সঞ্জীব নিয়োগী ও ‘অগল্পনীয়’: এক জঙ্গলশিল্পীর মায়াবী দর্পণ ও যন্ত্রণার রূপকথা
সাহিত্য নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার দৌড় খুব বেশি দূর নয়, বড়জোর তা আমার পরিচিত ওই পশ্চিমপাড়ার মোড় পর্যন্তই বিস্তৃত। চেনা জগতের সীমানায় বঙ্কিমচন্দ্রের শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্য, শরৎচন্দ্রের চিরন্তন আবেগ আর রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক আভিজাত্যের যে নিরাপদ বৃত্তে আমি বড় হয়েছি, সঞ্জীব নিয়োগীর ‘অগল্পনীয়’ সেখানে এক অতর্কিত ঝড়ের মতো হানা দেয়। আমার সামান্য গদ্য-জ্ঞানে তাঁকে চিনেছি এক অলৌকিক জাদুকরের মতো, যিনি শব্দের তলায় শিকড় লুকিয়ে রাখেন। ২০১৬-১৭ সালের সেই সময়টার কথা মনে পড়ে, যখন মায়ের সঙ্গে দেখা করতে মালদায় গিয়েছিলাম; সেখানেই অগ্রজ পল্লবকান্তি বিশ্বাস, যিনি রথবাড়িতে থাকতেন, তাঁর মাধ্যমে এবং যেহেতু সঞ্জীব নিয়োগী মালদায় ছিলেন, সেই সময় রথবাড়িতে লেখক তৃপ্তি সান্ত্রার বাড়িতে আমাদের আড্ডা হয়। অগ্রজ, কবি ও লেখক সঞ্জীবদার সঙ্গে নতুন করে নিবিড় হওয়া এবং তাঁর মেজাজ ও মননের গহন অলিগলিগুলো চেনা সেই সময় থেকে। ‘শূন্যকাল’ সম্পাদনা করার সেই দিনগুলো থেকে আজ অবধি, তাঁর প্রতি প্রতিটি পাঠে এক অব্যক্ত শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জমা হয়েছে। ‘দেহলিজে’র জন্য যখনই তাঁর কাছে পৌঁছেছি, প্রতিবারই আবিষ্কার করেছি এক অন্যতর মানুষকে। কবি হিসেবে তিনি আকাশছোঁয়া উচ্চতার, আর সেই কবি-হৃদয় যখন গদ্যের অরণ্যে প্রবেশ করে, তখন তা আর নিছক গল্প থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক ‘অগল্প’—যা তথাকথিত গল্পের কাঠামো ভেঙে চুরমার করে দেয়। ‘পানকৌড়ি’ থেকে প্রকাশিত তাঁর এই ‘অগল্পনীয়’ সংকলনটি কেবল একটি বই নয়, বরং এটি তাঁর নিজের শিকড়কে চেনার এবং সেই শিকড়ের গভীরে ঢুকে পড়ার এক পরাবাস্তব অভিযাত্রা।
বইটির নাম: অগল্পনীয়
প্রকাশক: পানকৌড়ি
সঞ্জীব নিয়োগীর এই জঙ্গলযাত্রার উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরতে হয় তাঁর জন্মভূমি ও বেড়ে ওঠার সেই সাঁওতাল পরগনায়, যেখানে জীবনের প্রথম চল্লিশটি বসন্ত তিনি অতিবাহিত করেছেন। এটি কোনো পর্যটকের দেখা জঙ্গল নয়, বরং এটি তাঁর নিজের ঘর—যাঁর নখে লেগে আছে সাঁওতালি মাটির লাল ধুলো, যাঁর নাসিকায় মিশে আছে হাঁড়িয়ার মাদকতা আর জাহের থানের পবিত্র সৌরভ। একজন লেখক যখন ভিনদেশি চোখে কোনো প্রান্তিক জনপদকে আঁকেন, তখন তাতে অনেক সময় ‘অধিগ্রহণ’ বা কৃত্রিমতার ছায়া পড়ে; কিন্তু সঞ্জীবের ক্ষেত্রে তা এক অবিরাম প্রত্যাবর্তন। তিনি কেবল অরণ্যকে দেখেননি, অরণ্য তাঁর শিরায়-উপশিরায় কথা বলেছে। তাঁর কলম যখন ‘এক যে ছিল মারাং’ বা ‘ভরত’-এর কথা লেখে, তখন তা কোনো কাল্পনিক চরিত্র হয়ে থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে প্রতিবেশী কোনো এক স্বজনের ছায়া, যে হয়তো কোনো এক নিঝুম দুপুরে পুলিশের বুলেটে রক্তাক্ত হয়ে অরণ্যেরই সার হয়ে মিশে গেছে। কবিতার সেই সংহত, প্রতীকী আর ধ্বনিময় জগৎ থেকে গদ্যের আঙিনায় তাঁর এই রূপান্তর বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন ভাষা দিয়েছে। ‘জানালা যেলা রাখার সম্পূর্ণ ইতিহাস’ কিংবা ‘খুর রাগ হয় ভালোভাবে ছুঁতে না দিলে’—এমন প্রতিটি শিরোনামের ভেতর লুকিয়ে আছে এক একটি লোকগাথার সংকেত, যা কবির নিপুণ কারুকাজে পরাবাস্তব সত্য হয়ে ধরা দেয়।
বইটির নাম ‘অগল্পনীয়’ রাখার মাঝেই সঞ্জীব নিয়োগী এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতার জাল বুনেছেন; যা বলা যায় না, যা গল্পের মোড়কে এঁটে ওঠে না, অথচ যা ধ্রুব সত্য—তা-ই ‘অগল্প’। এগারোটি আখ্যানের এই জঙ্গলযাত্রায় আমরা দেখি সিংভূম, পালামৌ আর বিহারের সেই শুকনো প্রান্তরের কান্না, যেখানে রাষ্ট্র আর বিদ্রোহের মাঝখানে পিষ্ট হওয়া মানুষেরা মাছের মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার শিল্প শেখে। ‘মানুষ-মারা মাছ আর সাঁতার বিষয়ক রূপকথা’র মতো গল্পে ম্যাজিক রিয়ালিজমের এক এমন পরত তৈরি হয়, যেখানে নদীর মাছ আর লুকানো গেরিলা যোদ্ধারা একাকার হয়ে যায়। রুকসানারার শরীর যখন ‘পীরতলা’র মতোই পবিত্র আর অবহেলিত এক তীর্থ হয়ে ওঠে, তখন ধর্ম আর প্রান্তিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এক অদ্ভুত বিষাদে। সঞ্জীব নিয়োগীর গদ্যে কোথাও বঙ্কিমী গাম্ভীর্য বা রাবীন্দ্রিক দীপ্তি নেই, আছে মাটির সোঁদা গন্ধ আর সাঁওতালি বাক্যরীতির এক অদম্য বুনো স্রোত। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, বাংলা মানে কেবল গঙ্গা-পদ্মার ইলিশ-ভাতের সংস্কৃতি নয়; বাংলা মানে বাঁকুড়ার রুক্ষ ধুলো আর ঝাড়খণ্ডের লৌহ-খনির রক্তিম দীর্ঘশ্বাসও। এটা একটা আবিষ্কার, বাংলা ভাষার গর্ব।
একবিংশ শতাব্দীর এই বাণিজ্যের যুগে, যেখানে প্রকাশকেরা বিক্রির অঙ্ক খোঁজেন আর পাঠকেরা সস্তা বিনোদন, সেখানে সঞ্জীব নিয়োগী এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম—এক আড়াল-প্রিয় জঙ্গলশিল্পী। মিডিয়ার ঝলকানি বা সাহিত্য সম্মেলনের কোলাহল থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে তিনি এক নির্জন সাধনায় মগ্ন থাকেন। তাঁর এই উদাসীনতা আসলে এক হিমালয়-প্রমাণ সাহস; বেস্টসেলার হওয়ার মোহ ত্যাগ করে তিনি বেছে নিয়েছেন সেই দুর্গম পথ, যা কাঁটাঝোপ আর বুনো ফুলের ঘ্রাণে আকীর্ণ। তিনি জানেন, লেখকের শ্রেষ্ঠ পরিচয় তাঁর সৃষ্টির গহন গভীরে, পর্দার আড়ালে থাকা গাছের মতো, যে কেবল অক্সিজেন দেয় কিন্তু নিজে সামনে এসে দাঁড়ায় না। তাঁর ‘অগল্পনীয়’ পাঠ করা মানে কেবল একটি বই পড়া নয়, বরং এক দীর্ঘশ্বাসের অরণ্যে পা রাখা, যেখানে পুলিশের লাঠির শব্দ আর সাঁওতালি হাহাকার একই সমান্তরালে বাজে। ‘টাই আফটার সাম টাইম’—হয়তো সেই সময় আসবে যখন এই অগল্পগুলোই আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ ইতিহাস হয়ে উঠবে।
সঞ্জীব নিয়োগীর শিল্পসত্তার এক অদম্য বৈশিষ্ট্য হলো সুদূরের পানে তাঁর অতৃপ্ত যাত্রা এবং নবতর সৃষ্টির সন্ধানে এক ক্লান্তিহীন পথচলা, যেখানে চেনা গল্পের প্রথাগত দৃষ্টিকোণ ভেঙে তিনি এক বহুমাত্রিক ‘পয়েন্ট অব ভিউ’র জন্ম দেন। কখনও তিনি মারাংয়ের আদিম চোখে অরণ্যকে দেখেন, কখনও ভরতের বিদ্রোহী হৃদপিণ্ডে কান পাতেন, আবার কখনও বা নিজেই আখ্যানের ভেতর সংগোপনে প্রবেশ করে ‘শ্যামলী পুর্কালেয়তের সাক্ষাৎকার’-এর মতো বিরল ও অভিনব ফরম্যাটে উন্মোচন করেন ইতিহাসের গূঢ় রহস্য। তাঁর বাচনভঙ্গি যেন সেই রুক্ষ মাটিরই এক দৃঢ় প্রতিধ্বনি, যেখানে সাঁওতালি শব্দের নিবিড় স্পর্শের পাশেই খেলা করে ‘টাই আফটার সাম টাইম’-এর মতো নাগরিক জীবনের তীক্ষ্ণ শ্লেষ কিংবা ‘যদু-মধুর গল্প’-এর সেই আটপৌরে সারল্য। তিনি একই জলস্রোতে নানা রঙের ঢেউ তোলেন, কিন্তু তাঁর বাচনের সেই বিচিত্র বিন্যাস এক অলৌকিক সুতোয় গাঁথা থাকে। সঞ্জীবের শিল্প-কারুকাজে ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ কেবল অলঙ্কার নয়, বরং এক অমোঘ বাস্তবতা; যেখানে কোনো নামহীনা নারীর অবরুদ্ধ কান্না হঠাৎ নদী হয়ে বয়ে যায়, বনের নিস্তব্ধ বৃক্ষেরা মানুষের ভাষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিংবা পীরতলার রহস্যময় ছায়া থেকে রুকসানারার ডাক ভেসে আসে—বাস্তব আর অলীক কল্পনার এই মায়াবী ধোঁয়াশাই তাঁর সৃষ্টির প্রাণভোমরা। তাঁর গল্পের প্লট কোনো মসৃণ রাজপথ নয়, বরং তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা একগুচ্ছ রঙিন কাঁচের খণ্ড বা এক মুঠো অনুভূতির টুকরো, যেখানে ‘উল্লেখড’ কিংবা ‘কপালের নাম নেপাল’-এর মতো আখ্যানগুলো প্রথাগত ঘটনাপ্রবাহকে অস্বীকার করে এক ‘অপ্লট’ বা ‘প্লটহীনতা’র নান্দনিকতা ঘোষণা করে, যা আসলে তাঁর ‘অগল্প’ দর্শনেরই এক অনবদ্য শৈল্পিক প্রকাশ।
সঞ্জীব নিয়োগীর এই কাজ কোনো সাধারণ গল্পের বই নয়, বরং এটি সাঁওতাল পরগনার সেই সব নামহীন মানুষের জন্য নির্মিত এক স্মারকসৌধ, যাঁদের ইতিহাস মূলধারার বইতে কখনও ঠাঁই পায়নি। দারিদ্র্য এখানে কোনো কাব্যিক অলঙ্কার নয়, বরং তা নোংরা, দুর্গন্ধময় এবং রূঢ় বাস্তব। লেখকের ভাষা এখানে অর্গানিক; তিনি যখন ‘হাঁড়িয়া’, ‘জাহের থান’ বা ‘মারাং’ শব্দগুলো ব্যবহার করেন, তখন মনে হয় স্বয়ং মাটি কথা বলছে। এই ‘অগল্প’গুলো আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে বাংলা মানে কেবল গঙ্গাপারের কলকাতা বা ইলিশ-ভাতের সংস্কৃতি নয়; বাংলা মানে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটি আর শোষিত মানুষের বুকের ভেতরে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনের লেলিহান শিখা। ‘অগল্পনীয়’ পড়া শেষ করলে পাঠকের মনে এক দীর্ঘস্থায়ী বিষাদ আর প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকে যায়। এই বই আমাদের শেখায় যে সত্য যখন গল্পের চেয়েও বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে, তখন তাকে আর ‘গল্প’ বলা যায় না, তা হয়ে ওঠে ‘অগল্প’। সঞ্জীব নিয়োগী আমাদের সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন যেখানে মাছেরা সাঁতার কাটতে শেখে মানুষের রক্তের নদীতে, আর জানালা খোলা রাখা মানেই অজানা আতঙ্কের নিমন্ত্রণ। এই জঙ্গলযাত্রা তাই কেবল ভ্রমণের নয়, বরং নিজের সত্তাকে চেনার এবং রাষ্ট্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া মানুষের হাহাকারকে নিজের হৃদয়ে অনুভব করার এক গভীর দার্শনিক অভিজ্ঞতা।
এই সমস্তই আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভবের নির্যাস। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রথাগত জীবনযাত্রা কিংবা আধুনিক গদ্য-ধারণা নিয়ে আমার বিশেষ কোনো মোহাচ্ছন্ন বক্তব্য তৈরি হয়নি। বরং আমার সীমিত বোধে মনে হয়, বর্তমান কলকাতার তথাকথিত ‘পরিশীলিত’ গদ্য আজ বড্ড বেশি ছকবাঁধা ও কাঠামোবদ্ধ; যেখানে শব্দচয়নের ঐশ্বর্য যেমন অপ্রতুল, তেমনি বিষয়ের বুননও বড্ড গতানুগতিক। বাংলার নির্মম রাজনৈতিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কিংবা জীবনের মূল ‘মুদ্দা’ থেকে বিচ্যুত হয়ে অকিঞ্চিৎকর ‘অমুদ্দায়’ গা ভাসিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা চারদিকে দেখি, তার বিপরীতে সঞ্জীবের গদ্য এক স্পর্ধিত ব্যতিক্রম। আগেই বলেছি, মোল্লার দৌড় যেমন মসজিদ পর্যন্ত, আমার পড়ার দৌড় পশ্চিমপাড়ার মোড় অবধি, সেখান থেকে সঞ্জীব নিয়োগীর ‘অগল্পনীয়’-তে হঠাৎ করে জঙ্গলের পথে পাড়ি দেওয়া মানে এক সাহসিক পদক্ষেপ। সামান্য জ্ঞানেই বলা, সামান্য পাঠকামি। বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ পড়ে জ্ঞানতৃষ্ণা মিটিয়েছি, শরতের ‘পথের দাবী’তে আবেগে ভেসেছি আর রবির ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়ে মুগ্ধতায় আবিষ্ট হয়েছি। সঞ্জীব নিয়োগীর পাঠে যা বুঝলাম, বাংলা গদ্যের এক আশ্চর্য ‘অন্য দিক’ আছে—যা ধুলো-ধূসরিত, জঙ্গলময় এবং যেখানে আতঙ্ক ও আশার এক পরাবাস্তব মিশ্রণ ঘটে। সঞ্জীবের কলম যেন এক মায়াবী হাঁড়িয়ার ভাঁড়; আপনি যত বেশি তা পান করবেন, ততই এক অবর্ণনীয় নেশায় বুঁদ হয়ে যাবেন। যখন জানালা খোলা রেখে উঁকি দেবেন জঙ্গলের পানে, তখন পশ্চিমপাড়া ছাড়িয়ে হয়তো দেখতে পাবেন—মারাং দাঁড়িয়ে আছে গাছের ছায়ায়, ভরত ছুটছে নালার ধার দিয়ে, আর রুকসানারা আপনাকে চোখের ইশারায় ডাকছে পীরতলা থেকে।
Comments
Post a Comment