদাঘাটে কাটিয়ে, নর্মদার জলকে সাক্ষী রেখে আমরা পরের গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হলাম।
তৃতীয় অধ্যায়: এক টুকরো বাংলাদেশ এবং শেকড়ের টান (জব্বলপুর থেকে আমডোহ)
পরের দিন আমাদের যাত্রা ছিল সবথেকে আবেগময়। জব্বলপুর থেকে নর্মদাপুরম হয়ে আমরা চলেছি আমডোহ (চপনা) গ্রামে। দূরত্ব প্রায় ৩৫২ কিলোমিটার। কিন্তু এই পথ শুধু কিলোমিটার দিয়ে মাপা যায় না, এ পথ ছিল রক্তের টানে ফিরে যাওয়ার পথ। আমার মামা, জসমন্ত বিশ্বাস, ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে সর্বস্ব হারিয়ে এখানে এসে নতুন করে জীবন শুরু করেছিলেন। দণ্ডকারণ্যের পুনর্বাসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রদেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁরা বসতি স্থাপন করেন।
গাড়ি যখন গ্রামের মাটির রাস্তায় প্রবেশ করল, এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম। চারপাশে সবুজের সমারোহ। মামার বাড়িতে পৌঁছাতেই যে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। জসমন্ত মামা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর চোখে ছিল হারানো দিনের স্মৃতি আর আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মধ্যপ্রদেশের এই গভীর অরণ্যময় এলাকায় এক জীবন্ত বাংলাদেশ বেঁচে আছে। আমডোহ এবং তার আশেপাশে মোট ৩৬টি গ্রাম রয়েছে, যেখানে শুধুই বাঙালিদের বাস। মামার সাথে কথা বলে জানলাম সেই সংগ্রামের ইতিহাস। কীভাবে জঙ্গল পরিষ্কার করে, বাঘ-ভাল্লুকের সাথে লড়াই করে তাঁরা এই রুক্ষ জমিকে শস্যশ্যামলা করে তুলেছেন।
এখানে একেবারেই বাংলা গ্রাম। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে চওড়া মাটির উঠোন, ধানের গোলা, চারপাশে সারিবদ্ধ ফুলগাছ, আর উঠোনের এক কোণে পবিত্র তুলশীতলা। মামার পুত্রবধুরাও বাঙালি, তাদের পরনে শাড়ি, কপালে টিপ। মনে হচ্ছিল যেন আমরা নদীয়ার কোনো গ্রামে এসেছি।
এখানে আমাদের খাওয়া-দাওয়া ছিল এক রাজকীয় ব্যাপার। লাউ, কুমড়ো, ওল, কচু, লেবু—সবই এখানকার জমিতে ফলানো দেশি সবজি। রাসায়নিক সারবিহীন এই সবজির স্বাদই আলাদা। আমার সেজো মামার ছেলে, রেন্টুদা। রেন্টুদার স্ত্রী আমাদের জন্য একবেলা ১২ পদের রান্না করেছিলেন। শুক্তো থেকে শুরু করে ডাল, ভাজা, মাছের ঝোল, চাটনি—কী ছিল না সেই পাতে! আহারে, এ এক অন্য বঙ্গভূমি। প্রবাসে থেকেও তাঁরা কীভাবে বাঙালি রান্নার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, তা দেখে বিউটি অবাক হয়ে গিয়েছিল।
আমডোহের সামাজিক পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানে রাত বারোটায় একজন মহিলা একা রাস্তায় হেঁটে যেতে পারেন, কোনো ভয় নেই। দরজায় এখনো তালা লাগানোর প্রয়োজন পড়ে না। রাতে উঠোনে মোটর সাইকেল পার্ক করা থাকে, কেউ ছুঁয়েও দেখে না। দিল্লির মতো শহরে যেখানে সিসিটিভি আর সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া আমরা অসহায় বোধ করি, সেখানে এই গ্রামের মানুষের সততা আর বিশ্বাস এক অন্য পৃথিবীর সন্ধান দেয়।
রাতে আমাদের জন্য এক বিশেষ পিকনিকের আয়োজন করা হলো। আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলে উঠোনে জড়ো হলাম। মেনুতে ছিল দেশি মুরগি আর খাসির মাংস। বন ফায়ার জ্বালানো হলো। আগুনের লিলিহান শিখা আর চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকার—উপরে তাকালে দেখা যায় লক্ষ কোটি তারা। দিল্লির ধোঁয়াশা ভরা আকাশে যা স্বপ্নেও দেখা যায় না। সেই পলিউশন ফ্রি আকাশের নিচে, চাটাই পেতে লাইন দিয়ে বসে আমরা সবাই খেলাম। মাংসের ঝোলের গন্ধ, মাটির সোঁদা গন্ধ আর আপনজনদের হাসিমুখ—এই স্মৃতি আমি আমৃত্যু লালন করব। এখানে আমরা টানা ৪ রাত্রি ছিলাম, প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উৎসবের মতো।
চতুর্থ অধ্যায়: সাতপুরার রানী ও সোনালী বিকেল (পাঁচমারি ভ্রমণ)
আমডোহে থাকাকালীন একদিন আমরা ঠিক করলাম কাছেই অবস্থিত বিখ্যাত হিল স্টেশন পাঁচমারি (Pachmarhi) ঘুরে আসব। আমডোহ থেকে পাঁচমারি গিয়ে ফিরে আসা—মোট ৩৯৪ কিলোমিটারের ড্রাইভ। সাতপুরার রানী বলা হয় এই পাঁচমারিকে।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে এক্স ইউ ভি চালিয়ে উপরে ওঠার মজাই আলাদা। পাঁচমারিতে আমাদের প্রধান গন্তব্য ছিল জটাশঙ্কর গুহা মন্দির (Jata Shankar Cave)। বিশাল পাথরের নিচে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই শিবলিঙ্গ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভস্মাসুরের হাত থেকে বাঁচতে মহাদেব এখানে লুকিয়ে ছিলেন। গুহার ভেতরে শীতল পরিবেশ আর ভক্তদের ভক্তিভাব এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
এরপর গেলাম বড় মহাদেব (Bada Mahadev) গুহা দেখতে। এটিও একটি বিশাল গুহা মন্দির। তবে পাঁচমারির সেরা দৃশ্য দেখলাম ‘প্রিয়দর্শিনী পয়েন্ট’ (Priyadarshini Point)-এ গিয়ে। এখান থেকে সাতপুরা পাহাড়ের বিশাল উপত্যকা দেখা যায়। আমরা যখন পৌঁছালাম, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। অস্তগামী সূর্যের আলো পাহাড়ের গায়ে পড়ে এক অদ্ভুত সোনালী রঙের সৃষ্টি করেছিল। পাহাড়গুলো যেন সব সোনা দিয়ে মোড়ানো। চোখ উল্টিয়ে আমি দেখি দূরের শৈলশ্রেনী, বিউটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল, "এর নাম সত্যিই সাতপুরার রানী।" প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ দেখে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় আবার আমরা ফিরে এলাম আমডোহের সেই শান্তির নীড়ে।
পঞ্চম অধ্যায়: আদিম মানবের ক্যানভাস ও ভোপাল (আমডোহ থেকে ভোপাল)
আমডোহের মায়া কাটানো খুব কঠিন ছিল। মামা, মামি, রেন্টুদা এবং গ্রামের সবার চোখের জল আর ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে আমরা রওনা দিলাম ভোপালের পথে। দূরত্ব প্রায় ১৫৭ কিলোমিটার।
পথে ওবায়দুল্লাগঞ্জ পার হয়ে আমরা থামলাম ভীমবেটকা (Bhimbetka) রক শেল্টারে। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। আদিম মানুষের আঁকা গুহাচিত্র দেখার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। হাজার হাজার বছর আগে, যখন মানুষের ভাষা ছিল না, তখন তারা পাথরের গায়ে ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করত। শিকারের দৃশ্য, নাচের দৃশ্য—লাল ও সাদা রঙে আঁকা সেই ছবিগুলো আজও কত স্পষ্ট! ইতিহাসের ছাত্র না হয়েও, মানুষের বিবর্তনের এই চাক্ষুষ প্রমাণ দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
ভীমবেটকা দেখে আমরা পৌঁছালাম ভোপালের কাটার হিলস (Katara Hills) এলাকায়। এখানে আমার আরেক মামা, সুকুমার বিশ্বাস থাকেন। মামার বাড়িতেই আমাদের রাত্রিবাস। ভোপাল শহরটি আমার খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে এর লেক এবং পাহাড়ি রাস্তা। সুকুমার মামার বাড়িতেও সেই একই রকম আতিথেয়তা পেলাম। রাতে আড্ডা হলো, ভোপালের গল্প আর পারিবারিক স্মৃতিচারণে রাত গভীর হলো।
ষষ্ঠ অধ্যায়: স্তূপের শান্তি ও হাইওয়েতে রোমাঞ্চ (ভোপাল থেকে দিল্লি)
ভ্রমণের শেষ পর্যায়। এবার ঘরে ফেরার পালা। সকাল সকাল সুকুমার মামার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রওনা দিলাম সাঁচীর উদ্দেশ্যে। ভোপাল থেকে মাত্র ৬৭ কিলোমিটার দূরে সাঁচী স্তূপ (Sanchi Stupa)।
সম্রাট অশোকের তৈরি এই স্তূপ বৌদ্ধ ধর্মের এক পবিত্র স্থান। মূল স্তূপের বিশাল তোরণ বা গেটগুলোর কারুকাজ দেখার মতো। বুদ্ধের জীবনের নানা কাহিনী পাথরে খোদাই করা আছে। জায়গাটার মধ্যে এক অদ্ভূত শান্তি বিরাজ করে। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই স্তূপ চত্বর থেকে চারপাশের দৃশ্য খুব সুন্দর দেখায়। আমরা সেখানে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম, ভ্রমণের ক্লান্তি যেন নিমেষেই উবে গেল সেই প্রশান্তিতে।
সাঁচী থেকে এবার আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য দিল্লি। প্রায় ৮৭৬ কিলোমিটারের বিশাল ড্রাইভ। সাঁচী থেকে সওয়াই মাধোপুর হয়ে আমরা ধরলাম দিল্লি-মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়ে।
গাড়ি চালানোর নেশা আমার বরাবরই, আর এক্স ইউ ভি ৭০০-এর মতো সঙ্গী থাকলে তো কথাই নেই। সওয়াই মাধোপুর পার করার পর আমরা এক্সপ্রেসওয়েতে উঠলাম। ভারতের অন্যতম সেরা এই রাস্তা। চার লেনের চওড়া রাস্তা, কোথাও কোনো বাধা নেই। গাড়ির গতি আর রাতের নিস্তব্ধতা মিলেমিশে একাকার।
এই যাত্রাপথের সবথেকে রোমাঞ্চকর অংশ ছিল আমাদের রাত্রিবাস। কোনো হোটেলে না থেকে, আমরা ঠিক করলাম গাড়িতেই রাত কাটাব। দিল্লি-মুম্বাই এক্সপ্রেসওয়ের একটি নিরাপদ রেস্ট এরিয়াতে গাড়ি থামালাম। এক্স ইউ ভি-র পেছনের সিটগুলো ফোল্ড করে একটা বিশাল বিছানার মতো তৈরি করে নিলাম। গাড়ির ভেতরেই রাত কাটানোর এই অভিজ্ঞতা ছিল এক নতুন অ্যাডভেঞ্চার। হাইওয়ের পাশে, তারার নিচে গাড়ির ভেতর ঘুমানো—এক জিপসি (Gypsy) জীবনযাপনের স্বাদ পেলাম। আমাদের এই ভ্রাম্যমান বাড়িটি তখন আমাদের কাছে ফাইভ স্টার হোটেলের চেয়েও বেশি আরামদায়ক মনে হচ্ছিল।
পরদিন সকালে আবার ড্রাইভ শুরু। দুপাশে রাজস্থান ও হরিয়ানার খেত, সরষে ফুলের হলুদ আভা আর ভোরের কুয়াশা চিরে আমরা এগিয়ে চললাম। দুপুরে যখন দিল্লির সীমান্তে পৌঁছালাম, তখন ট্রিপ মিটারে জ্বলজ্বল করছে ২৬৯৭ কিলোমিটার।
উপসংহার
গাড়ি পার্কিং লটে রেখে যখন লিফটে করে নিজেদের ফ্ল্যাটে উঠছি, তখন মনটা ভালোলাগা আর এক ধরণের মিষ্টি বিষাদে ভরে ছিল। ভালোলাগা—কারণ আমরা নিরাপদে, আনন্দে এত বড় একটা ট্রিপ শেষ করেছি। আর বিষাদ—কারণ সেই আমডোহ গ্রামের মাটির গন্ধ, নর্মদার গর্জন, খাজুরাহোর ইতিহাস আর মামাবাড়ির সেই তুলশীতলা ও ধানের গোলাকে পেছনে ফেলে এসেছি।
এই ভ্রমণ শুধু মাইল ফলক পার করা ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের সাথে বর্তমানের, প্রকৃতির সাথে মানুষের এবং সবশেষে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আত্মীয়দের সাথে পুনঃমিলনের এক মহাকাব্য। মধ্যপ্রদেশের বুকেই খুঁজে পেলাম এক টুকরো বাংলা, খুঁজে পেলাম নিজেদের নতুন করে। বিউটি বলল, "পরের বার কিন্তু আরও বেশি দিনের জন্য যাব।" আমি হাসলাম। জানি, এই রাস্তার ডাক আমরা বেশিদিন উপেক্ষা করতে পারব না। মাহিন্দ্রা এক্স ইউ ভি আবার গর্জন করে উঠবে, নতুন কোনো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আপাতত স্মৃতির অ্যালবামে জমা থাকল এই ২৭০০ কিলোমিটারের সোনালী দিনগুলো।
Comments
Post a Comment