Boseda

একটাই ফটো (১)

আমার দশ বছরে বালীতেই নতুন পাড়াতে এসে উঠলাম। এটা - আমাদের নিজেদের একতলা বাড়িতে তিনটা ঘর, বারান্দা, রান্নার ঘর আর পায়খানার ইত্যাদি ছিল। একটা পাতকুয়াও ছিল। সামনে অনেকটা জায়গাতে ফুল সবজির বাগান ছিল। ছোট মতন ব্যাডমিন্টন কোর্ট মতো ছিল। একটা সুন্দর লালরঙের (Red oxide) মেজেওয়ালা রোয়াক ছিল, ওই রোয়াকটা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। মা ও তাঁর কাজের ফাঁকে ওখানে বসে তাঁর ফুরসৎ এর কাজ চালাতেন। আমরা বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা দিতাম। মাথার উপর ছাত থাকাতে বৃষ্টিতে আড্ডার ব্যাঘাত হতো না। রাস্তার নাম ছিল যোড়া অশ্বত্থতলা লেন। এক মাথাতে আমরা যোড়া অশ্বত্থতলা বাসী হলাম। যোড়া অশ্বত্থতলা স্কুলের ঘন্টার আওয়াজ আমাদের বাড়ি থেকে শোনা যেত। আমার দাদাও ঐ স্কুলের ছাত্র ছিল। স্বাভাবিক-ভাবে নতুন বছরের শুরুতে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে গেলাম। নতুন স্কুল নতুন বন্ধু হল। অনেকের সাথে আগে থেকেই পরিচয় ছিল।


(২)
বালী যোড়া অশ্বত্থতলা স্কুল খুব সাধারণ পর্যায়ের ছিল। কোনো রকম ইউনিফর্মের বালাই ছিলনা। সকালবেলাতে আবশ্যিক মর্নিং প্রেয়ারের কোনো নিয়ম ছিলনা। কয়েক জন সম্ভ্রান্ত সম্পন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী দেশের স্বাধীনতার সাথে সাথে শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টায় এই- স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমরা যখন স্কুলেতে- ছাত্র- একসাথে চার জন শিক্ষক পদত্যাগী অরবিন্দ আশ্রমে চলে গেলেন। ১৯৭৪ সালে আমাদের স্কুলের তিন শিক্ষককে- স্বাধীনতা সংগ্রামীর- স্বীকৃতিতে- তাম্রপত্র সম্মানীত করেছিলেন। শিক্ষকদের অনুপ্রেরণাতে- কিছু ছাত্রও ১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবাস করেছিলেন। ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণাব মুখার্জীর বিশেষ আমন্ত্রণে ৭৮ বছর বয়সী শ্রী বৃন্দাবন ঘোষ আমাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র সম্বর্ধনা করে প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামীতে সম্মানীত করেন। যে বছর স্কুলে ভর্তি হলাম সে বছরের উল্লেখ যোগ্য ঘটনা যে চীনের ভারত আক্রমণ।

(৩)
দেশের পরিস্থিতিতে বিরাট পরিবর্তন, ব্ল্যাক আউট, সাইরেন, কালো রঙের ঘেরাটোপে মোড়া রাস্তার ল্যাম্পপোষ্ট। কোথাও কোথাও ট্রেঞ্চ খোড়া হল, আমাদের খেলার জায়গা হল সেই ট্রেঞ্চগুলো। বাজারের সব জিনিসের দাম আগুণ। আমাদের স্কুলে বিশেষ করে কুচকাওয়াজের অভ্যাস শুরু হলো, পাড়ায় পাড়ায় সিভিল ভলান্টিয়ার এসে ফার্স্টএইড এর শিক্ষা দিত। নানা দেশাত্ববোধের গান শোনা যেত। বালীর "শ্রীকৃষ্ণ" হলে মাঝে মাঝে Govt এর নিউজ রিল দেখতে যেতাম। আমাদের অঞ্চলে বিরাট সভা করে জনগন থেকে আর্থিক সাহায্যের আবেদন চলছিল। আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের তহবিলে জমা দেওয়ার জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে রাজ্যপালকে দেওয়া হল। এর মধ্যে আমার একটা ফটো স্কুলের হেডমাষ্টারের ঘরে টাঙানো হল। টাঙানো অবস্থায় এ ফটো আমার দেখা হয়নি। তখন হেডস্যারের ঘরে গিয়ে ফটো দেখা একটা দুঃসাহসিক কাজ ছিল। স্কুলে খুব ভালো ছাত্র ছিলাম না। কখনও প্রথম,


(৪)

দ্বিতীয় স্থানে থাকতাম না। খেলাধূলাতেও কোনো বিশেষ দক্ষতা ছিলনা। আমাদের ক্লাসের সুশীল ঘোষ খুব ভাল সাঁতারু ছিল। জাতীয় স্তরে তার স্থান ছিল। বালীতে তখন অনেক ভালো ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিল। ১৯৫৬ সালে মেলবোর্ন অলিম্পিকে ফুটবলে ভারতের স্থান ছিল চতুর্থ যা আজকাল স্বপ্নের মত মনে হয়। সেই - ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন ছিল বালীর সমর ব্যানার্জী। এছাড়া ভারতের ফুটবল কোচ প্রখ্যাত শচীন মিত্র (লেচা) আমাদের পাড়াতে থাকতেন। আমাদের ক্লাসের অনেকেই ভালো খেলোয়াড় ছিল। তবে Memory game নামে একটা কম্পিটিশনে দুবার প্রথম স্থানে ছিলাম যা প্রকৃত অর্থে স্পোর্টসই ছিলনা। আমার অবস্থা ছিল যাকে ইংরেজিতে বলে Also run. তাহলেও আমাদের Hero ছিল চুনি গোস্বামী, পিকে ব্যানার্জী, পেলে, গ্যারিনচা। তখন সিনেমা জগতের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না।
স্কুলের নতুন শিক্ষকদের বেশ ভালই লাগত। আমাদের P.T. টিচার ছিলেন বারীন দা। স্থানীয় সমস্ত ফুটবল ম্যাচের রেফারীর স্থায়ী পদে ছিলেন। আবার সন্ধেবেলা গানের ক্লাস নিতেন। একেবারে বিপরীত দক্ষতা বিপরীত-


(৫)
মেরুতে অবস্থান। পরে শুনেছিলাম সুকুমার সমাজপতি নামা ফুটবল প্লেয়ার ও খুব উঁচু দরের উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পী ছিলেন। সরোজবাবু আমাদের ভূগোলের ক্লাসে Map-pointing শেখাতেন। তিনি আরেক ক্লাসে আমাদের কেবল গল্পের বই পড়ে শোনাতেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের "সদাশিবের কাণ্ড" এর গল্পগুলো খুব ভালো লেগেছিল। মহারাষ্ট্রের গ্রামের ছেলের বুদ্ধিমত্তায় - ছত্রপতি শিবাজীর একের পর এক কেল্লা জয়ের ঘটনা আমাদের অভিভূত করত। আজকাল ছাত্ররা মোবাইল-ইন্টারনেটের যুগে গল্প শোনার স্বাদ জানে না। আমাদের যে পুরাতন কথকঠাকুরের মুখে গল্প বা পাঁচালী শোনার অভ্যাস আজ আর নেই। আমাদের পরবর্তী জীবনে সকল শিক্ষকদের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণাম।
স্কুলের পর্ব শেষের দিকে দেশের আবহাওয়া হঠাৎ পরিবর্তন শুরু হল। উত্তর বাংলার ছোট গ্রামের কৃষকদের অসন্তোষের সংবাদ সারাদেশে ছড়িয়ে গেল। ক্রমশঃ এই সংগ্রাম রাষ্ট্র শক্তিকে আঘাত করতে শুরু করল।

(৬)

আমাদের পরিচিত- অনেকেই- এই সংগ্রামে যোগ দিল। হঠাৎ জানতে পারলাম আমরা শ্রেণী শত্রুর দলে। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও তার ভয়াল রূপে নির্বিচারে নরমেধ খেতে উঠল। অনেক কাছের লোকও তার বলি হল। সারা দেশ এক অরাজকতাতে প্রবেশ করেছে। এই সময় [তপন]সিংহের 'আপনজন'-র সিনেমা হলে চলছে। ছবির বিজ্ঞাপনে একটা কবিতা ছিল যা দেশের সেই সময়ের অবস্থা বোঝা যেত।
"স্কুল কলেজে খিল
রাস্তায় মিছিল
সোনার চাঁদ ছেলেরা সব
অশ্বমেধের বলি ।"

আমাদের স্কুলেও সেই- আগুনের ছোঁয়া লাগল। ১৯৭০ সালে- সেই আগুনে ১৯৬২ সালের চীন ভারত- যুদ্ধের- রিলিফ ফান্ডে- স্কুলের পক্ষ থেকে তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রীমতি পদ্মজা নাইডুকে- অনুদান দেওয়ার আমার ছবিটা যেটা- হেড স্যারের ঘরে ছিল তা পুড়ে গেল। কোনো দিনই- সেটা- দেখা হয়নি।

Comments

Popular posts from this blog

যমুনার বৃত্তান্ত: মর্মরের কারাগার

লেখকের নিয়তি

লীলা মজুমদার - আনন্দের জগৎ