প্রবাসে

 পোয়েটিক প্রোজে লিখতে হবে, তিনটি লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে । 


একটি দিল্লির অজন্তা , একটি ভিলাইয়ের মধ্যবলয়, একটি পূর্ণিয়ার অক্ষর বিন্যাস । প্রবাসে থেকে বাংলা চর্চা করা একটি মহত বিষয় । এর জন্য মেধা, মনন, ত্যাগ, ভাষা প্রেম এর তুলনা হয় না । একজন, মানুষ পদ্মার পারে বসে দুবালতি জলের মূল্য কতোটা দেবে ? জল যদি রাজস্থানের কোন মরুঅঞ্চলে হয়, এই দুবালতি জলে একটি পরিবার সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারে । জীবন দিয়ে সেই মূল্য তারা চোকায় । বাংলা মূলভূমির বাংলা চর্চা আর প্রবাসে বাংলা চর্চার তাই অনেক মূল্যের তারতম্য । এই আরাবল্লীর পাহাড়ে একগাছা মালতী ফুটাতে হলে, যে মালী চাই, এই ভূভারতে আজ পাওয়া দুষ্কর । আরাবল্লীর মতোই পাহাড় প্রমান দুষ্কর । আজ তাই সেই যোদ্ধাদের নিয়ে কিছু কথা ।  

প্রথমে বলি মধ্যবলয়  নিয়ে । 

এই পত্রিকাটির নাম শুনি, দরবেশ কবি প্রাণজি বসাকের মুখে । দিল্লির প্রবীন কবিদের একজন । বাংলার পত্রিকার আলো যেখানে যেখানে পৌছেছে, সেখানে প্রাণজি বসাক কবিতা লেখেন । তারপর একজন কবি, সমরেন্দ্র বিশ্বাস সেই শ্রবনকে দৃঢ় করে দেন । ভিলাই থেকে কবি, আমাকে দেহলিজের কোন কাজে একবার মেসেঞ্জারে পিং করেন । কাকতালীয় ভাবেই, সেই কবি পরিচয় । তারপর, অনেক সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা আমাদের হয় ।  মধ্যবলয় নিয়ে জানান । এর ভিতর কলকাতা বইমেলায় শশরীরে উপস্থিত থাকার সুবাদে এই পত্রিকার সম্পাদক দুলাল সমাদ্দারকে শোনার অভিজ্ঞতা হয় । বাংলার বাইরে যে বাঙালি যে কি পরিমান অস্তিত্বের সংকটে আছে তারা তুলে ধরেন । চোখে জল চলে আসে । এক বতসর পর কলকাতা বইমেলায় দেখা হলে, আমি একটা সংখ্যা আবদার করে চেয়ে নিই । দাম, দিতে চাইলাম । সম্পাদক, আমার নাম শুনে , দাম নিলেন না ।  আমি ঋনী হয়ে গেলাম । 


প্রবাসে আছি এই রকম অনেকে বলেন । অনেকে বলেন বিদেশে আছি । এইটা হলো ৯০ শতাংশ একটি ভৌগোলিক দূরত্ব । বাকি ১০ শতাংশ হলো ঐতিহাসিক দূরত্ব । এইটা গণিতে বোঝানো মুশকিল । ভূগোলকে ইতিহাস দিয়ে যোগ করা যায় না । অর্থাত (ভূগোল x ৯০%) + (ইতিহাস x ১০%) == ১০০% প্রবাস বা বিদেশ এই রকম হয় না । এর মাঝে আরো কিছু ভ্যারিএবল আছে । একটা হলো, সময়, একটা হলো স্মৃতি , একটা হলো বাবার ক্ষেত থেকে ফিরে আসা । একটা হলো মায়ের আঁচলের গন্ধ । বাগচীদের পুকুরে তলিয়ে যাওয়া শৈশবের বন্ধু ইন্দ্রজিত । আর আমার হারিয়ে যাওয়া সময় । ১৭ বছর থেকে চাকরি করছি । হাফ প্যান্ট পরতাম যখন আমার চাকরি হয় বিমান বাহিনীতে । কৈশোর শেষ হলো না । যৌবন কি বুঝতে না বুঝতেই কর্পোরেটের চৌদ্দঘন্টার চাপে যৌবন শেষ হয়ে গেলো । বাংলার ভূমি, আমারও মা । বাংলা ভাষা, আমারও ভাষা । একজন সিলেট, একজন রংপুর, একজন বীরভূম, একজন নদীয়ার মতো, আমারও কিছু তার ঋণ আছে ।  আমি সেই ঋণ কবে মুক্ত হবো ?

হয়তো কোনদিন এই ঋণমুক্ত হবো না । তবে, এই যে যারা প্রবাসে প্রাণপনে বাংলার জন্য প্রাণ নিয়ে দিনরাত কাটায় , তাদের শ্রদ্ধায় , স্নেহে দিন কেটে যায় । ঋণ আছে । এই ঋণ ভালো ঋণ ।


মধ্যবলয়, একটি অতি উন্নত মানের বাংলা সাহিত্য পত্রিকা । পরিণতি , খুব উচ্চ মানের । স্থানীয় লেখকদের অনেককে আমি চিনতে পারলাম । কিছু লেখক পশিচবংগে ও ভারতের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে আছে। বৃহত বাংলার সতেজ স্বর ।। সূচীপত্র থেকে কিছু কথা ।




অনেকে বলেন বৃত্তের বাইরের বাঙালি । কিছু লোকে এই নিয়ে বিতর্ক করে । বাংলা মূলভূমির সাম্প্রতিক সংযোজন এই বিতর্ক ।  সঠিক মুদ্দাকে পিছনে রেখে বিতর্কের কারণে বিতর্ক করা । অথচ, আজ বাংলার বাইরে বাঙালিদের অস্তিত্ব বিপন্ন । আমরা মূলভূমির কোন গোষ্ঠী, সংঘটন, সমিতি, সমাজ, এসোশিয়েশন, ক্লাবকে এগিয়ে আসতে দেখলাম না, তাদের বলতে শুনলাম না । এই বাঙালি, বাংলা বিপন্ন । আমাদের চর্চা নেই, আমাদের চেতনা নেই, চেতনার উন্মেষ নেই । অভিনবত্ব নেই । বাংলা পিছিয়ে পড়েছে  শব্দ সংখ্যায়, বুতপত্তিতে, কম্পিউটার টেকনোলজীতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় । ইংরাজ আমলে আমরা আমাদের ভাষা ও সাহিত্যে আমরা অনেক এগিয়ে ছিলাম । 

   

 

  


একটি নিজের কবিতা দিয়ে শেষ করি, কবিতাটি ২০১৫ তে,  মুম্বাই থেকে প্রকাশিত , কবি অর্ঘ দত্তের সংকলন, কবিতা প্রবাসে পত্রিকায় বেরিয়েছিলো । 


জল জ্বলে ওঠে 



বিষয়বস্তুর ভিতরে ঢুকে মনে হলো
পথ হারিয়েছি
ফিরে আসার চিহ্নগুলি ধেবড়ে গেছে
     পায়ে পায়ে
আর দিলীপদা বলছিলো
সাংকেতিক বাঁকগুলোর কথা
গ্রানাইট থেকে কিভাবে তুলে নিতে হয় প্রচ্ছদ,
কিভাবে জানুয়ারীর প্রত্যেক রাত্রির জন্য 

জুলাইকে অনেক শীতল হতে হয়
কিভাবে লগে হরিয়ালী এঁকে গড়ে তুলতে হয়

বসন্তবিহার  থেকে
 একটানা গুঁড়গাও

এই সব যন্ত্রসর্বস্বতা
এত কার্বনের ভীড়, এত সালফার, এত সীসা
এর থেকে বীজ ছেনে নিয়ে জরায়ুর জলে রোপন করতে হয়
আমি নিষেকের কি বুঝি ?
এই গ্রীষ্মে আরাবল্লীর উপর এক গোছা মালতী ফোঁটাতে হলে
রৌদ্রের ঠোটে রাখতে হয় পেন্সিলের শীষ ।

দু-লাইনে দু-ঋতুর দিল্লিকে আমি কি দিয়ে লিখি ?
ধোঁয়া শব্দটি লিখতেই
ভিতর থেকে আবছা আগুনের ফুলকি ছুটে আসে  ।





---------

মধ্যবলয়ঃ


মধ্যবলয়: ইস্পাতনগরীর হৃদয়ে এক চিলতে পলিমাটি

ছত্তিশগড়ের রুক্ষ মাটির ওপর যখন ইস্পাত কারখানার আগুনের হলকা ওঠে, যখন যন্ত্রের ঘর্ষণে যান্ত্রিক হয়ে পড়ে সময়, ঠিক তখনই সেই ধোঁয়া আর উত্তাপের আড়ালে এক চিলতে স্নিগ্ধ জলছবির মতো জেগে ওঠে একটি নাম—‘মধ্যবলয়’। এটি কেবল একটি লিটল ম্যাগাজিন নয়; এটি হলো প্রবাসে বাঙালির আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক অবিনাশী সংগ্রাম।

১৯৬০ সালে স্থাপিত ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্থা, ভিলাই’ কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। যে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ এটি ৬০তম সংখ্যায় (শারদীয়া ১৪৩২) উপনীত হয়েছে, তার প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেগে আছে প্রবাসে বাংলা টিকিয়ে রাখার জেদ। সম্পাদক দুলাল সমাদ্দার এক নিরলস যোদ্ধা। কলকাতা বইমেলায় তাঁর মুখে যখন প্রবাসে বাঙালির অস্তিত্বের সংকটের কথা শুনেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল—পদ্মাপাড়ের মানুষটি জলের মূল্য না জানলেও, এই মরুভূমির মালিরা ঠিকই জানেন এক আঁজলা তৃষ্ণার দাম কত। তাঁর সেই উদারতা, সেই মমত্ববোধ আমাকে ঋণী করে রেখেছে। দাম নিতে অস্বীকার করে তিনি আসলে এক বৃহত্তর আত্মীয়তার বন্ধনে আমাকে বেঁধে নিয়েছেন।

পত্রিকাটির অঙ্গসজ্জা এবং বিষয়বৈচিত্র্য এক কথায় অনবদ্য। ‘আরাত্রিক’ নামাঙ্কিত এই সংখ্যাটির সূচিপত্রের দিকে তাকালে এক বিস্তৃত সৃজনশীল পৃথিবীর হদিস পাওয়া যায়। সুশান্ত হালদার, সুপ্রভাত সরকার, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, আশিষ রঞ্জন নাথ থেকে শুরু করে গোবিন্দ পাল, সুধাংশু রঞ্জন সাহা কিংবা দুলাল সমাদ্দার স্বয়ং—এক দীর্ঘ কবিতার মিছিল। এখানে যেমন আছে প্রবীণের অভিজ্ঞতা, তেমনি আছে নবীনের স্পন্দন। শুধু কবিতা নয়, মধুছন্দা মিত্রঘোষের ভ্রমণকাহিনী, মিহির সমাদ্দারের প্রতিবেদন কিংবা সমরেন্দ্র বিশ্বাস ও চিত্তরঞ্জন পাত্রের বই সমালোচনা—সব মিলিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ সারস্বত সাধনা।

সবচেয়ে মন ছুঁয়ে যায় সেই তথ্যটি—‘প্রতি শনিবারে কফি হাউসের আড্ডা চলছে... চলবে...’। ভিলাইয়ের রিসালী বা শক্তিবিহারের গলিগুলো যখন প্রতি শনিবার বাংলার আড্ডায় মুখর হয়, তখন মনে হয় ভূগোল হয়তো ব্যবধান তৈরি করে, কিন্তু ভাষা সেই ব্যবধান মুছে দেয়। ‘মধ্যবলয়’ আসলে সেই যোগসূত্র, যা আরবল্লীর রুক্ষতাকে বাংলার পলিমাটির সাথে মিলিয়ে দেয়। মিহির সমাদ্দারের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে পত্রিকাটি এক অনন্য শিল্পরূপ পেয়েছে।



অজন্তা

এখন পরিচালনা করছেন , কবিতা বন্দোপাধ্যায়



অজন্তা: রাজধানীর হৃদপিণ্ডে এক অবিনাশী সুরধ্বনি

দিল্লি—যেখানে মুঘলদের আভিজাত্য আর ব্রিটিশদের দম্ভ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। যমুনার তীরে যেখানে ইতিহাসের চাকা ঘোরে প্রতি পলে পলে, সেই পাথুরে মাটির বুক চিরে এক চিলতে পলিমাটির সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছিল ‘করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ’। ১৯৫৮ সালে যার প্রতিষ্ঠা, সেই সংসদই ১৯৬১ সালে জন্ম দিল এক কালজয়ী পত্রিকা—‘অজন্তা’।

দিল্লির বাংলা সাহিত্যচর্চার আকাশে ‘অজন্তা’ কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি দীর্ঘশ্বাস, একটি স্পন্দন। এর সূচনালগ্নে যিনি আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন ‘বটুকদা’—বিশিষ্ট কবি ও সুরকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র। তাঁর আঙুলের ছোঁয়ায় যেমন হারমোনিয়ামের রিড কথা বলত, তাঁর কলমেও তেমনই বেজে উঠত প্রবাস-বাংলার আর্তনাদ আর সম্ভাবনা। বটুকদা, জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায় আর নবেন্দু সেনরা মিলে যে ‘অজন্তা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তা ছিল দিল্লি আর কলকাতার মধ্যে এক অভিন্ন সাহিত্যিক সেতুবন্ধন। রাজধানীর যান্ত্রিক জীবনযাত্রার গভীরে থেকেও যে উচ্চমানের বাংলা চর্চা সম্ভব, অজন্তা তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ।

আজ সেই মশাল বহন করে চলেছেন কবিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সময়ের নিয়মে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু অজন্তার সেই ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আজও অটুট। বৈশাখ ১৪৩৩-এর (এপ্রিল ২০২৬) সদ্য প্রকাশিত সংখ্যাটি যখন হাতে নিই, দেখি প্রচ্ছদে বিপ্রজিৎ পালের শৈল্পিক ছোঁয়া। ভেতরে তাকালে মনে হয়, রাজধানীর বুকে বাংলা ভাষার এক বিশাল মহীরুহ ছায়া দিয়ে চলেছে নবীন আর প্রবীণদের। নবেন্দু সেন, রবীন চন্দ থেকে শুরু করে কবিতা বন্দ্যোপাধ্যায়—একঝাঁক নিষ্ঠাবান সম্পাদক মণ্ডলী এই মরু-উদ্যানে জল সিঞ্চন করে চলেছেন।

পত্রিকাটির সূচিপত্র যেন এক সমৃদ্ধ বাগান। গৌতম দাশগুপ্তের ‘কবি লিখলেন’ দিয়ে শুরু হওয়া সেই কবিতার মিছিলে যোগ দিয়েছেন পৃথা দাস, অগ্নি রায়, ইন্দিরা দাশ কিংবা গোপাল লাহিড়ীর মতো কবিরা। শাশ্বতী নন্দর ‘প্রতিদিনের পাতায় পাতায়’ কিংবা প্রশান্ত বারিকের ‘প্রহর’—প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ধরা আছে প্রবাসের একাকীত্ব আর শেকড়ের টান। সঞ্জীবন রায়ের ‘করোলবাগ-২০২৫’ কবিতাটি পড়লে বোঝা যায়, আগামী দিনের স্বপ্নগুলোও এই শহরের অলিতে-গলিতে বাংলা হরফেই বোনা হচ্ছে।

কেবল কবিতা নয়, গদ্যের ডালিও এখানে অপরূপ। সমৃদ্ধ দত্তর ‘মৃত্যু ও মুক্তি সংকেত’ কিংবা তিমিরণ দত্ত গুপ্তের ‘মায়া’—গল্পের শরীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন। কবিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্মৃতিমেদুর গ্রীষ্মযাপন’ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো দিনে, যেখানে আমের মঞ্জরির গন্ধে দুপুরের ঘুম ভাঙত। আর রতন মতিলালের ‘লাইফ সার্টিফিকেট’ যেন এক নির্মম অথচ সত্য দলিল, যা প্রবাসের প্রবীণদের অস্তিত্বের লড়াইকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

দিল্লির মতো এক মহাজাগতিক শহরে, যেখানে হিন্দি আর ইংরেজির প্রবল দাপট, সেখানে মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে একটি বাংলা পত্রিকা হাতে পাওয়া মানে—এক টুকরো বাংলাকে কাছে পাওয়া। এই পত্রিকাটি চালানো যে কত বড় এক ‘শ্রমসাধ্য যজ্ঞ’, তা কেবল তারাই বোঝেন যারা করোলবাগের সংকীর্ণ গলিতে বসে মুদ্রণের বিপুল খরচ আর বিপণনের দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ‘লেজার কম্পোজ’ করেন রমা চক্রবর্তীর মতো মানুষদের সাহায্যে।

এককালে দিল্লির বাংলা পত্রিকা সুন্দরবন বা সিলেটে পৌঁছানো ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু ‘অজন্তা’ সেই ভৌগোলিক গণ্ডিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে তার মেধা আর মনন দিয়ে। আজ যখন আমরা বলি ‘বৃহৎ বাংলা’, তখন অজন্তা সেই সংজ্ঞাকে পূর্ণতা দেয়। দিল্লির আরবল্লী পাহাড়ের মতো রুক্ষ পরিবেশে একগাছা মালতী ফোটানো যদি দুষ্কর হয়, তবে ‘অজন্তা’ সেই অসাধ্য সাধনকারী মালী।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র যে সুর বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন, আজও করোলবাগের ৩এ/৬১-৬৬ ডব্লু.ই.এ-র ঠিকানায় সেই সুর বেজে ওঠে। অজন্তা কেবল একটি পত্রিকা হয়ে থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে দিল্লির বাঙালির সাংস্কৃতিক ‘লাইফ সার্টিফিকেট’। যতক্ষণ অজন্তা আছে, যতক্ষণ এর পাতায় নতুনের পদধ্বনি শোনা যাবে, ততক্ষণ রাজধানীর ধুলোয় বাংলা ভাষার বিজয়পতাকা উড়বেই। এই যোদ্ধাদের জয়গান গাওয়ার মতো শব্দ হয়তো আমার ভাণ্ডারে নেই, কিন্তু আমার কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধা সবসময় তাঁদের চরণে অর্পিত থাকবে।


অক্ষর বিন্যাস: পূর্ণিয়ার ধুলোয় বোনা শব্দের আল্পনা

বিহারের পূর্ণিয়া। একদা যা ছিল মহানন্দা আর কৌশিকীর কোল ঘেঁষে এক চিলতে বাংলার স্বপ্ন। আজ সেই মাটির ঘ্রাণে বিহারের রুক্ষতা থাকলেও, পূর্ণিয়ার ‘ভাট্টা বাজার’ সংলগ্ন ‘গাঙ্গুলী পাড়া’র এক কোণে প্রতিদিন শব্দের মেলা বসে। সেখানে নিভৃতে চলে এক যজ্ঞ—যার নাম ‘অক্ষর বিন্যাস’।

এই যজ্ঞের দুই প্রধান ঋত্বিক হলেন অজয় সান্যাল আর চৈতালী সান্যাল। প্রবাসে বসে কেবল নিজের ভাষায় কথা বলা এক কথা, আর সেই ভাষাকে আগলে ধরে একটি পত্রিকা চালানো সম্পূর্ণ অন্য সাধনা। অজয় আর চৈতালী সান্যাল সেই কঠিন ব্রতটিই পালন করছেন। তাঁদের যুগলবন্দীতে ‘অক্ষর বিন্যাস’ আজ তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করেছে। এটি কেবল একটি পত্রিকা নয়, এটি পূর্ণিয়ার বাঙালির এক টুকরো ‘বই-ঘর’।

পত্রিকাটির নামের মধ্যেই এক কারিগরের নিপুণতা লুকিয়ে আছে। ‘অক্ষর বিন্যাস’—অর্থাৎ অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে এক একটি ইমারত গড়া। শিল্পী জয়শ্রী রায়ের তুলিতে এর অবয়বটি যখন মূর্ত হয়, তখন মনে হয় পূর্ণিয়ার রুক্ষ মাটির ওপর যেন কেউ সযত্নে পলিমাটি বিছিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো এর মুদ্রণ ব্যবস্থা। পূর্ণিয়া থেকে বীরভূমের বোলপুর—শান্তিনিকেতনের সেই পবিত্র মাটির সাথে ‘অক্ষর বিন্যাস’ এক অদৃশ্য নাড়ির টান তৈরি করেছে। জয়ন্ত চক্রবর্তীর মুদ্রণ ব্যবস্থাপনায় শান্তিনিকেতনের ‘বই-ঘর’ থেকে যখন এই পত্রিকা পূর্ণিয়ায় পৌঁছায়, তখন তাতে যেন রবীন্দ্রনাথের সেই চিরকালীন বাংলার সুবাস লেগে থাকে।

বৈশাখী বা শারদীয়া—প্রতিটি সংখ্যাই এক একটি রত্নভাণ্ডার। সম্পাদকীয়র সেই গভীর উপলব্ধিতে অজয় আর চৈতালী সান্যাল যখন প্রবাসের যন্ত্রণার কথা লেখেন, তখন পাঠকের হৃদয়েও ঢেউ জাগে। প্রবন্ধের পাতায় রণজিৎ কুমার মিত্র, ড. বাসুদেব রায় কিংবা মাল্যবান মিত্রের মতো প্রাজ্ঞ লেখকদের চিন্তা আমাদের ঋদ্ধ করে। কবিতার বিভাগটি যেন এক উন্মুক্ত আকাশ। সেখানে দিল্লির সেই চিরসবুজ কবি প্রাণজি বসাক যেমন আছেন, তেমনি আছেন উমা রায়, নিশিকান্ত সিনহা আর কালীপদ চক্রবর্তীরা। প্রবাসের ধুলোবালিতেও যে কত উজ্জ্বল সব মণিমাণিক্য ছড়িয়ে আছে, এই সূচিপত্র তার প্রমাণ।

অক্ষর বিন্যাসের একটি বিশেষ দিক হলো এর বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন জয়শ্রী রায়ের অনুবাদ কবিতা আমাদের বিশ্বসাহিত্যের স্বাদ দেয়, অন্যদিকে অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দাদার কীর্তি’ নিয়ে আলোচনা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ধ্রুপদী সিনেমার স্বর্ণযুগে। সমরেন্দ্র বিশ্বাস, আলো রায় কিংবা চৈতালী সান্যালদের গল্পে উঠে আসে জীবনের সেইসব না বলা কথা, যা কেবল প্রবাসের একাকীত্বেই জন্ম নিতে পারে। আবার বিবেকানন্দ বসাক কিংবা সুদেষ্ণা মিত্রদের ভ্রমণকাহিনী আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে বাইরের বিশাল পৃথিবীকে চিনিয়ে দেয়।

পূর্ণিয়ার মতো জায়গায় বাংলা পত্রিকা চালানো মানে হলো—মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে মেঘের জন্য প্রার্থনা করা। কিন্তু অজয় আর চৈতালী সান্যাল কেবল প্রার্থনা করে ক্ষান্ত হননি, তাঁরা শ্রম দিয়ে, মেধা দিয়ে সেই মেঘকে নামিয়ে এনেছেন অক্ষর বিন্যাসের পাতায়। পঁচাশট্টি টাকার এই পত্রিকাটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় যে পরিমাণ মেধা আর ত্যাগের স্বাক্ষর আছে, তা অমূল্য।

‘অক্ষর বিন্যাস’ আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বাংলা ভাষা কেবল কলকাতা বা ঢাকা কেন্দ্রিক নয়। যেখানেই একজন বাঙালি নিজের শেকড়কে অনুভব করেন, সেখানেই জন্ম নেয় এক একটি ‘অক্ষর বিন্যাস’। পূর্ণিয়ার গাঙ্গুলী পাড়া থেকে শান্তিনিকেতনের বোলপুর পর্যন্ত প্রসারিত এই যে সেতুবন্ধন—এটাই তো আমাদের ভাষার শক্তি।

আজকের এই যান্ত্রিক যুগে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর করপোরেট চাপে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন এই অক্ষর বিন্যাসের পাতাগুলো আমাদের অক্সিজেন দেয়। এই যোদ্ধাদের কুর্নিশ জানাই। তাঁরা জানেন, আরবল্লীর পাহাড়ের মতো কঠিন এই প্রবাস জীবনে একগাছা মালতী ফোটাতে হলে কেবল মালী হলে চলে না, হৃদয়ের রক্ত দিয়ে সেই চারাকে জল দিতে হয়। অক্ষর বিন্যাস সেই রক্তরাঙা ভালোবাসারই এক অন্য নাম।


উপসংহার: তিন বাতিঘরের মহাকাব্য

ভিলাইয়ের ‘মধ্যবলয়’, দিল্লির ‘অজন্তা’ আর পূর্ণিয়ার ‘অক্ষর বিন্যাস’—এই তিনটি লিটল ম্যাগাজিন আসলে তিনটি বাতিঘর। যারা সমুদ্রের মাঝখানে দিকভ্রান্ত হওয়া প্রবাসী বাঙালিদের ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাচ্ছে।

প্রবাসে থাকা মানে কেবল জীবিকার তাগিদে দেশ ছাড়া নয়, প্রবাসে থাকা মানে প্রতিনিয়ত নিজের ভাষার জন্য এক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। এই যোদ্ধারা কোনো রাজকীয় সম্মান পান না, তাঁদের নামের পাশে হয়তো কোনো বড় পুরস্কারের তকমা জোটে না। কিন্তু তাঁরা যা করেন, তা হিমালয়প্রমাণ। তাঁরা রাজস্থানের মরুভূমিতে বসে দুই বালতি জলের মূল্য বোঝেন। তাঁরা জানেন, বাংলার মূলভূমি থেকে শত মাইল দূরে বসে এক চিলতে বাংলা হরফ ছাপার অক্ষরে দেখার আনন্দ কতটা।

আমার ১৭ বছরের চাকরি জীবন আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু এই যে নিজের ভাষার প্রতি টান—এই ঋণ আমি কখনও মুক্ত হতে পারব না। এই তিনটি পত্রিকা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি একা নই। ভিলাইয়ে দুলাল সমাদ্দার আছেন, দিল্লিতে কবিতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, আর পূর্ণিয়ায় আছেন অজয় ও চৈতালী সান্যাল।

এই যে বাংলার বাইরে ‘বৃহৎ বাংলা’র জয়গান গাওয়ার মতো মানুষেরা আছেন, এটাই আমাদের শেষ ভরসা। আরাবল্লীর রুক্ষ পাহাড়ে মালতী ফুল ফোটানোর এই যে জেদ—এই জেদই বাংলা ভাষাকে অমর করে রাখবে। এই তিন যোদ্ধার চরণে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো বেঁচে থাকুক, কারণ এরাই আমাদের অস্তিত্বের একমাত্র 'লাইফ সার্টিফিকেট'।






---------------------------------------







অজন্তা

এখন পরিচালনা করছেন , কবিতা বন্দোপাধ্যায়


করো

নবাগ

деяй

স্থাপিত - 1958

করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ

৩এ /৬১-৬৬, ডব্লু.ই.এ.,করোলবাগ নিউ দিল্লী-১১০০০৫

০১১-৩৫৫২০৯০০ / ০১১-৩৫৫২১০৯৯ E-mail: kbbs_newdelhi@yahoo.co.in

১৯৬১ খ্রীস্টাব্দ  নাগাদ দিল্লির সাহিত্য জগতে 'অজন্তা' পত্রিকার আত্মপ্রকাশ এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্রের সুদক্ষ সম্পাদনায় এই পত্রিকাটি দিল্লি ও কলকাতার প্রতিষ্ঠিত লেখকদের মধ্যে এক সাহিত্যিক সেতুবন্ধন রচনা করেছিল।অজন্তা (১৯৬১): দিল্লির বাংলা পত্রিকার ইতিহাসে 'অজন্তা' একটি মাইলফলক। ১৯৬১ সালে এর প্রকাশনা শুরু হয়, এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায় এবং নবেন্দু সেনের মতো ব্যক্তিত্বদের নাম। 'বটুকদা' নামে পরিচিত জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ছিলেন একাধারে কবি, সুরকার এবং দিল্লির সাংস্কৃতিক জগতের এক মধ্যমণি। তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি 'অজন্তা'কে এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। এই পত্রিকা শুধু দিল্লির স্থানীয় লেখকদেরই নয়, কলকাতার প্রতিষ্ঠিত লেখকদের রচনাও প্রকাশ করত। এর মাধ্যমে দিল্লির সাহিত্যপ্রেমী বাঙালি পাঠকরা столичной জীবনযাত্রার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের মূলধারার সঙ্গেও সংযুক্ত থাকার সুযোগ পেতেন। 'অজন্তা' একটি সাহিত্যিক সেতু হিসেবে কাজ করেছিল এবং প্রমাণ করেছিল যে রাজধানীর বুকে থেকেও উচ্চমানের বাংলা সাহিত্যচর্চা সম্ভব।·        দিল্লিতে বাংলা লঘু পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসটি নিতান্ত নবীন নয়। ১৯৬১ সালে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায়দের হাত ধরে ‘অজন্তা’-র প্রকাশনা যে পথ নির্মাণ করেছিল, সেই পথে হেঁটেছে ‘দিগঙ্গন’, ‘বঙ্গচেতনা’, ‘উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস’-এর মতো বহু পত্রিকা। এই পত্রিকাগুলি ছিল দিল্লির বাঙালি সমাজের সাংস্কৃতিক আশ্রয়, তাদের সাহিত্যিক মনন প্রকাশের একমাত্র নির্ভরযোগ্য মঞ্চ। কিন্তু তাদের পথচলা ছিল শ্রমসাধ্য এবং সীমাবদ্ধ। মুদ্রণের বিপুল খরচ, বিপণনের সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি ভৌগোলিক গণ্ডি ছিল তাদের প্রধান অন্তরায়। একটি পত্রিকা দিল্লিতে ছাপা হয়ে সুন্দরবন বা সিলেটে পৌঁছানো ছিল প্রায় অকল্পনীয়। এই পত্রিকাগুলি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সাহিত্যপ্রেমী মানুষের একটি নিবিড় গোষ্ঠী তৈরি করতে পারলেও, বৃহত্তর বাঙালি পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তাদের ছিল না।

বৈশাখ সংখ্যা (বৈশাখ ১৪৩৩, এপ্রিল ২০২৬)

সম্পাদক মণ্ডলী :

নবেন্দু সেন, রবীন চন্দ, শ্রীমতী চক্রবর্তী, বিপ্রজিৎ পাল, দীপ্তাংশু ভট্টাচার্য, মনোজিৎ চক্রবর্তী ও কবিতা ব্যানার্জি

প্রচ্ছদ বিপ্ৰজিৎ পাল

লেজার কম্পোজ রমা চক্রবর্তী

সূচিপত্র

সম্পাদকীয় ৩ কবিতা

কবি লিখলেন / গৌতম দাশগুপ্ত ৫ অবক্ষয় / পৃথা দাস ৫ হাওয়ায় মাপা দূরত্ব / অগ্নি রায় ৬ ইন্দিরা দাশের কবিতা গুচ্ছ ৭ প্রতিদিনের পাতায় পাতায় / শাশ্বতী নন্দ ১০ প্রহর / প্রশান্ত বারিক ১০ চুনরি মেঁ দাগ / কৌশিক সেন ১১

এক টুকরো জীবনকথা / শাশ্বতী গাঙ্গুলি ১২ সিনেমাটিক / সোনালি মিত্র ১৩ করোলবাগ-২০২৫ / সঞ্জীবন রায় ১৩

গোপাল লাহিড়ী-র দুটি কবিতা ১৪

মুদ্রণ রমা চক্রবর্তী

ডি-৬৩০, চিত্তরঞ্জন পার্ক, নতুন দিল্লি-১১০০১৯

দূরভাষ : ৯২১৩১৩৪৪৮৭

রঙ্গিন খামের চিঠি / তুহিন চন্দ ১৫

স্মৃতির ভীড় / শর্মিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায় ১৫ অনুগল্প, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনী মৃত্যু ও মুক্তি সংকেত / সমৃদ্ধ দত্ত ১৬ মায়া / তিমিরণ দত্ত গুপ্ত ২১ অনন্ত পলাশ / জয়া চৌধুরী ২৭ সমান্তরাল / পৌলমী দেব ৩০

বিন্দী / সুরভি ঘোষ মৌলিক ৩৫

হ্যাঁ স

জীব-কুল,

রাস্তায় ঘু

এই

থাকি না

প্রকৃ ও কারে

বছরের সা

প্রকাশক

করোলবাগ বঙ্গীয় সংসদ

নতুন দিল্লি-১১০০০৫

৩-এ/৬১-৬৬, ডব্লু.ই.এ, করোলবাগ,

দূরভাষ ঃ ২৮৭৮১৫৭৮

ই-মেল : kbbs_newdelhi@yahoo.co.in

বা

যা যা

ষড়যন্ত্র

রুকেলি / সায়ন্তন ধর ৩৮

অনব

মানবী / মৃণাল ঘোষ ৩৯

চেনা পথ / নীলাশিস ঘোষ দস্তিদার ৪৩

পথে

পথ

মাথ

তি

না

অস্তরাগ / রেখা নাথ ৪৭ লাইফ সার্টিফিকেট / রতন মতিলাল ৪৮ স্মৃতিমেদুর গ্রীষ্মযাপন / কবিতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৪৯

প্রত্যাবর্তন / অভিজিৎ মুখার্জি ৫১

অসিত / রীতা বিশ্বাস পান্ডে ৫৫

অশ্বক্লান্ত: দণ্ডায়মান একটি অব্যক্ত ইতিহাস / ডরোথী দাশ

প্রতি সংখ্যা - ৫০ টাকা

বিশ্বাস ৫৮

আজীবন গ্রাহক - ১৫০০ টাকা

স্বচ্ছতর জলের শহর জব্বলপুর / পীযূষ কান্তি বিশ্বাস ৬৩

অজন্তা এ ২








অক্ষর বিন্যাস

সম্পাদনা ও পরিচালনা

অজয় স্যান্যাল ও চৈতালী স্যান্যাল

অক্ষর - বিন্যাস

তৃতীয় বর্ষা তৃতীয় সংখ্যা। ১৯৩৬

সম্পान

অজয় সান্যাল, চৈতালী সনাল

শিল্পী

জয়শ্রী রায়

দপ্তর

K গাঙ্গুলী পাড়া, ভাড়া বাজার, পূর্ণিয়া, বিহার

মূদ্রণ ব্যবস্থাপনা জয়ন্ত চক্রবর্তী

বই-ঘর শান্তিনিকেতন

মিশন কম্পাউন্ড, বোলপুর, বীরভূম

পিন ৭৩১২০৪

চলভাষ: +৯১৮৫৮৪৯88368

boighar.shantiniketan@gmail.com


-গল্প-৮৪-৯৮

আলো রায় । সমরেন্দ্র বিশ্বাস । বিদ্যুৎ পাল ।

মহিবুল আলম । চৈতালী সান্যাল

-ভ্রমণ- ৯৯-১১

বিবেকানন্দ বসাক । সুদেষ্ণা মিত্র । দীপ দত্ত

সুশান্ত নন্দী । অজয় সান্যাল

-আলোচনা : সিনেমা বিষয়ক - ১১৩-১১৪

Dadar Kirti - a timeless classic - Arnab Banerjee


সূচিপত্র

-সম্পাদকীয়- ০৬-০৭

অজয় সান্যাল, চৈতালী সান্যাল

-প্রবন্ধ- ০৮-৫৩

রণজিৎ কুমার মিত্র । ড. বাসুদেব রায় । জুলফিকার জিন্না । তন্ময় ধর । অপর্ণা দেব । জহর দেবনাথ । মাল্যবান মিত্ৰ । অঙ্কন রায়

-কবিতা- ৫৪-৭০

উমা রায়। প্রাণজি বসাক। নিশিকান্ত সিনহা। দুর্গাদাস মিদ্যা। কালীপদ চক্রবর্তী। বিশ্বজিৎ রায়। আশীষ ঘোষ। মনোজ পাইন। অভীক কুমার দে। বর্ণালী গুপ্ত। অভিজিৎ মান। সোমেন চক্রবর্তী। প্রদীপ কুমার দে নীলু। গোপাল পোদ্দার। জয়ন্ত চক্রবর্তী। কস্তুরী রায় চট্টোপাধ্যায়। ভবেশ দাস

-অনুবাদ কবিতা-৭১-৭৫

জয়শ্রী রায়

-স্মৃতিকথা- ৭৬-৮০

দেবপ্রসাদ দাস

বিন্যাস

রম্যরচনা-৮১-৮২

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

- অনুগল্প- ৮৩

রতন মতিলাল

-গল্প- ৮৪-৯৮

আলো রায় । সমরেন্দ্র বিশ্বাস । বিদ্যুৎ পাল । মহিবুল আলম । চৈতালী সান্যাল

-ভ্রমণ- ৯৯-১১২

বিবেকানন্দ বসাক । সুদেষ্ণা মিত্র । দীপ দত্ত

সুশান্ত নন্দী । অজয় সান্যাল

-আলোচনা : সিনেমা বিষয়ক- ১১৩-১১৪

Dadar Kirti - a timeless classic - Arnab Banerjee

m



মরু-উদ্যানে মালতী ফুল: প্রবাসে বাংলা চর্চার তিন যোদ্ধা

প্রাক-কথন: জলের মূল্য ও আরাবল্লীর চারা

পদ্মাপাড়ের মানুষটি কোনোদিন জানবে না এক ঘড়া জলের হাহাকার কী। যেখানে নদী দুহাত উপুড় করে বালি ও পলি মাখিয়ে দিয়ে যায়, যেখানে মেঘের বুক চিরে অঝোরে ঝরে নীলিমা, সেখানে জল তো কেবল তৃষ্ণা মেটানোর উপাদান নয়—জল সেখানে অস্তিত্বের এক সহজলভ্য বিলাস। কিন্তু রাজস্থানের তপ্ত বালুকাবেলায় যখন দু-বালতি জল একটি পরিবারকে সারাদিনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়, তখন সেই জলের বিন্দুতে ধরা থাকে ব্রহ্মাণ্ডের সমান মূল্য। জীবনের বিনিময়ে সেই জলটুকু আগলে রাখতে হয়।

বাংলা ভাষার চর্চাও আজ ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মূলভূমির উর্বর পলিমাটিতে বাংলা লেখা সহজ, বলা সহজ, বেঁচে থাকা আরও সহজ। সেখানে ভাষার জন্য মালি লাগে না, প্রকৃতিই তাকে লালন করে। কিন্তু যখন দিল্লি, ভিলাই কি পূর্ণিয়ার মতো রুক্ষ, ঊষর জমিতে একগাছা মালতী ফোটাতে হয়, তখন যে মালি চাই, এই ভূভারতে আজ তাঁর দেখা পাওয়া দুষ্কর। আরাবল্লীর পাহাড়ের মতো কঠিন সেই কাজ। আর যারা এই অসাধ্য সাধন করছেন, তাঁরা মালি নন—তাঁরা যোদ্ধ। আজ সেই যোদ্ধাদের গল্প বলব। এই গল্পে অভিমান আছে, স্মৃতি আছে, আর আছে নিজের ভাষার প্রতি এক অমোঘ, অবিনাশী প্রেম।


প্রথম অধ্যায়: মধ্যবলয় — ভিলাইয়ের হৃদস্পন্দন

ভিলাই—ছত্তিশগড়ের এক ইস্পাতনগরী। আগুনের হলকা আর লোহার ঘর্ষণে যেখানে জীবন কাটে যান্ত্রিক ছন্দে। সেই আগুনের শহরের অন্তরালে ফুটে আছে এক নীল পদ্ম—পত্রিকাটির নাম 'মধ্যবলয়'।

এই নামটির সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিল দিল্লির প্রবীণ কবি প্রাণজি বসাকের মুখে। প্রাণজি দা এমন একজন মানুষ, যাঁর চুলে দিল্লির ধুলো লাগলেও হৃদয়ে বইছে রূপনারায়নের জল। বাংলার ছোট পত্রিকার আলো যেখানেই পৌঁছায়, সেখানেই তিনি তাঁর কবিতার স্বাক্ষর রাখেন। এরপর সেই শ্রুতিলব্ধ পরিচয়কে রক্তমাংসের শরীর দিলেন কবি সমরেন্দ্র বিশ্বাস। কাকতালীয়ভাবেই একদিন মেসেঞ্জারের পিং-এ আলাপ। দেহলিজের কাজে তাঁর সাথে সখ্য গড়ে উঠল। তিনি জানালেন 'মধ্যবলয়'-এর কথা। সেই থেকে ভিলাই আর এক নামহীন শহর রইল না, ভিলাই হয়ে উঠল বাংলা সাহিত্যের এক দূরবর্তী বাতিঘর।

কলকাতা বইমেলা—যেখানে লক্ষ মানুষের পদচিহ্নে ধুলো ওড়ে, সেখানেই দেখা হলো 'মধ্যবলয়'-এর সম্পাদক দুলাল সমাদ্দারের সাথে। মানুষটিকে শোনার অভিজ্ঞতা এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আর গর্বের সংমিশ্রণ। তিনি যখন বলছিলেন প্রবাসে বাঙালির অস্তিত্বের সংকটের কথা, যখন বলছিলেন শিকড়হীন এক জাতির লড়াইয়ের কথা, তখন তাঁর গলার স্বরে ছিল এক অদ্ভুত কাঁপন। চোখে জল আসার মতো সেই মুহূর্ত। এক বছর পর আবার দেখা। আমি একটি সংখ্যা আবদার করে চেয়ে নিলাম। দাম দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দুলাল বাবু নিলেন না। নাম শুনে তিনি যে মমতা দেখালেন, তাতে আমি চিরঋণী হয়ে গেলাম। এই ঋণ কাগজের নয়, এই ঋণ অনুভবের।

'মধ্যবলয়' কেবল একটি পত্রিকা নয়, এটি একটি দর্পণ। ভিলাইয়ের 'বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্থা'র এই প্রয়াসটি শুরু হয়েছিল ১৯৬০ সালে। ভাবা যায়? ষাট বছর ধরে এক অন্য ভাষার পরিমণ্ডলে নিজের ভাষাকে সতেজ রাখা! শারদীয়া ১৪৩২-এর সংখ্যাটি যখন হাতে পাই, তখন তার সূচিপত্র দেখেই চমকে যেতে হয়। প্রশান্ত হালদার থেকে সুপ্রভাত সরকার, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুধাংশু রঞ্জন সাহা—কত কত নাম! এদের অনেকের কবিতা আমাদের মূলভূমির পাঠকদের অজানা। অথচ কী তীক্ষ্ণ তাঁদের শব্দবিন্যাস, কী গভীর তাঁদের জীবনবোধ।

'আরাত্রিক' বিভাগটি যেন এক শ্রদ্ধার ডালি। প্রতি শনিবার কফি হাউসের আড্ডার স্মৃতি, আড্ডার উত্তাপ ভিলাইয়ের বুকে বয়ে নিয়ে চলেছেন এঁরা। দুলাল সমাদ্দারের সম্পাদনায় এই পত্রিকাটি প্রমাণ করে দেয় যে, বাংলা ভাষা কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। 'মধ্যবলয়' আসলে সেই যোগসূত্র, যা রুংটা বা রিসালী-র গলিগুলোকে ধর্মতলা বা কলেজ স্ট্রিটের সাথে মিলিয়ে দেয়।


দ্বিতীয় অধ্যায়: প্রবাসের গাণিতিক পরিহাস

অনেকে বলেন প্রবাসে আছি, অনেকে বলেন বিদেশে। প্রবাস আর বিদেশের মধ্যে তফাৎ সামান্যই। আমি মনে করি, এটা ৯০ শতাংশ ভৌগোলিক দূরত্ব, কিন্তু বাকি ১০ শতাংশ এক গভীর ঐতিহাসিক দূরত্ব। এই দশ শতাংশকে গণিতে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। (ভূগোল x ৯০%) + (ইতিহাস x ১০%) কখনোই ১০০ শতাংশ প্রবাসের পূর্ণ ছবি হতে পারে না।

এর মাঝে রয়ে যায় কিছু নামহীন ভ্যারিয়েবল। এর মাঝে রয়ে যায় সময়, রয়ে যায় স্মৃতি। বাবার ক্ষেত থেকে ধান মাড়াইয়ের গন্ধ মেখে ফেরা—সেই মুহূর্তের কোনো গাণিতিক মান নেই। মায়ের আঁচলের সেই চিরকালীন গন্ধ, যা পৃথিবীর কোনো সুগন্ধি দিয়ে বানানো যায় না। বাগচীদের পুকুরে যে শৈশব তলিয়ে গিয়েছিল বন্ধু ইন্দ্রজিতের সাথে, সেই ইন্দ্রজিৎ আজও আমার মনের কোনো এক কোণায় ডুব দিয়ে আছে।

আমার জীবনের সতেরো বছর থেকে চাকরি। যখন হাফ প্যান্ট পরার বয়স, যখন কৈশোরের ডানায় রোদের ঝিলিক থাকার কথা, তখন থেকেই আমি বিমান বাহিনীর জওয়ান। কর্পোরেট জগতের ১৪ ঘণ্টার অমানুষিক চাপে কখন যে যৌবন ফুরিয়ে গেল, টের পাইনি। বাংলার মাটি আমারও মা, বাংলা ভাষা আমারও সত্তা। কিন্তু রংপুরের মানুষটি কিংবা নদীয়ার মানুষটি যেভাবে ভাষার ঋণ শোধ করতে পারেন, আমি কি তা পারি? আমার কি সেই অধিকার আছে?

হয়তো কোনোদিন এই ঋণ মুক্ত হতে পারব না। কিন্তু যখন দেখি দুলাল সমাদ্দারের মতো মানুষরা নিঃস্বার্থভাবে বাংলার জন্য প্রাণপাত করছেন, তখন শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। এই ঋণ আসলে এক 'ভালো ঋণ'। যে ঋণ মানুষকে ঋদ্ধ করে, যে ঋণ মানুষকে শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।


তৃতীয় অধ্যায়: দিল্লির 'অজন্তা' — ইতিহাসের রাজপথে বাংলার পদধ্বনি

দিল্লি—যেখানে সুলতানদের ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যেত এককালে, সেখানে আজ যান্ত্রিক শব্দের ভিড়। কিন্তু দিল্লির ধুলোর স্তরে স্তরে জমে আছে ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে ডানা মেলছে 'অজন্তা'।

দিল্লিতে বাংলা চর্চার লড়াইটা একটু অন্যরকম। এখানে বুদ্ধিজীবিতা আর আভিজাত্যের এক সংমিশ্রণ আছে। প্রাণজি বসাকদের মতো কবিরা যখন চিত্তরঞ্জন পার্কের অলিগলিতে হেঁটে বেড়ান, তখন মনে হয় গালিবের শহরের আকাশেও বাংলা মেঘ ভাসছে। 'অজন্তা' সেই মেঘের বৃষ্টি।

দিল্লির অজন্তা পত্রিকাটির গুরুত্ব কেবল সাহিত্যিক নয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিকও বটে। ভারতের রাজধানী শহরে থেকে একটি বাংলা পত্রিকা চালানো মানে হলো সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের অস্তিত্বের জানান দেওয়া। যখন মূলভূমির বাঙালিরা আত্মবিস্মৃত হতে বসেছে, তখন অজন্তা-র পাতায় পাতায় উঠে আসে দেশভাগ, উদবাস্তু স্মৃতি আর বর্তমানের লড়াই। প্রবাসের বাঙালিরা আজ অস্তিত্বের সংকটে। অথচ মূলভূমির কোনো সংগঠন বা ক্লাব কি তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে? আমরা কি একবারও ভেবেছি, মেঘালয়ে বা অসমে বা দিল্লির কোনো প্রান্তে কোনো বাঙালি বিপন্ন হলে আমাদের কী করণীয়?

অজন্তা সেই সংকটের কথা বলে। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও বাংলা ভাষাকে কীভাবে প্রাসঙ্গিক রাখা যায়, সেই চিন্তার ছাপ অজন্তার পাতায় পাওয়া যায়। ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্য বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার ছিল। আজ আমরা সেই জায়গা থেকে চ্যুত হচ্ছি। অজন্তা সেই হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের এক নীরব সৈনিক।


চতুর্থ অধ্যায়: পূর্ণিয়ার 'অক্ষর বিন্যাস' — সীমান্তপারের শব্দশ্রমিক

বিহারের পূর্ণিয়া। একদা যা বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। আজও সেখানে অনেক পরিবারে বাংলায় কথা বলা হয়, কিন্তু পরিবেশটি বদলে গেছে। সেই প্রতিকূলতার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে 'অক্ষর বিন্যাস'।

অক্ষর বিন্যাস-এর নামের মধ্যেই এক স্থপতিসুলভ গাম্ভীর্য আছে। বর্ণের পর বর্ণ সাজিয়ে এক একটি ইমারত তৈরি করছেন এর লেখক ও সম্পাদকরা। পূর্ণিয়ার মাটি রুক্ষ হতে পারে, কিন্তু সেই মাটিতে ফলানো সাহিত্যের স্বাদ একেবারে আলাদা। এখানে কোনো মেকি আধুনিকতা নেই, নেই কোনো সস্তা সস্তার জনপ্রিয়তার মোহ। আছে কেবল ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি এক অসীম অনুরাগ।

পূর্ণিয়ার এই ছোট পত্রিকাটি আমাদের শেখায় কীভাবে কম সম্পদেও মহৎ সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলার মূলভূমির বাইরে যে এক 'বৃহৎ বাংলা' পড়ে আছে, পূর্ণিয়ার লেখক গোষ্ঠী তার সতেজ স্বর। তাঁরা যখন লেখেন, তখন নদীয়ার জল আর পূর্ণিয়ার ধুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।


পঞ্চম অধ্যায়: বৃত্তের বাইরে ও ভেতরে

অনেকে বলেন 'বৃত্তের বাইরের বাঙালি'। এই শব্দটি নিয়ে ইদানীং প্রচুর বিতর্ক হচ্ছে। বিতর্ক করা বাঙালির মজ্জাগত। কিন্তু সঠিক মুদ্দাকে আড়াল করে দিয়ে বিতর্কের জন্য বিতর্ক করাই আজ দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্তিত্ব যখন বিপন্ন, তখন আমাদের উচিত ছিল ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কিন্তু আমরা বিভক্ত হয়ে পড়েছি শব্দ সংখ্যায়, ব্যুৎপত্তিতে।

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যে বাঙালিরা আছেন, তারা কি দ্বিতীয় শ্রেণির বাঙালি? কক্ষনো নয়। বরং তাঁরাই প্রকৃত যোদ্ধা। মরুভূমিতে একগাছা মালতী ফোটাতে যে শ্রম লাগে, বাগানে সেই ফুল ফোটাতে তার শতাংশের এক ভাগও লাগে না। মধ্যবলয়, অজন্তা কিংবা অক্ষর বিন্যাস—এই পত্রিকাগুলো কেবল কাগজের বান্ডিল নয়, এগুলো একেকটি দলিল। এগুলোতে লেখা আছে বিচ্ছেদের রক্তক্ষরণ, ফেরার আকুতি আর নিজের ভাষার প্রতি চিরন্তন আনুগত্য।


উপসংহার: যোদ্ধাদের জয়গান

আমি ১৭ বছর ধরে চাকরি করছি। আমার শৈশব হারিয়ে গেছে বিমান বাহিনীর ব্যারাকে, যৌবন হারিয়েছে কর্পোরেট ফাইলের স্তূপে। কিন্তু আজও যখন কোনো প্রবাসের লিটল ম্যাগাজিন হাতে পাই, মনে হয় আমি সেই ১৭ বছরের কিশোরটিই আছি। মনে হয়, মাটির আঁচলের গন্ধ এখনও আমায় ডাকছে।

দুলাল সমাদ্দাররা যখন বইমেলায় ঘাম মোছেন, যখন তারা বিনা পয়সায় পত্রিকা তুলে দেন আমার মতো এক নগণ্য পাঠকের হাতে, তখন মনে হয় বাংলা ভাষা কখনও মরবে না। এই যোদ্ধা যারা মধ্যবলয়, অজন্তা কিংবা অক্ষর বিন্যাস-এর মলাটের আড়ালে লুকিয়ে আছেন, তাদের প্রণাম জানাই।

আরাবল্লীর পাহাড়ে মালতী ফোটানো অসম্ভব হতে পারে, কিন্তু এই মানুষেরা সেই পাহাড়কেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে উপত্যকা বানিয়ে ফেলেছেন। প্রবাসে বাংলা চর্চা কোনো শখ নয়, এটি একটি ত্যাগ। এটি একটি সাধনা। এই সাধনার জয় হোক।

আমার ঋণ শোধ হওয়ার নয়। তবু এই কলমের ডগা থেকে ঝরা কয়েক ফোঁটা কালি যদি এই যোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানাতে পারে, তবেই আমার এই লেখা সার্থক। প্রবাসে থাকা মানে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, প্রবাসে থাকা মানে বাংলার সীমানাকে আরও একটু বাড়িয়ে দেওয়া।

জয় হোক মধ্যবলয়-এর, জয় হোক অজন্তা আর অক্ষর বিন্যাস-এর। জয় হোক সেই মালিদের, যারা মরুভূমিতেও ফুল ফোটাতে জানেন।

Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ