মেহরামনগর ও তার দহনকাল

মেহরামনগর ও তার দহনকাল

 

প্রথম পরিচ্ছেদ: মেহরাম নগরের দীর্ঘশ্বাস ও পালামের অগ্নিগর্ভ আকাশ

জুলাই মানেই আগুনের মাস। দিল্লির আকাশ আজ আর মেঘমল্লারের মেঘ চেনে না; সে চেনে কেবল সূর্যের রুদ্ররোষ। আকাশের রঙ আজ আর নীল নয়, বরং এক ধূসর পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করেছে, যেন কোনো প্রাচীন ও অলক্ষ্য অভিশাপে দগ্ধ হয়ে গেছে তার সমস্ত নীলিমা। দিল্লির বুক চিরে যখন লু-হাওয়া বয়ে যায়, তখন মনে হয় মহাকালের এক তৃষ্ণার্ত অসুর তার তপ্ত নিশ্বাস ফেলছে চরাচরে। এই সেই মেহরাম নগর, যেখানে আজ আধুনিকতার নিরেট কংক্রিট আর পালাম বিমানবন্দরের ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টের যান্ত্রিক কোলাহল। কিন্তু এই তপ্ত পিচ আর ধোঁয়াটে বাতাসের আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে আছে অন্য এক মেহরাম নগরের ইতিহাস—এক শীতল ও সবুজ অতীত। সেই সময়ের কথা ভাবলে আজ বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে হয়, যখন এই বিস্তীর্ণ প্রান্তর ছিল সবুজ ঘাসে ঢাকা এক স্নিগ্ধ চারণভূমি। আজ যেখানে বোয়িং আর এয়ারবাসের দানবীয় ইঞ্জিনের গর্জন কান ছিদ্র করে দেয়, সেখানে একদা শোনা যেত আদিম প্রকৃতির নিজস্ব সুর আর রাখালের বাঁশির তান। 

আগুন বাতাস । সাতচল্লিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড । পারদ যখন থার্মোমিটারের কাঁচ ভেদ করে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে, তখন আমরা ভাবি, এটাই হয়তো বর্তমান পৃথিবীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা। আমরা দ্রুতগতির এই জীবনে যান্ত্রিক উত্তাপকে প্রগতির নামান্তর হিসেবে মেনে নিয়েছি। কিন্তু অলক্ষ্যে, অতি সন্তর্পণে পৃথিবীর তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে, তা আমরা সময়মতো উপলব্ধি করতে পারিনি। বনভূমি ধ্বংস করে কংক্রিটের জঙ্গল বানানো, নদী শুকিয়ে আবাসন গড়া—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে তাপমাত্রা আজ তার চূড়ান্ত সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক নিয়মেই জল যেমন গরম হতে হতে একসময় একশো ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে ফুটতে শুরু করে, ঠিক তেমনি আমাদের পরিবেশ আজ সেই 'স্ফুটনাঙ্কে' এসে পৌঁছেছে। এখন আমরা বাষ্প হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক এক ফোঁটা জল, যারা উত্তাপের চরম সীমায় পৌঁছে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে বিলীন হওয়ার উপক্রম করছি।

মেহরাম নগরের এই মাটি ছিল বীর ও শ্রমজীবী মানুষের চারণভূমি। সোলাঙ্কিরা ছিল এই মাটির আদি সন্তান। এই অঞ্চলের ইতিহাসে মিশে আছে তোমোর, জাঠ, গুর্জর, রাঠোর, চৌহানদের বীরত্বগাথা। তাদের জীবন আবর্তিত হতো মাটির কাছাকাছি, আদিম প্রকৃতির পরম শীতলতায়। ভোরবেলা যখন শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে বাছুরগুলো আলতো পায়ে চারণভূমিতে হেঁটে যেত, তখন বাতাসের তাপমাত্রা ছিল মমতাময় জননীর স্পর্শের মতো। সেই ঘাস আর আর্দ্র মাটির গন্ধে মিশে ছিল এক অকৃত্রিম প্রশান্তি। মানুষগুলোর জীবনযাত্রার ধরণ ছিল প্রকৃতির সাথে একাত্ম। মাটির ঘর, গভীর কুয়োর জল আর ঘন বৃক্ষরাজি মিলিয়ে এক প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ছিল এই জনপদে। অভাব হয়তো ছিল, কিন্তু আজকের মতো এমন প্রাণঘাতী অস্থিরতা ছিল না। আজ সেই মেহরাম নগরের সেই শীতল আবেশ কেবল ইতিহাসের জীর্ণ পাতায় অথবা বৃদ্ধের ঘোলাটে স্মৃতিতে অবশিষ্ট। আজ সেখানে ঘাসের বদলে জেগে আছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত উত্তপ্ত রানওয়ে। পিচ আর কংক্রিট সারাদিন সূর্যের দহন শুষে নিয়ে রাতেও আগুনের হলকা ছাড়ে। এই যে রূপান্তর—সবুজ চারণভূমি থেকে অগ্নিগর্ভ বিমানবন্দর—এটাই কি আমাদের অগ্রগতির প্রকৃত স্বরূপ? প্রকৃতির বুক চিরে আমরা যে যান্ত্রিক সুখের প্রাসাদ গড়লাম, তা আজ আমাদেরই দহন করছে।

আক্ষরিক অর্থেই আগুনময় ছিল না এই শহর। এটি ছিল এক পরম নিশ্চিন্তের পান্থশালা। এই জনপদের নামকরণের গভীরে লুকিয়ে আছে মুঘল ইতিহাসের এক বিস্মৃত ও বর্ণিল অধ্যায়। 'মেহরাম কি সরাই'—যার আক্ষরিক অর্থ মেহরামের পান্থশালা। ইসলামি পরিভাষায় 'মেহরাম' শব্দটি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মেহরাম বলতে সেইসব পুরুষদের বোঝায়, যাদের সাথে কোনো নারীর বিবাহ নিষিদ্ধ এবং যাদের সামনে পর্দা করার আবশ্যকতা নেই। এই নামকরণের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় মুঘল আমলের সেই প্রতাপশালী ও বিশ্বস্ত খোজা মেহরাম খানের চরিত্রে। মেহরাম খান ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের হেরেমের এক ঘনিষ্ঠ রক্ষক। অন্তঃপুরের রাজকীয় নারীদের কাছে তিনি ছিলেন মেহরাম—এক বিশ্বস্ত অভিভাবক, যিনি পর্দার আড়ালে সম্রাজ্ঞীদের নিরাপত্তা ও সুখ-দুঃখের দেখভাল করতেন। মুঘল যুবরাজ খুররম (যিনি পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহান নামে পরিচিত হন) মাহাবত খানের সমর্থনে আপন পিতা জাহাঙ্গীর এবং নূর জাহানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নিশান ওড়ান, তখন মেহরাম খান এক রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়েছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল যে, তিনি বিদ্রোহী শাহজাহানের সাথে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করছেন। রাজকীয় সন্দেহের তালিকায় পড়ার পরও মেহরাম খান সেই অগ্নিপরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং মুক্তি পান। পরবর্তীতে তিনি এই এলাকায় নিজের নামে একটি সরাই বা পান্থশালা এবং একটি বাজার নির্মাণ করেন। পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের বিশ্রামের জন্য নির্মিত সেই সরাইখানাটি ছিল লাখোরি ইট আর রুবল গাঁথনির এক চমৎকার স্থাপত্য। সরাইয়ের প্রাচীরের ভেতরে ছিল ছায়াঘেরা বাগান এবং তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো একটি শীতল জলের চ্যানেল। আজ সেই পান্থশালার ধ্বংসাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে বিমানবন্দরের যান্ত্রিক আস্ফালনের মাঝে। মেহরাম খাঁ যে শীতলতা ও আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই জনপদ গড়েছিলেন, আজ তা এক মল কালচারের অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

এই যে অসহ্য উত্তাপ, এটি কি কেবল সূর্যের তেজ বাড়ার ফল? না, এটি একটি গভীর জলবায়ুগত সমস্যা যা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি। দিল্লির এই রুদ্রমূর্তি কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, এটি আমাদের চারপাশের বাস্তুসংস্থানের চরম বিনাশের ফলাফল। মেহরাম নগরের সেই শান্ত গ্রামটি যখন পালাম বিমানবন্দরের যান্ত্রিকতায় বিলীন হয়ে গেল, তখনই আমরা হারিয়ে ফেললাম আমাদের শীতলতার মূল উৎসগুলোকে। মাটির সাথে ঘাসের সম্পর্ক চুকে গেছে, ফলে মাটি আর তাপ শোষণ করতে পারে না। এখন সর্বত্র শুধু তাপ—বায়ুমণ্ডলে তাপ, কংক্রিটে তাপ। রানওয়ে দিয়ে যখন একটি বিমান বিশালাকার আগুনের শিখা ছেড়ে আকাশে ডানা মেলে, তখন মনে হয় তা যেন আমাদের দগ্ধ ধরণীর শেষ আর্তনাদ। এই তপ্ত বায়ুমণ্ডলে আজ আর কোনো পাখির গান শোনা যায় না; কাক-চিলেরা তৃষ্ণায় ছটফট করে প্রাণ হারায়। শোনা যায় কেবল এসি মেশিনের একটানা ঘরঘর আর যান্ত্রিক বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। সোলাঙ্কিদের সেই সরল ও প্রাকৃতিক প্রশান্তি আজ ডমেস্টিক টার্মিনালের এসি মেশিনের কৃত্রিম ও ক্ষণস্থায়ী শীতলতায় খোঁজার চেষ্টা করাটা এক চরম পরিহাস। এই আগুনের ফুলকি কেবল দিল্লির আকাশে নয়, এটি এক বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের অংশ যা দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা এক এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি যেখানে শীতলতা হবে এক দুষ্প্রাপ্য বিলাসিতা।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: পালামের অগ্নিগর্ভ আকাশ ও আরাবল্লি

কী তবে আমাদের এই আধুনিক সভ্যতা, কী আমাদের এই সাধের গণতন্ত্র আর কী বা তার শিক্ষার প্রকৃত গরিমা? আজ যখন আকাশের উত্তাপ মানুষের চামড়া ছাড়িয়ে হৃদপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে, তখন এই প্রশ্নটি বড় বেশি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায় যে, শিক্ষা কি তবে এই দাবানল নেভানোর ক্ষমতা রাখে না? আমাদের আধুনিক শিক্ষা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে আকাশ ছুঁতে হয়, কীভাবে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের দূরত্ব মাপতে হয়; কিন্তু তা শেখাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে কীভাবে নিজের ভেতরের এই ক্রমবর্ধমান উত্তাপকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

আমাদের শৈশবের সেই স্মৃতিগুলোর দিকে তাকালে অবাক হতে হয়। তখন তাপমাত্রা হয়তো আজকের মতো এত চড়া ছিল না। উত্তর ভারতের গ্রীষ্ম তখনো ছিল, কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য তা সইয়ে নিত। সমাজ ও পরিবেশের সম্পর্ক ছিল শান্ত জলের মতো—টলটলে, শীতল এবং স্বচ্ছ। ছোটবেলায় যখন আমরা কলতলায় বা পুকুরঘাটে জল ছিটিয়ে খেলতাম, তখন সেই জলের শীতলতা শরীরে এক গভীর প্রশান্তি এনে দিত। কিন্তু আজ সেই দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। আমরা বড় হয়েছি, আধুনিক হয়েছি, কিন্তু আমাদের চারপাশের পরিবেশ আজ মরুভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে। দিল্লি ও সংলগ্ন উত্তর ভারতের পারদ আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যা মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে। থার্মোমিটারের পারদ যখন ৪৭ বা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করে, তখন তা কেবল সংখ্যা নয়, বরং এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দলিল।

সেই মেহরাম নগরের রানওয়েতে যখন তপ্ত পিচ থেকে মরীচিকার কাঁপন ওঠে, তখন মনে হয় সময় নিজেই যেন অসহ্য উত্তাপে কুঁকড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বাহ্যিক দহন কি কেবল প্রকৃতির এক খেয়াল? নাকি এটি আমাদের মগজের প্রতিটি কোষে কোষে তিলে তিলে দানা বেঁধে ওঠা এক দীর্ঘস্থায়ী মরুভূমির বহিঃপ্রকাশ? যন্ত্রের তৈরি কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শরীরের চামড়াকে হয়তো সাময়িক হিম করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের গভীরে যে ঘৃণা ও উত্তেজনার লাভাস্রোত বইছে, তাকে নেভানোর ক্ষমতা কোনো আধুনিক প্রযুক্তির নেই। মানুষের মন আজ এক একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, যা সামান্য উসকানিতে ফেটে পড়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিল্লি এন সি আর এর প্রান্তঘেঁষে থাকা সেই প্রাচীন আরাবল্লি পর্বতমালা। একসময় যা ছিল এই গাঙ্গেয় অঞ্চলের রক্ষাকবচ, এক সুপ্রাচীন সবুজ মহাপ্রাচীর। লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে এই পাহাড়গুলো উত্তর ভারতের তপ্ত ধূলিঝড়কে নিজের বুকে আটকে দিত, তার অরণ্যঘন উপত্যকায় বইত পরম শীতল বাতাস। কিন্তু আজ আরাবল্লির সেই রুদ্রমূর্তি নেই। মানুষের সীমাহীন লোভের করাত আর ডিনামাইটের অবিরাম বিস্ফোরণে আজ আরাবল্লির পাঁজরা বেরিয়ে পড়েছে। পাহাড়ের বুক চিরে পাথর উত্তোলনের যে মরণখেলা চলছে, তা কেবল এক ভৌগোলিক বিপর্যয় নয়, তা আমাদের সামষ্টিক বোধশক্তির চরম অবক্ষয়। আরাবল্লির সেই ন্যাড়া ও ক্ষতবিক্ষত পাহাড়গুলো আজ দুপুরের রোদে আয়নার মতো তাপকে প্রতিফলিত করে লোকালয়ে পাঠিয়ে দেয়। একদা যে পাহাড় ছিল শান্তির নীড় ও শীতলতার উৎস, আজ তা মানুষের হাতে পড়ে হয়ে উঠেছে এক বিশালাকার জ্বলন্ত তপ্ত কড়াই।

আরাবল্লির এই পাথুরে মরুকরণ আসলে আমাদের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থারই এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। আমাদের শিক্ষা আজ আর মানুষের মনকে অরণ্যের মতো স্নিগ্ধ ও ছায়াময় করতে পারছে না; বরং তা তৈরি করছে এক একটি পাথুরে ও সংবেদনহীন মস্তিষ্ক। মেহরাম নগরের সেই জাঠ, গুর্জর, রাঠোর কিংবা চৌহানদের পূর্বপুরুষেরা হয়তো কোনোদিন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পার হননি, কিন্তু তারা জানতেন আরাবল্লির কোন গুহায় দুঃসময়ের শীতল জল মেলে, কোন প্রাচীন বৃক্ষের নিবিড় ছায়ায় বসলে শ্রান্ত প্রাণের ক্লান্তি দূর হয়। তাদের প্রজ্ঞা ছিল প্রকৃতির সাথে লীন হওয়া, তাকে শাসন করা নয়। আর আজকের এই উচ্চশিক্ষিত প্রজন্ম? তারা আরাবল্লির পাথর চেনে কেবল আবাসন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে। শিক্ষা আজ জীবনবোধ শেখানোর বদলে শেখাচ্ছে কেবল ‘আহরণ’ আর ‘দখল’ করতে। এই যে বোধশক্তির চরম খরা, এটাই কি তবে আমাদের আধুনিক শিক্ষার আসল স্বরূপ? আমরা যত বেশি তথ্যের বোঝা মস্তিষ্কে চাপাচ্ছি, আমাদের অন্তরের মানবিক সরসতা তত বেশি শুকিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা আজ আর মনের তৃষ্ণা মেটায় না, বরং অন্তহীন প্রতিযোগিতার উত্তাপ বাড়িয়ে মানুষকে এক দিশেহারা দহনের দিকে ঠেলে দেয়।

আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাও আজ প্রতিযোগিতার এক উত্তপ্ত কড়াই। শৈশব থেকেই একটি শিশুকে পরম মমতার বদলে এক নিষ্ঠুর মন্ত্র শেখানো হচ্ছে—'দৌড়াতে হবে', 'প্রথম হতে হবে', 'কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়া যাবে না'। এই যে অবিরাম অন্ধের মতো ছুটে চলা, এই প্রতিযোগিতার অবিরাম ঘর্ষণেই কি তৈরি হচ্ছে না সেই ঘাতক তাপ? মেহরাম নগরের সেই আদিম মেষপালকদের কোনো উচ্চতর ডিগ্রি ছিল না, কিন্তু তাদের ছিল জীবন ও প্রকৃতিকে বোঝার এক গভীর ও শীতল প্রজ্ঞা। 

আরাবল্লির সেই খাঁ খাঁ করা রুক্ষতা আজ আমাদের যান্ত্রিক সভ্যতার অহংকারকে উপহাস করছে। আমরা ভেবেছিলাম পাহাড় কেটে শহর বানালে আমরা উন্নত ও আধুনিক হব, কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে সেই পাহাড়ই ছিল আমাদের টিকে থাকার শীতল উৎস। ঠিক তেমনি, আমরা ভেবেছিলাম নৈতিকতা ও নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে কেবল বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে পারদর্শী হলেই আমরা সভ্য হব, কিন্তু আমরা আজ এক ‘শিক্ষিত অসভ্যতার’ চরম সীমায় বাস করছি। এই যে শিক্ষা ব্যবস্থা, যা মানুষকে কেবল নিপুণ রোবট বানাচ্ছে কিন্তু সংবেদনশীল মানুষ বানাচ্ছে না, এটিই কি তবে দেশ ও জাতির অন্তিম পতনের মূল কারণ নয়? যখন একটি দেশের শিক্ষিত সমাজ সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করতে পারেনা, যখন তারা সামান্য গুজবে উত্তেজিত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে, তখন বুঝতে হবে তাদের মানবিক বোধশক্তি আজ স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছে বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে। তারা এখন কেবল উত্তপ্ত ও প্রাণহীন জড় পদার্থ।

সভ্যতার এই চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ মেহরাম নগরের সেই সোলাঙ্কিদের আদিম জীবনদর্শন বড় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তারা জানতেন, যতটুকু প্রয়োজন তার বেশি প্রকৃতি থেকে নেওয়া এক মহাপাপ। কিন্তু আমাদের আধুনিক শিক্ষা আমাদের কেবল শিখিয়েছে ‘উপভোগ’ আর ‘দখল’। আরাবল্লিকে ন্যাড়া করে আমরা যে আকাশচুম্বী কাঁচের অট্টালিকা বানাচ্ছি, সেই অট্টালিকার এসি মেশিনের তাপ বাইরে বেরিয়ে পরিবেশকে আরও কয়েক গুণ উত্তপ্ত করছে। আমাদের অর্জিত জ্ঞানও আজ ঠিক সেই এসি মেশিনের মতোই—নিজের ঘর ঠান্ডা রাখতে সে বাইরের বিশাল জগতকে আরও পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এই যে চরম স্বার্থপরতার উচ্চ তাপমাত্রা, এটিই কি তবে আমাদের চূড়ান্ত ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছেআরাবল্লির ক্ষতবিক্ষত পাহাড়ের গায়ে যখন রক্তিম সূর্যাস্তের আলো পড়ে, তখন মনে হয় যেন বিশাল পাহাড়টা নীরবে রক্তক্ষরণ করছে। পাহাড়ের এই নীরব আর্তনাদ শোনার মতো কান আজ আমাদের নেই। আমাদের কান আজ যান্ত্রিক কোলাহলে আর বিদ্বেষের বক্তৃতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। 


আমরা যদি এখনই আমাদের শিক্ষার এই রুক্ষ পাথুরে পথ পরিবর্তন না করি, তবে খুব শীঘ্রই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কোনো সবুজ স্মৃতি অবশিষ্ট থাকবে না। তারা জন্ম নেবে এক এমন তপ্ত পৃথিবীতে, যেখানে নদী থাকবে না, পাহাড় থাকবে না, আর মানুষের মনে থাকবে না কোনো দয়া বা মায়া। আরাবল্লির ধ্বংসাবশেষ থেকে যেমন আর সেই নিবিড় অরণ্য ফিরে পাওয়া কঠিন, তেমনি বোধশক্তির এই বিনাশ থেকে মনুষ্যত্বকে উদ্ধার করাও হবে এক প্রায় অসম্ভব লড়াই। আমরা কি পারব এই মানসিক ও প্রাকৃতিক খরা কাটাতে? নাকি এই স্ফুটনাঙ্কের তাপে আমাদের সাধের সভ্যতা বাষ্প হয়ে মহাকাশে বিলীন হয়ে যাবে? এই জ্বলন্ত প্রশ্নটিই আজ আরাবল্লির তপ্ত হাওয়ায় হাহাকার করে ফিরছে।

 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ : ইন্দ্রপ্রস্থের হাহাকার

ইন্দ্রপ্রস্থের আকাশ আজ আর কেবল নীলিমার অনুপস্থিতিতে ধূসর নয়, তা আমাদের সামষ্টিক পাপের কার্বন-আস্তরণে ঢাকা এক বিশাল চিতা। এই মেগাসিটির হৃদপিণ্ডে আজ আর প্রাণের স্পন্দন শোনা যায় না, শোনা যায় তিন কোটি মানুষের তপ্ত নিশ্বাসের এক সম্মিলিত হাহাকার। দিল্লির জনসংখ্যা আজ যখন তিন কোটির গণ্ডি ছাড়িয়ে মহাবিস্ফোরণের অপেক্ষায়, তখন প্রশ্ন জাগে—এই যে অসহ্য দহন, এর প্রকৃত কারণ কি কেবল সূর্যের নিষ্ঠুরতা? বিজ্ঞানের তত্ত্ব আমাদের শেখায় ‘গ্রিনহাউস এফেক্ট’-এর কথা, কার্বন ডাই অক্সাইডের সেই বিষাক্ত চাদরের কথা যা পৃথিবীকে এক তপ্ত কড়াই বানিয়ে রেখেছে। আমরা জানি, জীবাশ্ম জ্বালানির দহন আর আমাদের বিলাসী যাপনের নির্গত তাপ ওজোন স্তরকে ছিদ্র করে সূর্যকে সরাসরি আমাদের চামড়া পোড়ানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক কারণগুলোর গভীরে লুকিয়ে আছে এক চরম নৈতিক সত্য—আর তা হলো মানুষের সীমাহীন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং প্রকৃতির প্রতি আমাদের চরম ঔদাসীন্য।

তিন কোটি মানুষের এই রুদ্ধশ্বাস ভিড়ে আজ ব্যক্তিগত আরামই শেষ কথা, সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ এখানে এক পরিত্যক্ত ধারণা। আমরা আমাদের ড্রয়িংরুমকে কনকনে ঠান্ডা রাখার জন্য যে লক্ষ লক্ষ এয়ার কন্ডিশনার চালিয়ে রেখেছি, তার জঠর থেকে নির্গত উত্তপ্ত হাওয়া রাজপথের পথচারী বা ফুটপাতে শুয়ে থাকা রিকশাচালকের জীবনকে দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আমাদের এই ‘স্বার্থপর শীতলতা’ বাইরের জগতকে আরও কয়েক ডিগ্রি উত্তপ্ত করে তুলছে। প্রতিটি একক মানুষের এই যে ‘আমি’ কেন্দ্রিক যাপন, যেখানে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরিবেশকে বলি দিতে আমরা বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করি না, সেটাই আজ ইন্দ্রপ্রস্থকে এক জীবন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। আমরা মাটির নিচ থেকে শেষ বিন্দু জলটুকু শুষে নিচ্ছি, অথচ এক ফোঁটা জলও মাটির নিচে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়ভার গ্রহণ করি না। আমরা কংক্রিটের জঙ্গল বাড়িয়ে চলছি, কিন্তু একটি চারাগাছ রোপণ করে তাকে আগলে রাখার মতো ধৈর্য বা সময় আমাদের নেই।

দায়িত্ববোধের এই নিদারুণ প্রতুলতা আজ দিল্লির প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি সিগন্যালে প্রকট। একটি সমাজ যখন তার নিয়মকানুনকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখে এবং রাজপথে নেমে ‘রুল ব্রেক’ করাকেই চাতুর্য মনে করে, তখন সেই সমাজের পতন অনিবার্য। দিল্লির রাজপথে আজ শৃঙ্খলা এক অলীক কল্পনা; সবাই আগে যেতে চায়, সবাই অন্যকে মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়। এই যে ‘সবার আগে যাওয়ার নেশা’ আর ‘অন্যকে তুচ্ছ করার মানসিকতা’, এটিই আসলে আমাদের ভেতরের সেই ক্রমবর্ধমান তাপের উৎস। তাপমাত্রা যখন বাড়ে, তখন পদার্থের অণুগুলো যেমন বিশৃঙ্খলভাবে ছোটাছুটি করে, তিন কোটির এই জনসমুদ্রও আজ ঠিক তেমনই বিশৃঙ্খল। নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলা, যমুনার বুকে বিষ ঢালা আর প্লাস্টিকের স্তূপে শহরকে শ্বাসরুদ্ধ করা—এসবই আমাদের সেই চরম দায়িত্বহীনতার সাক্ষ্য দেয়।

ইন্দ্রপ্রস্থের এই দহন আসলে আমাদের বিবেকের দহন। যখন একটি দেশের নাগরিক তার নিজের পরিবেশের প্রতি ন্যূনতম মমতা অনুভব করে না, যখন সে কেবল ভোগ করতেই শেখে কিন্তু রক্ষা করতে শেখে না, তখন প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। দিল্লির এই গরম তাই কেবল আবহাওয়ার খামখেয়ালি নয়; এটি আমাদের সেই যান্ত্রিক ও সংবেদনহীন মানসিকতারই এক অনিবার্য প্রতিফলন। ইন্দ্রপ্রস্থের এই তপ্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আজ মনে হয়, আমরা কি সত্যিই অগ্রগতির শিখরে উঠছি? নাকি আমরা তিন কোটি মানুষ মিলে এক অতল গহ্বরের দিকে ঝাঁপ দিচ্ছি? জল নেই, জমি শেষ, আর অবশিষ্ট যেটুকু মনুষ্যত্ব ছিল, তাও আজ স্ফুটনাঙ্কের তাপে বাষ্প হয়ে উড়তে শুরু করেছে। এই যে নৈতিক খরা, এই যে দায়িত্ববোধের চরম শূন্যতা—এটাই কি তবে আধুনিক সভ্যতার প্রকৃত সংজ্ঞা? তিন কোটির এই রুদ্ধশ্বাস ভিড়ে আজ একেকটি মানুষ যেন একেকটি বিচ্ছুরিত পরমাণু, যারা কেবল নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে গোটা পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই আগুন নেভানোর শক্তি কোনো প্রযুক্তি বা কোনো বিজ্ঞানের নেই, যদি না আমাদের অন্তরে সেই হারানো দায়িত্ববোধ আর প্রকৃতির প্রতি মৈত্রীর শীতল বোধটুকু ফিরে আসে।


চতুর্থ পরিচ্ছেদঃ  সোস্যাল মিডিয়া

মেহরাম নগরের এই বাহ্যিক দহন আজ আর কেবল সূর্যের উত্তাপে সীমাবদ্ধ নেই; তা আজ আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা ওই ক্ষুদ্র কাঁচের পর্দার নীল আলোয় এক ভয়ঙ্কর ‘মানসিক দাবানল’ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবী আজ আর কেবল মাটি, জল আর বাতাসের পিঞ্জর নয়; তা আজ এক অদৃশ্য তড়িৎ-তরঙ্গ আর সিলিকন চিপের মায়াজালে বন্দি এক বিশালাকার বৈশ্বিক অগ্নিকুণ্ড। সোশাল মিডিয়া—যাকে একসময় ভাবা হয়েছিল দূরত্বের সেতুবন্ধন, আজ তা পরিণত হয়েছে এক অনিয়ন্ত্রিত বিষবাষ্পের আঁতুড়ঘরে। পোস্ট, কমেন্ট আর প্রতিক্রিয়ার নামে সেখানে আজ যা চলছে, তা কোনো সুস্থ সভ্যতার পরিচয় নয়, বরং এক আদিম ও অসভ্য উল্লাস। এই ডিজিটাল জগতের তাপমাত্রা আজ দিল্লির রাজপথের উত্তাপকেও হার মানিয়েছে।

এই নতুন জগতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো এর ‘ছদ্মবেশ’ এবং ‘নিষ্ক্রিয় দায়িত্ববোধ’। পর্দার ওপারে বসে থাকা মানুষটির প্রকৃত পরিচয় কী, তার সামাজিক দায়বদ্ধতা কতটুকু—তা আজ কুয়াশাচ্ছন্ন। যেহেতু এখানে সঠিক মানুষকে চিনে নেওয়া বা তার অপরাধের জন্য সরাসরি দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব, তাই একদল মানুষ অত্যন্ত কদর্যভাবে এই ধরাছোঁয়ার বাইরের জগতের সুযোগ নিচ্ছে। অভদ্রতা করেও পার পেয়ে যাওয়া আজ এক নিত্যনৈমিত্তিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কাউকে যেহেতু সরাসরি ধরা যাচ্ছে না, তাই বাকস্বাধীনতার সেই পবিত্র সংজ্ঞাকে আজ কলুষিত করে দেওয়া হয়েছে; এর আড়ালে চলছে বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ এবং পরিকল্পিত মিথ্যার কারবার। মানুষের ভেতরকার যে অবদমিত পাশবিকতা একসময় লোকলজ্জার ভয়ে গোপন থাকত, আজ তা সহস্র মুখে ফণা তুলছে এই ডিজিটাল অরণ্যে।

এই অনিয়ন্ত্রিত অসভ্যতা আমাদের চেতনার বাতিঘরটিকে তিলে তিলে নিভিয়ে দিচ্ছে। মানুষের মনের তাপমাত্রা আজ আর স্বাভাবিক নেই; তা এক নিরন্তর জ্বরে ভুগছে। আমরা আজ সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অনুভূতির জগৎ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছি। মানুষের মন যখন সর্বক্ষণ উত্তেজনার পারদে চড়ে থাকে, তখন তার পক্ষে আর সম্ভব হয় না কোনো ধ্রুপদী সংগীতের আলাপ, কোনো গভীর দর্শনের গদ্য বা কোনো বিমূর্ত চিত্রকলায় মনোনিবেশ করা। আমাদের মনোযোগের ক্ষমতা আজ ছিন্নভিন্ন। মানুষ আজ তথ্যের প্রকৃত সত্যতা খোঁজে না, সে কেবল সেইসব খবর বা সংবাদের পেছনে উন্মাদ হয়ে ছুটছে যা তার স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, যা কুৎসা রটায়। এই উত্তেজনার নেশায় আমরা যা কনসিউম করছি, তার অধিকাংশই আজ ফেব্রিকেটেড বা পরিকল্পিতভাবে সাজানো মিথ্যা।

ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে—মানুষের চিন্তা করার শক্তি আজ লোপ পাচ্ছে। আর্ট, কবিতা কিংবা শিল্পকলায় মানুষের মনোনিবেশ আজ শূন্যের কোঠায়। একটি সভ্য সমাজ কি শিল্প আর সংস্কৃতি ছাড়া কোনোদিন প্রাণ ফিরে পেতে পারে? শিল্প মানে তো স্থিরতা, সংস্কৃতি মানে তো সহনশীলতা—যেখানে মন শান্ত না থাকলে কোনো সৃজনশীলতাই অঙ্কুরিত হতে পারে না। কিন্তু যেখানে আমাদের মস্তিষ্কের পারদ সর্বক্ষণ ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশায় টগবগ করে ফুটছে, সেখানে কে পড়বে জীবনানন্দ দাশের ধীরস্থির কবিতা? কার সময় হবে মহৎ কোনো দর্শনের গোলকধাঁধায় প্রবেশের? চিত্রকর যখন তার তুলিতে কোনো প্রশান্ত গোধূলির রং মেশান, সেই রঙের আবেদন বোঝার মতো শীতল চোখ আজ আমাদের নেই। আমাদের চোখ আজ কেবল স্ক্রল করে চলা সস্তা ও উত্তেজক ক্লিপিংসে অভ্যস্ত।

এই খবরের তাপমাত্রা আজ এতটাই বিধ্বংসী যে, সামান্য এক মুহূর্তের অসতর্কতায় বা আবেগের বশবর্তী হয়ে মানুষ মানহানির মতো জটিল মামলায় ফেঁসে যাচ্ছে। অথচ বিড়ম্বনা এটাই যে, সেই মানহানি বা কলঙ্কিত খবরটিই আবার দাবানলের মতো ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। সত্যের চেয়ে মিথ্যার গতি আজ এই ডিজিটাল বিশ্বে আলোর চেয়েও প্রখর। একটি সভ্য সমাজের মেরুদণ্ড হলো তার শিল্পচেতনা ও নৈতিকতা; কিন্তু যেখানে ঘৃণা আর গালাগালিই জনপ্রিয়তার মাপকাঠি, সেখানে মনুষ্যত্ব আজ এক শুষ্ক কাষ্ঠের মতো পুড়ে ছাই হচ্ছে। মানুষ আজ তার সৃজনশীলতার আধারটিকে নিজেই বিষাক্ত করে তুলছে। সোশাল মিডিয়ার এই কোলাহল আসলে এক মহাজাগতিক একাকীত্বের রুগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

ইন্দ্রপ্রস্থের এই উত্তপ্ত বাতাসের মতো আমাদের ডিজিটাল বায়ুমণ্ডলও আজ সুস্থ মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মানব মন যদি শান্ত না হয়, যদি আমরা এই উত্তপ্ত প্রচারণার মরীচিকা থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত সত্য আর সুন্দরের সাধনায় মনোনিবেশ না করি, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম কোনোদিন জানবে না যে কবিতা কী বা শিল্পের মাহাত্ম্য কী। তারা কেবল জানবে ট্রোলিং, তারা কেবল জানবে ভাইরাল হওয়া আর অন্যকে ডিজিটাল ময়দানে মাড়িয়ে যাওয়ার আদিম ও কদর্য নেশা। এই অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ একটাই—মনের তাপমাত্রা কমিয়ে আনা, আর সেই হারানো শীতলতার ছায়ায় বসে আর একবার সত্যম শিবম সুন্দরমের বন্দনা করা। নয়তো, এই আগুনের গ্রাসে শেষ হয়ে যাবে আমাদের হাজার বছরের তিলে তিলে গড়া শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা।




পঞ্চম পরিচ্ছেদ : কালিন্দীর ঘোলা জলে

যমুনা আজ কেবল একটি নদী নয়, তা এক মৃত সভ্যতার বিষাক্ত ও রুদ্ধ ধমনী। যে কালিন্দীর তীরে দাঁড়িয়ে একদা শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মোহন বাঁশিতে শীতল সুর তুলতেন, যার নীলাভ প্রশান্তি দেখে মুনি-ঋষিরা ধ্যানে বসতেন, আজ সেই যমুনা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এক করুণ আর্তনাদ করছে। যমুনার সেই আদিম নীলিমা আজ অদৃশ্য; তার বদলে সেখানে আজ এক গাঢ় কালচে পিচের মতো থকথকে তরল বয়ে চলেছে। এটি জল নয়, এটি আধুনিক মানুষের সীমাহীন লোভ আর যান্ত্রিক প্রগতির বিষাক্ত নিশ্বাস। প্রখর গ্রীষ্মের দহন যখন চরমে পৌঁছায়, যখন চরাচর আগুনের হলকায় ঝলসাতে থাকে, তখন যমুনার জল শুকিয়ে তলানিতে এসে ঠেকে এবং বেরিয়ে আসে তার কঙ্কালসার বীভৎস বুক। সেখানে আজ আর রুপোলি বালু নেই, নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন; সেখানে পড়ে আছে কলকারখানার নিক্ষিপ্ত বর্জ্য, প্লাস্টিকের স্তূপ আর রাসায়নিকের বিষাক্ত সাদা ফেনা। এই ফেনা যেন যমুনার মৃত্যুর এক সুবিশাল কাফন, যা বাতাসের ঝাপটায় উড়ে এসে আমাদের লোকালয়কে নিরন্তর সংকেত দেয়—সভ্যতা আজ তার স্ফুটনাঙ্কের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে জীবনদায়ী জলও মারণবিষে রূপান্তরিত হয়েছে।

কিন্তু এই দহনের উৎস আরও গভীরে, আরও উঁচুতে। আমাদের এই বিশাল ভূখণ্ডের জলভাণ্ডার, সেই চিরতুষারাবৃত হিমালয় আজ আর স্থির নেই। যে হিমালয়কে আমরা অজেয় ও অমর ভাবতাম, সেই মহাগিরি আজ আমাদেরই তৈরি করা উত্তাপে তিলে তিলে ঘামছে। হিমবাহগুলো আজ রক্তক্ষরণের মতো গলতে শুরু করেছে। যমুনোত্রী আর গঙ্গোত্রীর সেই পবিত্র উৎসগুলো আজ সংকুচিত। হিমালয় যদি তার শীতল মৌনতা হারায়, যদি তার সঞ্চিত বরফ এভাবেই অসময়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে ভারতের সমতল ভূমি এক তৃষ্ণার্ত শ্মশানে পরিণত হতে সময় লাগবে না। হিমালয়ের এই গলিত অশ্রুই আজ সমতলের নদীগুলোতে প্লাবন আনে, আবার পরক্ষণেই তাদের শুকিয়ে মরুভূমি করে দেয়। নদীগুলো আজ তাদের নাব্যতা হারিয়েছে; পলি আর বর্জ্যের স্তূপে তাদের গভীরতা আজ ইতিহাস। একদা যে নদী দিয়ে বাণিজ্যতরী চলত, আজ সেখানে এক চিলতে নোংরা জলও এগোতে পারে না। এই যে নদীর মৃত্যু, এটি কেবল ভূগোলের পরিবর্তন নয়, এটি আমাদের কৃষি ও জীবনের নাড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস। 

সেচের জলের অভাবে আজ উত্তর ভারতের বিশাল শস্যভাণ্ডার ধুঁকছে। যে কৃষক বৃষ্টির আশায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, তার চোখে আজ মেঘের বদলে কেবল ধুলোবালি আর আগুনের ফুলকি। জলহীনতার এই হাহাকার আমাদের এক ভয়ঙ্কর ঐতিহাসিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের মনে পড়ে যায় সেই মহান সিন্ধু সভ্যতার কথা। মহেঞ্জোদাড়ো আর হরপ্পার সেই সুশৃঙ্খল নগরীগুলো কি কেবল কোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণে ধূলিসাৎ হয়েছিল? না, আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীরা আজ একবাক্যে বলছেন—সিন্ধু সভ্যতার পতনের মূলে ছিল এই একই রকম জলবায়ুর পরিবর্তন। নদী যখন তার গতিপথ বদলেছিল, সরস্বতী যখন শুকিয়ে মরুভূমি হয়েছিল, আর দীর্ঘস্থায়ী খরা যখন শস্যক্ষেত্রগুলোকে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তখনই সেই মহিমান্বিত সভ্যতা তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। আজ যমুনার এই বিষাক্ত রূপ, হিমালয়ের এই পশ্চাদপসরণ আর মাটির নিচের জলের এই নিঃশেষিত ভাণ্ডার কি সেই একই প্রলয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে না?

ইতিহাস কি তবে নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করছে? সিন্ধু নদের তীরের সেই মানুষগুলো হয়তো আমাদের মতোই ভেবেছিল যে প্রকৃতিকে শাসন করা যায়। আজ আমরা যান্ত্রিক আস্ফালনে পৃথিবীকে উত্তপ্ত করছি, অরণ্য কাটছি, নদীকে ড্রেন বানাচ্ছি—আর ভাবছি আমরা প্রগতির শিখরে উঠছি। কিন্তু আমাদের চারপাশের এই ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা আসলে এক মহাজাগতিক সংকেত। যখন জলবায়ুর ভারসাম্য ভেঙে পড়ে, যখন ঋতুচক্র তার ছন্দ হারায়, তখনই শুরু হয় এক সভ্যতার অন্তিম যাত্রা। যমুনার কালো জল আজ আমাদের সেই আয়না, যেখানে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। যদি আজ আমরা এই বিষাক্ত বর্জ্য আর পরিবেশগত ধ্বংসলীলা থামাতে না পারি, তবে আধুনিক এই ‘ইন্দ্রপ্রস্থ’ বা ডিজিটাল সভ্যতাও একদিন সিন্ধু সভ্যতার মতো মাটির নিচে চাপা পড়ে যাবে। কেবল ধ্বংসাবশেষ হয়ে থাকবে আমাদের এই অহংকারী ইমারতগুলো। প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার কোনো যান্ত্রিক কবচ আমাদের নেই; যদি না আমরা হিমালয়ের সেই আদিম শীতলতা আর যমুনার সেই হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার শপথ গ্রহণ করি। নদী মরে গেলে জীবন মরে যায়, আর জীবন মরে গেলে কোনো ইতিহাসই অবশিষ্ট থাকে না। যমুনার এই তপ্ত শ্মশানে দাঁড়িয়ে আজ সেই প্রশ্নই বারবার আমাদের বিদ্ধ করছে—আমরা কি ধ্বংসের সেই পুরনো পথেই হাঁটছি না?

যমুনার এই বিষাক্ত রূপ আমাদের রাজনীতির মতোই ঘোলাটে। নদী পরিষ্কারের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ঠিকই, কিন্তু নদীর জল আজও সেই তপ্ত বিষই রয়ে গেছে। কেন? কারণ আমাদের নীতিবোধ আজ বাষ্পীভূত হয়ে গেছে। ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষগুলো নদীর হাহাকার শুনতে পায় না, তারা শোনে কেবল যন্ত্রের ঘরঘর শব্দ আর অর্থের ঝনঝনানি। যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে যখন সেই বিষাক্ত ফেনাগুলোকে বাতাসের ঝাপটায় উড়তে দেখি, তখন মনে হয় আমাদের মনুষ্যত্বও বোধহয় এইভাবেই ফেনিল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা নদীকে 'মা' ডাকি, অথচ সেই মায়ের শরীরেই ঢেলে দিচ্ছি অ্যাসিড আর সায়ানাইড। এই যে ভণ্ডামি, এটিই কি তবে আমাদের আধুনিক শিক্ষার শেষ পাঠ? শিক্ষা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সম্পদ উৎপাদন করতে হয়, কিন্তু শেখায়নি কীভাবে সেই সম্পদকে সুস্থভাবে রক্ষা করতে হয়।

আরাবল্লির পাথর কাটা আর যমুনার জল বিষাক্ত করা—এই দুইয়ের উৎস আসলে একই। তা হলো মানুষের অন্তহীন ভোগলিপ্সা। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে যমুনার তলদেশের বর্জ্য থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস বাতাসকে আরও ভারি ও উত্তপ্ত করে তোলে। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নেওয়া আজ এক দুঃসহ দহন। আমরা যে সভ্যতা গড়েছি, তা আসলে একটি স্বনির্মিত চিতাগ্নি। আমরা নিজেদের আরামের জন্য পৃথিবীকে জ্বালিয়ে দিচ্ছি, আর সেই আগুনের আঁচে প্রথম বলি হচ্ছে আমাদের নদী, আমাদের প্রকৃতি। যমুনা যখন শুকিয়ে যায়, তখন শুধু জল কমে না, আমাদের হৃদয়ের আর্দ্রতাও শুকিয়ে যায়। জলশূন্য নদী মানেই হলো সংবেদহীন সমাজ। মানুষ যখন দেখে তার চোখের সামনে একটি নদী মরে যাচ্ছে এবং সে নির্বিকার থাকে, তখন বুঝতে হবে তার ভেতরের সহনশীলতা ও মমতা মৃতবৎ।

যমুনার এই তপ্ত শ্মশানে দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়—এটাই কি সেই দেশ যার জন্য আমরা গর্ব করি? এটাই কি সেই সভ্যতা যা আমরা গড়তে চেয়েছিলাম? যান্ত্রিকতার এই মরণনেশা আমাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে যেখানে তৃষ্ণা মেটানোর জন্য জল নেই, আছে কেবল রাসায়নিকের মিশ্রণ। আমাদের রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা—সবই আজ এই বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। আমরা কি পারব এই নদীকে আবার তার নীলাভ রূপ ফিরিয়ে দিতে? নাকি যমুনার এই মৃত্যুসংবাদই হবে আমাদের সভ্যতার এপিটাফ?

 

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: শিক্ষার মরুকরণ ও বোধশক্তির স্ফুটনাঙ্ক

দিল্লির লুটিয়েন্স জোন থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক গলি—সর্বত্র আজ এক অদ্ভুত দহন। এই দহন কেবল সূর্যের নয়, এ এক ক্ষমতার দহন। মেহরাম নগরের পান্থশালায় যখন মাঠের সবুজ ঘাসে বসে অতিথিরা বাকিটা পথযাত্রার ঠিকানা নির্ণয় করত, তখন সেই আলোচনায় এক ধরনের শীতল শুভেচ্ছা ছিল। অনতিদ্ূরে শাহিবি নদীর কুলকুল স্রোতধারা,  বটগাছের ছায়ায় বসে তারা যখন কথা বলত, তখন প্রকৃতি তাদের মাথার ওপর আশীর্বাদের মতো শীতলতা ঢেলে দিত। কিন্তু আজ? আজ রাজনীতির অলিন্দে যে উত্তাপ, তা যেন কোনো এক অদৃশ্য কামারের হাঁপর থেকে নির্গত আগুনের হলকা। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে যে সিদ্ধান্তগুলো নেমে আসে, তা আজ আর জনপদের জন্য প্রশান্তির বৃষ্টি হয়ে ঝরে না; বরং তা হয়ে ওঠে তপ্ত লাভাস্রোত, যা সাধারণ মানুষের ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।

রাজনীতি আজ আর সেবা নয়, তা হয়ে উঠেছে এক সর্বগ্রাসী রৌদ্রদহ। প্রতিটি নির্বাচনী প্রচার যেন এক একটি অগ্নিকুণ্ড। বক্তৃতার মঞ্চ থেকে যখন বিষোদ্গার ছড়ায়, তখন বাতাসের আর্দ্রতা নিমেষেই উবে যায়। শব্দগুলো আজ আর অর্থ বহন করে না, তারা কেবল স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে আক্রমণ করে যে বাকযুদ্ধ চালায়, তাতে সত্যের অপমৃত্যু ঘটে এবং চারপাশটা ধোঁয়াটে হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ, প্রধানত পশুপালন, কৃষিজমির উপরে যাপন তাদের, যারা মেহরাম নগর, নজফগড়, কিলা রায় পিথোরার সবুজে সোলাংকিদের শান্তিতে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল, তারা আজ এই রাজনীতির দাবানলে দিশেহারা। তারা বুঝতে পারে না, এই যে ‘উন্নয়ন’ বা ‘বিপ্লব’-এর নামে যে উত্তাপ ছড়ানো হচ্ছে, তা কি তাদের শীতল ছায়া দেবে, নাকি তাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেবে? রাজনীতির এই প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন একটু শান্তির আশা করে, তখন তার সামনে মেলে ধরা হয় মরীচিকা—এক অবাস্তব সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন, যা মরীচিকার মতোই তৃষ্ণা না মিটিয়ে মানুষকে মরুভূমির আরও গভীরে নিয়ে যায়।

আমাদের দেশ আজ এক অদ্ভুত রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার। একদল সবুজ পতাকা, অন্যদল গেরুয়া । একদল, উত্তর মেরু, অন্যদল দক্ষিণ মেরু ।  তাপমাত্রা বাড়লে যেমন বায়ুচাপের পরিবর্তন হয় এবং ঝড়ের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি এই রাজনৈতিক উত্তাপ আজ সমাজের পরতে পরতে বিভাজনের ঝড় তুলেছে। এক সময়ের বন্ধু আজ কেবল আদর্শের ভিন্নতায় শত্রুতে পরিণত হয়েছে। মানুষের মনের মধ্যে যে সহনশীলতার জলাধার ছিল, রাজনীতির প্রখর তাপে তা আজ শুকিয়ে কাঠ। এখন কোনো আলোচনা নেই, আছে কেবল আস্ফালন। আমরা ভুলে গেছি যে, একটি সুস্থ সমাজ টিকিয়ে রাখতে হলে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার সেই ‘শীতল’ মনোভাব থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের রাজনীতিকরা আজ সেই পরমতসহিষ্ণুতার বাষ্পীভবন ঘটিয়ে ফেলেছেন। তারা জানেন, মানুষকে যত বেশি উত্তেজিত করা যাবে, ভোটব্যাংকের পারদ তত বেশি চড়বে। এই যে উত্তেজনার পারদ বাড়ানো, এটিই কি তবে আধুনিক গণতন্ত্রের স্ফুটনাঙ্ক?

দিল্লির সেই লাল বেলেপাথরের অট্টালিকাগুলো থেকে যে রাজনীতির চাষ হয়, তা আজ দেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে। মেহরাম নগরের সেই আদিম কৃষিজীবী মানুষগুলো আজ আর মাটির গন্ধ শুকতে পারে না, তারা এখন রাজনৈতিক দলের পতাকার রঙ চেনে। সেই রঙগুলো আজ শান্তির নয়, বরং যুদ্ধের সংকেত বয়ে আনে। ক্ষমতার এই খেলা এমনই এক নিষ্ঠুর রৌদ্রদহ যে, এতে মনুষ্যত্বের ঘাসগুলো আর জন্মাতে পারে না। যখন কোনো নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন যে তিনি ‘দেখে নেবেন, তখন বুঝতে হবে সেই আগুন কেবল প্রতিপক্ষের ঘরে লাগবে না, তা পোড়াবে গোটা দেশের সভ্যতাকে। রাজনীতির এই উচ্চ তাপমাত্রা আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে বিকল করে দিয়েছে যে, আমরা সাধারণ জনস্বাস্থ্যের চেয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা ভুলেই গেছি যে, আগুনের কোনো ধর্ম নেই; সে যখন জ্বলে, তখন সে বিচার করে না কে ধার্মিক আর কে অধার্মিক।

দেশ আজ এক অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর রাজনীতির কারবারিরা সেই আগুনে ঘি ঢালছেন। এই যে অবক্ষয়, এটিই কি পতনের মূল কারণ নয়? যখন একটি দেশের শিক্ষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতি—সবই রাজনীতির এই রুদ্রতাপে ঝলসে যায়, তখন সেখানে আর প্রাণের স্পন্দন থাকে না। মেহরাম নগরের আকাশ দিয়ে যখন বিমানগুলো ওড়ে, তখন তারা যেমন জ্বালানির ধোঁয়া ছেড়ে যায়, ঠিক তেমনি রাজনীতির এই দানবীয় ইঞ্জিনগুলো সমাজকে দূষিত করে চলেছে। আমরা আজ এক এমন এক সভ্যতায় বাস করছি যেখানে ‘ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা’ শব্দবন্ধটি অভিধান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। উত্তেজনা, উন্মাদনা এবং উগ্রতা—এই তিনের সংমিশ্রণে তৈরি হচ্ছে এক নতুন তাপমাত্রা, যা আমাদের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

এই ক্ষমতার মরীচিকা মানুষকে অন্ধ করে দিয়েছে। যে মানুষটি রোদে পুড়ে রিকশা চালায় বা যে কৃষকটি বৃষ্টির আশায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, তাদের জন্য রাজনীতির এই উত্তাপ কোনো সমাধান আনে না। তাদের কেবল প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, আর সেই প্রতিশ্রুতির উত্তাপে তারা আরও বেশি করে দগ্ধ হয়। আমরা কি পারি না আবার সেই মেহরাম নগরের মতো একটি ছায়াঘেরা রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে? যেখানে আলোচনার টেবিলে থাকবে জলের মতো শীতলতা, যেখানে অন্যের মতকে গ্রাহ্য করার মতো মনের উদারতা থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। দিল্লির রাজপথ থেকে শুরু করে বাংলার সবুজ প্রান্তর—সর্বত্র আজ রাজনীতির লু-হাওয়া বইছে। এই হাওয়া আমাদের ফুসফুসকে অবশ করে দিচ্ছে, আমাদের বিচারবুদ্ধিকে বাষ্পীভূত করে দিচ্ছে।

রাজনীতি যখন ধর্মের সাথে হাত মেলায়, তখন সেই উত্তাপ হয়ে ওঠে পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো বিধ্বংসী। তখন আর কোনো যুক্তি চলে না, কেবল চলে আবেগের দাবানল। আমরা আজ সেই দাবানলের শিকার। দেশ, মানুষ, মনুষ্যত্ব—সবই আজ এই রাজনৈতিক চুল্লিতে আহুতি দেওয়া হচ্ছে। মেহরাম নগরের সেই সোলাঙ্কিদের আদিম সরলতা আজ আমাদের জন্য এক দূরবর্তী রূপকথা। আজ আমরা কেবল জানি কীভাবে প্রতিপক্ষকে পুড়িয়ে ছারখার করতে হয়। এই যে ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি, এটিই কি তবে আমাদের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি? এই প্রশ্নটিই আজ ইতিহাসের পাতায় উত্তপ্ত অক্ষরে লেখা হচ্ছে। আমরা কি পারব এই আগুন নেভাতে, নাকি এই আগুনের শিখায় দগ্ধ হয়েই শেষ হবে আমাদের সাধের সভ্যতা?

বাস্তব উন্নয়ন বলতে যা বোঝায়—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্মল বায়ু আর পানীয় জল—তা আজ রাজনীতির অভিধান থেকে নিখোঁজ। মেহরাম নগরের বিমানবন্দরের টার্মিনালগুলো ঝকঝক করে ঠিকই, কিন্তু তার পেছনের বস্তিগুলোতে আজও ডাস্টবিনের দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। উন্নয়নের নামে আমরা কেবল কংক্রিটের জঙ্গল বানিয়েছি, যা সূর্যতাপকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু সেই যমুনার দূষণ রোধ করার বা আরাবল্লির পাহাড়কে রক্ষা করার কোনো বাস্তব পরিকল্পনা আজও সফল হয়নি। কেন? কারণ তাতে তাৎক্ষণিক কোনো রাজনৈতিক লাভ নেই। আমরা এমন এক 'চিফ মিনিস্টার' সংস্কৃতি তৈরি করেছি যেখানে দৃশ্যমান চাকচিক্যই শেষ কথা, মানুষের অন্তরের জ্বালা মেটানোর কোনো দায়বদ্ধতা সেখানে নেই। জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনে হাততালি দেওয়া তৃষ্ণার্ত জনতা যখন বাড়ি ফেরে, তখন তাদের কলতলায় জল থাকে না, তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো নিশ্চিত দিশা থাকে না।

এই যে বাস্তব উন্নয়নের অভাব, এটিই মানুষের মনে জন্ম দেয় এক নীরব অস্থিরতা। সেই অস্থিরতা যখন চরমে পৌঁছায়, তখনই সমাজ তার সহনশীলতা হারায়। আমরা যখন দেখি কোটি কোটি টাকা খরচে উৎসব হচ্ছে, অথচ হাসপাতালে একটা বেড নেই, তখন মনের তাপমাত্রা বাষ্পীভবনের সীমা ছাড়িয়ে যায়। রাজনীতির এই দহনকাল আমাদের শিখিয়েছে কেবল দাবি করতে আর ঘৃণা করতে। আমরা ভুলে গেছি যে, উন্নয়ন মানে কেবল বড় রাস্তা বা ফ্লাইওভার নয়, উন্নয়ন মানে হলো এমন এক সমাজ যেখানে মানুষ নির্ভয়ে শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারে। কিন্তু আমাদের বর্তমান শাসকরা আমাদের সেই শীতলতা দিতে ব্যর্থ। তারা কেবল জানেন কীভাবে আগুনের ওপর ঘি ঢালতে হয়। তাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতাগুলো আসলে এক একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নয়, বরং তা আগুনের লিলিহান শিখা।

মেহরাম নগর আর আমাদের এই দুইদিনের পান্থশালা । সাধারণ মানুষগুলো আজ দিশেহারা। তারা দেখেছে কীভাবে তাদের চারণভূমি বিমানবন্দরের রানওয়ে হয়েছে, কীভাবে তাদের নদীটি বিষাক্ত ড্রেন হয়েছে। তারা এখন ভোট ভিক্ষার সেই মরসুমি উৎসবের দর্শক মাত্র। তাদের সামনে যে রঙিন স্বপ্নগুলো ঝোলানো হয়, রোদের তেজে সেগুলো বিবর্ণ হতে সময় লাগে না। এই যে রাজনীতির অলীক মরীচিকা, এটিই আমাদের জাতীয় অবক্ষয়ের মূল কারণ। যখন শাসকের কাছে মানুষের প্রাণের চেয়ে ক্ষমতার আসন বড় হয়ে ওঠে, তখন দেশ একটি অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। আমরা আজ সেই কুণ্ডের ভেতরেই বাস করছি। তাপমাত্রা বাড়ছে প্রকৃতির নিয়মে নয়, বরং আমাদের অপশাসনের ধোঁয়ায়।

 



অষ্টম পরিচ্ছেদ: 
রুল ব্রেক

শহরের ধমনীর মতো ছড়িয়ে থাকা চওড়া রাজপথগুলো আজ আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ নয়, তা হয়ে উঠেছে এক একটি উন্মত্ত রণক্ষেত্র। বিশেষ করে মেহরাম নগরের সেই বিমানবন্দরের সংযোগস্থল থেকে শুরু করে গোটা শহরের ট্রাফিক জ্যামের দিকে তাকালে মনে হয়, আস্ত একটা সভ্যতা যেন লোহার খাঁচায় বন্দি হয়ে ছটফট করছে। পিচগলা রাস্তা থেকে উঠে আসা আগুনের হলকা, আর হাজার হাজার যান্ত্রিক দানবের ইঞ্জিন থেকে নির্গত তপ্ত নিশ্বাস মিলে এক অসহ্য নরককুণ্ড তৈরি করে। এই জ্যামে আটকে থাকা মানুষগুলোর মনের তাপমাত্রা তখন বাইরের ৪৭ ডিগ্রিকে অনায়াসেই হার মানায়। হর্নের যে অবিরাম চিৎকার—তা কোনো সংকেত নয়, তা হলো এক আদিম অসহিষ্ণুতার আর্তনাদ। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নয়; প্রত্যেকেই চায় অন্যকে টপকে আগে যেতে। এই যে ‘ওভারটেক’ করার নেশা, এটিই কি আমাদের বর্তমান সভ্যতার প্রধান চরিত্র নয়?

ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি অনন্ত দহন। সেখানে কোনো শৃঙ্খলা নেই, আছে কেবল নিয়ম ভাঙার এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। ‘রুল ব্রেক’ বা নিয়মভঙ্গ করাটাই এখনকার সময়ে চাতুর্য বা বীরত্বের লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। ট্রাফিক পুলিশ যখন অসহায়ের মতো ঘাম মোছে, তখন তার চোখের সামনে দিয়েই সাই সাই করে বেরিয়ে যায় ক্ষমতাবান বা উদ্ধত তরুণের গাড়ি। এই যে নিয়ম না মানার মানসিকতা, এটি আসলে আমাদের হৃদয়ের ক্রমবর্ধমান তাপেরই ফল। তাপমাত্রা বাড়লে যেমন অণু-পরমাণুরা বিশৃঙ্খলভাবে ছোটাছুটি করে, ঠিক তেমনি আমাদের সমাজের মানুষেরাও আজ বিশৃঙ্খল। কার আগে কে যাবে, কার গাড়ি কত বড়, কে কত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাবে—এই ইঁদুর দৌড়ে আমরা ভুলেই গেছি যে রাস্তার পাশে আরও অনেক মানুষ আছে।

 এগিয়ে যাওয়াই আজ একমাত্র লক্ষ্য। তা সে হোক না কাউকে কুচলে বা মাড়িয়ে। চাকার তলায় কার স্বপ্ন পিষ্ট হলো, কার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলো, কার বুক ফাটা হাহাকার বাতাসে মিশে গেল—তা দেখার মতো সময় বা শীতল মস্তিষ্ক আজ আমাদের নেই। আমরা আজ এক ‘ব্লাইন্ড রেস’-এর ঘোড়া। মেহরাম নগরের সেই সোলাঙ্কিরা যখন বাছুর নিয়ে রাস্তা পার হতো, তখন পথিকরা দাঁড়িয়ে যেত। এক মায়া ছিল, এক ধৈর্য ছিল। আর আজ? রাস্তার মোড়ে কোনো বৃদ্ধ বা শিশু যদি সামান্য দেরি করে পার হতে চায়, তবে একশটি হর্ন তাকে আক্রমণ করে। যদি কেউ দুর্ঘটনায় পড়ে রাস্তার ধারে কাতরায়, তবে সাহায্য করার বদলে মানুষ ভিড় জমায় ভিডিও করতে। এই যে সহমর্মিতার মৃত্যু, এই যে অন্যকে মাড়িয়ে যাওয়ার হিংস্র আকাঙ্ক্ষা—এটাই কি সেই ‘উন্নয়ন’ যা আমরা চেয়েছিলাম?

রাজনীতি আর ক্ষমতার ট্রাফিকও ঠিক এই রাস্তার মতোই। সেখানেও একে অপরকে টপকে যাওয়ার জন্য চলে কুৎসিত ষড়যন্ত্র। ছোট মেজাজ আর বড় গাড়ি—এই দুয়ের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণমুখর পরিবেশ। রাস্তায় সামান্য ধাক্কা লাগলে মানুষ আজ পিস্তল বের করে বা লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই যে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা, এটিই সেই ‘স্ফুটনাঙ্ক’। মানুষের স্নায়ুগুলো আজ তপ্ত তারের মতো টানটান হয়ে আছে; সামান্য আঘাতেই তা ছিঁড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটিয়ে দেয়। আমাদের সভ্যতা আজ এক বিশাল ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্সের মতো, যার ভেতরে মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাচ্ছে ‘মানবতা’, কিন্তু রাস্তা ছাড়ার মতো মানবিক বোধটুকু কারো নেই।

 আমরা কি পারব আবার সেই শান্ত চারণভূমির মতো জীবন ফিরে পেতে? যেখানে গতির চেয়ে স্থিতির দাম বেশি ছিল, যেখানে জেতার চেয়ে পাশে থাকাটা বড় ছিল। কিন্তু দিল্লির এই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রাজপথে সেই চিন্তা করাও আজ বিলাসিতা। চাকা ঘুরছে, তাপ বাড়ছে, আর আমরা একে অপরকে পিষ্ট করে এক অলীক গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছি। এই গন্তব্যের শেষ কোথায়? হয়তো কোনো এক বিশাল মহাসড়কের মোড়ে, যেখানে কোনো নিয়ম থাকবে না, কোনো আলো থাকবে না, থাকবে কেবল ভাঙাচোরা কিছু মানুষের অবশিষ্টাংশ। সভ্যতার এই যানজট কি কোনোদিন খুলবে? নাকি এই অস্থিরতার তাপে আমরা সবাই একদিন একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাব?

সভ্যতা আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে চিৎকার করে ভোট চাওয়াটাই বীরত্ব, আর নিভৃতে মানুষের সেবা করাটা দুর্বলতা। বোধশক্তি যখন তার স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছায়, তখন মানুষ আর সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে না। সে তখন সেই জ্বালাময়ী বক্তৃতার মোহিনী মায়ায় ধরা দেয় এবং নিজের বিনাশ নিজেই ডেকে আনে। আমরা কি পারব এই মরীচিকা ভেদ করে বাস্তবের শীতল ছায়ায় ফিরে যেতে? নাকি এই রাজনৈতিক দহনই হবে আমাদের সভ্যতার শেষ শ্মশান? দিল্লি থেকে শুরু হওয়া এই আগুনের পথ কি সত্যিই কোথাও গিয়ে শান্তির বৃষ্টিতে শেষ হবে?

 

অষ্টম পরিচ্ছেদ: ডিজিটাল দাবানল ও দগ্ধ বিবেকের হাহাকার

পৃথিবী আজ আর কেবল মাটি, জল আর বাতাসের পিঞ্জর নয়; তা আজ এক অদৃশ্য তড়িৎ-তরঙ্গ আর সিলিকন চিপের মায়াজালে বন্দি। আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা ওই ক্ষুদ্র কাঁচের পর্দাটি আজ আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তা হয়ে উঠেছে এক বিশালাকার বৈশ্বিক অগ্নিকুণ্ড। দিল্লির প্রখর রোদে চামড়া পোড়ে ঠিকই, কিন্তু এই ডিজিটাল পর্দার নীল আলোয় আমাদের আত্মা আজ দাউ দাউ করে জ্বলছে। সোশাল মিডিয়া—যাকে ভাবা হয়েছিল দূরত্বের সেতুবন্ধন, আজ তা পরিণত হয়েছে এক অনিয়ন্ত্রিত বিষবাষ্পের আঁতুড়ঘরে। পোস্ট, কমেন্ট আর প্রতিক্রিয়ার নামে সেখানে যা চলছে, তা কোনো সুস্থ সভ্যতার পরিচয় নয়, বরং এক আদিম ও অসভ্য উল্লাস।

এই ডিজিটাল জগতের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো এর ‘ছদ্মবেশ’। পর্দার ওপারে কে বসে আছে, তার প্রকৃত পরিচয় কী, তার দায়বদ্ধতা কোথায়—তা আজ কুয়াশাচ্ছন্ন। যেহেতু এখানে মানুষকে সরাসরি চিনে নেওয়া বা আইডেন্টিফাই করে তার কৃতকর্মের জবাবদিহি করা প্রায় অসম্ভব, তাই একদল মানুষ অত্যন্ত কদর্যভাবে এই অরণ্যের সুযোগ নিচ্ছে। অভদ্রতা করেও পার পেয়ে যাওয়া আজ এক নিত্যনৈমিত্তিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বাকস্বাধীনতার সেই পবিত্র সংজ্ঞাকে আজ কলুষিত করে দেওয়া হয়েছে; এর আড়ালে চলছে বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ এবং পরিকল্পিত মিথ্যার কারবার। কাউকে ধরা যাচ্ছে না বলেই যেন মানুষের ভেতরের সেই অবদমিত পাশবিকতা আজ সহস্র মুখে ফণা তুলছে।

 এই অনিয়ন্ত্রিত অসভ্যতা মানুষের চেতনার বাতিঘরটিকে নিভিয়ে দিচ্ছে। মানুষের মনের তাপমাত্রা আজ আর স্বাভাবিক নেই; তা নিরন্তর বাড়ছে। আমরা আজ সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতর অনুভূতির জগৎ থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছি। কোনো ধ্রুপদী সংগীতের আলাপ, কোনো গভীর দর্শনের গদ্য বা কোনো বিমূর্ত চিত্রকলায় মনোনিবেশ করার মতো শীতল মস্তিষ্ক আজ আমাদের নেই। মানুষের চেতনা আজ কেবল সেইসব খবর বা সংবাদের পেছনে উন্মাদ হয়ে ছুটছে, যা উত্তেজনা ছড়ায়, যা কুৎসা রটায়—যার অধিকাংশই আজ বানোয়াট বা ‘ফেব্রিকেটেড’। মানুষ আজ তথ্যের ভোক্তা নয়, সে আজ উত্তেজনার দাস। এই বিষাক্ত খবর কনসিউম করতে করতে আমাদের বিচারবুদ্ধি আজ পঙ্গু হয়ে পড়েছে। আমরা আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি, আমরা কেবল রিঅ্যাক্ট করতে জানি, রেসপন্ড করতে জানি না।

খবরের এই কৃত্রিম তাপমাত্রা আজ এতটাই চড়া যে, মুহূর্তের অসতর্কতায় মানুষ মানহানির মামলায় ফেঁসে যাচ্ছে, অথচ সেই কলঙ্কিত খবরটিই আবার দাবানলের মতো ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। সত্যের চেয়ে কুৎসার গতি আজ আলোর চেয়েও বেশি। একটি মিথ্যা যখন লক্ষবার শেয়ার হয়, তখন তা সত্যের পোশাক পরে জনমানসে আসন গেড়ে বসে। আর এই ডামাডোলের মাঝে চিরতরে হারিয়ে যায় মানবিক গরিমা। আমরা ভুলে গেছি যে, একটি সভ্য সমাজ কেবল তার প্রযুক্তি দিয়ে পরিচিত হয় না, তার পরিচয় তার শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির উচ্চতায়। কিন্তু আজ আমাদের সেই দর্পণে কেবল কালিমা।

সভ্যতা কি শিল্প আর সংস্কৃতি ছাড়া কোনোদিন প্রাণ ফিরে পেতে পারে? শিল্প মানে তো স্থিরতা, সংস্কৃতি মানে তো সহনশীলতা। কিন্তু আমাদের মন যদি শান্ত না থাকে, যদি আমাদের মস্তিষ্কের পারদ সর্বক্ষণ স্ফুটনাঙ্কের ওপর চড়ে থাকে, তবে কে পড়বে জীবনানন্দ দাশের ধীরস্থির কবিতা? কার সময় হবে রুশো বা কান্টের দর্শনের জটিল গোলকধাঁধায় প্রবেশের? চিত্রকর যখন তার তুলিতে কোনো প্রশান্ত গোধূলির রং মেশান, সেই রঙের আবেদন বোঝার মতো চোখ আজ আমাদের নেই; আমাদের চোখ আজ কেবল স্ক্রল করে চলা সস্তা ক্লিপিংসে অভ্যস্ত। আর্ট আর কালচার হলো মনের বৃষ্টির মতো, যা তপ্ত মাটিকে শীতল করে। কিন্তু যেখানে মাটির নিচেও আজ আগুন জ্বলছে, সেখানে সেই বৃষ্টির ফোঁটা স্পর্শ করার আগেই বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।

মানুষ তার সৃজনশীলতার আধারটিকে আজ নিজেই বিষাক্ত করে তুলছে। সোশাল মিডিয়ার এই কোলাহল আসলে এক মহাজাগতিক একাকীত্বেরই প্রকাশ। মানুষ একা বলেই সে ভিড় বাড়ায় ভার্চুয়াল কমেন্ট বক্সে, আর সেই ভিড়ে সে হারায় তার নিজস্বতাকে। গালাগালি আর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই মহোৎসব আসলে এক রুগ্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই যে ক্রমাগত উত্তাপ বাড়ানো, অন্যের চরিত্রহনন করা আর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মরিয়া হওয়া—এটাই কি আমাদের অগ্রগতির পরম লক্ষ্য ছিল?

দিল্লির সেই যমুনার কালো জল যেমন মাছের বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে, আমাদের এই ডিজিটাল বায়ুমণ্ডলও আজ সুস্থ মানুষের চিন্তা করার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আমাদের আজ এক আমূল ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ দরকার, এক দীর্ঘ মেয়াদী শীতলতার প্রলেপ দরকার। যদি মানব মন শান্ত না হয়, যদি আমরা এই উত্তপ্ত প্রচারণার মরীচিকা থেকে বেরিয়ে না আসি, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম কোনোদিন জানবে না যে কবিতা কী বা শিল্প কী। তারা কেবল জানবে ট্রোলিং, তারা কেবল জানবে ভাইরাল হওয়া আর অন্যকে মাড়িয়ে যাওয়ার আদিম নেশা। এই অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ একটাই—মনের তাপমাত্রা কমিয়ে আনা, আর সেই হারানো শীতলতার ছায়ায় বসে সত্য আর সুন্দরের সাধনা করা। নয়তো, এই আগুনের গ্রাসে শেষ হয়ে যাবে আমাদের হাজার বছরের তিলে তিলে গড়া সভ্যতা।

 


নবম পরিচ্ছেদ:  মহাপ্রলয়ের সংকেত

ইন্দ্রপ্রস্থের আকাশ আজ আর মেঘের ছায়া চেনে না, সে চেনে কেবল আগুনের হলকা। সেই প্রখর দহনবেলায় যখন যমুনার শুষ্ক বালুচরের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় এক বিশাল কঙ্কালের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। কালিন্দীর সেই স্রোত আজ কেবল বই-পুস্তকের পাতায় বন্দি; বাস্তবে সেখানে বয়ে চলে এক বিষাক্ত ধোঁয়া আর ধুলোর ঝড়। দিল্লির নাড়ি আজ শুকিয়ে গেছে। যে মাটির নিচে একসময় শীতল জলধারা খেলা করত, আজ সেখানে কেবল শূন্যতা। কলতলায় যখন হাহাকার ওঠে, যখন জলের একটি ট্যাঙ্কারের পেছনে হাজার হাজার তৃষ্ণার্ত মানুষ পাগলের মতো ছোটে, তখন বুঝতে পারি আমরা কত বড় এক বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। জলহীনতা কেবল তৃষ্ণার নাম নয়, এটি একটি মৃতপ্রায় সভ্যতার অন্তিম আর্তনাদ।

এই সংকটের মূলে রয়েছে এক দানবীয় বাস্তবতা—দিল্লির জনসংখ্যা আজ তিন কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এক সময়কার সেই শান্ত মেহরাম নগর, যেখানে সোলাঙ্কিদের বাছুরগুলো মুক্ত বাতাসে বিচরণ করত, আজ সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। তিন কোটি মানুষের নিশ্বাস আর তাদের অবিরাম চাহিদার চাপে দিল্লির ফুসফুস আজ অবশ। যেটুকু জমি অবশিষ্ট ছিল, তাও গ্রাস করে নিয়েছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর কংক্রিটের জঙ্গল। মাটির প্রতিটি ইঞ্চি আজ সিমেন্টে ঢাকা, ফলে বৃষ্টির এক ফোঁটা জলও আর গর্ভে প্রবেশের সুযোগ পায় না। পৃথিবী আজ রুদ্ধশ্বাস। মানুষের এই অতি-ঘনবসতি যেন এক জীবন্ত বিস্ফোরণ, যা প্রতি মুহূর্তে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিন কোটি মানুষের চিৎকার, কোলাহল আর গতির ঘর্ষণে দিল্লির বাতাস আজ বিষাক্ত গ্যাসে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এই ভিড়ের চেয়েও ভয়ংকর হলো নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। একটি সমাজ যখন তার নিয়মকানুন ভুলে যায়, যখন নীতিমালা কেবল কাগজের নৌকার মতো ভেসে বেড়ায়, তখন সেই সমাজের কাঠামো ভেঙে পড়তে বাধ্য। দিল্লিতে আজ কেউ নিয়ম মানে না। লাল সিগন্যাল ভাঙা থেকে শুরু করে জলের পাইপলাইন কেটে চুরি করা—সবই আজ বীরত্ব হিসেবে গণ্য হয়। নিয়ম ভাঙার এই সংস্কৃতি আসলে এক গভীর অসহিষ্ণুতার প্রকাশ। মানুষ যখন জানে যে সম্পদ সীমিত, অথচ ভোগীর সংখ্যা কোটি কোটি, তখন সে আর নীতি মেনে চলার ধৈর্য রাখে না। সে চায় কেড়ে নিতে, সে চায় অন্যের অধিকার মাড়িয়ে নিজের তৃষ্ণা মেটাতে। মেহরাম নগরের সেই আদিম শৃঙ্খলার জায়গায় আজ রাজত্ব করছে এক চরম নৈরাজ্য। এই শৃঙ্খলাহীনতা কি সভ্যতার পতনের মূল কারণ নয়?

দিল্লির অবশিষ্ট যেটুকু জল আছে, তা আজ যেন আক্ষরিক অর্থেই ফুটতে শুরু করেছে। রোদের উত্তাপে জলাধারের জল যখন উত্তপ্ত হয়, তখন তা কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, তা আমাদের সামষ্টিক উত্তেজনার প্রতীক। তিন কোটি মানুষের জমানো রাগ, ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস মিলে এক অদৃশ্য বাষ্প তৈরি করেছে, যা আমাদের মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সহনশীলতা—যা একদা আমাদের সমাজের অলঙ্কার ছিল—তা আজ তার অন্তিম স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছে গেছে। মানুষ আজ কথা বলে না, সে কেবল চিৎকার করে। ছোটখাটো বচসা আজ প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়। আমরা এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে সামান্য একটি আগুনের ফুলকি গোটা শহরকে জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সহনশীলতার এই চূড়ান্ত বিনাশই কি সেই মহাপ্রলয়ের সংকেত, যার কথা প্রাচীন মুনি-ঋষিরা বলে গেছেন?

জমিন আজ শেষ। দিল্লির সীমানা আর বাড়তে পারে না, কিন্তু মানুষের চাহিদা বেড়েই চলেছে। এই রুদ্ধদ্বার পরিস্থিতিতে মানুষ আজ একে অপরের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে নদীর জল আমরা দেবতা জ্ঞান করে পূজা করতাম, আজ সেই নদী শুকিয়ে বিষাক্ত ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এই শুষ্কতা কেবল বাইরে নয়, এই শুষ্কতা আমাদের অন্তরেও। তিন কোটির এই জনসমুদ্র আসলে একেকটি নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো, যারা কেবল নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত। আমরা ভুলেই গেছি যে, প্রকৃতিকে বঞ্চিত করে কোনো সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। দিল্লির এই উত্তপ্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আজ মনে হয়, আমরা কি সত্যিই প্রগতির শিখরে উঠছি? নাকি আমরা এক অতল গহ্বরের দিকে ঝাঁপ দিচ্ছি যেখানে জল নেই, ছায়া নেই, আছে কেবল আগুনের লেলিহান শিখা?

অলক্ষে এই বিনাশ যে গতিতে বাড়ছে, তা আমরা আমাদের যান্ত্রিক জীবনে বুঝতেই পারিনি। আমরা এসি ঘরের কৃত্রিম শীতলতায় নিজেদের লুকিয়ে রেখেছি, অথচ বাইরের পৃথিবীটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। যখন সেই কৃত্রিম শীতলতাও আর কাজ করবে না, যখন যমুনার শেষ ফোঁটা জলটুকুও বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে, তখন এই তিন কোটি মানুষের ভিড় কোথায় দাঁড়াবে? তখন কোনো ‘চিফ মিনিস্টার’-এর জ্বালাময়ী বক্তৃতা বা কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কি এক অঞ্জলি জল জোগাতে পারবে? সেই বিভীষিকার কথা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। সহনশীলতা যখন স্ফুটনাঙ্ক অতিক্রম করে বাষ্প হয়ে যায়, তখন আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না; তখন শুরু হয় এক মহাজাগতিক ধ্বংসলীলা।

দিল্লির এই তপ্ত রণক্ষেত্র ছেড়ে আমাদের মন এখন এক গভীরতর শান্তির অন্বেষণ করছে। উত্তরের এই আগুনের ফুলকি কি কোনোদিন শীতল হবে? এই প্রশ্ন নিয়ে আজ আমরা এই অগ্নিগর্ভ শহর থেকে দূরে, পূর্বের সেই পুণ্যভূমির দিকে যাত্রা করছি—যেখানে গঙ্গা তার পবিত্র শীতলতা নিয়ে অপেক্ষা করছে সাগরসঙ্গমের জন্য। দিল্লির এই দহন কি গঙ্গাসাগরের সেই পুণ্যস্নানে প্রশমিত হবে? নাকি আমাদের ভেতরের এই আগুনের তাপ সেখানেও পৌঁছে যাবে? দিল্লির এই অন্তিম হাহাকার আমাদের ঠেলে দিচ্ছে সেই শেষ ঠিকানার দিকে, যেখানে ধর্ম, মেলা আর মানুষের ভিড় এক নতুন উত্তর খুঁজতে সমবেত হয়।

 

দশম পরিচ্ছেদ: প্রেমহীনতায় কে বাঁচিতে চায়

আকাশের মেঘেরা আজ একদল পাষাণ যাযাবর। তারা আসে, দিগন্তের ওপারে তাদের ধূসর ডানার ছায়া ফেলে, বজ্রের নির্ঘোষে চরাচর কাঁপিয়ে দেয়—কিন্তু সেই আস্ফালন কোনো বারতা বয়ে আনে না। দিল্লির তপ্ত পিচ আর মেহরাম নগরের বিমানবন্দরের ধূসর রানওয়ের ওপর এক ফোঁটাও বারিবর্ষণ হয় না। এই মেঘের প্রতারণা যেন আমাদের আধুনিক সময়েরই এক ক্রূর পরিহাস। চারদিকে কেবল শব্দের গর্জন, প্রতিশ্রুতির মেঘডম্বরু আর রাজনীতির আস্ফালন, কিন্তু তৃষ্ণার্ত প্রাণের পিপাসা মেটানোর মতো একবিন্দু শীতলতা কোথাও নেই। আমরা এক ভয়ঙ্কর খরা ও চরম জলহীনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। শুধু কি জলের অভাব? না, এ এক নিদারুণ ‘প্রেমহীনতা’। যে সমাজে মানুষের মনে মানুষের জন্য একবিন্দু করুণা নেই, যেখানে সহমর্মিতা আজ বাষ্পীভূত, সেখানে বেঁচে থাকা আর আগুনের ওপর হাঁটা একই কথা।

দিল্লির সেই ডোমেস্টিক এয়ারপোর্ট-এর যান্ত্রিকতা আর ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আজ মনে হয়, আমরা সবাই কিছু একটা ছেড়ে পালাতে চাইছি। কিন্তু পালাব কোথায়? তিন কোটি মানুষের এই অবরুদ্ধ নগরীতে আজ নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই। জনসংখ্যার এই দানবীয় ভারে দিল্লির প্রতিটি গলি, প্রতিটি রাজপথ আজ রুদ্ধশ্বাস। নীতিমালা কেউ মানে না, নিয়ম ভাঙার এক উন্মত্ত উল্লাস আজ সমাজকে গ্রাস করেছে। যেটুকু জল অবশিষ্ট আছে, তা যমুনার মরা বুকে আজ ফুটতে শুরু করেছে। এই ‘ফুটন্ত’ অবস্থা কেবল জলের নয়, এটি আমাদের সহনশীলতার। ফেসবুকে, খবরের চ্যানেলে, সোশ্যাল মিডিয়ায়—সর্বত্র আজ কেবল অসভ্যতা, গালাগালি আর তপ্ত বাক্যযুদ্ধ। প্রতিটি স্ক্রিন আজ এক একটি ছোটখাটো অগ্নিকুণ্ড, যা মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। এই ডিজিটাল নরকের মাঝে দাঁড়িয়ে কোনো নাগরিক কি শান্তিতে ঘুমাতে পারে? ‘গর্মাগর্মীর রাজনীতি’র এই দেশে শান্তি আজ এক বিলুপ্ত শব্দ।

মেহরাম নগরের সেই পান্থশালার যাত্রীদের কথা আবার মনে পড়ে। মনে পড়ে, সেই সোলাংকি মেষপালকের কথা। সেই শান্ত রাখাল বালকটি যখন তার গাভীকে নিয়ে যমুনার চরে হাঁটত, তখন আকাশের মেঘেরা তাকে ফাঁকি দিত না। প্রকৃতির সাথে মানুষের যে আদিম চুক্তি ছিল, তা আজ আমরা ভেঙে ফেলেছি। আমরা ‘এগিয়ে যাওয়ার’ নেশায় আজ প্রকৃতিকে মাড়িয়ে দিয়েছি, ঠিক যেমন রাজপথে আমরা একে অপরকে কুচলে দিয়ে যেতে চাই। তাপমাত্রা বেড়ে গেছে অসহ্যভাবে। এই তাপ কি কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের? নাকি আমাদের নিজেদের পরিচালনায় তৈরি হওয়া এক কৃত্রিম নরকের? আমাদের আজ এক আমূল ‘পরিবর্তন’ দরকার। তা হোক প্রাকৃতিক মেঘের বর্ষণ, অথবা আমাদের অন্তরের এক নতুন চেতনার প্লাবন। আমরা সেই বৃষ্টির প্রতীক্ষায় আছি, যা কেবল তপ্ত পৃথিবীকে ভেজাবে না, বরং ধুয়ে দিয়ে যাবে আমাদের মনের জমিনে জমে থাকা হিংসা আর অসভ্যতার পুরু ধুলোবালি।

দিল্লির এই অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি পেতে আমরা উত্তর দিকে যাত্রা করি, যেখানে হিমালয়ের পাদদেশে গঙ্গা আজও তার আদিম শীতলতা ধরে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে। হরিদ্বারের তপ্ত ঘাটে দাঁড়িয়ে যখন দেখি লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়, তখন মনে হয় এ কেবল কুম্ভ মেলা বা তীর্থের সমাগম নয়, এ হলো এক মহাজাগতিক তৃষ্ণার মিছিল। দিল্লির সেই ৩ কোটির ভিড় আর এই ঘাটের ভিড় আজ মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। সবাই এসেছে নিজের আত্মার দহন জুড়াতে। কিন্তু হিমালয়ের সেই চিরতুষারাবৃত চূড়াগুলোও আজ যেন ঘামছে। আমাদের পাপের তাপে, আমাদের লোভের আগুনে পাহাড়ের বরফও আজ গলিত অশ্রুর মতো ঝরে পড়ছে। যদি এই হিমালয়ও তার শীতলতা হারায়, তবে আমাদের শেষ আশ্রয় কোথায়?

আজ বড় বেশি বৃষ্টি দরকার। উত্তর ভারতের এই বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি আজ হাহাকার করছে এক পশলা শান্তির জন্য। আমরা কি পারব না আমাদের রাজনীতিকে শীতল করতে? আমরা কি পারব না আমাদের শিক্ষাকে আর একবার মনুষ্যত্বের ছায়ায় নিয়ে আসতে? মেহরাম নগরের সেই বিমানবন্দরের রানওয়ে দিয়ে যখন বিশাল বিমানটি ডানা মেলে আকাশে ওড়ে, তখন সে মাটিকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। আমাদের এই সভ্যতাও আজ ঠিক সেইভাবেই কাঁপছে। আমরা স্ফুটনাঙ্কের এমন এক বিন্দুতে পৌঁছেছি যেখানে আর সামান্য উত্তাপ মানেই মহাপ্রলয়। এই প্রলয় থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো—আবার সেই মাটির কাছাকাছি ফিরে যাওয়া, নিয়ম মানার সংস্কৃতিতে ফিরে আসা এবং অন্যের প্রাণের মূল্য দিতে শেখা।

আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখের মণি জ্বলে যায়। কোথাও কোনো মেঘমল্লারের সুর নেই। কিন্তু তবুও, এই চরম দহনের মাঝে দাঁড়িয়েও আমরা আশাবাদী হতে চাই। হয়তো কোনো এক অলক্ষ্য মেঘে জল জমছে। এমন এক বৃষ্টি আসবে, যা দিল্লির যমুনাকে আবার তার টলটলে যৌবন ফিরিয়ে দেবে, যা মেহরাম নগরের সেই চারণভূমিতে আবার সবুজ ঘাসের গালিচা বিছিয়ে দেবে। এমন এক বৃষ্টি, যা আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার গালাগালির বিষ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে। আমরা সেই বৃষ্টির প্রতীক্ষায় আছি, যা মানুষের ‘উত্তেজিত’ মনকে করবে ‘শান্ত জলের মতো’।

হিমালয়ের দিক থেকে আসা এক চিলতে শীতল বাতাস আজ আমাদের কপালে স্পর্শ করে। এই বাতাস যেন এক সতর্কবার্তা আর আশীর্বাদ দুটোরই মিশেল। সে বলছে—শান্ত হও, থামো, অন্যকে মাড়িয়ে যাওয়ার এই দৌড় বন্ধ করো। দেশ, রাজনীতি, ধর্ম—সবই আজ সেই এক অঞ্জলি পবিত্র জলের জন্য তৃষ্ণার্ত। আমাদের মেজাজ যদি শীতল না হয়, তবে প্রকৃতিও আমাদের আর ক্ষমা করবে না। সহনশীলতা যখন স্ফুটনাঙ্ক অতিক্রম করে বাষ্প হয়ে যায়, তখন আর কোনো জাতি বা সভ্যতার অস্তিত্ব থাকে না। দিল্লির এই আগুনের কাহিনী তাই শেষ হোক এক প্রার্থনায়—বৃষ্টি আসুক। আকাশ থেকে ঝরে পড়ুক করুণার ধারা, আর আমাদের অন্তর থেকে ঝরে পড়ুক পারস্পরিক ভালোবাসার শীতল মেঘ।

রাত্রি ঘনিয়ে আসে। উত্তর ভারতের এই তপ্ত প্রান্তর এখনো ধুঁকছে। কিন্তু দূর আকাশে দেখা যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সে যেন সেই শীতল আগামীর সংকেত। আমরা কি পারব আমাদের এই দগ্ধ পৃথিবীকে আবার এক শান্ত, সুশীতল ছায়ায় রূপান্তর করতে? এই প্রশ্নটিই আজ উত্তর ভারতের প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছে। বৃষ্টি আসুক। মেঘমল্লারের সেই প্রাচীন রাগিনী আবার বেজে উঠুক আমাদের এই রুক্ষ জীবনে। শান্তি, শান্তি, শান্তি।



Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ